আজিমপুরের দুর্দান্ত যোদ্ধারা, প্রথম পর্ব

 

আজিমপুরের দুর্দান্ত যোদ্ধারা, প্রথম পর্ব

 মার্চের প্রথম থেকেই ঢাকায় একটা থমথমে ভাব। প্রায় প্রত্যেক দিন মিটিং ও মিছিলের স্লোগানে ঢাকা ভরপুর। ৭ই মার্চে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পর সারা দেশে সাজ সাজ রব পড়ে গেল। বঙ্গবন্ধুর সেই অমর আহবান, “তোমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে,” বাঙ্গালীদের উজ্জীবিত করলো, সবাই যে যার মতো প্রস্তুত হলে থাকলো। আমি তখন আজিমপুর কলোনিতে থাকি। আজিমপুর কলোনির দুর্দান্ত ছেলেদের কেউ ঘাটাতে সাহস করতো না।

 যাই হোক, ২৫-মার্চের কালরাত্রির পর আমরা সকলেই জানতাম যে কলোনিতে পাকিরা রেইড করবে। তাই আমারা অনেকেই সিদ্ধান্ত নিলাম যে প্রথম সুযোগেই যুদ্ধে যেতে হবে। আমাদের এই দলটা পনের জনের। প্রায় সবাই কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। ২৬-সে মার্চ কারফিউ থাকলেও কলোনির ভিতরে আমারা সব বন্ধুরা যোগাযোগ রেখেছিলাম। কোনো মিলিটারির গাড়ি দেখলেই অবশ্য লুকিয়ে পড়তাম। এদিকে মার্চের ২৭ তারিখে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ সারা দেশে মানুষের লাইসেন্স করা অস্ত্র ও গোলাবারুদ জমা দিতে নির্দেশ দেয়। ফলে, ২৮ তারিখে যাদের অস্ত্র আছে তারা সবাই নিকটস্থ থানায় জমা দেবার জন্য বের হয়। আমরা এই সুযোগ ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেই।

 আমরা চার পাঁচটা দলে ভাগ হয়ে আজিমপুর থেকে লালবাগ থানার যাবার রাস্তার আশেপাশে অবস্থান নেই। যারাই অস্ত্র জমা দিতে যাচ্ছিল তাদের কাছ থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে নেই। অনেকেই স্বেচ্ছায় দিয়ে দেন কিন্তু কিছু লোককে একটু কড়া কথা বলতে হয়। এভাবে আমরা বেশ কিছু অস্ত্র ও গোলাবারুদ সংগ্রহ করতে সক্ষম হই। এর মধ্যে ছিল কয়েকটা দুই-নলা বন্দুক (এক নলাও পেয়েছিলাম কিন্তু সেগুলো লুকিয়ে রেখে দেই), কয়েকটা পয়েন্ট টুটু রাইফেল, আর বেশ কয়েকটা বিভিন্ন ক্যালিবারের পিস্তল ও রিভলভার।

 ঢাকায় আমাদের বেশ নাম-ডাক থাকায় আমরা যে পাকিদের কোপানলে পড়ব, সেটা অনুমান করতে পেরেছিলাম। ফলে, আমরা ঠিক করলাম এখন আর বাসায় তো নয়-ই, ঢাকাতেই থাকা যাবে না। সঠিক কোথায় যাব সেটা ঠিক করতে না পারলেও কালকের মধ্যেই যে ঢাকা ত্যাগ করা উচিৎ সেটা বুঝতে পারছিলাম। কাজেই আমরা সবাই ঠিক করলাম কাল অথবা পরশুর মধ্যেই আমরা নদী পার হয়ে আপাতত কেরানীগঞ্জে চলে যাব। আমি সবাইকে যে যার পরিবার পরিজনের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আসতে বললাম। বলে দিলাম একটা ছোট ব্যাগ ছাড়া অন্য কিছু নেয়া যাবে না। ঠিক হলো ভোর চারটার সময় আমরা ১৪-নাম্বার বিল্ডিঙের সামনে মিলিত হয়ে যাত্রা শুরু করবো। কালকে আর যাওয়া হলো না, যেতে যেতে পরশু, অর্থাৎ পহেলা এপ্রিল হয়ে গেল। 

 ১ এপ্রিল ভোর চারটা। নির্ধারিত সময়ে আমরা সবাই মিলিত হলাম। কাছেই এক বন্ধুর বাসায় আমাদের অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুকানো ছিল। সব অস্ত্র ও গোলাবারুদ ১৪ নম্বরের সামনে একটা খোলা মতো যায়গায় জড়ো করা হলো। আমি চিন্তা করছিলো কী নিব, পয়েন্ট টুটু রাইফেল না দো-নালা বন্দুক? পয়েন্ট টুটু রাইফেলের সুবিধা হচ্ছে আমাদের কাছে অনেক টুটু-র গুলি আছে, টূটু-র রেঞ্জ ও বেশী কিন্তু বুলেটগুলো খুব ছোট হবার ফলে মানুষ মারার জন্য কতটুকু কার্যকর সেটা বলা মুশকিল। আবার দো-নলা বন্দুকের রেঞ্জ কম হলেও এটা অনেক ক্ষতি করতে পারে। অনেক চিন্তা ভাবনা করে অবশেষে টুটু রাইফেল নিলাম। 

আমার রাইফেলটা সেমি অটোমেটিক। ব্যারেলের নীচে একটা লম্বা টিউব ম্যাগাজিন যেখানে এক সাথে ১৮-টা গুলি ভরা যেত। কাজেই একটা গুলিতে কাজ না হলে পরপর কয়েকটা গুলি করার সুযোগ থাকবে। পিস্তল ও রিভলভারের মধ্যে থেকে একটা পয়েন্ট ৩২ রিভলভার নিলাম। রিভলভারটা একটা স্যাম ব্রাউন বেল্টসহ খাপে ভরা ছিল। মনে হয় রিভলভারটা কোনো প্রাক্তন পুলিশ অফিসারের হবে। বেল্টসহ খাপ পরার পর নিজেকে নিজের বেশ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হলো। 

যাই হোক আমারা সবাই পছন্দ মতো হাতিয়ার নিয়ে গন্তব্যে রওয়ানা হলাম। আমাদের দলে লালবাগের দুজন ছিল তারা আমাদের কে লালবাগের বিভিন্ন অলিগলি দিয়ে বুড়িগঙ্গার ঘাটে নিয়ে গেল। আমাদের এক বন্ধু আগে থেকেই একটা নৌকা ঠিক করে রেখেছিল, আমরা সবাই নৌকা দিয়ে কোন ঝামেলা ছাড়াই নদী পার হয়ে জিনজিরাতে নামলাম। আমরা যখন নামলাম তখন পূর্ব আকাশে সূর্য উঠি উঠি করছে। আমাদের পরিকল্পনা হচ্ছে জিনজিরাতে কিছুদিন থেকে অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা এবং সুবিধা মতো কোথায় যাব ঠিক করা। 

 আমরা যেখানে নামলাম যায়গাটার নাম রোহিতপুর। এ জায়গাটি নদী সংলগ্ন। আমাদের দলের কয়েকজন জিঞ্জিরার রাস্তাঘাট ভালই চিনত। আপাতত ঠিক হলো আমরা একটি মসজিদে উঠবো। নদীর কাছেই একটি মসজিদে আমার গিয়ে আমাদের মালপত্র মসজিদের বারান্দায় রাখলাম। দেখলাম মসজিদে শুধু আমরা ছাড়াও অনেকে আশ্রয় নিয়েছে। 

ইতোমধ্যে অনেকেই ২৫-সে মার্চের ভয়াবহতা দেখে ভয়ে ঢাকা ছেড়ে নদী পার হয়ে জিনজিরাতে ঠাই নিয়েছে। আমরা সবাই ক্ষুধার্ত, নাস্তা খাওয়া দরকার। মসজিদের মুয়াযযিন কে আমাদের মালপত্রের দিকে লক্ষ্য রাখার অনুরোধ করে আমরা সবাই খাবারের খোঁজে বের হলাম। বেশিদূর যেতে হলো না, কাছেই একটা ছাপরা খাবার দোকান ছিল। দেখলাম পরোটা ভাজছে। ইতোমধ্যে কয়েকজন লোক দোকানের ভিতরে বসে আছে। আমাদের ১৪-জনের বিশাল দল দেখে দোকানি বেশ খুশী হলো, আমাদের কে বসার তোরজোড় শুরু করলো। আমরা চাপাচাপি করে সবাই বসলাম। দেখলাম সবজি রান্না এখনো শেষ হয়নি।

 এখানে মনে হয় আমাদের এই প্রাথমিক আর্থিক অবস্থার বিবরণ দেয়া উচিৎ। সবাইকে বলা ছিল যে যা পারে বাসা থেকে যেন টাকা পয়সা নিয়ে আসেআজিমপুরে যারা থাকে তারা সবাই চাকুরীজীবী। কাজেই কারও বাসায় অনেক টাকা পয়সা থাকে না। যেমন আমার কাছে ২০০ টাকা ছিল। প্রায় সবার কাছেই ২০০ থেকে ৩০০ টাকার মতো, শুধু দুই জন ছাড়াযে দুজন সিদ্দিক বাজারে থাকত। এদের একজনের নাম রহিম, রহিমের বাবার নবাবপুরে হার্ডওয়ারের দোকান। কাজেই রহিমের বাসায় অনেক টাকা থাকত। রহিম তার বাবাকে না বলেই ২,০০০ টাকা ধারকরেছিল। দ্বিতীয় জনের নাম ইদ্রিস। ইদ্রিসের বাবা ইসলামপুরে কাপড়ের ব্যবসা করতেন। ইদ্রিসের কাছে ১৫০০ টাকা ছিল। কাজেই সব মিলে প্রায় ৭,০০০ টাকার মতো। আমি সবাইকে বললাম সবার টাকার অর্ধেক আমাকে দিতে। এই টাকা আমাদের থাকা খাওয়া ও অন্য আনুষঙ্গিক কাজে খরচ করা হবে। আমি রহিমকে এই সব জড়ো করা টাকার দায়িত্ব দিলাম। এখন থেকে রহিম আমাদের কোষাধ্যক্ষ।

 কিছুক্ষণের মধ্যেই নাস্তা টেবিলে এলো, গরম গরম সদ্য ভাজা পরোটা, লাবড়ার মতো সবজি, আর সুজির হালুয়া। আমারা সবাই বেশ তৃপ্তি নিয়ে খেলাম। তারপরে এই কাপ গরম চা সাথে সিগারেট। আমাদের দলের প্রায় সকলের সিগারেটের অভ্যাস ছিল।

 চা-সিগারেট যখন খাচ্ছি, তখন দুটি চিন্তা মাথায় ঘুরছিল। প্রথমটি হচ্ছে, নদীর এতো কাছে আমাদের থাকা ঠিক হবে না। কেননা পাকিস্তান আর্মি যদি এখন নদী পার হয় তাহলে আমরা সহসাই বিপদে পড়ব। আর দুই নাম্বার মাথা ব্যথার কারণ, আমাদের সবার কাছে অস্ত্র থাকলেও সবাই অস্ত্র চালাতে জানে না। ব্যবহার করতে না জানলে অস্ত্র থাকা শুধু অর্থহীনই না বরং অন্যদের জন্য বিপদের কারণ হতে পারে। কাজেই কিছু ট্রেনিঙয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।

 খাওয়া শেষে আমি সবাইকে নিয়ে গোল করে বসলাম এই দুটি বিষয়ে আলোচনার জন্য। সহজেই সকলে আমার সাথে একমত হলো। ঠিক হলো আজকে সন্ধ্যার মধ্যেই আমরা সবাই কেরানীগঞ্জের আরও ভিতরে চলে যাব। আমি ছাড়াও আমাদের দলে আরও দুজন UOTC-র ক্যাডেট ছিল। এই ক্যাডেটদেরকে সেনাবাহিনীর তত্বাবধানে রাইফেল চালানোর প্রশিক্ষণ দেয়া হতো। আমি এই দুইজনকে অস্ত্র প্রশিক্ষণের দায়িত্ব দিলাম।

 এর পর আমি যায়গাটা একটু চেনার জন্য কয়েকজনকে সাথে নিয়ে বের হলাম। কিছুক্ষণ হাটার পরে নীলক্ষেতের তিনজনের সাথে দেখা হলো। নীলক্ষেতের ছেলেদের সাথে আজিমপুরের ছেলেদের অম্লমধুর সম্পর্ক। অম্ল সম্পর্কের কারণ আজিমপুরের ছেলেরা এদেরকে কলোনির মেয়েদেরকে বিরক্তকরতে দিত না, মাঝে মাঝে এ নিয়ে দুই দলের মারামারিও হতো। মধুর সম্পর্কের কারণ হচ্ছে যখন দূরের কোন দল, যেমন মতিঝিল কলোনি, অথবা লালবাগের কেউ যখন আজিমপুর বা নীলক্ষেতের সাথে ঝামেলা লাগতো তখন আজিমপুর ও নীলক্ষেতের ছেলেরা একযোগে তাদের রুখত। কাজেই, অম্লমধুর সম্পর্ক।

 যাই হোক, আমারা শুভেচ্ছা বিনিময়ের পর জানতে পারলাম তারা আমাদের একদিন আগে এসেছে। শীঘ্রই তারা ভারত সীমান্তের দিকে যাবে। ঠিক কোথায় যাবে সেটা এখনো ঠিক করেনি। আমিও তাদেরকে আমাদের সম্পর্কে জানালাম। ঢাকা সম্পর্কে বিশেষ কিছু নতুন জানাতে পারলো না। কিছু সাঙ্গপাঙ্গ পরিবেষ্টিত ছাত্র নেতার সাথে দেখা ও সৌজন্য বিনিময় হলো। আমি তাদের বললাম আমরা যুদ্ধে যোগ দিতে যাচ্ছি, আমাদের কোথায় যাওয়া উচিৎ? তারা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কথা বলল, সেখানে নাকি মুক্তিযোদ্ধারা সংগঠিত হচ্ছে। ঢাকায় থাকতেই অবশ্য ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কথা শুনেছিলাম। এখন মনে মনে ঠিক করলাম, সেখানেই যাব। 

ব্রাহ্মণবাড়িয়া যেতে গেলে আমাদেরকে প্রথমে নরসিংদী যেতে হবে, সেখান থেকে সহজেই ব্রাহ্মণবাড়িয়া যাওয়া যাবে। নরসিংদী এখনও মুক্ত অঞ্চল, কাজেই কালক্ষেপণ না করে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমাদের ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পৌঁছতে হবে। আরও কিছুক্ষণ ঘুরে দেখে আমারা আবার মসজিদে ফিরে গেলাম। এখন প্রায় দুইটা বাজে। কিছুক্ষণ পরে দেখলাম কিছু স্থানীয় ছেলেরা আমাদের জন্য বালটি ভরে ভাত, ডাল, ভাজি, আর মাছের তরকারি নিয়ে এসেছে।

জিঞ্জিরায় এখন অনেক শরণার্থী। স্থানীয় লোকেরা, যারা জিঞ্জিরায় আশ্রয় নিয়েছে, তাদের সব খাওয়া দাওয়ার দায়িত্ব নিয়েছে। মানুষের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা মানুষে মানুষে বিভেদ ভুলিয়ে এক অপূর্ব সৌহার্দের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় লোকেরা যথাসাধ্য চেষ্টা করছে আশ্রিতদের সাহায্য করতে। অনেকেই তাদের নিজের ঘর শরণার্থীদের থাকার জন্য ছেড়ে দিয়েছে।

খাওয়া শেষ হলে আমরা সবাই সলা পরামর্শ করতে বসলাম। আমি সবাইকে জানালাম আমাদের গন্তব্য হওয়া উচিৎ ব্রাহ্মণবাড়িয়া। কেউ দ্বিমত করলো না। সিদ্ধান্ত নিলাম ২ তারিখে খুব ভোরে আমরা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিব। কিন্তু তার আগে আজকেই আমাদের বর্তমান অবস্থান থেকে কমপক্ষে দুই মাইল ভিতরে সরে যেতে হবে।

 ওহ! ভুলেই গিয়েছিলাম, আমাদের দলের সদস্যদের পরিচয় এখনো দেয়া হয়নি। আগেই বলেছি আমারা সর্বমোট ১৪-জন। আজিমপুর কলোনির ৯-জন।

১। সেলিম, বয়স ২৩, কিন্তু দেখে মনে হয় ১৭ বা ১৮, আমাদের মধ্যে সবচেয়ে লম্বায় খাটো হলেও সবচেয়ে আক্রমণাত্মক। যখন আমরা কোনো মারামারিতে জড়াতাম, বেশিরভাগ সময়ে সেলিমই প্রথম আক্রমণ করত। সেলিমের সবচেয়ে বড় সুবিধা ছিল যে প্রতিপক্ষ তার ছোটোখাটো, বালকসুলভ চেহারার জন্য নিরীহ মনে করত। সেলিম কলেজের ছাত্র ছিল।

২। সারোয়ার, বয়স ২৩, বিশ্ববিদ্যালয়য়ের পড়ত, বেশ লম্বা, ছিপছিপে গড়ন, সবার সাথেই সুসম্পর্ক ছিল। পড়াশুনায় ভাল, কলোনিতে ভাল ছেলে বলে সুনাম ছিল। মেয়েরা সারোয়ারকে পছন্দ করত।

৩। মাহতাব, বয়স ১৯, মেধাবী কলেজ ছাত্র। কৌতুক প্রিয়, সবাইকে হাসাতে পারত। কোনো কারণে আমাদের মন খারাপ হলে, তার কাজ ছিল আমাদেরকে উজ্জীবিত করা।

৪। হানিফ, বয়স ২১, কলেজ ছাত্র। খুবই রোমান্টিক, কিছুদিন পরপরই তার একেক মেয়ের সাথে সম্পর্ক হতো বলে দাবি করলেও আমরা জানতাম বেশীর ভাগই তার কল্পনা।

৫। টুটুল, ২৩, চারুকলার ছাত্র, নিয়মিত ব্যায়াম করার ফলে সুঠাম শরীরের অধিকারী। সব সময় এমন কাপড় পড়ত যেন তার শরীরের সব ব্যায়াম পুষ্ট মাংসপেশি দেখা যায়। হাটা চলার সময় কেমন যেন একটু ভারিক্কি ভারিক্কি ভাব ছিল, হাতদুটোকে দুপাশে মেলে ধরে দুলে দুলে চলত।

৬। টনি, বয়স ২৩, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, আমাদের দলের গায়ক। সুরেলা গলা সাথে ভাল গিটার বাজাতে পারত।

৭। রফিক, বয়স ১৭, আমাদের দলের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য, কলেজে প্রথম বর্ষে পড়ত। কনিষ্ঠ হলেও সাহসে কারো থেকে কম না, সবসময় দলের সামনে থাকত। রফিকের পরিবারের সবাই ছিল সুটার বা মার্কসম্যান। রফিক রাইফেল চালাতে সিদ্ধহস্ত ছিল। সে অনেক প্রতিযোগিতায় পুরস্কার পেয়েছিল।

৮। বাচ্চু, বয়স ২২, কলেজের ছাত্র, অসম্ভব সাহসী কিন্তু চুপচাপ শান্ত স্বভাবের। স্বল্পভাষী, ও বিনয়ী। আমি বাচ্চুকে দলের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বলে মনে করতাম এবং সে আমার পাশে থাকলে জানতাম যে দুর্যোগের সময় সে আমাকে ফেলে ভাগবে না।

৯। সোহেল, আমার নাম, বয়স ২২, ইঞ্জিনিয়ারিঙের ছাত্র, আমার ঠাণ্ডা মাথা এবং পরিকল্পনা করার সক্ষমতার কারণে দলনেতা। আমাদের দলের ভিতরে আরেকজন দলনেতা পদের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল, সেলিম। সেলিম দলের নেতা হতে চাইত কিন্তু তার অতি আক্রমণাত্মক স্বভাবের জন্য দলের অন্যদের মন:পুত ছিল না।

আমাদের দলে লালবাগের দুইজন ছিল। এই দুইজন সবসময় আমাদের সাথে থাকার ফলে আমরা সবাই তাদেরকে আমাদের দলের সদস্য করে নেই। আমাদের অনেক কর্মকাণ্ডে এই দুইজনের সক্রিয় ভূমিকা থাকতো।

  ১০। সবুজ, বয়স ২২, কলেজ ছাত্র, গোবেচারা চেহারা, এমন চেহারা যাকে মনে রাখার মতো কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। সে ছিল আমাদের গুপ্তচর। অন্য কোন প্রতিদ্বন্দ্বী দলের খবরাখবর জানার জন্য সবুজ ছিল খুবই কার্যকারী। তার আরেকটা গুণ ছিল, সে যদিও আজিমপুর কলোনিতে থাকতো না, তা স্বত্বেও কলোনির কোথায় কী হচ্ছে, কোন ছেলের সাথে কোন মেয়ের সম্পর্ক, কলোনির বাইরের কোন ছেলের কলোনির কোন মেয়ের সাথে সম্পর্ক, ইত্যাদি সব কিছু সম্পর্কে জানতো এবং প্রয়োজন মনে হলে আমাদেরকে জানতো।

  ১১। মোসলেম, বয়স ২৩, কলেজের ছাত্র, সবুজের মতো সবসময় আমাদের সাথে থাকত। বাবার কেমিকেলের দোকান ছিল। কোনো ধরণের কেমিকেলের দরকার হলে মোসলেম ছিল আমাদের ভরসা। (মাঝেমাঝে পটকা জাতীয় বোমা বানানোর জন্য আমাদের কিছু কেমিকেলের দরকার পড়ত।)

 সিদ্দিক বাজারের দুইজন আমাদের দলের সাথে ছিল। এদের কথা আগেও বলে হয়েছে।

  ১২। রহিম। বয়স ২৩, বাপের ব্যবসা দেখাশুনা করত। (কিন্তু দেখতাম বেশিরভাগ সময় সে কলোনিতে আমাদের সাথে সময় কাটাত)হঠাৎ আমাদের টাকার দরকার পড়লে রহিম ও ইদ্রিস ছিল আমাদের ভরসা। এই দুজনের কাছে সবসময় টাকা থাকতো।

  ১৩। ইদ্রিস, বয়স ২১, কলেজের ছাত্র, হিন্দি ও উর্দু সিনেমার সব ডায়লগ মুখস্থ ছিল, মাঝেমাঝেই এই ডায়লগ ছাড়ত। পাকিস্তানি সিনেমার নায়ক ওয়াহিদ মুরাদের অনুরক্ত, তার মতো চুল কাটাত এবং তাকে অনুকরণ করত।

 পলাশী ও আজিমপুর কলোনির এক অংশের অবস্থান রাস্তার এপারে ও ওপারে। পলাশীর নিজস্ব দল থাকলেও পলাশীর একজন আমাদের দলের সাথে ছিল।

  ১৪। কবির, বয়স ২১, কলেজের ছাত্র। কবির ছিল নামকরা দৌড়বিদ। তাছাড়া সে ছিল জুডোতে ব্ল্যাক বেল্ট। কাজেই যেকোনো মারামারিতে তার এক লাথিই সাধারণত যথেষ্ট ছিল।

 এই হলো আমাদের ১৪-জনের দল।

 যাক, এখন আবার ঘটনার বর্ণনায় ফিরে যাই।

 আমি সবুজকে আগেই পাঠিয়ে দিয়েছিলাম প্রায় দুই মাইল দূরে কোন যায়গা ঠিক করতে যেখানে আজকের রাতটা কাটানো যায়। আমার জিনজিরাতে এত লোক দেখে কেমন যেন এক অস্বস্তিকর বিপদের আশঙ্কা  করছিলাম। কেন যেন মনে হচ্ছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনী যে কোনো সময় জিনজিরা আক্রমণ করতে পারে। আমার স্থানীয় যার সাথেই দেখা হয়েছে, আমি তাদের বলেছিলাম জিনজিরা থেকে দূরে কোথাও চলে যেতে, কমপক্ষে নদীর কাছাকাছি কোথাও না থাকতে। অবশ্য জিনজিরাতে কেউ থাকার জন্য আসেনি, সবাই অন্য কোথাও যাবার উদ্দেশ্যেই জিনজিরাতে এসেছে, অনেকে জিনজিরাতে এক রাত কাটানোর পর তাদের গন্তব্যে চলে গেছে। কিন্তু প্রতিদিনই ঢাকা থেকে ভীত সন্ত্রস্ত মানুষ ক্রমাগত জিনজিরাতে আসছে।

 সবুজ ইতোমধ্যে রাত কাটানোর জন্য একটা যায়গা ঠিক করে এসেছে-একটি প্রাইমারি স্কুল। আমরা পহেলা এপ্রিলের সূর্য ডোবার সাথে সাথে আমাদের নতুন গন্তব্যের দিকে হাটা ধরলাম। দুই মাইল যেতে বেশীক্ষণ লাগলো না। প্রাইমারি স্কুলের একটি কামরায় আমাদের ঠাই হলো। অন্য কামরাগুলোও লোকজনে ঠাঁসা। 

সবুজ রাতে খাবার যায়গাও ঠিক করে রেখেছিল, আমরা সেখানে রাতের খাবার খেয়ে যখন স্কুলে ফিরলাম তখন ৯-টা বাজে। আমরা সবাই শুয়ে পড়লাম। 

আমি শুলাম কিন্তু কিছুতেই ঘুম আসছিল না। কেমন যেন এক দু:চিন্তা আমাকে মাঝে মাঝেই গ্রাস করতে চাইছিল। তারপরে কখন যেন নিজের অজান্তেই ঘুমিয়ে পড়েছি। রাত চারটার দিকে হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেল। আমি দরজা খুলে বারান্দায় বেরিয়ে এলাম। চারিদিক নিস্তব্ধ ছিমছাম, মাঝে মধ্যে দূরে কোথাও কুকুরের চিৎকার, আশেপাশের কোন বাসায় এক শিশুর কান্নার আওয়াজ। আমি প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে দিয়াশলাই জ্বালিয়ে ধরালাম। সিগারেটে কেবল দুটা টান দিয়েছি, ঠিক তখনই দুপ দুপ করে দুটো আওয়াজ শুনতে পেলাম, মুহূর্তেই চারিদিক দিনের মতো আলোকিত হয়ে উঠলো এবং প্রায় সাথে সাথেই মেশিনগানের ট্যাট, ট্যাট, ট্যাট, ট্যাট আওয়াজ। তার সাথে যোগ হলো বিভিন্ন ধরণের আগ্নেয়াস্ত্রের সম্মিলিত গর্জন। কিছুক্ষণ পর বিকট শব্দে বোমা বিস্ফোরণের আওয়াজ, বুঝতে পারলাম পাকিস্তানিরা গোলা ছুড়ছে (তখনও মর্টার, আর্টিলারি, ইত্যাদি সম্পর্কে ভাল ধারণা ছিল না)।

 ঘুম থেকে উঠতে কাউকেই বলতে হলো না, গোলাগুলির আওয়াজ শুনে সবাই উঠে অস্ত্র হাতে দাড়িয়ে আছে। সবার মুখে অনিশ্চিত ভাব। কী হচ্ছে? পাকিস্তানিরা যে আক্রমণ করতে পারে সেই সম্ভাবনার কথা আমরা সবাই আলোচনা করেছিলাম। কিন্তু আলোচনা করা আর বাস্তবে আক্রমণের শিকার হওয়া তো এক কথা না। মনে হচ্ছে গোলাগুলির আওয়াজ ক্রমেই আমাদের দিকে আসছে। আজকে যদি আমরা আগের অবস্থানে থাকতাম তাহলে প্রথম ধাক্কাতেই আমারা আক্রমণের মুখে পড়তাম। এখন চারিদিকে ভয়ার্ত লোকজন দৌড়াদৌড়ি করছে। ভয়ার্ত, নিরীহ, ও নিরস্ত্র মানুষ পরিবার পরিজন নিয়ে যে যার মতো নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটছে।

 আমাদের স্কুলে যারা আশ্রয় নিয়েছিল তাদেরকে মালপত্র নিয়ে কেরানীগঞ্জের ভিতরের দিকে দৌড়াতে বললাম। এখন আমাদের সামনের রাস্তা লোকে লোকারণ্য, আর্তনাদ করতে করতে লোকজন পালাচ্ছে। আমাদের মাথার উপর দিয়ে অসংখ্য গুলি উড়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝেই আশেপাশে গোলা পড়ে বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হচ্ছে, সে এক ভয়াবহ অবস্থা। আমি জানতাম যে আমাদের এই .২২ রাইফেল আর দো-নলা বন্দুক দিয়ে সেনাবাহিনীর মোকাবিলা করা যাবে না। আমি সবাইকে দৌড়াতে নির্দেশ দিলাম, আমাদের উদ্দেশ্য এখান থেকে যতটুকু সম্ভব দূরে সরে যাওয়া। পাকিস্তান সেনারা এখন আমাদের প্রায় কাছাকাছি চলে এসেছে।

 জানি না কতক্ষণ হবে, এক ঘণ্টা-তো হবেই, দৌড়ানোর পর রাস্তার পাশে একটা জঙ্গল মতো যায়গা দেখে আমরা সবাই সেখানে ঢুললাম। এতক্ষণ দৌড়িয়ে আমরা বসে হাঁপাচ্ছিলামপ্রায় সবাই শুধু কবির ছাড়া। কবিরকে দেখে মনে হলো সে কেবল গোছল করে বেরিয়েছে।

 আমি এভাবে দঙ্গল করে সবাই বাসে থাকাটা পছন্দ করলাম না। দূরে এখনও গোলাগুলির আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। আমি সবাইকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গাছের আড়ালে বসতে বললাম। আমরা এভাবে বেশ কিছুক্ষণ বসে রইলাম। বসে বসে চিন্তা করছিলাম কি রকম নি:সংশ দানবীয় বিকৃত মানসিকতার মানুষ হলে নিরপরাধ ও নিরস্ত্র শিশু, নারী, পুরুষ নির্বিচারে মেশিনগান ও অন্যান্য স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র সজ্জিত প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনী গণহত্যা চালাতে পারে। আজকে যে অসংখ্য হতাহত হয়েছে তাঁতে কোন সন্দেহ নেই।

 গোলাগুলির আওয়াজ কিছুটা কমলেও থেমে থেমে এখনও হচ্ছে। এখন প্রায় নয়টা বাজে। সকাল থেকে পেটে কিছু দানাপানি পড়েনি, আমাদের সাথে কোনো খাবার বা পানি নেই। কাজেই জঙ্গলে আর থাকা যাবে না। লোকালয়ের সন্ধান করতে হবে।

 আমাদের বর্তমান অবস্থান থকে প্রায় চার মাইল দূরে ধলেশ্বরী নদী। কিন্তু আমরা যদি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যেতে চাই তাহলে আমাদের বুড়িগঙ্গা পেরিয়ে কিছুটা ডানে যেয়ে মাহনা-মাধবদী-নরসিংদী-রায়পুরা হয়ে আশুগঞ্জ পৌঁছে মেঘনা পার হয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যেতে হবে। এটা হচ্ছে হাটা পথ। অবশ্য নদীপথ যদি শত্রু-মুক্ত থাকে তাহলে নরসিংদী পৌছার পর মোটর লঞ্চে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌঁছাতে দুই ঘণ্টার মতো সময় লাগে। আমাদের দলের হানিফের দেশের বাড়ি নরসিংদীতে, সে এই পথ ভালভাবে চেনে। কাজেই এই পথেই আমরা যাব ঠিক করলাম।

 এপ্রিলের ২ তারিখে সকাল বা বিকেলে কোনো খাওয়া হয়নি, উত্তেজনায় আমাদেরও খুব খিধা ছিল না। কিন্তু সন্ধ্যার পর আর থাকা গেল না। আমরা একজন গেরস্তর বাসায় যেয়ে দরজা নাড়ালাম। আমাদেরকে দেখে তো বেচারা মনে করল আমরা ডাকাত-টাকাত হব। তাকে অনেক বুঝানোর পরে সে দরজা খুলল। আমরা তাকে আমাদের অবস্থা জানানোর পরে কিছু টাকা দিয়ে আমাদের জন্য রান্না করতে বললাম। খুব বেশী কিছু পাওয়া গেল না। ভাত, ডিমের তরকারি ও ডাল। এটাই আমাদের কাছে অমৃত মনে হলো। খাওয়া শেষ হলে সেই বাড়ির উঠানেই আমরা রাতে ঘুমলাম। পরের দিন খুব ভোরে রাতেই আমরা ব্রাহ্মণবাড়িয়া রওয়ানা হব। প্রচণ্ড ক্লান্তির ফলে কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হলাম।

 আমাদের যেমন করে হোক ভোরের আগেই বুড়িগঙ্গা পার হতে হবে। সকালে পার হতে গেলে শত্রুর নজরে পড়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকবে। ফলে আমরা সবাই রাত সাড়ে তিনটার সময় রওয়ানা দিলাম। ঘণ্টা খানেকের মাঝেই নদীতে পৌঁছলাম কিন্তু তখন নদীতে কোনো নৌকা নেই। এখন কি করি? আমরা সবাই নদীর পাড়ে ঝোপ ঝাড়ের আড়ালে লুকিয়ে রইলাম। 

 আমাদের গুপ্তচর সবুজ মোসলেমকে সাথে নিয়ে নৌকা খুঁজতে চলে গেল। বেশ কিছুক্ষণ পরে মোসলেম ফিরে এসে জানালো যে সবুজ নদীর পাড়ে নৌকা নিয়ে অপেক্ষা করছে। মোসলেম আমাদের সবাইকে পথ দেখিয়ে যেখানে নৌকা বাঁধা ছিল সেখানে নিয়ে গেল। নৌকাটা বুড়িগঙ্গার খেয়া পারাপারের নৌকা, বেশ বড়। আমরা ১৪-জন উঠার পরেও অনেক যায়গা রইল। নৌকায় চড়ে আমরা আবার বুড়িগঙ্গা পার হলাম। এখন পূর্ব আকাশে কিছুটা আলো দেখা যাচ্ছে কিন্তু পুরপুরি সকাল এখনো হয়নি। নৌকা থেকে নেমে মাঝিকে পারিশ্রমিক বুঝিয়ে আমরা যাত্রা শুরু করলাম।

 বেশ কিছুক্ষণ হাটার পর আমারা মাতুয়াইল নামে এক জায়গায় পৌঁছলাম। এখানে একটা ছোট বাজারের মতো আছে, আমরা সেখানে যেয়ে একটা খাওয়ার যায়গা পেলাম। এখানেও সকালের নাস্তা পরাটা, পাঁচমিশালী সবজি আর ডিম। আমরা সবাই পেট ভরে খেলাম, আমি নিজেই প্রায় ছয়টা পরোটা সাবাড় করে দিলাম। এমন সময় দেখি আশেপাশের অনেক লোকজন আমাদের চারিদিকে ঘিরে আছে। অনেকের সাথেই লাঠিসোটা ও বল্লম। আমাদের অনেকেই অস্ত্র গুলি করার জন্য প্রস্তুত করছিল। আমি হাতের ইশারায় তাদেরকে নিবৃত করলাম। এই জনগণকে গুলি করা মানে আত্মহত্যা করার সামিল। তাছাড়া নিজের দেশের সাধারণ লোককে গুলি করার কথা আমি চিন্তাও করতে পারি না।

 ছাত্র নেতা টাইপের একজন এসে আমাদের পরিচয় ও কোথায় যাচ্ছি জানতে চাইল। আমি জানালাম আমরা ঢাকার বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়য়ের ছাত্র, মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের উদ্দেশ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া  যাচ্ছি। আমাদেরকে অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত দেখে তাদের সন্দেহ হচ্ছিল। আমরা এত অস্ত্র কোথায় পেলাম জানতে চাইলে আমরা তাদেরকে বুঝিয়ে বললাম। যাই হোক অনেকক্ষণ পরে তারা আশ্বস্ত হলো—“বুঝলেন না ভাই এখন তো সবাইকেই সন্দেহ হয় পাকিস্তানি গুপ্তচর বলে। আমাদের এখান দিয়ে অবশ্য অনেক শরণার্থী প্রতিদিন বর্ডারের দিকে যাচ্ছে। কিছু কিছু দু:খ্জনক ঘটনাও ঘটেছে শরণার্থীদের সাথে। অনেকেই পথে লুটপাটের শিকার হয়েছে।আমরা এই লুটপাটের কথা এই প্রথম জানতে পারলাম।

 কারা এই জঘন্য কাজ করছে,” আমি জানতে চাইলাম। আমরা ঠিক বলতে পারি না, খুব সম্ভবত ডাকাত দলের কাজ। এখানে কিছু কিছু গ্রাম আছে যেখানে ডাকাতদের আড্ডা,” ছাত্রনেতা আমাকে উত্তর দিল। আপনার কিছু করতে পারেন না?” আমি পাল্টা প্রশ্ন করলাম। হ্যাঁ, আমরা চেষ্টা করছি। রাতে আমরা এলাকায় টহল দেই, কিন্তু আমাদের ভাল অস্ত্রশস্ত্র নেই,” সে আমাদের অস্ত্রগুলোর দিকে লোলুপ দৃষ্টি দিয়ে বলল। আমি বুঝালাম এখানে বেশীক্ষণ থাকা উচিৎ হবে না। আমাদেরকে এখন উঠতে হবে যথা শীঘ্র সম্ভব ব্রাহ্মণবাড়িয়া  পৌঁছান দরকার।আমি সবাইকে ইশারায় উঠতে বললাম। ভাই আপনারা দুপরে খেয়ে যান, আমরা সব ব্যবস্থা করে দিচ্ছি,” ছাত্রনেতা উচ্ছ্বাসের সাথে অনুরোধ করল। না ভাই আজকে না, অন্য সময় যদি এদিকে আসা হয় তাহলে অবশ্যই আপনাদের আতিথেয়তা গ্রহণ করব।এই বলে আমরা সবাই আমাদের অস্ত্রশস্ত্র সহ উঠে দাঁড়ালাম। আমাদের পরবর্তী গন্তব্য মাহনা, বড়পা, মাধবদী হয়ে নরসিংদী পৌছা।  সৌভাগ্যক্রমে এই এলাকায় এখনো পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আগমন হয়নি। মাধবদীতে পৌঁছতেই সন্ধ্যা হয়ে এলো। সকালে একটি ভারী নাস্তা হয়েছিল ফলে দুপরের খাবারের খুব একটা প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু সন্ধ্যা নামতেই আবার খিধা মাথাচাড়া দিল।

 কিন্তু এখানেও স্থানীয় লোকজনকে আবার অনেক কৈফিয়ত দিতে হলো। আমার মনে হয় আমাদের এই অস্ত্রসহ বড় দল দেখে গ্রামবাসীর সন্দেহ হচ্ছিল। 

আনেকেই তো এখন এখান দিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু এরকম সুসজ্জিত দল তো আগে দেখনি। কিন্তু আবার আমাদেরকে দেখে কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়য়ের ছাত্র বলেই তো মনে হচ্ছে? যাই হোক শুধু জেরা ছাড়া অমাদেরকে অন্য কোনো বিড়ম্বনায় পড়তে হয়নি। একবার আমাদের সম্পর্কে সন্দেহ দূর হলে আমাদের প্রতি তাদের সৌহৃদ্যের কোনো কমতি ছিল না। তারা তাদের সাধ্য মতো আমাদের সেবা যত্ন করেছে।

 স্থানীয়দের আয়োজিত রাতের খাবার উপাদেয় ছিল। খাবার পরে কিছুক্ষণ আমাদের আপ্যায়নকারীদের সাথে গল্পগুজব করে সময় কাটালাম, আমারা সবাই ক্লান্ত থাকায় শীঘ্রই ঘুমিয়ে পড়লাম।

সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি আমাদের জন্য নাস্তা তৈরি। পরাটা, গোরুর মাংস, ডিম ভাজি, ও পায়েস, এক এলাহি কাণ্ড। সকালে এত খাওয়া দেখে আমরা অভিভূত। অনেক খাবার কাজেই আমার আমাদের আপ্যায়নকারীদেরও আমাদের সাথে যোগ দিতে অনুরোধ করলাম। নাস্তা খাওয়া শেষ হলে আমরা তাদেরকে আমাদের একটা বিশ্রামের যায়গার জন্য অনুরোধ করলাম। এই কয়েকদিন রাতে ভাল ঘুম না হবার ফলে আমরা সকলে খুব ক্লান্ত ছিলাম। মনে করলাম সারা দিন বিশ্রাম শেষে সন্ধ্যায় আবার যাত্রা শুরু করব। আমাদের আশ্রয়দাতাদের অনুরোধ করতেই তারা সনন্দে রাজি হয়ে গেল।

সন্ধ্যায় ঘুম থেকে উঠে সবাই প্রস্তুত হলাম। কিন্তু এবার একটা ভাল কাজ হলো, আমাদেরকে পথ দেখিয়ে দেবার জন্য একজন গাইড দেয়া হলো।

 ইতোমধ্যে লক্ষ্য করলাম এই সন্ধ্যাতেও অনেক শরণার্থী সীমন্তের দিকে ধাবিত হচ্ছে। সবাই চোখে মুখেই চরম আতঙ্ক, সীমন্তের ওপারে পৌছাই যেন তাদের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য।

 আমরা যখন রওয়ানা দিলাম তখন চারিদিক অন্ধকার। আমাদের গাইডের হাতে একটি টর্চ লাইট ছিল, সেই টর্চ লাইটের টিমটিমে আলোতে আমাদের গাইড় পথ দেখিয়ে আমাদের নিয়ে চলল। আমাদের বুঝতে অসুবিধা হল না যে এই গাইড় ছাড়া এই অন্ধকারে আমাদের পথ হারার সমূহ সম্ভাবনা ছিল।

 এখানে আগেই বলেছি আমাদের সামনে বেশ কয়েকটা শরণার্থীর দল ছিল। প্রায় ঘণ্টা দুই হাটার পর আমাদের সামনে প্রায় তিনশ থেকে চারশো গজ দূরে হঠাৎ বিপন্ন মানুষের করুণ আর্তনাদ ভেসে আসলো। বাবাগো, মাগো, বাচাও, বাচাও। এটা শুনেই আমি সবাইকে থামতে বললাম।

  আমাদের সবাই জানতে চাচ্ছি সামনে কি হচ্ছে? আমাদের গাইড় জানালো খুব সম্ভবত কোনো শরণার্থীর দল ডাকাতের খপ্পরে পড়েছে। আমি সবাইকে অস্ত্র প্রস্তুত করে সামনের দিকে দৌড়াতে নির্দেশ দিলাম, সবার সামনে আমি আর সেলিম। কিছুক্ষণ পর আমারা দেখতে পেলাম শরণার্থীদের উপর একদল হিংস্র বর্বর ডাকাত মশাল হতে বিভিন্ন ধরণের দেশীয় অস্ত্র সমেত আক্রমণ করছে এবং নির্বিচারে নিরীহ, নিরস্ত্র শরণার্থীদের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। আমাদের সামনের দলে কয়েকজন ১৬ থেকে ২২ বছরের মেয়ে বা মহিলা ছিল, কিছু বর্বর তাদের কয়েকজনকে টানাটানি করে কাপড় খোলার চেষ্টা করছে। 

আমি মাথা ঠিক রাখতে পারলাম না। আমার সামনে প্রথমে যাকে পেলাম, তাকে লক্ষ্য করে দুই তিনটা গুলি ছুড়লাম, লোকটা মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। প্রায় একই সাথে সেলিম তার বন্দুক দিয়ে আরেকজনকে গুলি করলো, এই লোকটাও মাটিতে পড়ে গেল। এতক্ষণে ডাকাতরা বুঝে ফেলেছে তাদেরকে কেউ আক্রমণ করছে, তারা এবার আমাদের দিকে ঘুরে দাঁড়ালো। আমরা ১৪-জন, কিন্তু ডাকাতরা প্রায় ৩০-৩৫ জন। তীর ধনুক, দা, বল্লম, পাইক, টেটা, কোঁচা, ইত্যাদি সজ্জিত ডাকাত দল। একটা কথা আমরা সবাই বুঝতে পাচ্ছিলাম যে এদেরকে আমাদের কাছে ভিড়তে দেয়া যাবে না। আমি চিৎকার করে সবাইকে অস্ত্র নিয়ে এক লাইনে দাড়াতে বললাম। লাইন যেন কেউ না ভাঙ্গে, আমি হুঁশিয়ারি দিলাম। কয়েকজন ডাকাত এখন আমাদের দিকে বিকটা হুঙ্কার দিতে দিতে অস্ত্র উঁচিয়ে ধেয়ে আসছে, আমরা যদি এখন ভয় পেয়ে পেছনে যাবার বা পালাবার চেষ্টা করি তাহলে এই ডাকাতদল সহজেই আমাদের খতম করে ফেলবে। কাজেই কোন ভাবের পেছনে হটা যাবে না। তাছাড়া আমরা আজিমপুরের ছেলে, মারামারি করে অভ্যস্ত, তার উপরে আজকে আমাদের হাতে বন্দুক আর ডাকাতদের সাথে দেশীয় অস্ত্র। আমারা ভয় পাব কেন? আজিমপুরের ছেলেরা সহজে ভয় পায় না।

 আমার দিকে একটা ষণ্ডামার্কা ডাকাত বল্লম উঁচিয়ে ধেয়ে আসছিল, আমি তাকে পরপর দুইবার গুলি করলাম, কিন্তু .২২ রাইফেলের গুলি তাকে থামাতে পারল না। সে আমাকে লক্ষ্য করে বল্লম ছুড়তে উদ্যত হলো। কিন্তু সে বল্লম ছোড়ার আগেই কে যেন বন্দুক দিয়ে পরপর দুটি গুলি করলে ডাকাত বল্লম ছোড়ার আগেই মাটিতে ধপাস করে আছড়ে পড়ল। আমি ঘুরে দেখি আমার পাশে সেলিম বন্দুক খুলে নতুন গুলি ভরছে।

 অন্যরাও একনাগাড়ে গুলি করেই চলেছি। আমি চিন্তা করলাম এভাবে গুলি করলে তো কিছুক্ষণেই আমাদের সব গুলি ফুরিয়ে যাবে। আমি সবাইকে গুলি থামাতে বললাম, দেখলাম অনেক ডাকাত পালিয়ে যাবার চেষ্টা করছে। এই সমস্ত নরপশুদের বাচতে দেয়া উচিৎ না। তাদের তাড়া করতে বললাম। আমি নিজেও রাইফেল উঁচিয়ে তাদের পেছনে ছুটলাম। আমার সামনে দৌড়ানো এক ডাকাতকে একসাথে চার পাঁচটা গুলি করাতে সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। কবীরের হাতে .২২ রাইফেল ছিল কিন্তু সে গুলি না করে দৌড়ে এক ডাকেতের চুল ধরে মাটিতে আছড়ে ফেলে রাইফেলের বাট দিয়ে পিটিয়ে মাথা থেতলে দিল কিন্তু তা স্বত্বেও কিছু ডাকাত পালিয়ে যেতে পারল। আমাদের হতে দশজন ডাকাত মৃত, ও প্রায় ১২-জনের মতো আহত হয়ে পড়ে আছে। এই সমস্থ ঘটনা ঘটতে তিন চার মিনিটের বেশী সময় লাগেনি

 এখন দেশের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা নেই বললেই চলে, কাজেই ডাকাতদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তুলে দেবার ব্যবস্থা নেই তাদেরকে যদি অক্ষত ছেড়ে দেয়া হয় তাহলে তারা আবার একই কাজ করবে  আমাদের চারিদিকে নিরীহ শরর্নাথীদের মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখে আমি তখন ক্রোধে হিতাহিত জ্ঞান শূন্য। আমার রিভলভার প্রথম বারের মতো গর্জে উঠল, রিভলভার বের করে কয়েকজন আহত ডাকাতকে এক এক করে মাথায় গুলি করলাম। এই বর্বর পশুদের বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই। আমার দেখে দলের অন্যরাও সব জীবিত ডাকাতকে খতম করে ফেললো। আমরা যে এতো তাড়াতাড়ি এরকম হিংস্রে হতে পারি ভাবতে পারিনি। কিন্তু পরিস্থিতি হয়ত মানুষকে এতো দ্রুত পরিবর্তন করতে পারে। চারিদিকে যখন মৃত্যুর হাতছানি, যখন নিজের জীবন বিপন্ন তখন সাধারণ সময়ের নৈতিকতা ও মূল্যবোধ মনে হয় আর কাজে আসে না।

 অবশ্য এই এলাকার ডাকাতদের একটি শিক্ষা পাওনা ছিল। আমার ধারণা এর পরে নিরীহ শরণার্থীদের উপর অত্যাচার করতে এই ডাকাতদের অনেক চিন্তা করতে হবে। যাই হোক আহত শরণার্থীদের ক্ষয়ক্ষতি দেখায় মনোযোগ দিলাম। ৩০-৩৫ জন শরণার্থীর মধ্যে এখন প্রায় দশ জন বেঁচে আছে। এই নরপশুরা শিশুদেরকেও ছেড়ে দেয়নি। রাস্তার পাশে তাদের ক্ষতবিক্ষত লাশ পড়ে আছে। এমন সময় হঠাৎ ১৭-১৮ বছরের এক মেয়ে, সাথে ৭-৮ বছরের ছেলের হাত ধরে রাস্তার পাশের ঝোপ থেকে কাঁদতে কাঁদতে দৌড়ে বেরিয়ে এলো। সামনে পড়ে থাকা এক মধ্য বয়সী লোকের মৃতদেহের পাশে বসে বিলাপ করে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকল। আমরা তাকে সান্ত্বনা দেবার ভাষাও খুঁজে পেলাম না। তাদের এই করুণ বিলাপে এই বধ্যভূমির  বিলাপ বলেই মনে হলো।

 ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ম্ৎৃত কারের কোনো ব্যবস্থা করার উপায় আমাদের ছিল না। আমরা কিছু মৃতদেহ জড় করে চাদর দিয়ে ঢেকে রাখলাম। আমরা কেউই আগে এত মৃতদেহ দেখিনি। এই ঘটনা আমাদের সবার মনে এক বিশেষ দাগ কাটে। এই প্রথম আমরা কোনো মানুষকে হত্যা করলাম। গোলাগুলি শেষ হবার পর আমাদের কাজের ফলাফল দেখে নিজেরাই বিস্মিত হলাম।

 কিন্তু অনুশোচনা হলো না। যারা নিজের দেশের নিরীহ লোকদের উপর এমন নিষ্ঠুর অত্যাচার করতে পারে তাদেরকে সমূলে নিপাত করা সকল মুক্তিযোদ্ধার কর্তব্য। এরা পাকিস্তানি সেনাদের থেকেও নিকৃষ্ট। 

 তা স্বত্বেও এই ঘটনার শেষে আমাদের দলের অনেকেই বমি করতে শুরু করল। প্রথম কোনো মানুষকে হত্যা করলে হয়ত এরকম হয়ে থাকে।

 আমাদের চারিদিকে অনেক শরণার্থীর মৃতদেহ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। সবার শরীরে ধারালো অস্ত্রের ক্ষতচিহ্ন, কারও গলা কাটা, কারও নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে আছে, গুরুত্বর আহত কিছু মানুষ চিৎকার করছে। সে এক বীভৎস দৃশ্য আমাদের কাছে কোনো চিকিৎসা সামগ্রী না থাকায় আমরা তাদেরকে সাহায্য করতে পারছিলাম না। 

আমরা কিছুক্ষণ হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে রইলাম। আর কিছুক্ষণ আগে আমারা পৌঁছতে পারলে হয়ত এদের অনেকের জীবন বাচাতে পারতাম। এই মেয়ে ও ছেলেই একমাত্র সম্পূর্ণ অক্ষত ছিল।

চারিদিকে লক্ষ্য করে দেখলাম, শুধু এই শরণার্থী দলই না, তাদের আগে যারা এসেছিল তাদেরও একই পরিণতি হয়েছে। তাদের মৃতদেহ রাস্তার পাশের গর্তে পড়ে আছে।

আমরা ডাকাতদের সব মৃতদেহ খুঁজলাম। বেশ কিছু টাকা ও সোনার গহনা পেলাম।

আমাদের সাথে যে স্থানীয় গাইড় ছিল তাকে স্বল্প আহতদের নিয়ে মাধবদীতে ফেরত পাঠালাম। এখনে যারা গুরুতর আহত তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে অনুরোধ করলাম। তার সাথে ডাকাতদের কাছ থেকে পাওয়া টাকা ও স্বর্ণালংকার দিয়ে বললাম সেই ছাত্র নেতাকে দিতে এবং যার যা প্রাপ্য বুঝিয়ে দিতে। বাকী যা থাকবে সেটা এই আহতদের চিকিৎসা বা মৃতদেহের সৎকারে ব্যাবহার করতে।

 আমাদের গাইড চার-পাঁচ জন স্বল্প আহতের নিয়ে যখন যেতে উদ্যত তখন সেই মেয়ে মাধবদী ফিরে যেতে চাইলো না। সে তার বাবার মৃতদেহ ফেলে কোথাও যাবে না। আমরা অনেকেই তাকে বুঝানোর চেষ্টা করলাম যে তার পক্ষে এখানে একা থাকা যাবে না। ডাকাতদল যদি আবার লোকজন নিয়ে ফিরে আসে তাহলে কী হবে? কিন্তু সে গো ধরল যে সে কোনো ভাবেই মাধবদী ফিরে যাবে না। সে আমাদের সাথে যাবে। আপনাদের সাথে গেলে আমি ও আমার ভাই নিরাপদে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌঁছাতে পারব। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আমার আত্মীয় আছে, আমার অসুবিধা হবে না, কাঁদতে কাঁদতে সে আমাদের জানাল। আমরা তাকে যতই বুঝাতে চেষ্টা করি যে আমরা যুদ্ধ করতে যাচ্ছে, কোনো মেয়ে বা বাচ্চা ছেলেকে আমাদের সাথে নেয়া সম্ভব না, ততই সে বলে আমাকে শুধু ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পৌঁছে দিন, আর কিছু লাগবে না। আমি আপনাদের রান্না করে খাওয়াব, আপনাদের কোনো অসুবিধা করবো না। দরকার হলে আমাদেরকে কিছু খেতে না দিলেও হবে।

 মেয়েটির কথা শুনে শিক্ষিত বলে মনে হলো। স্পষ্ট শুদ্ধ বাংলায় কথা বলছে। হিন্দু মেয়ে, কপালে সিঁদুর নেই। তন্বী, দেখতে সুশ্রী, লম্বা লম্বা চুল, বড় বড় হরিণের মতো চোখ, লম্বায় প্রায় পাঁচ ফুট চার ইঞ্চি। এই মেয়ের প্রেমে যে কোনো ছেলেই পড়তে পারে।

 আমরা এই মেয়ের কথা শুনে একজন আরেকজনের মুখ চাওয়া চাওয়ি করতে থাকলাম। এতো দেখি মহা বিপদে পড়া গেল। ইতোমধ্যে ১৫-২০ জনের আরেক দল শরণার্থী এসে হাজির। চারিদিকে এতো মৃতদেহ ও আগের শরণার্থীদের করুণ পরিণতি জানতে পেরে তারাও আমাদের সাথে যেতে চাইল। আমরা আর কী করি, অগত্যা রাজি হলাম। সেই মেয়ে ও তার ভাইকে সাথে নিতেও এখন অসুবিধা হলো না। ভাগ্য ভাল এই এলাকা এখনো শত্রু-মুক্ত।

 আমারা দুই ভাগে বিভক্ত, একদল শরণার্থীদের সামনে আরেক দল পেছনে, শরণার্থীরা মাঝখানে। আমাদের পরবর্তী গন্তব্য নরসিংদী, আমরা এখন প্রায় নরসিংদী ও মাধবদীর মাঝামাঝি। আমাদের সামনের কারো কারো কাছে ডাকাতদের ফেলে যাওয়া মশাল। চারিদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার, ১০০-গজ সামনের কিছু দেখা যায় না। আমাদের সবার অস্ত্র এখন প্রস্তুত। কিছুক্ষণ আগের ডাকাতদের মতো আবার কেউ আক্রমণ করতে পারে।

 এভাবে আমরা যখন নরসিংদীর কাছাকাছি, অন্ধকারে কে যেন চিৎকার করে বলে উঠল, “এই, কে যায়? থাম!অন্ধকারে আমরা কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম না। আমরা সবাই দাঁড়িয়ে পড়লাম, সবার অস্ত্র প্রস্তুত। শরণার্থীদের মধ্যে আবার ভয়ার্ত গুঞ্জন শুরু হলো। কিছুক্ষণ পর লাঠিসোঁটা সহ কিছু লোক অন্ধকারের ভিতর থেকে উদয় হলো।

 আমাদের হাতের অস্ত্র তাদের দিকে তাক করা দেখে লোকগুলো থমকে দাঁড়াল। তাদের দলনেতা একটু সামনে এসে বেশ রুক্ষ ভাবে প্রশ্ন করলো, “আপনারা কে, কোথায় যাচ্ছেন?”

 এই দল সম্পর্কে আমাদের কিছুই জানা নেই, ডাকাতও হতে পারে। আমাদের অস্ত্রগুলো দুই হাতে ধরে আছি, সবার আঙ্গুল ট্রিগারে। কিছু গড়বড় দেখলেই গুলি করার জন্য প্রস্তুত। আমি দুপা এগিয়ে গেলাম,  “আমরা ঢাকার ছাত্র, মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া যাচ্ছি। রাস্তায় আমদের এক ডাকাত দলের সাথে সংঘর্ষ হয়, তারা অনেক শরণার্থীদের হত্যা করে, কয়েকজনকে আমরা বাচাতে সক্ষম হই। এই শরণার্থীদের আমরা পাহারা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছি।

 মনে হয় আমার বক্তব্য দলনেতাকে আশ্বস্ত করতে পারল না। কিন্তু দলনেতার সাহস আছে বলতে হবে। আমাদের উঁচিয়ে থাকা অস্ত্র দেখেও বলে উঠল, “আপনাদের সব অস্ত্রশস্ত্র আমাদের দেন, আমরা আপনাদের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পৌঁছে দিব।” 

 আমাদের কি মাথা খারাপ। এত কষ্ট করে সংগ্রহ করা অস্ত্র এদেরকে জমা দিব? ঠিক এই সময় যেই মেয়েটাকে আমারা উদ্ধার করেছিলাম সে ভিড় ঠেলে আমার পাশে এসে দাঁড়াল। আমার বাবা সহ অনেককে  ডাকাতরা হত্যা করেছে, এরা আমাদের সাহায্য করতে না এলে আমাদের সবাইকেই ডাকাতরা মেরে ফেলত,” কথা বলতে বলতে মেয়েটা কেঁদে ফেলল। এই সময় আমাদের মধ্যে যার বাড়ি নরসিংদী, সে এগিয়ে এসে তার পরিচয়, বাবার নাম, ও ঠিকানা জানালো।

 এসব কথা শুনে দলনেতার মনে হয় মতের পরিবর্তন হলো। ও আচ্ছা, আমরা এই এলাকার লোক,” বলে সে তার ডান দিকে ইশারা করল। আমি অবশ্য অন্ধকারে কোনো লোকালয় দেখতে পেলাম না। এখন সময় খারাপ বলে রাত জেগে আমরা পাহারা দেই। আমাদের এখানেও ডাকাতরা মাঝে মাঝে হানা দেয়,” দলনেতা জানালেন। আমি আপনাদেরকে দুজন লোক দিচ্ছি পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবার জন্য। সে আপনাদের নরসিংদী পৌঁছে দিবে। আপনাদের কোনো অসুবিধা হবে না।দলনেতা জানালেন।

 আমাদেরকে দুজন গাইড় পেলাম। আমারা সবাই গাইডদের পেছনে পেছনে আবার যাত্রা শুরু করলাম। ঘণ্টা খানেক পরে আমরা নরসিংদী পৌঁছলাম। গাইড় দুজন আমাদেরকে শরণার্থী সহ একটা স্কুলে নিয়ে গেল। স্কুলটা মোটামুটি খালি ছিল। আমরা একটা বড় কক্ষ দখল করে সেখানে শুয়ে পড়লাম।

 স্কুলের অন্য কয়েকটা কক্ষতে শরণার্থীদের যায়গা হলো।

 খুব সকালে ঘুম থেকে উঠলাম। দরজা খুলতেই এক মিষ্টি বাতাস গুমোট ঘরের বিষণ্ণতাকে দূর করে দিল। কিছুক্ষণ স্কুলের সিঁড়িতে বসে রইলাম। সকালে ঘুম থেকে উঠার পরপরই মাথায় অনেক চিন্তার উপদ্রব শুরু হয়। আমার উপরে এখন অনেক দায়িত্ব। আমার একটি ভুল সিদ্ধান্তের ফলে আমার দলের এক বা একাধিক সদস্য হতাহত হতে পারে। রাতে ভাল ঘুম হয়নি, আরও কিছুক্ষণ ঘুমানো দরকার ছিল। যতটুকু বুঝতে পারলাম যে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এখনও এই এলাকায় আসেনি। কিন্তু আমার ধারণা যে কোন মুহূর্তে চলে আসতে পারে। কাজেই সময়ক্ষেপণ না করে তাড়াতাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করা উচিৎ। সারা রাতের ক্লান্তিতে দলের অন্য সবাই ঘুমাচ্ছে। অদূরে একটা নলকূপ দেখে সেখানে হাত, মুখ, পা, মাথা সব ধুলাম, গোছল করতে পারলে ভাল হতো।

 একটা সিগারেট ধরিয়ে আবার সিঁড়িতে গিয়ে বসলাম। রাতের সেই মেয়েটার কথা একবার মনে হলো, কিন্তু পরীক্ষণের অন্য চিন্তায় সেটা উবে গেল। এখন মেয়েদের নিয়ে চিন্তার সময় নেই।

 বেশ কিছুক্ষণ পরে আমাদের সবাই ঘুম থেকে উঠে আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। সবার হাত মুখ ধোয়া শেষ হতেই দেখি কয়েকজন লোক একটা বাঁশে ঝুলানো বড় ডেকচি বাসের দুই প্রান্ত ঘাড়ে রেখে দুলতে দুলতে আমাদের দিকে আসছে। একজনের হাতে দেখলাম অনেক কলা পাতা। দেখে মনে হলো আমাদের সকালের নাস্তা।

 ৭১-সালে, আমারা যেখানেই গিয়েছি, মানুষের আতিথেয়তার কোন ঘাটতি দেখিনি। সবাই সাধ্যমত, কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া, আমাদেরকে, শরণার্থীদেরকে সাহায্য করেছে।

 সকালের নাস্তা পাতলা খিচুড়ি। কলাপাতা বিছিয়ে আমাদেরকে খিচুড়ি পরিবেশন করা হলো। মুখে দিয়ে দেখলাম খেতে বেশ ভাল, একটু ঝাল ঝাল যেটা আমার পছন্দ। অদূরে শরণার্থীদের জন্য আলাদা ভাবে খিচুড়ি পরিবেশন করা হয়েছে।

 আমরা সবাই পেট ভরে খিচুড়ি খেলাম। খাওয়া শেষ হলে কলপাড়ে যেয়ে হাত মুখ ধুয়ে পানি খেলাম। এসময় দেখি রাতে আমাদের সাথে যে দলনেতার দেখা হয়েছিল সে এসেছে। দলনেতাকে দেখে বুঝা যায় রাতে ঘুম হয়নি, চোখ লাল হয়ে আছে। সৌজন্য বিনিময়ের পরে আমরা দুজন সিঁড়িতে বসলাম। জানতে পারলাম সে স্থানীয় এক কলেজের ছাত্র সংসদের ভিপি, নাম জসিম, ছাত্রলীগ করে। আমি লঞ্চের ব্যাপারে জানতে চাইলে জানালো, “হ্যাঁ, লঞ্চ তো চালু আছে। লঞ্চ ঘাট এখান থেকে বেশী দূরে না। হেটেই যেতে পারবেন। আচ্ছা, আমি একটা কাজ করি আপনাদের সাথে আমার একজন লোককে দিয়ে দিব আপনাদের লঞ্চঘাট চিনিয়ে দিবে এবং স্নানীয়দের সাথে যেন আবার কোন ঝামেলা না হয় সেটাও দেখবে। বুঝলেন না, বহিরাগত কাউকে দেখলেই এখন পাকিস্তানি গুপ্তচর বলে সন্দেহ হয়।আমি নেতাকে আমাদের সাথে আসা শরণার্থীদেরকে নিরাপদে ভারতে পাঠানোর অনুরোধ করলাম, সে আমাকে আশ্বাস দিল যে তারা অবশ্যই সেটা করবে। আমরা ইতোমধ্যে অনেক শরণার্থীকে নিরাপদে ভারতে পাঠিয়েছি।আরও কিছুক্ষণ কথা বলে ছাত্র নেতা বিদায় নিয়ে চলে গেল।

 আমি সবাইকে লঞ্চঘাটে যাবার জন্য প্রস্তুত হতে বললাম। কিন্তু হানিফকে তার বাবা মায়ের সাথে দেখা করার সুযোগ দিতে হবে। কাজেই ঠিক হলো লঞ্চঘাটে যাবার পথে হানিফকে তার বাসায় নামিয়ে আমরা লঞ্চঘাটে তার অপেক্ষা করব। হানিফকে বললাম যে সে যেন দুই ঘণ্টার বেশী দেরি না করে। তাছাড়া, তার অস্ত্রশস্ত্র সে আমাদের সাথে রেখে যাবে। তাকে এটা বলার উদ্দেশ্য ছিল যে তার অস্ত্রের লোভে কেউ যেন তার ক্ষতি না করে।

 নরসিংদী শহর খুব বড় না। কিছুক্ষণেই আমরা হানিফকে তার বাড়িতে পৌছায় লঞ্চ ঘাটের দিকে যাত্রা করলাম। অল্পক্ষণেই ঘাটে পৌঁছে গেলাম। বেশ ব্যস্ত ঘাট, অনেক নৌকা ও দুই তিনটা লঞ্চ ঘাটে ভিড়ান। আমাদের ঘাটে পৌঁছার পর ছাত্র নেতার দেয়া সেই লোক একটু আসছিবলে কোথায় যেন গেল।

 প্রায় আধা ঘণ্টার মতো হবে ঘাটের পাশে অপেক্ষা করছি, দেখলাম ছয় সাত জন খাকী পোশাক পরিহিত লোক আমাদের দিকে আসছে। সবার হাতে .৩০৩ লী-এনফিল্ড রাইফেল। লোকগুলোকে দেখে আনসার বা পুলিশ বলে মনে হলো। এদের কয়েকজনের রাইফেল আলতো ভাবে আমাদের দিকে তাক করা। আমাদের দলের অনেকেই এদের দেখে উত্তেজিত হয়ে উঠছিল দেখে আমি হাতের ইশারায় চুপ করে বসে থাকতে বললাম। দলনেতার সাথে রাইফেল না, কোমরে ঝুলান হোলস্টারে রিভলভার।

 খাকী পোশাকের দলনেতা, আমাদের সামনে এসে দুই হাত কোমরে রেখে, পা দুটো একটু ছড়িয়ে দাঁড়ালেন। আপনারা কে, এখানে কী করছেন? আপনাদের কাছে এত অস্ত্রশস্ত্র কেনদলনেতা উত্তর দাবি করলেন।

 আমরা সবাই ঢাকার বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়ার যাচ্ছি। এই অস্ত্রগুলো আমাদের দখল করা। সবাই যখন পাকিস্তানিদের নির্দেশ মতো থানায় অস্ত্র জমা দিতে যাচ্ছিল তখন তাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়া।কথা বলে আমি দলনেতার দিকে তাকিয়ে রইলাম। অন্যরা সবাই নির্লিপ্তের মতো বসে রইল।

 দলনেতার চোখে এখন এক অনিশ্চিত ভাব। আপনাদেরকে এখানে কেউ চেনে? আমরা কেন আপনার কথা বিশ্বাস করব? আপনাদেরকে আমাদের সাথে যেতে হবে। আপনাদের পরিচয় নিশ্চিত হবার পর আপনারা যেতে পারবেন।ঠিক এই সময় সেই নেতার দেয়া লোকের আবির্ভাব  হলো। তাকে দেখে বুঝতে পারলাম সে এই খাকী দলনেতাকে ভাল করেই চেনে। আরে কমান্ডার সাহেব যে, জসিম ভাই (সেই ছাত্র নেতার নাম) আমাকে এদের সাথে পাঠিয়েছেন। এরা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যাচ্ছেন যুদ্ধে যোগ দিতে।

 এইবার কমান্ডার সাহেবকে বেশ নিরুদ্বেগ মনে হলো। কোমর থেকে হাত সরিয়ে, পা-দুটো সোজা করে দাঁড়িয়ে হাঁসি হাঁসি মুখে বললেন, “ও আচ্ছা, আচ্ছা, এবার বুঝতে পারলাম। ঠিক আছে, ঠিক আছে যারা যুদ্ধে যেতে চায় আমরা তাদের সবাইকে সহযোগিতা করি। আপনারা মনে হয় লঞ্চের অপেক্ষা করছেন?” তার কথা শুনে মনে হলো বলি, “না লঞ্চঘাটে আমরা ট্রেনের অপেক্ষা করছি।অবশ্য সেটা না বলে স্মিত হেঁসে বললাম, “ঠিকই ধরেছেন, লঞ্চের অপেক্ষা করছি।

 একটু পরে কমান্ডার (আনসার কমান্ডার) তার দলবল সহ বিদায় হলেন। এখন আমার হাতের ঘড়িতে এগারোটা, আর পনের মিনিটের মধ্যেই হানিফের দুই ঘণ্টা শেষ হবে।  আমরা সবাই হানিফের ফেরার অপেক্ষা করছি।

 কিছুক্ষণ পর হানিফকে আসতে দেখলাম সাথে এক মধ্য বয়সী ভদ্রলোক, বুঝতে অসুবিধা হলো না হানিফের বাবা। হানিফ বেচারার মুখ খুবই মলিন, মনমরা হয়ে আছে। বাবা মায়ের সাথে বিদায় সব সময় করুণ হয়ে থাকে। হানিফ এসে আমাদের সকলের সাথে তার বাবার পরিচয় করিয়ে দিল। হানিফের বাবা বললেন, “আমার দুই ছেলে, হানিফ বড়। আমি হানিফকে দেশের জন্য উৎসর্গ করলাম,” বলেই হানিফের বাবা হানিফকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন, এ এক হৃদয় বিদারক দৃশ্য, আমাদের সকলেরই চোখে পানি, সবার নিজেদের বাবা মায়ের কথা মনে হলো। কিছুক্ষণ পরে হানিফের বাবা নিজেকে সামলে নিলেন, অথবা বলা যায় সামলানোর চেষ্টা করলেন। আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, “বাবা তোমাদের হাতে আমার ছেলেকে সপে দিলাম, একটু খেয়াল রেখো।

 যুদ্ধে যাচ্ছি, আমি কেমন করে বলি আমাদের মাঝে কে বাচে আর কে মরে। তবুও, একজন পিতার নিজের ছেলেকে অনিশ্চিত ভবিষ্যতে ঠেলে দেয়ার যে যন্ত্রণা সেটা তো আমিও বুঝি। আমি তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললাম, “চাচা, দোয়া করবেন আমরা সবাই যেন গাজী হয়ে ফিরতে পারি।এর থেকে বেশী কিছু আমি বলতে পারলাম না।

 কিছুক্ষণ পরে চাচা চোখ মুছতে মুছতে চলে গেলেন।

 এখন প্রায় বেলা বারটা। আশেপাশে বেশ কয়েকটা খাবার দোকান। মনে হলো এখানেই দুপুরের খাওয়া শেষ করি, এই দুর্যোগের সময় আবার কখন খাওয়া জোটে কিছুই বলা যায় না। একটা খাবার দোকান থেকে গোরুর মাংসের লোভনীয় ঘ্রাণ আসছিল, আমারা সবাই সেখানে ঢুকলাম। এখানে আলাদা চেয়ার টেবিল নেই, একটা লম্বা কাঠের টেবিল সাথে লম্বা একটা বেঞ্চ। সবাই একসাথে এখানে বসে খায়। ভাত আর ডাল পেট চুক্তি, মানে এইটি নিদিষ্ট টাকায় যত খুশী ভাত ও ডাল খাওয়া যায়। তরকারি জন্য আলাদা টাকা দিতে হয়। সেলিমের খাওয়ার কথা ভেবে মনে মনে হাসলাম।

 বুঝতে পারলাম এই খাবার দোকান বেশ জনপ্রিয়, অনেক ধরণের তরকারি আছে। কয়েক প্রকারের মাছ, গোরু, খাসির ও মুরগীর মাংস, পাঁচমিশালী সবজি, ডিমের তরকারি, ইত্যাদি। দেখলাম মাংস ছোট ছোট টিনের বাটিতে করে পরিবেশন করা হচ্ছে, কিন্তু পরিমাণ দেখে মনে হচ্ছে এ দিয়ে আমাদের চলবে না। আমরা সবাই চার প্লেট গোরুর তরকারি ও এক প্লেট করলা ভাজির অর্ডার দিলাম। সেলিম অবশ্য তার সাথে রুই মাছের তরকারি যোগ করল।  

 কিছুক্ষণ পরেই আমাদের খাওয়া পরিবেশন করা হলো। টেবিলে আগে থেকেই বিশাল কয়েকটা গামলায় ভাত ও ডাল রাখা ছিল। কিন্তু আমরা বসার পর আবার দুই গামলা গরম গরম ভাত ও ডাল দিয়ে গেল। কিছুক্ষণ পরে তরকারি ও ভাজি পরিবেশন করা হলে আমরা খেতে শুরু করলাম। সেলিম অবশ্য টেবিলে বসার সাথে সাথেই ভাত আর ডাল দিয়ে খাওয়া শুরু করেছে। খুবই সুস্বাদু গোরুর তরকারি। আমরা সবাই পেট ভরে খেলাম। মনে হলো আজকে রাতে না খেলেও চলবে।

 এখন প্রায় একটা পনের বাজে। পাশেই লঞ্চ ঘাট। আমাদের স্থানীয় গাইড সাথেই ছিল। আমরা টিকিট কিনলাম। সেই গাইড লঞ্চে উঠে সারেঙের সাথে কিছু কথা বলল। লঞ্চ থেকে নেমে আমাকে জানালো যে সে সারেঙকে আমাদের সম্পর্কে বলেছে, লঞ্চে আমাদের কোনো অসুবিধা হবে না। সে চলে যেতে চাইলে বললাম, “থামেন, থামেন, আমাদের সাথে একটা সিগারেট তো খেয়ে যাবেন”? আমরা সবাই সিগারেট ধরালাম। সিগারেট খেতে খেতে আমরা সবাই তাকে তাদের আতিথেয়তা ও সহযোগিতার জন্য আমাদের কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানালাম। জসিম ভাইকে আমাদের ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা দিতে ভুলবেন না কিন্তু।সিগারেট শেষ হলে সে বিদায় নিয়ে চলে গেল।

 লঞ্চ ছাড়ার সময় হয়ে এলে আমরা সবাই লঞ্চে উঠলাম। ঘড়িতে তখন বেলা দুইটা। লঞ্চ সম্পূর্ণ ভর্তি, বসার যায়গা পাওয়াও কষ্টকর। যাই হোক আমাদেরকে দেখে অথবা আমাদের অস্ত্রশস্ত্র দেখে বসার যায়গা করে দিল। আমরা সবাই ঠেলাঠেলি করে বসলাম, আমাদের অস্ত্র দু-পায়ের মাঝখানে।

 এই ভরপেট খাবার পরে আমাদের অন্যকেরই ঘুম পাচ্ছিল। তাছাড়া নদীর ফুরফুরে নির্মল মিষ্টি বাতাসের প্রভাবে আর চোখ খুলে রাখতে পারলাম না। নিজের অজান্তেই কখন যেন ঘুমিয়ে পড়লাম।

 এক ঘণ্টা পরে ঘুম ভাঙল। আমাদের প্রায় সকলেই তখন গভীর ঘুমে মগ্ন। আমি একটা সিগারেট ধরিয়ে উঠে লঞ্চের রেলিঙ ধরে দাঁড়ালাম। বিশাল মেঘনা নদী। আমাদের ছোট লঞ্চ ভট ভট শব্দ করে ঢেউয়ের সাথে পাল্লা দিয়ে হেলতে দুলতে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে বিভিন্ন রঙের ও আকৃতির পালতোলা নৌকা বা অন্য লঞ্চ দেখা যাচ্ছে। কিছু মাছ ধরার নৌকাও দেখতে পেলাম। এখন তিনটে বাজে, রোদের প্রখর তাপ এখনো কমেনি। কিন্তু চলমান লঞ্চের ফুরফুরে বাতাস সূর্যের তাপকে সহনীয় করে দিয়েছে।

 আমি সিগারেট টানতে টানতে নদীমাতৃক বাংলাদেশের অপরূপ সৌন্দর্য যখন উপভোগ করছি, তখন একজন লম্বা চওড়া লোক আমার পাশে রেলিঙ ধরে দাঁড়াল। আমি ঘুরে তাকাতে সে মৃদু হেসে পকেট থেকে একটা ক্যাপস্টেন সিগারেটের প্যাকেট বের করে একটা সিগারেট ধরাল ও আমাকে একটা সাধল। আমার সিগারেট কেবল মাত্র শেষ হয়েছে। আমি বললাম, “আমারটা এখনই শেষ হয়েছে, আপনি খান।“  লোকটাকে দেখে সাধারণ গ্রামের লোক মনে হলো না। সাদার উপরে লাল স্টাইপ দেয়া ফুল সার্ট, কালো ফুল প্যান্ট, পায়ে সাদা টেনিস খেলার জুতা, সার্টের পকেটে একটা কলম, ঘাড়ে ঝোলানো একটা ছোট ব্যাগ, বয়স আমার থেকে তিন চার বছর বেশী হবে।

 আমি ক্যাপ্টেন রানা, মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিতে যাচ্ছি। আমার কর্মস্থল ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে, ছুটি কাটাতে এসেছিলাম।তিনি তার পরিচয় দিয়ে আমার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন। আমার নাম সোহেল, ঢাকায় ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তাম। আমি আমাদের দলের দিকে ইঙ্গিত করে বললাম, “আমরা প্রায় সবাই আজিমপুর কলোনির ছেলে, সব বন্ধুরা একসাথে যুদ্ধে যোগদান করতে যাচ্ছি।আমার কথা শেষ হলে ক্যাপ্টেন সাহেব একটু হেসে বললেন, “আজিমপুর? আছা, আমিও তো ছোটবেলা আজিমপুরে থাকতাম। আব্বা অবসরে গেলে আমরা অন্য জায়গায় চলে যাই।তিনি জানতে চাইলেন, “তোমরা এত অস্ত্রশস্ত্র কোথায় পেলে?” আমি তাকে আমাদের অস্ত্র যোগাড় করার কথা বললাম। তিনি মাথা নাড়িয়ে তার বাহবা দিলেন। ইতোমধ্যে অন্য সবার ঘুম ভেঙ্গে গেছে। সবাই এসে আমাদের সাথে যোগ দিলে আমি সবার সাথে ক্যাপ্টেন সাহেবের পরিচয় করিয়ে দিলাম। আমরা তাকে আমাদের ভ্রমণের অভিজ্ঞতা, জিনজিরার ঘটনা, পথে ডাকাতদের সাথে সংঘর্ষ, ইত্যাদির বিবরণ দিলাম। তিনি মাথা নাড়তে নাড়াতে সব শুনলেন।

 কিছুক্ষণ পরে দূরে ঘাট দেখতে পেলাম। ক্যাপ্টেন জানালেন ঘাটের নাম গোর্কন ঘাট। কিছুক্ষণ পর লঞ্চ ঘাটে এসে থাকল।

 সব যাত্রীদের নামা শেষ হলে আমরা নামলাম। লঞ্চ থেকেই দেখেছিলাম যে নীচে দুই জন খাকী পোশাক পরা আনসার হাতে রাইফেল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

 আমাদেরকে অস্ত্রসহ লঞ্চ থেকে নামতে দেখে দুজনই বেশ সজাগ হয়ে উঠল। আমাদেরকে ঠিক বুঝতে পারছে না। এরা কারা, আমার কোমরের খাপে পিস্তল, হাতে রাইফেল, মুখের ভাব, চলার ধরণ ইত্যাদি দেখে দুজনেই আমাকে কোনো অফিসার ভেবে স্যালুট দিল। আমি যে স্যালুট পেতে অভ্যস্ত এমন ভাব দেখিয়ে গম্ভীর গলায় জিজ্ঞাস করলাম, “এখানকার দায়িত্বে কে?” ইতোমধ্যে ক্যাপ্টেন রানা নেমে আনসারদের নিজের পরিচয় দিলেন। আনসার দুজন পরিচয় জেনে সম্ভ্রমে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে অনভ্যস্ত মিলিটারি কায়দায় স্যালুট দিল। তারপরে বলল, “স্যার, আমাদের সাথে আসেন।আনসার দুজন সামনে আর আমরা তাদের পেছনে মিছিল করে এগিয়ে চললাম। কিছুদূর হাটার পরে নদী সংলগ্ন একটি লম্বা টিনের ছাউনি দেয়া আধা পাকা ঘর দেখতে পেলাম। আমারা ঘরে ঢুকলাম।

 ঘরের ভিতরে এক খাকী পোশাক পরা, মাথায় বিশাল টাক, মধ্যবয়সী লোক চেয়ারে বসে ঝিমচ্ছে। আমাদেরকে ঢুকতে দেখেই সে চেয়ারে সোজা হয়ে বসল। ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞাসু নয়নে আমাদের দিকে তাকিয়ে রইল। আমাদের সবার হাতের অস্ত্র দেখে মনে হয় একটু শঙ্কিত হলো।

 ক্যাপ্টেন রানা তার পরিচয় দিতেই কমান্ডার প্রায় লাফ দিয়ে চেয়ার থেকে উঠে স্যালুট দিলেন। ক্যাপ্টেন সাহেব স্যালুটের উত্তর দিয়ে জানতে চাইলেন, “এই এলাকার দায়িত্বে কোন আর্মি অফিসার আছেন।ক্যাপ্টেন রানাকে একটা চেয়ার এগিয়ে দিয়ে কমান্ডার বললেন, “স্যার, এখানে ক্যাপ্টেন জহির সাহেব দায়িত্বে আছেন।ক্যাপ্টেন শুনে একটু হেসে বললেন, “, জহির, ভালই হলো, সে আমার কোর্স মেট।কম্যান্ডারের দিকে তাকিয়ে বললেন, “জহির এখন কোথায়? আমি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তার সাথে দেখা করতে চাই।তারপর আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “ওরা সব ঢাকার থেকে এসেছে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিতে। তাদেরও জহিরের সাথে দেখা করা দরকার।

 কমান্ডার এখন তটস্থ হয়ে উঠে বলল, “স্যার, আপনারা কী দুপুরে কিছু খেয়েছেন? কিছু খাবার ব্যবস্থা করি?” ক্যাপ্টেন রানা আমাদের দিকে তাকালেন। আমরা লঞ্চে উঠার আগে খেয়ে উঠছি,” আমি জানালাম। ক্যাপ্টেন রানাও খেয়ে এসেছেন জেনে, কমান্ডার বলল, “তাহলে স্যার একটু চায়ের ব্যবস্থা করি?” এই বলেই কমান্ডার প্রায় দৌড়ে ঘরের বাইরে গিয়ে কাকে যেন কী সব বলে আবার ঘরে ফিরে এলেন।

 ঘরে আসবাবপত্র বলতে একটি টেবিল ও তিনটি চেয়ার। ফলে আমরা সবাই ঘরের দেয়ালে হেলান দিয়ে মেঝেতে বসলাম। এখন আমাদের যে কোনো জায়গায় বসতে বা ঘুমাতে সমস্যা হয় না। যেখানে বালিশ নরম না হলে চিৎকার করে বাসা ফাটিয়ে ফেলতাম, সেই আমি এখন প্রায় সব জায়গায় ঘুমাতে পারি। এই কয়দিনেই কী পরিবর্তন।

  কিছুক্ষণ পরে চা এলো। চা না বলে বলা উচিৎ দুচা, মানে অর্ধেক চা আর অর্ধেক দুধ। চুমুক দিয়ে ভালই লাগল, অনেক চিনি দেয়া আর গোরুর দুধের গন্ধ। আমার জন্য নতুন ধরণের চায়ের স্বাদ।

 যাই হোক, কিছুক্ষণ পরে একটা পিকআপ-ট্রাক এলে আমরা সবাই পেছনে উঠলাম আর ক্যাপ্টেন রানা ড্রাইভারের পাশের সিটে বসলেন। পিকআপ চলতে শুরু করল।

 ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রাস্তাঘাট এখন প্রায় ফাঁকা। মনে হলো অনেক লোক শহর ছেড়ে অন্য কোথাও চলে গেছে। রাস্তায় দু একটা রিক্সা, সাইকেল, ও মোটর সাইকেল ছাড়া অন্য যানবাহন দেখা গেল না। কিছুক্ষণ পরে পিকআপ একটা একতালা দালানের সামনে থামল। দেখে মনে হলো একটা স্কুল। দালানের সামনে একটা আর্মি জিপ দাঁড়িয়ে, চার পাঁচজন  লোক বিভিন্ন অস্ত্রসহ জীপের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের কয়েকজন সামরিক পোশাক পরিহিত থাকায় বুঝতে অসুবিধা হলো না এরা সবাই সেনাবাহিনীর সদস্য। আমরা গাড়ি থেকে নামলাম। আমাদের এতজনকে সশস্ত্র মানুষকে এক সাথে গাড়ি থেকে নামতে দেখে তারা কৌতূহলের দৃষ্টিতে আমাদেরকে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল। কিন্তু আমাদের সাথের দো-নলা বন্দুক, .২২ রাইফেল  আমাদের বয়স ও কাপড় চোপড় দেখে হয়ত বুঝতে পারল যে আমরা সবাই ছাত্র।

 যাই হোক, ক্যাপ্টেন রানা প্রথমে একটা ঘরে ঢুকলেন। আমরা বাইরে দাঁড়িয়ে রইলাম। বেশ কিছুক্ষণ পরে একজন লোক সেই ঘর থেকে বের হয়ে আমাদের সবাইকে ঘরে ঢুকতে বলল। আমরা সবাই ঘরে ঢুকলাম।

 ঘরটা মোটামুটি বেশ বড়। ঘরের বেশিরভাগ যায়গা একটা লম্বা টেবিল দখল করে আছে। টেবিলের এক মাথায় একজন ২৫-২৬ বছরের সেনাবাহিনীর অফিসারের পোশাক পরিহিত লোক বসে আছে। বুঝলাম তিনি ক্যাপ্টেন জহির। তার ঠিক ডানদিকে ক্যাপ্টেন রানা বসে আছেন। তাছাড়া আরও চার পাঁচজন লোক টেবিলের চারপাশে চেয়ারে বসে আছে।

 ক্যাপ্টেন জহির আমাদেরকে বেশ আগ্রহ নিয়ে পর্যবেক্ষণ করছেন বলে মনে হলো। আমরা সবাই তাকে সালাম দিলাম। তিনি মাথা নেড়ে সালামের উত্তর দিলেন।

 আমরা কিছু না বলে দাঁড়িয়ে আছি, তার প্রশ্নের অপেক্ষা করছি। আমাদের সবাইকে দেখা শেষ হলে তিনি বললেন, “রানা বলেছে তোমাদের সাথে তার লঞ্চে দেখা হয়েছে। তোমাদের জিনজিরার অভিজ্ঞতা, পথে ডাকাতদের সাথে সংঘর্ষ, তোমাদের অস্ত্র সংগ্রহের কাহিনী সবই বলেছে। আমি শুনে খুব খুশী হয়েছি। তোমাদের মতো তরুণদের দেশের এখন প্রয়োজন, দেশের স্বাধীনতার জন্য এখন আমাদের সবাইকে যুদ্ধ করতে হবে,“ একনাগাড়ে কথা বলে ক্যাপ্টেন জহির একটু থামলেন। তারপর আবার শুরু করলেন, “তোমাদের সাথের অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে তো যুদ্ধ করা যাবে না, তাছাড়া তোমাদেরকে যুদ্ধের অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ নিতে হবেআমরা কয়েকদিন আগে এক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চালু করেছি, আমি তোমাদেরকে সেখানে যত শীঘ্র সম্ভব পাঠানোর ব্যবস্থা করব। হয়ত দু-দিন সময় লাগবে। তোমারা থাকবে কোথায়? এখানে কাউকে চেনো?”

 এদিকে আমাদের দলের মাহতাবের দেশের বাড়ি কুমিল্লা হলেও তার এক মামা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার থাকতেন। মাহাতাব বলত তার মামা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছাত্রলীগের বড় নেতা গোছের, নাম মাহবুব। আমার অবশ্য মাহতাবের মামা সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না।

 আমি মাহতাবের দিকে তাকালাম। মাহতাব বলল, “আমার এক মামা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার থাকেন, নাম মাহবুব। তিনি এখানকার ছাত্রলীগের নেতা।“ “ও মাহবুব, সেতো কিছুক্ষণ আগেও এখানে ছিল। এখানকার ছাত্ররা আমাদেরকে বিভিন্ন ব্যাপারে সাহায্য করছে। আমি তাকে ডাকার জন্য লোক পাঠাচ্ছি।কথা শেষ করে তিনি পাশের লোককে কিছু বললে সে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। তোমরা পাশের ঘরে অপেক্ষা কর, আমারা একটা জরুরী মিটিঙে আছি।

 ক্যাপ্টেন জহিরের কথা শেষ হলে আমরা সবাই ঘর থকে বেরিয়ে এলাম। অন্য ঘরে না ঢুকে আমরা সবাই লাইন করে বারান্দায় বসে সিগারেট ধরালাম। আমাদের সামনে যে চার পাঁচ জন দাঁড়িয়ে ছিল তাদেরকেও সিগারেট দিলাম। আমরা সবাই সিগারেট খেতে খেতে বিভিন্ন আলাপ আলোচনা করতে লাগলাম। জানতে পারলাম যে এরা সবাই চতুর্থ ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্য। তারা পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে বিদ্রোহ করে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রতিরক্ষার দায়িত্বে এখন ক্যাপ্টেন জহিরের নেতৃত্বে এই রেজিমেন্টের একটি কোম্পানি রয়েছে।

 প্রায় ঘণ্টা খানেক পরে কয়েকজনকে তিনটা মটর সাইকেলে চড়ে স্কুলের দিকে আসতে দেখলাম। আমাদের অদূরে তারা মোটর সাইকেল থেকে নামলেন।  তাদেরকে দেখে মাহতাব উঠে দাঁড়িয়ে একটু সামনে এগিয়ে গেল। মাহতাব একজনকে দেখে মাহবুব মামা, মাহবুব মামা বলে চিৎকার করে ডাকতে শুরু করল। যারা আসছিল সবাই থেমে মাহতাবের দিকে ফিরে তাকাল। মাহতাব দৌড়ে একজনকে জড়িয়ে ধরল। মামা তো মাহতাবকে দেখে অবাক, “আরে মাহতাব, তুমি এখানে কী করে? আপা, দুলাভাই কেমন আছেন?” মাহতাব তার মামাকে সব বুঝিয়ে বলল। কথা শেষ হলে মাহতাব আমাদের সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিল।

 মামা বললেন, “থাকার কোনই সমস্যা হবে না। আমরা এখন অনেক শরণার্থীর থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করছি, তোমরা আর কয়জন। তাছাড়া আমার নিজের বাসাই এখন একদম খালি, তোমরা সবাই আমার বাসাতেই থাকবে, কোনো অসুবিধা হবে না।মামা আবার বললেন, “আমি একটু ক্যাপ্টেন সাহেবের সাথে দেখা করে আসি, কিছু কাজের কথা আছে।মামা দলবল নিয়ে ক্যাপ্টেন সাহেবের সাথে দেখা করতে গেলেন।

 কিছুক্ষণ করে মামা তার দলবল সহ মিটিং শেষ করে বের হলেন। আমাদেরকে বললেন, “আমি একজনকে রেখে যাচ্ছি তোমাদেরকে আমার বাসায় নিয়ে যাবার জন্য। আমি মোটরসাইকেলে যাচ্ছি তোমরা আস।মামা মোটরসাইকেলে চেপে চলে গেলান।

 আমরা ১৪-জন মামার রেখে যাওয়া লোকের সাথে মামার বাসার দিকে হেটে চললাম। বাসা বেশী দূরে না, অল্পক্ষণেই পৌঁছে গেলাম। মামার বাসায় ঢুকতে হলে একটি প্রধান দরজা পার হতে হয়, দরজা পার হলে এক বিশাল উঠান। উঠানের চারপাশে অনেকটা ইংরেজি U-মতো করে ঘরগুলো। ঘরগুলোর সামনে বারান্দাবারান্দায় উঠার তিনদিকে সিঁড়ি আছে। বাসায় দুজন কাজের মানুষ ছাড়া অন্য কাউকে দেখতে পেলাম না। মামা অবশ্য আগেই বলেছিলেন বাসায় এখন কেউ নেই।

 আমদেরকে মামা চারটা ঘর থাকার জন্য বরাদ্দ করলেন। প্রত্যেক ঘরেই চকি পাতা, কোনো কোনো ঘরে দুটো করে। মনে হলো আজকে হয়ত মাটিতে ঘুমাতে হবে না।

 উঠানের একদিকে একটা কুয়া ও নলকূপ। আমরা সবাই সেখানে হাত মুখ ধুয়ে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হলাম। আমার ব্যাগে একটা প্যান্ট, একটা শার্ট, দুটো গেঞ্জি, দুটা জাঙ্গিয়া, দুই জোড়া মোজা, একটা ছোট তোয়ালে, টুথপেস্ট, টুথব্রাশ, আর একটা চিরুনিএই হলো এখন আমার সম্বলঢাকা ছাড়ার পর এখনও কাপড় বদলানো হয়ে ওঠেনি। ব্যাগটা অবশ্য ঘুমানোর সময় বালিশ হিসাবেও ব্যবহৃত হতো।

 এখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে, বাসার দুজন কাজের লোক ছিল। তারা হ্যারিকেন জ্বালিয়ে দিয়ে গেল। আমরা কিছুক্ষণ বিশ্রাম করলাম। একটু পরে আমাদেরকে খাওয়ার জন্য ডাকল। বের হয়ে দেখি বারান্দায় মাটিতে আমাদের খাওয়া দেয়া হয়েছেপাতলা খিচুড়ি, বেগুন ভাজি, সাথে বাটিতে ঘি। খিচুড়ির সাথে ঘি মিশিয়ে খেতে খুবই ভাল লাগল।

 খাওয়া শেষ হলে আমরা সবাই মাহবুব মামার সাথে গল্প করতে বসলাম। জানতে পারলাম যে ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্যরা নদীর পাড়ে অনেক ট্রেঞ্চ ও বাঙ্কার তৈরি করে প্রতিরক্ষা অবস্থানে আছে। এ সমস্ত জানতে পেরে আমরা বেশ নিরাপদ বোধ করলাম। আরও জানতে পারলাম সিলেটের এক চা-বাগানে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্র তৈরি করা হয়েছে। আমাদেরকে খুব সম্ভবত পরশু দিন সেখানে পাঠানো হবে। মামা বললেন, “তোমরা তো এইসব অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে প্রশিক্ষণে যেতে পারবা না। চাইলে আমার কাছে রেখে যেতে পারো।আমি বললাম আমরা নিজেদের মধ্যে কথা বলে আগামীকাল জানাব। আরও কিছুক্ষণ কথাবার্তার পর আমরা সবাই ঘুমাতে গেলাম, তখন প্রায় সাড়ে নটা বাজে।

 পরের দিন উল্লেখযোগ্য কিছুই ঘটল না। কাজের মধ্যে আমরা সবাই ঢাকা থেকে বের হবার পর প্রথম গোছল করলাম এবং পরনের কাপড় ধুলাম। বেশ কিছুক্ষণ ঘুমালাম, নিজেরা গল্পগুজব করে শুয়ে বসে সময় কাটালাম। সন্ধ্যার সময় খবর পেলাম আগামীকাল আমাদেরকে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হবে।

 পরের দিন ভোরে আমরা সবাই ঘুম থেকে উঠে তৈরি হলাম। আমাদেরকে বলা হয়েছিল সকাল নয়টার মধ্যে সেই স্কুল ভবনে উপস্থিত থাকতে। সকালের নাস্তা ছিল আটার রুটি, ভাজি, ও ডিম। নাস্তা শেষ করতে করতে আটটা বেজে গেল। এর আগেই আমরা সবাই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে আমার অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ মামার কাছে রেখে যাব। কিন্তু আমাদের রিভলভার ও পিস্তলগুলো সাথে নিয়ে যাব।

 পিস্তল ও রিভলভার মিলে আমাদের ৮-টা অস্ত্র। পাঁচটা রিভলভার যার চারটা .৩২ ক্যালিবারের আরে একটা .২২। পিস্তলের মধ্যে একটা .২৫, একটা .২২ ও একটা ৭.৬৫ এম এম। আমাদের সাথে অবশ্য এই অস্ত্রের পর্যাপ্ত গুলি ছিল না। কাজেই একবার গুলি ফুরিয়ে গেলে এই অস্ত্রগুলো আর কোনো কাজে আসবে না। সবাইকে তাদের অস্ত্র ব্যাগে লুকিয়ে রাখতে বললাম।

 মামার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমরা সবাই স্কুলের দিকে রওয়ান হলাম। যখন স্কুলে পৌঁছলাম তখন সাড়ে আটটা বাজে। স্কুলের সামনে একটা বাস দাঁড়ান ছিল, মনে হয় আমাদেরকে নিয়ে যাবার জন্য। আরও কিছু ছেলেকে দেখলাম ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছোট ছোট জটলা করে দাঁড়িয়ে আছে। আমরা সহ প্রায় ৪০-জনের মতো হবে।

 কিছুক্ষণ পর ক্যাপ্টেন জহির তার অফিস থেকে সাথে আরও দুই তিন জন সহ বেরিয়ে এলেন। ইতোমধ্যে মাহবুব মামা তার কয়েকজন সাথী সহ এসে যোগ দিলেন। একজন লোক স্কুলের ভিতর থেকে একটা টেবিল আর তিন চারটা চেয়ার নিয়ে এলো। ক্যাপ্টেন জহির বসার পর মাহবুব মামা ও আরেকজন লোক তার পাশে একটা রেজিস্টার খাতা নিয়ে বসলেন। আমাদের সবাইকে লাইন করে দাড়াতে বলা হলো। তারপর এক এক করে প্রথমে রেজিস্টার খাতায় নাম, বয়স, পিতার নাম, ঠিকানা, ইত্যাদি লিখার পর এক এক করে বাসে উঠে বসলাম। সাড়ে নয়টার দিকে সবাই বাসে উঠলে বাস চলতে শুরু করল।

 আমরা শুধু জানি আমরা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে যাচ্ছি, কিন্তু কোথায় আর যেতে কতক্ষণ লাগবে সেটা আমাদের জানা ছিল না।

 বাস চলছে, আমি জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছি। গাছপালা, বাড়ি ঘর, ধান ক্ষেত, গোরু, ছাগল, ইত্যাদি দেখা গেলেও আসলে কিছুই দেখছি না। মনে অনেক চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। কী ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে সামনে? দলনেতা হিসাবে ১৩-টি প্রাণের দায়িত্ব আমার কাঁধে। এই দায়িত্ব ঠিক মতো পালন করতে পারব তো? আমরা কী আবার ফিরে যেতে পারব? কয়জন পারব?

 (চলবে)

 

দ্রষ্টব্য: এটি গল্প হলেও কিছু ঐতিহাসিক ঘটনার উপর ভিত্তি করে রচিত।

 

  আজিমপুরের ছেলেরা সত্যিই ২৮-সে মার্চে যারা পাকিস্তানি প্রশাসনের নির্দেশে অস্ত্র জমা দিতে যাচ্ছিল, তাদের অনেকের কাছ থেকে অস্ত্র কেড়ে নিয়েছিল। এই ছেলেদের অনেকেই জিনজিরাতে গিয়েছিল।

  ২ এপ্রিল ১৯৭১ সালে জিনজিরাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিরস্ত্র বেসামরিক মানুষের উপরে আক্রমণ করেছিল। এই নির্মম ও নিশংস কাপুরোষচিত ধ্বংসযজ্ঞে ১,০০০-এর বেশী মানুষ নিহত ও আরও অনেকে আহত হয়।

  অনেক শরণার্থী তাদের যাত্রা পথে ডাকাতদের কবলে পড়ে জান, মাল, ও সম্ভ্রম হারিয়েছিল। এই নরপশুদের হাত থেকে আবালবৃদ্ধবনিতা কেউ নিষ্কৃতি পায়নি।

  আমি ১৯৭১ সালে আজিমপুরে থাকতাম না। আমি যুদ্ধ থেকে ফেরার পর ১৯৭২ সাল থেকে আজিমপুরে থাকতে শুরু করি। যদিও এখানে সব নামই কাল্পনিক, তার পরেও মোটামুটি ভাবে আমার দেখা বা চেনা আজিমপুরের কিছু ছেলেদের ভিত্তি করে চরিত্রগুলো তৈরি করা।

 

 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পরিবর্তন ও প্যারাড়াইম

আজিমপুরের দুর্দান্ত যোদ্ধারা, পঞ্চম পর্ব

আজিমপুরের দুর্দান্ত যোদ্ধারা, চতুর্থ পর্ব