পরিবর্তন ও প্যারাড়াইম
পরিবর্তন ও প্যারাড়াইম
পরিবর্তন একটি প্রাকৃতিক
প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে এই বিশ্বজগতের সবকিছুই এক অবস্থা থেকে আরেক অবস্থায় পৌঁছে।
এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সব কিছুই পরিবর্তনের সর্ব-শক্তিমত্তার কাছে পরাভূত—সব কিছুর পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী—এর থেকে কোন পরিত্রাণ নেই। অনেক ক্ষেত্রেই পরিবর্তনের এই নির্মমতা অনুধাবন
দুষ্কর কারণ এই অগ্রগতি সাধারণত খুবই সূক্ষ্ম ও মন্থর, খেয়াল না করলে সচরাচর বোধগম্য হয় না। কাজেই একটি নির্দিষ্ট সীমারেখা অতিক্রম
না করা পর্যন্ত এর ব্যাপ্তি দৃশ্যমান হয় না অথবা বোঝা যায় না।
অবশ্য কোন কোন সময় মধ্য বা
দীর্ঘমেয়াদি চরম বিপদসংকুল পরিবেশের প্রভাবে বৈপ্লবিক পরিবর্তন হতে পারে।
আধুনিক মানব সমাজের অবশ্য
পরিবর্তনকে আত্তীকরণের প্রবণতা আশাব্যঞ্জক নয়। যাযাবর মানুষ যখন ধীরে ধীরে
কৃষিকার্য আবিষ্কারের পরে গ্রাম, নগর, শহর,
ও সভ্যতার বেড়াজালে পরিবেষ্টিত করার পর মানব সমাজ
ক্রমশ পরিবর্তনকে সংহতি বিনষ্টকারী হুমকি হিসেবে গণ্য করতে থাকে। প্রায় সব ধর্মেই
পরিবর্তনের পরিবর্তে স্থায়িত্বকেই যে প্রাধান্য বা গুরুত্ব দেয়া হয় তাইনা,
বরং পরিবর্তনকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করার প্রবণতা
লক্ষ্য করা যায়। কোন ধর্মেই এর ব্যতিক্রম হয় না। কাজেই সভ্যতার বিকাশ,
বৃদ্ধি, ও উন্নয়নের সাথে সাথে মানুষ পরিবর্তনকে ভয় পেতে শুরু করে এবং এক সময়
পরিবর্তনকে সম্পূর্ণ নির্বাসিত করে। এই একবিংশ শতাব্দীতেও একই প্রবণতা লক্ষণীয়।
পরিবর্তন সম্পর্কে আলোচনার জন্য
প্যারাডাইম (Paradigm) নামে একটি শব্দের সাথে পরিচিত হতে হবে। বাংলা ভাষায় এই ইংরেজি শব্দের কোন
প্রতিশব্দ না পেয়ে আমি একে প্যারাডাইমই লিখব। অনেকেই প্যারাড়াইম শব্দটির সাথে
পরিচিত হলেও এই লেখায় প্যারাড়াইম বলতে কী বুঝচ্ছি তা পরিষ্কার করা উচিৎ।প্যারাডাইম
জিনিষটা কী?
প্যারাডাইমকে এভাবে বর্ণনা করা
যেতে পারে যে এটি এমন একটি প্রক্রিয়া যার প্রভাবে আমদের পৃথিবী,
পরিবেশ, সমাজ, নৈতিকতা,
ধর্ম, ন্যায়/অন্যায়, মানুষে মানুষে সম্পর্ক; সমাজে লিঙ্গের বিভাজন, দায়িত্ব ও ক্ষমতার বণ্টন, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা, ইত্যাদির সম্পর্কে আমাদের ধারণা, কার্যকলাপ ও উপলব্ধিকে প্রভাবিত করে সেটাই প্যারাড়াইম। অনেক ক্ষেত্রে একটি
প্যারাড়াইম তৈরি বহু বছরের লব্ধ অভিজ্ঞতার বিবর্তনের মাধ্যমে আবার কোন কোন সময় কোন
মহা বিপর্যায়ের ফলে হঠাৎ করেই এর পরিবর্তন হতে পারে। প্যারাডাইম সম্পর্কে সুস্পষ্ট
ধারণা থাকলে কী কী শক্তি পরিবর্তনকে বাঁধাগ্রস্ত বা প্রতিরোধ করে তা বুঝতে সহায়ক
হয়। তাছাড়া, প্যারাডাইম
সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পরিবর্তন সম্পর্কে আলোচনার জন্য একটি বিশেষ ভাষা হিসেবে
ব্যবহার করা যায়। এর মাধ্যমে পরিবর্তন সম্পর্কে নেতিবাচক চিন্তার কারণ বিশ্লেষণ
করা সম্ভব হয়।
প্যারাডাইম জানা থাকলে আরও অনেক
উপকারে আসতে পারে, যেমন: ১) আমাদের অন্বেষণ স্পৃহাকে অধিক জাগ্রত করতে পারে;
২) আমাদেরকে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের পথে উদ্বুদ্ধ করতে
পারে যেই পরিবর্তন সমাজের মৌলিক পরিবর্তন সাধিত করতে সক্ষম;
৩) সূক্ষ্মদৃষ্টিতে নতুনত্ব প্রক্রিয়াকে (innovation)
অন্তর্দৃষ্টি ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে কী ভাবে
ত্বরান্বিত করা সম্ভব তার নির্দেশনা দিতে পারে।
প্যারাডাইমের সমার্থক শব্দ হতে
পারে তত্ব বা থিওরি, মডেল, বিশ্বাসের
সমষ্টি বা belief system, ইত্যাদি।
প্রসঙ্গত এখানে আমাদের কিছু প্রাক্তন ধারণা বা বিশ্বাসের উদাহরণ দেওয়া যায়। আমাদের
পূর্বপুরুষদের ধারণা ছিল পৃথিবী সৌরজগতের কেন্দ্রে অবস্থিত। কিন্তু আমরা এখন জানি
যে এটা সত্যি না বরং উল্টোটাই সত্য—সৌরজগতের কেন্দ্রই সূর্য। আপনাদের হয়ত স্মরণ থাকবে গ্যালেলিও তার আবিষ্কৃত
দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে সৌরজগত পর্যবেক্ষণের পর পৃথিবী যে সৌরজগতের কেন্দ্রে
নয় বরং সূর্যই সৌরজগতের কেন্দ্রে এই কথা বলার পর গ্যালেলিও-কে কিধরণের অত্যাচার
সহ্য করতে হয়েছিল? একই ভাবে এক সময় মনে করা হতো পৃথিবী সমতল, কিন্তু এখন আমরা জানি পৃথিবীর আকৃতি একটি কমলা লেবুর মতো। এভাবে আরও অনেক
উদাহরণ উপস্থাপন করা যেতে পারে।
প্যারাডাইমকে অবশ্য অন্য ভাবেও
চিন্তা করা যায়। আমরা যদি একটি দ্বিমাত্রিক (two dimensional) বাক্স হিসেবে কল্পনা করি, তাহলে প্যারাডাইম হচ্ছে এই বাক্সের চার দেয়াল ঘেরা সীমানা। বাম দিকের দেয়াল
হচ্ছে নৈতিকতা, ডান দিকের দেয়াল আইনি কাঠামো, উপরের দেয়াল প্রাযুক্তিক সীমানা, এভাবে অরোও অনেক সীমানা থাকতে পারে। মোদ্দা কথা এই যে আমরা প্রায় সকলেই এই
রকম একটি বাক্সের ভিতরে অবস্থান করি এবং বাক্সের বাহিরে যেতে ভয় পাই,
শঙ্কা বধ করি, অস্বচ্ছন্দ বোধ করি, ইত্যাদি।
প্যারাডাইমকে আবার অনেকগুলি ছোট
থেকে বড় সমকেন্দ্রিক বৃত্যের মতো কল্পনা করতে পারি—অনেকটা গুলি ছুড়ার সময় যে ধরনের টার্গেট ব্যবহার করা হয় সে রকম। এই বৃত্য
সমষ্টির পরিধি থেকে যতই কেন্দ্রের দিকে যাওয়া যায় প্যারাডাইমের প্রভাব ততই প্রবল
থেকে প্রবলতর হয়। কাজেই প্যারাডাইমের প্রভাব সবচেয়ে বেশী পরিলক্ষিত হয় এর
কেন্দ্রে। উদাহরণ স্বরূপ, যে কোন ধর্মের কেন্দ্রে থাকবে পুরোহিতরা। উলটো করে বললে,
কেন্দ্র থকে যতই পরিধির দিকে যাওয়া যায়,
প্যারাডাইমের প্রভাব ততই কমতে থাকে।
এখানে অবশ্য একটি বিশয় খোলাসা
করা উচিৎ। একটি বড় প্যারাডাইমের ভিতরে অনেক ছোট ছোট উপ-প্যারাডাইম থাকতে পারে।
আবার উপ-প্যারাডাইমের ভিতরে আরও ছোট প্যারাডাইম হতে পারে। ধর্ম যদি একটি
প্যারাড়াইম হয় তাহলে ইসলাম ধর্ম যদি একটি উপ-প্যারাডাইম;
এভাবে খৃষ্ট ধর্ম, হিন্দু ধর্ম, বৌদ্ধ ধর্ম, ইত্যাদি সব ধর্মের উপ-প্যরাড়াইম। আবার ইসলাম ধর্মের ভিতরে সিয়া,
সুন্নি, ইত্যাদি উপ-উপ-প্যারাডাইম। সুন্নিদের ভিতরে আবার আরও ছোট ভাগ থাকতে পারে।
এখন আসা যাক,
কী কী নূতন প্যারাডাইম আসতে পারে অথবা ইতিমধ্যে
এসেছে। যেমন ক্লোনিং (cloning)। আজ থেকে ১০০-বছর আগেও কি কেউ কল্পনা করতে পেরেছিল যে একদিন ক্লোনিং নামে
একটি প্রযুক্তির উদ্ভব হবে যার দ্বারা প্রাকৃতিক উপায় ছাড়াও জীবন তৈরি করা যাবে?
অথবা আমরা ই-ব্যবসা (E-business) নিয়েও আলোচনা করতে পারি। টেলেগ্রাফ ও টেলিফোন আবিষ্কারের সময় কেউ কি কল্পনা
করতে পেরেছিল যে একদিন একই ধরনের উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে ঘরে বসেই বাজার সওদাই
করা যাবে? ভিডিও
কনফারেন্সের কথাই ধরা যাক। ৫০-বছর আগে এই ধারণা করা সম্ভব ছিল?
১৯৬৬ সাল থেকে শুরু হওয়া স্টার ট্রেক (Star
Trek) ছবিতে প্রথম আমরা সেল-ফোনের মতো
যন্ত্র দেখতে পাই। সে সময় আমরা সবাই একে অলীক কল্পনা মনে করতাম। কিন্তু আজকে
বিশ্বের ৭৮০ কোটি জনসংখ্যার জন্য ৯৮২ কোটি সেল-ফোন আছে—তার মানে জনসংখ্যার তুলনায় অনেক বেশী—এটি সম্ভব হয়েছে ৫০-বছরেরও কম সময়ে!
উপরের উদাহরণগুলো থেকে বুঝা যায়
যে প্যারাডাইম বদলায়। যখন এই ধরনের কোন পরিবর্তন হয় তখন এটাকে বলে হয়
প্যারাডাইম-পরিবর্তন (Paradigm Shift). কিন্তু আমরা যখন কোন নিদিষ্ট প্যারাডাইমের অভ্যন্তরে থাকি তখন আমাদের নিজের
প্যারাডাইমের বাইরে যে অন্য প্যারাডাইম থাকতে পারে সেটা চিন্তাও করতে পারি না।
আমাদের প্যারাডাইম ক্রমশ আমাদেরকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেছে ফেলে এবং অনেক ক্ষেত্রেই
পরিবর্তন-বিমুখ ও অনুভূতিহীন করে ফেলে। অবশ্য এটাও সত্যি যে একটি নূতন প্যারাডাইমে
প্রবেশ করাও সংকটময় হতে পারে কেননা নূতন প্যারাডাইমে আগের প্যারাডাইমের বেশীর ভাগ
আইন-কানুন, প্রযুক্তি,
ধারণা, উপায়, ইত্যাদি অচল
হয়ে পড়ে এবং সব কিছুই আবার শূন্য থেকে শুরু করতে হয়।
কাজেই,
পরিবর্তনের পূর্বশর্ত হচ্ছে বুঝতে পারা যে আমরা যা
করছি সেটা আমাদের বর্তমান প্যারাডাইম তাড়িত হয়ে করছি এবং কোন কিছু অর্জন করার এটাই
একমাত্র উপায় নয়।
একটি প্যারাডাইমের অভ্যন্তরে
থাকার একটি বিশেষ অসুবিধায় আছে। প্যারাডাইমের প্রভাবে অনেক সময় আমার বা আমাদের
প্যারাডাইমই একমাত্র সঠিক ও অপরিবর্তনীয় মনে হতে পারে। এই অবস্থাকে বলে
প্যারাডাইম-পক্ষাঘাত (paradigm paralysis). প্যারাডাইমের যতই কেন্দ্রের দিকে যাওয়া যায় এই প্রবণতা ততই ঘনীভূত হয়। ফলে
প্রস্তাবিত কোন ধরনের নূতন চিন্তা, ভাবনা, উপায়, পদ্ধতি,
নিয়ম, ইত্যাদিকে বর্তমানে প্রচলিত প্যারাড়াইমের আলোকে কোন চিন্তা বা বিবেচনা ছাড়াই
সরাসরি প্রত্যাখ্যান করা হয়।
নূতন প্যারাডাইম যারা সৃষ্টি
করেন তারা সাধারণত প্যারাডাইমের বাহিরের লোক—তারা পুরানো প্যারাডাইমের অন্তর্ভুক্ত লোক না। কাজেই যারা প্যারাডাইম
পরিবর্তনের অগ্রদূত (Paradigm Pioneers) তারা কেউই পুরাতন প্যারাডাইমের কেন্দ্র বা কেন্দ্রের আশেপাশে তৈরি হতে পারে
না। সব সময় আদের উৎপত্তি ঘটে পুরাতন প্যারাডাইমের পরিধি সীমানা থেকে। কাজেই
প্যারাডাইম পরিবর্তনের আভাস পেতে হলে কেন্দ্রে দৃষ্টি দিলে হবে না,
দৃষ্টি দিতে হবে পরিধিতে যেখানে প্যারাডাইমের
প্রভাব সবচাইতে দুর্বল। এই পরিধিতে অথবা পরিধির বাইরেই সব নূতন ধরনের চিন্তা,
চেতনা, ভাবনা, উপায়, ইত্যাদির
উদ্ভব হয়।
যে সমস্ত লোক পূরানো
প্যারাডাইমের পরিবর্তে নূতন প্যারাডাইমকে সর্ব প্রথমে গ্রহণ করেন তাদেরকে
প্যারাডাইম-অগ্রদূত বা paradigm Pioneer বলে। এই লোকদের খুবই সাহসী হতে হয় কেননা পুরানো প্যারাডাইমকে অবজ্ঞা বা
ত্যাগ করে নূতন একটি প্যারাডাইমকে গ্রহণ করতে হলে নূতন প্যারাডাইমের প্রতি দৃঢ়
বিশ্বাস ও গভীর আস্থা থাকতে হয়। কাজেই খুবই সাহসী লোক ছাড়া এ কাজ সম্ভব হয় না।
এখন কিছু উদাহরণ উপস্থাপন করা
যাক:
১। সুইসরা (সুইজারল্যান্ডের
অধিবাসী) শত বছর থেকে ছিল বিশ্বসেরা যান্ত্রিক ঘড়ি নির্মাতা। তারাই প্রথম কোয়ার্টজ
(quartz) ঘড়ি আবিষ্কার
করে, যেটা ছিল এক
বৈপ্লবিক প্রযুক্তি। কিন্তু তারা এই প্রযুক্তিকে সম্পূর্ণ অবজ্ঞা করে কেননা তাদের
শত বছরের ঐতিহ্যগত যান্ত্রিক ঘড়ি তৈরিতে শ্রেষ্ঠতার জন্য। তারা তাদের প্যারাডাইমের
প্রভাবে এতই বুঁদ হয়ে ছিল যে কোয়ার্টজ বা ডিজিটাল ঘড়ি যে এক সময় তাদের শত বছরের
অভিজ্ঞতালব্ধ শিল্পের জন্য মারাত্মক হুমকি হতে পারে তার ধারণা ছিল না। তাদের বিগত
সাফল্যে আপ্লূত থাকায় নূতন কিছু ভাবার প্রয়োজন বোধ করেনি। কিন্তু জাপানিদের কাছে
বাজার হারানোর পর তাদেরকে নূতন ভাবে চিন্তা করতে হয়।
২। মেইনফ্রেম (Mainframe)
কম্পিউটার নির্মাতারা প্রথম দিকে পার্সোনাল
কম্পিউটারের সম্ভাব্যতাকে খুব গুরুত্ব দেয়নি এবং খুব শীঘ্রই যে তাদের ব্যবসাকে
তছনছ করে ফেলবে সেটা অনুধাবন করতে পারেনি।
৩। রেল কোম্পানি বুঝতে পারেনি যে
ট্রাকের ব্যবসা তাদের ব্যবসায় ধ্বস নামাবে।
৪। টেলিগ্রাফ কোম্পানি বুঝতে
পারেনি যে টেলিফোন কোম্পানি তাদেরকে হটিয়ে নিজেরা রাজত্ব করবে।
৫। টেলিফোন কোম্পানি বুঝতে
পারেনি যে মোবাইল বা সেল ফোন তাদেরকে সরিয়ে বাজার দখল করবে।
৬। কিছুদিন পর হয়ত দেখা যাবে যে
আজকের টেলিভিশন স্টেশনকে ইন্টারনেট টেলিভিশন দখল করে নিয়েছে।
5. পরিশেষে,
সেই জিততে পারে যে শুধু দ্রুত গতিশীলই নয় দূরদর্শীও
বটে; যারা কী
পরিবর্তন আসতে পারে অনুধাবন করতে পারে। বিংশ শতাব্দীর একদম প্রথমে (১৯০১) একটি নাম
করা ঘোড়ার গাড়ি প্রস্তুতকারী কোম্পানি, যখন ঘোড়ার গাড়ি তৈরির ব্যবসা খুবই লাভজনক ছিল তখন,
মটর গাড়ি তৈরি শুরু করে—সেই কোম্পানির নামা বেঞ্জ (Benz)!
আমরা পরিবর্তনকে নিম্নে উল্লিখিত
কারণে প্রতিরোধ করি:
• উদ্বেগ—আমি কি এই কাজ করতে পারব?
• ক্ষমতা হারানোর ভয়
• কষ্ট-লব্ধ অভিজ্ঞতা নিমিষে অপ্রাসঙ্গিক হওয়ায় ক্ষোভ।
• নূতন উপায় দীর্ঘমেয়াদী টেকসই হবে কি না তা নিয়ে সন্দেহ।
• অন্যেরা আমার থেকে এই নূতন উপায়ে কাজে অনেক ভাল এই চিন্তা প্রসূত হিংসা।
• ইত্যাদি
কাজেই দেখা যায় যে পরিবর্তনকে যে
সমস্ত কারণে বাধাগ্রস্ত করা হয় সেটা পরিবর্তনের সুবিধা বা অসুবিধার সাথে সম্পর্কিত
নয়।
আমাদের মনে রাখা দরকার যে যখন
প্যারাডাইম-পরিবর্তন (paradigm shift) হয় তখন:
• সবাইকে শূন্য থেকে আবার শুরু করতে হয় কেননা প্যারাডাইম-পরিবর্তন সব নিয়ম
কানুন এমন ভাবে পরিবর্তন করে যে আগে লব্ধ জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, ইত্যাদি বিশেষ কাজে লাগে না।
• খুব বড় পরিবর্তন প্রসূত নেতিবাচক অনুভূতি বাস্তব এবং আমাদেরকে এর মোকাবিলা
করতে হয়। যারা এই পরিবর্তনকে আত্মস্থ করতে সক্ষম হয় না, তাদেরকে কঠিন সমস্যায় পড়তে হয়।
• প্যারাডাইম পরিবর্তন থেকে সুবিধা পেতে হলে আমাদের সম্পূর্ণ শক্তি ও মেধা
কাজে লাগাতে হবে।
• সক্রিয় প্যারাডাইম-পরিবর্তনের অন্বেষণের মাধ্যমে আমরা সবাইকে পিছনে ফেলে
প্রথমে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে পারি।
নীচে কিছু উদাহরণ দিলাম কেমন করে
পুরানো প্যারাডাইমের স্থলে নূতন প্যারাডাইম প্রতিষ্ঠাপিত হয়েছে:
• একসময় জাপানকে মনে করা হতো সস্তা ও ঠুনকো জিনিষের প্রস্ততকারক হিসেবে।
কিন্তু এখন জাপান হচ্ছে সবচেয়ে উন্নত মানের পণ্যের জন্য পৃথিবীজুড়ে বিখ্যাত।
• বাংলাদেশকে এক সময় “তলা-বিহীন ঝুড়ি” বলা হত। সেই বাংলাদেশ এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক তৈরির দেশ।
• যেই চীন একসময় দুর্ভিক্ষের দেশ বলে পরিচিত ছিল সেটা এখন বিশ্বের প্রধান পণ্য
উৎপাদক দেশ।
• ১৯৬৫ সালে সিঙ্গাপুর যখন স্বাধীন হয়, তখন দেশটি খুবই গরিব ছিল। মাত্র ৫৫ বছরে দেশটি এখন সবচেয়ে উন্নত দেশের
কাতারে নিজের স্থান করে নিয়েছে।
প্যারাডাইম-পরিবর্তন থেকে
সুবিধার জন্য যা করা প্রয়োজন:
• নিশ্চিত হন যে আপনার নিজস্ব প্যারাডাইম সম্পর্কে আপনার স্পষ্ট ধারণা আছে।
• নিজেকে প্রশ্ন করুণ, আমার এলাকার বাইরের কোন শিল্প বা প্রতিষ্ঠানকে বা যারা আমার সমস্যা সমাধানে
সাহায্য করতে পারে? তাদের কাছে গিয়ে আলোচনা করুন ও সাহায্য নিন।
• কোন পরিবর্তনের সুপারিশ পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে বিচার বিবেচনা করুন—ভাল ও মন্দ উভয়য়েই।
• নিজের প্যারাডাইমের পরিবর্তনের আভাষ সনাক্তের জন্য নিজের ডোমেইনের (domain)
বাইরে নিয়মিত যোগাযোগ ও খবরাখবর রাখুন।
অনেক সময় একটি প্যারাড়াইম
পরিবর্তনের সুযোগ থাকা স্বত্বেও বিভিন্ন কারণে সেই প্যারাড়াইমের আর্বিভাবকে
প্রতিহত করা হয়। আমি একটি উদাহরণ দেই:
গণতন্ত্রের কথাই ধরা যাক। মোটা
দাগে গণতন্ত্রের কাঠামো হচ্ছে জনগণের দ্বারা শাসন। কিন্তু এখন প্রত্যেক রাষ্ট্রের
অনেক জনগণ থাকায় সবার পক্ষে রাষ্ট্র পরিচালনায় যেহেতু প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ সম্ভব না,
আপস হিসেবে জনগণের প্রতিনিধি নির্বাচনের মাধ্যমে
জনগণের দ্বারা শাসন নিশ্চিত করা হয়। এখানে উল্লেখ্য যে প্রতিনিধি দ্বারা শাসন
কিন্তু জনগণের প্রত্যক্ষ শাসনের অন্তরায়।
কিন্তু এখন এই একুশ শতকে আমরা কি
জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী ও মজবুত করতে পারি
না?
আমাদের মোবাইল ফোনের ব্যবহারের
কথাই ধরা যাক। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে আমরা এখন অনেক অর্থনৈতিক কার্যকলাপ সম্পন্ন
করি। এখন আমাদের একটি জাতীয় তথ্যভাণ্ডার আছে যেখানে বাংলাদেশের সকল নাগরিককে সঠিক
সনাক্তকরণের তথ্য জমা আছে। এখন আমার প্রশ্ন হলো, এই মোবাইল ফোনের মাধ্যমে কি ভোট গ্রহণ করা সম্ভব না?
কেন সম্ভব না? এই বিষয়ে তো আমি কাউকেই কোন উচ্চবাচ্য করতে দেখি নি।
অবশ্য বুঝতে কষ্ট হয় না যে
মোবাইল ফোনের মাধ্যমে যদি ভোট নেয়া হয় তাহলে এখন যারা রাজনীতি করেন তাদের সমূহ
বিপদ। এর কারণ দুটি। প্রথম কারণ, তাদের ক্ষমতার ক্ষয়; দ্বিতীয়, একবার ফোনের মাধ্যমে যদি ভোটাভুটি প্রতিষ্ঠিত হয় তাহলে সংসদে যখন কোন
গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয় তখন ফোনের মাধ্যমে জনগণ কেন প্রত্যক্ষভাবে অংশ নিবেন
না? তাই যদি হয়
তাহলে আমাদের যে বর্তমান রাজনৈতিক অবকাঠামো তার কী হবে? যারা বর্তমান কাঠামোর সুবিধাভোগী তারা কি কখন এক ধরনের বৈপ্লবিক পরিবর্তন
চাইবেন? কাজেই বুঝা
যায় যে অনেক পরিবর্তনের সুযোগ থাকলেও বিভিন্ন কারণে এই সব পরিবর্তন সম্ভব হয়ে উঠে
না।
কভিড-১৯ এর প্রভাবে যে আমারা এক
প্যারাড়াইম-পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি তা কি অনুধাবন করতে পারছেন?
এই প্যারাড়াইম-পরিবর্তনের ফলে সমাজের বিভিন্ন স্তরে
আমরা অনেক পরিবর্তন দেখতে পারব।
একটি অনুরোধ করে এই লেখাটি শেষ
করতে চাই। খুঁটিয়ে দেখুন আপনি নিজেই কোন প্যারাডাইম-পক্ষাঘাতের শিকার কি না?
ভাল করে ভেবে দেখুন। মনে রাখবেন কোন অভীষ্ট লক্ষে
পৌঁছানোর একাধিক উপায় থাকে, আপনার উপায় কখনই একমাত্র উপায় নয়।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন