আজিমপুরের দুর্দান্ত যোদ্ধারা, দ্বিতীয় পর্ব
আজিমপুরের
দুর্দান্ত যোদ্ধারা, দ্বিতীয় পর্ব
প্রায় দুই ঘণ্টা
পরে মুড়ির টিন থামলে আমরা সবাই নেমে আড়মোড়া ভাঙলাম। আশেপাশে কোনো লোকালয় নেই।
অদূরে একটা বেসামরিক ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে। ট্রাকের পাশে দুই তিন জন লোক বেসামরিক পোশাকে
দাঁড়িয়ে আছে, তাদের একজন সশস্ত্র, হাতে ৩০৩ রাইফেল।
তিনজনের মধ্যে
যিনি বয়োজ্যেষ্ঠ তাকে আমাদের দিকে এগিয়ে আসতে দেখে আমারা সবাই জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে
তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। তিনি কাছে এসে নিজেকে নায়েব সুবেদার করিম পরিচয় দিলেন।
আমাদেরকে বেশ ভালভাবে দেখে মনে হয় সন্দষ্ট হয়ে বললেন, “সবাই ট্রাকে ওঠো। তার
কথামত আমরা সবাই ট্রাকের পেছনে উঠলাম। সুবেদার সহ আরেকজন ট্রাকের সামনে ড্রাইভারের
সাথে বসল, আর দুইজন আমাদের সাথে
ট্রাকের পিছনে উঠল।
ট্রাক চলতে শুরু
করল। আমরা সবাই এখন চুপচাপ। সবাই মনে হয় চিন্তা করছে এই অজানা যাত্রার শেষ কোথায়? কিছুক্ষণ পর বাস পাকা রাস্তা
ছেড়ে এবড়োখেবড়ো মাটির রাস্তায় ঢুকল। আমরা ট্রাকের পেছনে, বসার কোনো জায়গা নেই, আমরা কেউ কেউ ট্রাকের
রেলিঙে আধা বসা আধা দাঁড়ান আর কেউ কেউ ট্রাকের পাটাতনে বসে দুলতে দুলতে চললাম।
কিছুক্ষণ পরে
ট্রাক এক জঙ্গল-মতো এলাকায় প্রবেশ করল। চারিদিকে সরু সরু লম্বা লম্বা গাছ, লাল
মাটির, মাঝে মাঝে ছোট ছোট টিলা, টিলা কেটে রাস্তা তৈরি
করা। এভাবে প্রায় ২০-মিনিট চলার পর ট্রাক একটা ছোট খোলা জায়গা বা মাঠে থামল। মাঠের একপাশে কয়েকটা ছনের চাল দেয়া মাটির
ঘর বা কুটির।
আমরা সবাই ট্রাক
থেকে নামলে সেই সুবেদার আমাদেরকে লাইন করে সোজা হয়ে দাড়াতে নির্দেশ দিলে আমরা সবাই
তাই করলাম। সুবেদার একটি কুটিরে ঢুকলেন। কিছুক্ষণ পরে কুটির থেকে সুবেদার সহ তিনজন
বেরিয়ে এলেন। নতুন দুজনের মধ্যে একজন চশমা পড়া, বেশ লম্বা, ছিপছিপে, বয়স আনুমানিক ৩২-এর
কাছাকাছি হবে। দ্বিতীয় জনের বয়স অপেক্ষাকৃত কম, ২৫ হবে। দুজনের মুখেই
খোঁচা খোঁচা দাড়ি,
চার পাঁচ দিন
দাড়ি না কাটলে যেরকম হয়। (আমাদের অবস্থাও তথৈবচ, ঢাকা ছাড়ার পর এখনও আমাদের দাড়ি কাটবার সুযোগ
হয়নি।) লম্বা জনের পরনে ফুল-পেন্ট, কোমরে কালো চামড়ার বেল্ট, সবুজ হাফ-হাতা শার্ট, শার্ট পেন্টের ভিতরে ঢুকানো, পায়ে কালো চামড়ার বুট
জুতা। অন্য জনের পরনে খাকী হাফ-পেন্ট, কালো রঙের কলার বিহীন টি-শার্ট, পায়ে সবুজ রঙের
ক্যানভাসের বুট জুতা। দুজনের বাম হাতেই ঘড়ি।
দুজনেই প্রথমে
আমাদের সকলকে গম্ভীর ভাবে ভালভাবে পর্যবেক্ষণ করার পর হাফ-পেন্ট পরা নিজের পরিচয়
দিলেন, “আমি লেফটেন্যান্ট শামিম, উনি ক্যাপ্টেন ডাক্তার
জামাল।
এইবার হাফ-পেন্ট পরা লেফটেন্যান্ট শামিম এক নাতিদীর্ঘ বক্তৃতা দিলেন, “আমাদের দেশ এখন চরম সঙ্কটে, নি:শংস্য পাকিস্তানি বাহিনী আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে, নিরীহ জনগণকে নির্বিচারে হত্যা করছে, মা বোনদের সম্ভ্রম লুটছে, ও বাড়ি ঘর জ্বালিয়ে দিচ্ছে। দেশের কোনো বাঙ্গালী এখন নিরাপদে নেই, পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসরেরা যখন যেখানে খুশি সেখানে মানুষদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে, মেরে ফেলছে। এদেরকে উচিৎ শিক্ষা দিতে হবে। এদেরকে আমাদের দেশ থেকে সমূলে উৎখাত করতে হবে এবং এখানে যুদ্ধ ছাড়া অন্য কোনো পন্থা নেই। আমাদের সবাইকে, সব বাঙ্গালীকে ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, লিঙ্গ নির্বিশেষে সকলকে বঙ্গবন্ধু যে ডাক দিয়েছিলেন, ‘তোমাদের যার যা কিছু আছে তাই দিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে‘ বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে সব বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ই পি আর, পুলিশ, আনসার, মুজাহিদ, ও তোমাদের মতো তরুণেরা এখন দলে হলে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিচ্ছে। আমি তোমাদের কে মুক্তিবাহিনীতে স্বাগত জানাচ্ছি, জয় বাংলা, জয় বাংলাদেশ।“
তার বক্তৃতা শেষ
হলে আমি তালি বাজাতে শুরু করলাম, আমার দেখাদেখি
আমাদের অন্য ১৩-জনও যোগ দিল, আবার আমাদের
দেখাদেখি অন্য যারা ছিল তারাও তালি শুরু করল।
ক্যাপ্টেন ও
লেফটেন্যান্ট সাহেবরা ভেবাচেকা খেয়ে আমাদের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। যেহেতু
আমরা সবাই বেসামরিক লোক আমাদের তো জানার কথা না যে সামরিক বাহিনীতে বক্তৃতার পর
এরকম তালি বাজানোর নিয়ম নাই।
সংবৎ ফিরলে
লেফটেন্যান্ট সাহেব চিৎকার করে বলে উঠলেন, “এ্যাটেনসন”। আমরা সবাই তালি থামিয়ে
সোজা হয়ে দাঁড়ালাম। (আমি অবশ্য UOTC ক্যাডেট ছিলাম
বলে জানতাম যে তালি বাজান যায় না, একটু মজা করলাম
বৈকি।) অবশ্য লক্ষ্য করলাম লেফটেন্যান্ট সাহেব একটু বাঁকা চোখে আমার দিকে
তাকাচ্ছেন।
যাই হোক, এবার আমাদেরকে লাইন করে
মার্চ করে প্রায় দশ মিনিট হাটার পর একটা জঙ্গলের ভিতরে নিয়ে যাওয়া হলো। জঙ্গলের
ভিতরে একটি খালি জায়গায় কয়েকটা তাঁবু টাঙ্গান—ভাল করে লক্ষ্য করে দেখলাম ঠিক তাঁবু না, বাঁশের খুঁটিতে ত্রিপল
লাগিয়ে তাঁবু তৈরি করা হয়েছে। একদিকে মোট চারটা ত্রিপল দিয়ে বানানো তাঁবু, পাশাপাশি। মাঠের অন্য
প্রান্তে দুটো মধ্যম মাপের সত্যিকারের তাঁবু।
আমরা ১৪-জন একটা তাঁবু দখল করলাম। কিন্তু মেঝেতে ভেজা মাটি, এখানে ঘুমাবো কেমন করে। অবশ্য কিছুক্ষণ পরে একজন বাঁশের তৈরি কয়েকটা চাটাই তাঁবুর ভিতরে ফেলে গেল। কিন্তু এই এবড়োখেবড়ো বাঁশের চাটাইয়ের উপরে ঘুমালে তো পিঠ কেটে যাবে। কী করা যায়? আশেপাশে খড় পাওয়া গেলে খড় দিয়ে বিছানা বানান যেত, কিন্তু এখানে খড় পাব কোথায়। আমাদের আশেপাশে অনেক ঝোপঝাড় ও গাছপালা ছিল। আমরা সবাই গাছের পাতা বিছিয়ে আমাদের শোবার বিছানা বানালাম। বালিশের জন্য রইল আমাদের ব্যাগ।
আরেকটা সমস্যার
কোনো সমাধান পেলাম না। আমাদের তাঁবুর দুই দিক, অর্থাৎ যেই পথ দিয়ে তাঁবুতে ঢুকে, সেই দুটো দিক খোলা। দিনে
অসুবিধা হবে না। কিন্তু রাতে অথবা যখন জোরে বৃষ্টি পড়বে তখন কী হবে? বুঝতে পারলাম আপাতত হয়ত
এর সমাধান পাওয়া যাবে না, পরে দেখা যাবে।
এসব করতে করতে
প্রায় বেলা দুটো হয়ে এলো, সকালে পেটে কিছু
দানাপানি পড়েনি,
তাই বেশ খিধা
পেয়েছে। দেখলাম তাঁবুর একপাশে কিছু টিনের থালা ও মগ জড়ো করে রাখা। দুজন লোক দুটো
বড় ডেকচি নিয়ে আসছে। তারা এসে জড়ো করে রাখা বাসনের অদূরে ডেকচি নিয়ে বসল। এমন সময়
সেই নায়েব সুবেদার আরেকজন লোক সহ এসে আমাদের সবাইকে লাইন করে দাঁড়াতে বললে আমরা
একটা থালা ও মগ নিয়ে লাইন করে দাঁড়ালাম। কিন্তু থালা মগ পরিষ্কার না নোংরা কিছুই
তো জানি না। তাছাড়া খাবার পানি তো দেখছি না। আমি নায়েব সুবেদারকে জিজ্ঞাস করলে
তিনি হাত দিয়ে নির্দেশ করে জানালেন অদূরে একটি পাহাড়ি ছড়া আছে, সেটাই আমাদের একমাত্র
পানির উৎস।
গাছপালার জন্য
আমরা এতক্ষণ ছড়াটি দেখতে পাইনি। একটু সমনে এগোতেই ছড়াটা চোখে পড়ল। খুবই মনোরম
পাহাড়ি ছড়া, কলকল করে পানি বয়ে
যাচ্ছে। পরিষ্কার টলটলে পানি, খেতে অসুবিধা হবে
না। ছড়ায় অনেক নুড়ি পাথর বলেই হয়ত পানি এত স্বচ্ছ। ছড়াটা চওড়ায় প্রায় ১৫-ফুটের মতো, পানির গভীরতা কোথাও হাঁটু
পানির কাছাকাছি,
কোথাও একটু বেশী
কোথাও একটু কম। ছড়ার অন্য দিক জঙ্গলে ভরা, কোনো মানুষ থাকে বলে মনে হলো
না। এমন সময় নায়েব সুবেদার এসে আমাদেরকে জানালেন যে ছড়ার ওপাড়ে ভারত এবং আমরা যেন
ছড়া ডিঙ্গিয়ে অন্য পাড়ে না যাই। আমরা এখন বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে।
থালা বাসন ধুয়ে
আমরা আবার লাইনে এসে দাঁড়ালাম। সবাই ধীরে ধীরে ডেকচির দিকে
এগিয়ে যাচ্ছি। দেখলাম দুপুরের খাবার হচ্ছে দুটো আটার মোটা রুটি ও ডাল। কিন্তু রুটি
আর ডাল দেখে আমার চক্ষু ছানাবড়া। এইটা রুটি! বেলা দুটার তীব্র আলোতে
রুটি থেকে অনেক নিরীহ শহীদ পোকা আমার দিকে তাকিয়ে আছে। এটা খেতে হবে? এটা খাওয়া ছাড়া অবশ্য
উপায় নেই। হয় এটাই খেতে হবে অথবা উপোষ করতে হবে। একবার মনে হলো পোকা তো ভালই, রুটির সাথে কিছু প্রোটিন
ও খাওয়া হবে বলে নিজেকে প্রবোধ দিলাম। কিন্তু পোকা খেতে পারলেও রুটি যে এরকম শক্ত
হতে পারে ধারণা ছিল না। এখন ডালের দিকে দৃষ্টি দিলাম। রুটির মতো ডালও অভিনব। এটাকে
ডাল বলব না ডালের গন্ধযুক্ত লবণ মেশানো গরম পানি বলব?
বাস্তবতা হলো
এটাই এখন একমাত্র খাওয়া, কাজেই এত
বাছবিচার করা যাবে না। আমাদের অন্য সকলের দিকে তাকান যায় না, সবাই আমার মতো বিমর্ষ
চেহারায় থালার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি খেতে শুরু করে অন্যদের বললাম, “এই মিয়ারা, খাওয়া শুরু করেন, আমরা যুদ্ধ করতে আসছি, পাঁচতারা হোটেলে খেতে
আসিনি।“ সবাই খাবার মুখে তুলে
নিলো। আমরা যারা শহরের ছেলে, আমাদের এই
সমস্যা। আরাম আয়েশে থাকতে থাকতে, তিন বেলা ভরাপেট
খেয়ে অভ্যস্ত হয়ে,
কষ্ট সহ্য করতে
পারি না। কিন্তু এখন উন্নাসিকতা করার সময় না।
সবচেয়ে ভাল খবর
হলো যে আমরা এক মগ দুধ ছাড়া গরম চা পেলাম। চা’য়ে অনেক চিনি
মেশানো, মিষ্টি গরম চা খেতে ভালই
লাগল।
খাওয়া শেষে ছড়াতে
যেয়ে থালা ও মগ ধুয়ে আমরা সবাই গোল হয়ে বসে সিগারেট ধরালাম। একটা বড় ভুল হয়ে গেছে।
আমাদের কিছু সিগারেট কেনা উচিৎ ছিল। আমাদের কাছে এখন দুই তিন দিন চলার মতো সিগারেট
আছে। আশেপাশে কোনো দোকান তো দেখতে পেলাম না। সিগারেট শেষ হলে কী করব?
রহিমের কাছে কত
টাকা খরচ হয়েছে জানতে চাইলে বলল যে তিনশ টাকার মতো খরচ হয়েছে। আমাদের নিজের কাছে
যে টাকা ছিল তা থেকে কিছু খরচ করতে হয়নি। একটা ব্যাপার বুঝতে পারলাম যে আমাদের
নিজেদের পয়সায় কিছু খাবারের আয়োজন করতে হবে, বিশেষ করে কিছু ফলমূল ও সম্ভব হলে ডিম।
আমাদের টাকা
কোথায় রাখব? ট্রেনিং-এর সময় তাঁবুতে
কেউ থাকবে না ফলে টাকা ও পিস্তল অরক্ষিত থাকলে হারিয়ে যাবার সম্ভাবনা আছে।
সিদ্ধান্ত নিলাম যে টাকা ও অস্ত্র তাঁবুর ভিতরে গোপনে মাটিতে পোঁতে রাখব। আমাদের
নিজস্ব টাকার দায়িত্ব নিজের।
কিছুক্ষণ পরে
সুবেদার সাহেব এক দাড়িওয়ালা লোককে নিয়ে এসে আমাদেরকে ‘ফল-ইন” করতে বললেন। আমরা সবাই এর
মানে জানার ফলে এক লাইনে সুবেদারের দিকে মুখ করে দাঁড়ালাম, আমাদের দেখাদেখি অন্যেরাও
আমাদের সাথে লাইনে যোগ দিল।
সুবেদার সাহেব
সাথের লোককে দেখিয়ে বললেন, “ইনি হাবিলদার
দেলোয়ার, তোমাদের ওস্তাদ। কাল থেকে
তোমাদের প্রশিক্ষণ শুরু হবে এবং এই ওস্তাদ তোমাদের ট্রেনিং দিবে। আমাদের অবশ্য এই ‘ওস্তাদকে’ দেখে যথেষ্ট মনে হলো না।
আমরা সবাই চুপ করে রইলাম।
সুবেদারের আবার
শুরু করলেন, “আমরা সবাই সূর্য উঠার আগে
ঘুম থেকে উঠবো। ঘুম থেকে উঠার সংকেত দেয়া হবে। ঘুম থেকে উঠার সংকেত পাবার সাথে
সাথে সবাইকে এই ক্যাম্পের প্রতিরক্ষার জন্য চারিদিকে অবস্থান নিতে হবে। তোমরা “স্ট্যান্ড-টু, স্ট্যান্ড-টু’ বলে চিৎকার শুনতে পাবে।
কিছুক্ষণ পরে আবার “স্ট্যান্ড-ডাউন, স্ট্যান্ড-ডাউন’ আওয়াজ শুনার পরে তাঁবুতে
ফিরে আসবে। ঠিক একই জিনিস আবার সূর্য ডুবার সময় হবে। এর কারণ হচ্ছে শত্রু সাধারণত
সূর্য উঠার আগে অথবা সূর্য ডুবার সময় আক্রমণ করে। তোমাদের প্রশিক্ষণের অস্ত্র পরে
দেয়া হবে। সকালের নাস্তা ঠিক ছয়টার, সকাল সাতটা থেকে প্রশিক্ষণ
শুরু হবে। এই সময়ের মধ্যে তোমাদের নিজেদের সব কাজ শেষ করবা। ক্যাম্পের ডানদিকে
ল্যাট্রিন আছে সেখানে কাজ সারবা। কেউ দেরী করলে ওস্তাদ শাস্তি দিবে। তোমাদের কোন
প্রশ্ন আছে?” নায়েব সুবেদার প্রশ্ন
দিয়ে তার লম্বা বক্তব্য শেষ করলেন।
আমি বলে উঠলাম, “এখানে আশেপাশে কোনো দোকান
আছে যেখানে সিগারেট বা অন্যান্য টুকটাক জিনিস কিনতে পাওয়া যায়?”
“না, এখনো সেরকম কোন ব্যবস্থা
নাই। কিছু দরকার হলে আমাদেরকে বললে আমরা এনে দেবার চেষ্টা করব। আর কিছু?” সুবেদার আবার জানতে
চাইলেন।
আবার আমি জানতে
চাইলাম, “সকাল সাতটা থেকে ট্রেনিং
কতক্ষণ চলবে, দুপর ও রাতের খাবার কখন
দেয়া হবে?”
“ট্রেনিং সকাল ৭-টা থেকে
বিকাল ৫-টা পর্যন্ত চলবে। মাঝে ১২-টা থেকে ১-টা পর্যন্ত এক ঘণ্টার বিরতি হবে।
দুপরের খাবার ঠিক বেলা ১২-টার সময়, রাতের খাবার সন্ধ্যা ছয়টার সময়। সেনাবাহিনীতে রাতের খাবার
সূর্য ডুবার আগেই করতে হয়। আর কোনো প্রশ্ন?“
আমাদের সাথে যারা
এসেছে তাদের একজন জানতে চাইল, “স্যার, ট্রেনিং-এর সময় ছুটি
পাওয়া যাবে?”
“কোনো, ট্রেনিং-এর
সময় ছুটির কোনো দরকার? না ট্রেনিং-এর সময় কোনো ছুটি হবে না,“ সুবেদার বেশ কড়া ভাবে
জবাব দিলেন। আমাদের আর প্রশ্ন না থাকায় তিনি হাবিলদারকে নিয়ে চলে গেলেন।
আমরা ঠিক করলাম
আশেপাশের এলাকাটা একটু ঘুরে দেখা উচিৎ। আমরা দুজনকে তাঁবুতে রেখে বাকী সবাই তাঁবু
থেকে বের হলাম। আমাদের উত্তরে ছড়া যেটা আমরা ইতোমধ্যে দেখেছি। তাছাড়া এখানে আসার
সময় দক্ষিণ দিক থেকে থেকে এসেছি, কাজেই সেটা
মোটামুটি দেখা হয়েছে, তাহলে বাকী থাকল
পূর্ব ও পশ্চিম। আমরা পশ্চিম দিকে কী আছে দেখার জন্য জন্য ক্যাম্প থেকে বের হলাম।
ক্যাম্প থেকেই দেখা যাচ্ছে অনেক গাছের জঙ্গল। আমরা জঙ্গলে ঢুকলাম।
কয়েকটা গাছ পার
হবার পরে একটা গাছে আমার পকেট ছুরি দিয়ে একটা দাগ কাটলাম (ঢাকা থেকে আসার সময় একটা
ভাজ করা যায় এমন একটা ছোট ছুরি বা পকেট নাইফ নিয়ে এসে ছিলাম যেটা সব সময় পকেটে
থাকতো।) সাবধানের মার নাই, কিছুক্ষণ পরপর
গাছে দাগ দিয়ে রাখলাম যেন পথ ভুলে না যাই।
প্রায় দশ বারোটা
গাছের সারি পার হবার পর ধানক্ষেত দেখা
গেল। এখন ধান নেই। ধানক্ষেতের পরে আবার গাছের সারি, কিছু ছোট ছোট টিলা ছাড়া আর কিছু নেই। আমরা
কিছুক্ষণ ধানক্ষেতের পাশে বসে সিগারেট ধরালাম। সন্ধ্যা হবার আগেই
ক্যাম্পে ফিরে এলাম। এসে দেখি ক্যাম্পে না দেখে সুবেদার সাহেব আমাদের খুঁজছেন।
“তোমরা কোথায় ছিলে?” সুবেদার বেশ কড়া গলায়
জানতে চাইলেন। আমার তার এই কড়া ভাষা পছন্দ হলো না। “এমন কিছুই না, আমরা আশপাশটা দেখার জন্য বেরিয়েছিলাম”, আমি শান্ত ভাবে উত্তর
দিলাম। “না, না, এভাবে আমাদের অনুমতি ছাড়া
ক্যাম্প থেকে আর কেউ যেন বের না হয়। এরকম নিয়ম নাই। তাছাড়া ট্রেনিং-এর সময় তোমাদের
দায়িত্ব আমাদের উপর, কাজেই এভাবে হঠাৎ
কাউকে কিছু না বলে আর বের হবা না।“ আমি কোনো উত্তর দিলাম না। সুবেদার গজগজ করতে করতে চলে
গেলেন। ঘড়িতে তখন সাড়ে পাঁচটা।
আমরা যখন তাঁবুতে বিশ্রাম নিচ্ছি তখন সুবেদারের
চিৎকার শুনতে পেলাম, “স্ট্যান্ড-টু, স্ট্যান্ড-টু” আমরা সবাই তাঁবু থেকে বের
হলাম। দেখি হাবিলদার অর্থাৎ আমাদের ওস্তাদ আমাদেরকে কয়েকটা দলে ভাগ করে পূর্ব, পশ্চিম, ও দক্ষিণ দিকে ক্যাম্পের
বাইরে মাটিতে শুয়ে অবস্থান নিতে বলল। তার কথা মতো ক্যাম্পের বাইরে পৌঁছে গাছের
আড়ালে বসলাম। কিছুক্ষণ পরে ওস্তাদ আমাদের বসে থাকতে দেখে খুশী হলো না। “না, না, এই ভাবে না, এই ভাবে না,” বলে নিজেই একটা গাছের
আড়াল নিয়ে শুয়ে পড়ল। তাকে অনুকরণে আমরাও মাটিতে শুয়ে পড়লাম।
এভাবে মিনিট দশেক
পরে আবার চিৎকার শুনতে পেলাম, “স্ট্যান্ড-ডাউন, স্ট্যান্ড-ডাউন,” আমরা সবাই আবার ক্যাম্পে
ফিরে এলাম। কিছুক্ষণ পরে খাবার পরিবেশন করা হলো, খাবার সেই আগের মতো, রুটি ও ডাল, কিন্তু এখন চা নেই। তবে
একটা জিনিষ ভাল,
অন্ধকার বলে
রুটির পোকা দেখা যাচ্ছে না।
কিছুক্ষণের
মধ্যেই চারিদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার নেমে আসলো। তাঁবুর বাইরে কয়েকটা লণ্ঠন টিম টিম করে
জ্বলছে। লণ্ঠনের অপর্যাপ্ত আলো মনে হলো অন্ধকারকে আরও গম্ভীর করে তুলেছে। এই
অন্ধকারে আমাদের কিছুই করার নেই। পাতার বিছানায় শুয়ে কিছু সময় নিজেদের মধ্যে কথা
বলার পর ঘুমিয়ে পড়লাম।
পরের দিন ৮
এপ্রিল সূর্য উঠার আগেই “স্ট্যান্ড-টু, স্ট্যান্ড-টু” চিৎকার শুনতে পেয়ে সবাই
আগের দিনের মতো দৌড়ে ক্যাম্পের বাইরে অবস্থান নিলাম। কিছুক্ষণ পরে “স্ট্যান্ড-ডাউন” ঘোষণার পর তাঁবুতে
ফিরলাম। ঘড়িতে এখন ছয়টা বাজতে পনের মিনিট বাকী। অবশ্য একটু পরেই সকালের নাস্তা
দেয়া হলো। সকালের নাস্তা আগের মতো দুটা আটার রুটি ও এক মগ দুধ ছাড়া মিষ্টি চা, এবার ডাল নেই।
নাস্তা শেষ হলে
আমাদের অন্য কাজকর্ম শেষ করতে করতে প্রায় সাতটা হয়ে এলো। একটু পরে ওস্তাদ ডাকলে
আমরা সবাই তাঁবুর সামনের খালি জায়গায় জড়ো হলাম। ওস্তাদ আমাদেরকে তিন লাইনে দাড়াতে
নির্দেশ দিল।
তারপর শুরু হলো
লেফট-রাইট করা,
আমাদের কাছে খুবই
বিরক্তিকর। কোনো অস্ত্র ছাড়াই আমরা ড্রিল করতে থাকলাম। দুপরের খাবার পর্যন্ত এই
লেফট-রাইট চলল।
দুপুরের খাবারের
পর আবার ড্রিল,
সন্ধ্যা পর্যন্ত।
তারপর স্ট্যান্ড-টু/স্ট্যান্ড-ডাউন, রাতের খাওয়া, ঘুমান। প্রথম দুইদিন এই ছিল আমাদের বিরক্তিকর রুটিন।
তৃতীয় দিন আমারা
প্রত্যেকে একটা ৩০৩ লী-এনফিল্ড বোল্ট একশন রাইফেল পেলাম, কিন্তু কোনো গুলি ছাড়া।
এইবার শুরু হলো রাইফেল সহ লেফট-রাইট করা। তাছাড়া রাইফেল কীভাবে পরিষ্কার করতে হয়, কীভাবে নিশানা ঠিক করতে
হয়, সাধারণ সময়ে কীভাবে
সাবধানে রাইফেল রাখতে হয়, ইত্যাদি শেখান
হলো। আমরা যারা UOTC-তে ছিলাম তারা ছাড়া
অন্যদের জন্য এই প্রশিক্ষণ দরকার ছিল। ইতোমধ্যে আমরা এখন সকালে ও সন্ধ্যায় রাইফেল
নিয়ে স্ট্যান্ড-টু/স্ট্যান্ড-ডাউন করি।
তৃতীয় দিনে
লেফটেন্যান্ট শামিম আমাদের প্রশিক্ষণ কেমন হচ্ছে দেখতে এলেন। তার কাছে আমাদের
প্রশিক্ষণ কতদিন চলবে জানতে চাইলে বললেন যে ১৫-তারিখের মধ্যে আমাদের ট্রেনিং শেষ
করতে হবে কারণ ১৬-তারিখে আরেক দল ট্রেনিং-এ আসবে। শামিম জানালেন যে
ক্যাপ্টেন রানার সাথে তার আমাদের নিয়ে আলাপ হয়েছে এবং ক্যাপ্টেন তাকে আমাদের আসার
সময়ের ঘটনা বলেছেন। তাকে আজকে আমাদের প্রতি বেশ বন্ধুত্ব-ভাবাপন্ন মনে হলো।
এদিকে আমাদের
সিগারেট প্রায় শেষ। আমি লেফটেন্যান্ট শামিমকে সিগারেট কোথায় কিনতে পাওয়া যাবে
জানতে চাইলে তিনি উত্তর বললেন তিনি কিছু সিগারেট আমাদেরকে পাঠানোর চেষ্টা করবেন।
আরও কিছুক্ষণ কথা বলার পর লেফটেন্যান্ট শামিম চলে গেলান।
আমরা আবার রাইফেল
নিয়ে কসরত শুরু করলাম।
চতুর্থ দিন
আমাদের সাব-মেশিনগান ও হালকা-মেশিনগান (লাইট-মেশিনগান) ট্রেনিং শুরু হলো। আমরা
এদের ব্যবহার,
কীভাবে পরিষ্কার
করে, কীভাবে নিশানা ঠিক করে, কীভাবে গুলি ভরে, এইসব শিখলাম।
চতুর্থ দিন
আরেকটা ভাল কাজ হলো, একজন ভারতীয়
নাগরিক ছড়ার ভারতের দিকে এক টং দোকান
খুলল। দোকানে সিগারেট, বিড়ি, দেশলাই, বিস্কুট, কলা, ইত্যাদি পাওয়া যেত।
কিন্তু সিগারেট মাত্র এক ব্র্যান্ডের, নাম চারমিনার। ভারতীয় চারমিনারে ভাজা তামাক বা
রোস্টেড-তামাক (roasted
tobacco) ব্যবহার করত যেটা
আমাদের দেশে প্রচলিত ছিল না। ফলে, প্রথম দিকে
চারমিনারের স্বাদ আমরা পছন্দ করতাম না। চারমিনার যদি এখন খেতে না চাই তাহলে হয়
বিড়ি খেতে হবে অথবা ধূমপান ছাড়তে হবে। নাই মামা থেকে যখন কানা মামা ভাল, সেই যুক্তিতে অগত্যা
চারমিনারই আমাদের ভরসা। লেফটেন্যান্ট শামিম সিগারেট পাঠাবেন বললেও কিন্তু আমরা
কোনো সিগারেট পাইনি। হয় ভুলে গেছেন অথবা যোগাড় করতে পারেননি।
পঞ্চম দিন আমরা
মধ্যম-মেশিনগানের (মিডিয়াম-মেশিনগান) ব্যবহার শিখলাম, কিন্তু কেমন করে বিভিন্ন
যন্ত্রাংশ খুলে পরিষ্কার করার পরে আবার জুড়তে হয় সেটা তখন শেখান হলো না।
ষষ্ঠ দিন, কেমন করে এম্বুশ পাততে হয়, কীভাবে গ্রেনেড ব্যবহার
করতে হয়, বিভিন্ন ধরনের বিস্ফোরক ও
তাদের ব্যবহার,
ইত্যাদি শিখলাম।
সপ্তম দিন রেইড
বা ঝটিকা আক্রমণ কেমন করে করতে হয় শিখলাম। তাছাড়া, এম্বুশ ও রেইড ওস্তাদের তত্বাবধানে নিজেরা
অনুশীলন করলাম। তাছাড়া, এন্টি-পারসোনাল ও
এন্টি-ট্যাঙ্ক মাইন সম্পর্কে জানলাম।
অষ্টম দিন
চান-মারিতে গিয়ে দশ রাউন্ড রাইফেলের ও দশ রাউন্ড ৩০৩ লাইট-মেশিনগান
থেকে গুলি ছোড়ার সুযোগ পেলাম।
এভাবে ১৫ই এপ্রিল
আমাদের অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ শেষে আমারা মুক্তিযোদ্ধায় রূপান্তরিত হলাম।
আমাদের ইচ্ছা ছিল
ট্রেনিং শেষে আমরা বাংলাদেশের ভিতরে ফিরে গেরিলা অপারেশন করব। কিন্তু ট্রেনিং শেষে
আমাকে এই সদ্য প্রশিক্ষিত প্লাটুনের (৪০-জনের) প্লাটুন লিডার নিযুক্ত করে
ক্যাপ্টেন রানার কোম্পানিতে সন্নিবেশিত হলাম।
আমাদের ট্রেনিং
কিন্তু আমার মনঃপুত হয়নি। এই সাত দিনে আমরা শুধু বিভিন্ন অস্ত্র সম্পর্কে ভাসা
ভাসা জ্ঞান আর সামান্য কিছু গেরিলা যুদ্ধের তত্ব শিখলাম। বুঝতে পারলাম
যুদ্ধের মাঠেই আমাদের আসল প্রশিক্ষণ হবে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে প্রশিক্ষণের সময় ভুল
করলে শুধরানো যায়,
কিন্তু যুদ্ধের
ময়দানে ভুল করলে প্রাণ যায়, দ্বিতীয়বার সুযোগ
সাধারণত পাওয়া যায় না।
১৬-ই এপ্রিল
সকালে আমাদেরকে অস্ত্রাগারে নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানে অস্ত্রের মধ্যে ছিল, যুক্তরাজ্যের তৈরি ৩০৩
রাইফেল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ৯ mm স্টেন-গান ও ৩০৩
হালকা-মেশিনগান বা ব্রেন লাইট-মেশিনগান; ভারতীয় ৯ mm স্টারলিং
সাব-মেশিনগান,
৭.৬২ mm এস এল এর (SLR) রাইফেল, ৭.৬২ mm হালকা মেশিনগান; ও দুই ধরণের গ্রেনেড।
১৯৭১ সালে যেই অস্ত্রটার সবচেয়ে বেশী চাহিদা ছিল সেটি AK-47 এস্যাল্ট-রাইফেল।
পাকিস্তান সেনাবাহিনী যেই AK-47 রাইফেল
ব্যবহার করত সেটি আসল AK-47 না, এটি AK-47-এর চীনা সংস্করণ, যার সঠিক নাম Type 56 Assualt Rifle। আমরা এটাকে চাইনিজ
সাব-মেশিনগান বা সংক্ষেপে চাইনিজ SMG বলতাম। কিন্তু কিছু অফিসার ও বেঙ্গল রেজিমেন্টের সুবেদার ও কিছু হাবিলদার ছাড়া
অন্য কারো কাছে এই অস্ত্র ছিল না। চাইনিজ আরেকটা অস্ত্র ছিল ৭.৬২mm রাইফেল (SKS), সেটাও অস্ত্রাগারে ছিল
না। আরেকটা কথা,
এখানে লক্ষ্য
করলাম অস্ত্রাগারকে সবাই ‘কোত” বা ‘কোথ” বলত—কেন বলত জানি না।
আমাদের কেউ
স্টারলিং সাব-মেশিনগান আর কেউ SLR রাইফেল নিলেও
কয়েকজন, তাদের ৩০৩ রাইফেল পরিবর্তন
করল না। আমি ব্যাপারটা পছন্দ না করলেও তখন কিছু বললাম না। অপছন্দ করার কারণ একই
ধরণের অস্ত্র সবার কাছে থাকলে দরকারের সময় একজনের গুলি আরেকজন ব্যবহার করতে পারে।
৩০৩ রাইফেলের গুলি ৭.৬২ SLR রাইফেলে ব্যবহার
করা যায় না, উলটোটাও করা যায় না।
কাজেই অস্ত্রের ধরণ যত কম থাকবে ততই দলের জন্য সুবিধা।
গোলাবারুদ সাথে
রাখার জন্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সেনারা যে রকম কোমরে লাগানো
ক্যানভাসের ব্যাগ ব্যবহার করত সেরকম বেল্ট যুক্ত দুটো ব্যাগ পেলাম (১৯৭১ সালে
ভারতীয় ও পাকিস্তানি উভয় দেশের সীমান্ত রক্ষীরাও এই ধরণের ব্যাগ ব্যবহার করত)।
তাছাড়া, সোল্ডার-স্ট্রেপ দেয়া
ক্যানভাসের পিঠে ঝুলানোর ব্যাগ নিলাম। আমার ঢাকা থেকে নিয়ে আসা ব্যাগের তুলনায় এই
জলরোধী বা ওয়াটার-প্রুফ ব্যাগ অনেক উন্নত। আমার সাব-মেশিনগানের সাথে তিনটা ম্যাগাজিন পেলাম, একটি ম্যাগাজিনে ঠেলাঠেলি করে ৩৪-টি গুলি ভরা গেলেও ওস্তাদের নির্দেশ মতো আমরা সাধারণত ৩০-টির
বেশী ভরতাম না। তাছাড়া কিছু অতিরিক্ত
গুলি ও দুটো ছোট আনারসের মতো বিস্ফোরক গ্রেনেডও নিলাম। আরেক ধরণের গ্রেনেড ছিল, নাম স্মোক বা ধোয়া তৈরির
গ্রেনেড, কিন্তু ব্যবহার না জানায়
নিলাম না।
অস্ত্রাগারে
পিস্তল থাকলেও জানতে পারলাম সেগুলো শুধু অফিসারদের জন্য সংরক্ষিত, আমাদের মতো সদ্য
প্রশিক্ষিত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নয়।
আমরা পূর্ব পরিচিত ক্যাপ্টেন রানার
কোম্পানিতে সংযুক্ত হব যেনে সবাই খুশী হলাম। আমাদের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প থেকে প্রায়
দশ মাইল দূরে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের অপাড়ে
ক্যাপ্টেন রানার
ক্যাম্পের দিকে হেটে যাত্রা শুরু করলাম। বোচকা-বুচকি সহ উঁচুনিচু মাটির রাস্তা দিয়ে
হেটে পৌঁছতে ঘণ্টা তিনেকের মতো সময় লাগল। পৌঁছে দেখি আমাদের ৪০-জনের জন্য তিনটি
তাঁবু টাঙ্গান হয়েছে, একটি বেশ বড়,
আরেকটি মাঝারি ও
তৃতীয়টি খুবই ছোট।
ক্যাপ্টেন রানা
ক্যাম্পেই ছিলেন। আমরা এসেছি শুনে তিনি এগিয়ে এলেন। আমাদের সবার সাথে সৌজন্য
বিনিময়ের পর ছোট তাঁবুটা আমাকে দেখিয়ে বললেন যে আমি যেহেতু প্লাটুন কমান্ডার
সেজন্য ছোট তাঁবুটা আমার থাকার জন্য। আমি বিনীত ভাবে তাকে
জানালাম যে তার দরকার হবে না, আমি আমার দলের সাথে
একই তাঁবুতে একসাথে থাকব। তিনি আপত্তি করলেন না।
আমরা যোগ দেবার
আগে ক্যাপ্টেন রানার কোম্পানিতে ৯০ জনের মতো ছিল, আমরা যোগ দেয়ায় লোকসংখ্যা এখন
১৩০-জন। এদের মধ্যে আমরা সহ ৫০-জন ছাত্র বা বেসামরিক লোক।
ক্যাপ্টেন রানার
কোম্পানির প্রায় সবাই প্রাক্তন ই.পি.আর (EPR, বা East Pakistan Rifles; বর্তমানে এদের নাম BGB বা Border Guard Bangladesh) সৈন্য, কিছু ছাত্র আছে
যারা সম্ভবত আশেপাশের এলাকা থেকে যোগ দিয়েছিল। ক্যাপ্টেন রানার কোম্পানির সবার
পাঁচমিশালী অস্ত্রশস্ত্র। কারো কাছে, চাইনিজ আবার কারো কাছে ভারতীয়। কিছু ৩০৩ রাইফেলও দেখলাম, এরা সম্ভবত সরাসরি
যুদ্ধের সাথে যুক্ত না, যেমন রান্নার লোক, যোগালি, ইত্যাদি।
এখন প্রায়
দুপুরের খাবার সময়। আমরা সবাই হাতে টিনের প্লেট ও মগ নিয়ে দুরুদুরু বক্ষে এগিয়ে
যাচ্ছি। আজকের খাবার না জানি কী রকম হয়? পৌঁছে দেখি দুপুরের খাবার
পাঁচমিশালি সবজি ভাজি, ডাল, ও আটার রুটি। ভাল ভাবে
বানান রুটি, কোনো পোকামাকড় নেই, ডালও বেশ ঘন, ভাল সুগন্ধ ছড়াচ্ছে, সবজি ও খুবই সুস্বাদু। গত
পনের দিনের যে খাদ্য আমরা খেয়েছি তার তুলনায় এই খাবার অমৃত তুল্য। আমরা
গোগ্রাসে অনেক দিন পরে তৃপ্তির সাথে খেলাম।
খাবার পর
কিছুক্ষণ বিশ্রাম শেষে আমি ক্যাপ্টেন রানার তাঁবুতে গেলাম। ক্যাপ্টেন রানার তাঁবুতে
একটা বাঁশের মাচায় বিছানা। একপ্রান্তে একটি ছোট টেবিল ও দুটি চেয়ার। তাঁবুর এক কোনায়
তার চাইনিজ এস.এম.জি ও গুলির পাউচ ঝোলানো, আরেক প্রান্তে একটি দড়ি টাঙ্গান, সেখানে কিছু কাপড়চোপড়
ঝুলছে। টেবিলের উপরে একটি রেডিও, কিছু কাগজপত্র, একটি অ্যালুমিনিয়ামের পানির জগ ও কাঁচের গ্লাস।
আমাকে দেখেই
ক্যাপ্টেন বলে উঠলেন, “আসো, আসো সোহেল, চেয়ারে বস।“ আমি চেয়ারে বসলে তিনিও
বিছানা ছেড়ে চেয়ারে এসে বসলেন। “খাওয়া ঠিক ছিল? তোমাদের ট্রেনিং-এর সময়
তো শুনেছি খাবার খুবই জঘন্য ছিল। এখন কী একটু ভাল?” তিনি জানতে চাইলেন। “এখানকার খাবারের সাথে
আগের খাবারের তুলনাই করা যায় না।“ আমি জবাব দিলাম।
কিছুক্ষণ পরে তিনি জানতে চাইলেন, “বলো তোমাদের জন্য
কী করতে পারি?”
আমি তাকে জানালাম
যে আমাদের ট্রেনিং খুবই সাদামাটা ছিল এবং অনেক কিছুই আমরা শিখতে পারিনি। আমাদের
অস্ত্রের আরেকটু প্রশিক্ষণ দরকার। তাছাড়া এখানে অনেক অস্ত্র দেখছি, যেমন চাইনিজ এস.এম.জি, চাইনিজ লাইট মেশিনগান, চাইনিজ মিডিয়াম মেশিনগান, ইত্যাদি, যার ব্যবহার আমরা জানি
না।
(কোনো অস্ত্রের শিক্ষা মানে অস্ত্রে গুলি ভরতে
পারা, গুলি ছোড়ার সময় কোনো
সমস্যা হলে সেটা সমাধান করতে পারা, অস্ত্র কেমন করে খুলে পরিষ্কারের পর আবার জুড়তে হয় তা রপ্ত
করা, কেমন করে যুদ্ধের সময়
ব্যবহার করতে হয়,
যুদ্ধের সময় হঠাৎ
অস্ত্র গুলি নে
বের হলে কীভাবে
আবার সচল করতে
হয়,
কী ধরনের
সাবধানতা নিতে হয়,
ইত্যাদি সবকিছু
রপ্ত করার পরই শিক্ষা শেষ হয়।)
ক্যাপ্টেন রানা
মনোযোগের সাথে আমার কথা শুনে বললেন, “তুমি ঠিকই বলেছ। ঠিক আছে, আগামী সাত দিন আমার লোকেরা তোমাদের দলকে
ট্রেনিং দিবে। আরও কিছু ছোট খাট কথা শেষে আমি তাঁবুতে ফিরে এলাম।
আমাদের সবাইকে তাঁবুতে গোল করে বসে ক্যাপ্টেন রানার সাথে কী কথাবার্তা হয়েছে
জানালাম। সবাই সম্মতি দিল।
পরের দিন থেকে
আবার আমাদের ট্রেনিং শুরু হলো। এবার একেক বিষয়ে একেকজন প্রশিক্ষক। আমরাও গুরুত্বের
সাথে সব কিছু রপ্ত করলাম।
ইতোমধ্যে আমরা
কিছু নতুন কাপড় ও জুতা পেলাম। খাকী রঙের একটি প্যান্ট ও একটি শার্ট, এবং বুট জুতা। বুট জুতা
দুই ধরণের ছিল,
একটি চামড়ার কালো
রঙের, অপরটি সবুজ রঙের
ক্যানভাসের। আমি সবুজ ক্যানভাসের জঙ্গল-বুট নিলাম। তাছাড়া সবাই দুই জোড়া মোজাও
পেলাম।
আমাদের ট্রেনিং
শেষ হবার পরের দিন ক্যাপ্টেন রানা জানালেন যে কয়েকদিন পরে ৫০-জনের একটি
দল রেইড করতে যাবে। ক্যাপ্টেন এখন কাউকে কিছু বলতে নিষেধ
করলেন।
আমি অবশ্য তাঁবুতে
ফিরে সেলিমকে তাঁবুর বাইরে এনে জানালাম। আমার ইচ্ছা আমাদের দলের সবাই যেন এই
অভিযানে যোগ দেয়। সেলিম আমার সাথে একমত হলো। আমি সেলিমকে এখন কাউকে কিছু বলতে মানা
করলাম। বললাম ক্যাপ্টেন রানা নিজেই সময়মত জানাবেন।
একদিন পর সকালের
নাস্তার পর ক্যাপ্টেন সম্পূর্ণ কোম্পানিকে তাঁবুর সামনে জড়ো করে রেইডের কথা
জানালেন। জানতে চাইলেন কে কে যেতে
চায়। আমি আর সেলিম প্রথমে এগিয়ে গেলাম, আমাদের দেখা দেখি আমাদের দলের অন্য সবাই এগিয়ে গেল। আমরা
১৪-জন ছাড়া আমাদের প্লাটুনের অন্য কয়েকজনও এগিয়ে এলো, কিন্তু আমি তাদেরকে আবার
পিছনে ফিরে যেতে বললাম, কেননা আমাদের
দলের প্রত্যেকের উপর আমার পূর্ণ আস্থা ছিল যে গোলাগুলি শুরু
হলে দৌড়ে পালাবে না, কিন্তু অন্যদের
ব্যাপারে সেই রকম বিশ্বাস ছিল না।
ক্যাপ্টেন রানা
আমাদের ৫০-জনকে আলাদা করে জানালেন যে আগামীকাল সন্ধ্যায় ৫০-জন একটি বিদ্যুৎ
কেন্দ্রে রেইড করতে যাবে। আমাদের উদ্দেশ্য দখল করা নয়, বরং ঝটিকা আক্রমণ করে
যতটুকু সম্ভব ক্ষয়ক্ষতি করা। কোথায় রেইড হবে সেটার নাম বললেন না। সন্ধ্যা সাতটার
সময় আমরা ক্যাম্প থেকে যাত্রা শুরু করব। সব কিছু ঠিক থাকলে রাত দুটো নাগাদ
লক্ষ্যবস্তুর কাছাকাছি পৌঁছব। সূর্য উঠার ঠিক আগ মুহূর্তে আমরা আক্রমণ করব।
তিনি মাটিতে ছবি
একে রেখেছিলেন। সেটা দেখিয়ে সবাই কে কার কী কাজ সেটা বুঝিয়ে দিলেন। আমাদের দলের
দিকে ফিরে বললেন,
“তোমাদের এটা
যেহেতু প্রথম অপারেশন, সেজন্য যারা রেইড
করবে তোমরা তাদের সাথে থাকবে না। তোমাদের কাজ হবে রেইডের সময় রাস্তার দুদিকে ব্লক করে রাখা ও আমরা যখন আক্রমণ শেষে ফিরে আসব তখন প্রয়োজন হলে কাভারিং ফায়ার
দিয়ে সহায়তা করা। এটা অবশ্যই খুবই গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এ কাজে যদি কোনো ভুল হয় তাহলে
আমাদের অনেকে হতাহত হতে পারে। আমি তোমাদের উপরে ভরসা করছি। তাছাড়া তোমাদেরকে দুটো চাইনিজ লাইট
মেশিনগান দিচ্ছি;
তোমাদের ভারতীয়
লাইট মেশিনগান নেবার দরকার নেই। আমি সুবেদার পাশাকে বলে দিচ্ছি তোমাদের যে দুজন এই
চাইনিজ লাইট মেশিনগান ব্যবহার করবে ও তাদের যে দুজন সহযোগিতা করবে তাদেরকে আবার
ভাল করে সঠিক ব্যাবহারের নিয়ম কানুন বুঝিয়ে দিতে। কোনো ভুল করা চলবে না,” ক্যাপ্টেন তার লম্বা বক্তব্য শেষ করলেন। আরও কিছুক্ষণ
আলোচনার পর আমরা তাঁবুতে ফিরে এসে কোন দুইজন লাইট মেশিনগান ব্যবহার করবে সেটা ঠিক
করার জন্য আলোচনায় বসলাম।
আমাদের ৪০-জিনের
দলের সাথে ইতোমধ্যে চারটি ভারতীয় ৭.৬২ লাইট মেশিনগান আছে। আমাদের ১৪-জনের
আজিমপুরের দলের কাছে দুটি। একটা বহন করে বাচ্চু, তার সহযোগী টনি। আরেকটা কবির, তার সহযোগী ইদ্রিস। (লাইট
মেশিনগানের জন্য দুইজনের প্রয়োজন হয়। সহযোগীর প্রধান কাজ গুলি বহন করা, গুলি ভরা, ও গুলি ছোড়ার সময় লক্ষ্য
রাখা গুলির বেল্ট যেন পেঁচিয়ে না যায়। চাইনিজ লাইট মেশিনগানের ড্রাম ম্যাগাজিন—একটি ড্রামে লোহার চেইনে
১০০-টি গুলি থাকে। এই চাইনিজ লাইট মেশিনগানের গুলি ৭.৬২ ক্যালিবারের হলেও ভারতীয় SLR বা LMG থেকে ছোট। প্রথমটা ৭.৬২ X ৩৯ mm, অপরটি ৭.৬২ X ৫১ mm. কাজেই চীনা অস্ত্রের গুলি
ভারতীয় অস্ত্রে ব্যবহার করা যায় না।
আমরা সবাই তাঁবুতে
ফিরে আবার গোল হয়ে বসলাম। আমাদের সবার ইচ্ছে বাংলাদেশের ভিতরে ঢুকে গেরিলা
কার্যক্রম করা। আমি সবাইকে বললাম, “দেখ, আমাদের কিছুদিন ক্যাপ্টেন
রানার সাথে থাকে যুদ্ধের কলাকৌশল রপ্ত করা উচিৎ। কাজেই ক্যাপ্টেন রানার সাথে যেই
সময়টা কাটাব সেটাকে উন্নত প্রশিক্ষণ ধরতে হবে। আমাদের যুদ্ধের কলাকৌশল অনেক কিছুই
জানার বাকী আছে।“
সবাই মাথা নেড়ে
সম্মতি জানাল।
আজকে সারাদিন
কোনো কাজ নেই। মাঝে মাঝে এক নাপিত
আমাদের ক্যাম্পে আসত। নাপিতকে দিয়ে ঢাকা থেকে রওয়ানা হবার পর আমরা সবাই এই প্রথম দাড়ি-মোচ
কাটালাম।
আমরা সবাই নিজস্ব
অস্ত্রশস্ত্র সম্পূর্ণ খুলে ভাল ভাবে পরিষ্কার করার পর তেল মাখিয়ে সযত্নে রাখলাম।
যুদ্ধের সময় এই অস্ত্রই আমাদের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু। কাজেই একে যথা সম্ভব যত্ন ও
সম্মান দেখাতে হবে।
আমাদের যাদের
কাছে স্টারলিং,
তাদের সাথে মোট
তিনটি ম্যাগাজিন,
একটি অস্ত্রে
লাগান অপর দুটি সাথের পাউচে। কিন্তু আমাদের অপারেশনের জন্য এই তিনটি ম্যাগাজিন পর্যাপ্ত
মনে হলো না। তাছাড়া, দুটি ম্যাগাজিন
পাউচে রাখার পরও পাউচ প্রায় খালি। আমি আরও ১০০-টি গুলি পাউচে ভরলাম। স্টারলিং-এ ৯
এম.এম পিস্তলের গুলি
ব্যবহার করা হয়। কাজেই ১০০-টি খুচরা গুলি নিতে সমস্যা হলো না।
আবার যাদের সাথে ভারতীয় SLR-রাইফেল
তাদের রাইফেলে লাগান একটি ম্যাগাজিন সহ মোট চারটি ম্যাগাজিন। প্রত্যেকটি ম্যাগাজিনে ২০-টি
গুলি থাকে। এই গুলিগুলো কিন্তু স্টারলিং-এর গুলি থেকে অনেক বড় ফলে ওজনও বেশী। আমি সবাইকে ৫০-রাউন্ড আলাদা
গুলি সাথে নিতে বললাম।
এছাড়াও আমাদের পেছনে ঝোলান ব্যাগে আরও কিছু গোলাবারুদ নিতে
হলো। আমার ভাগে পড়ল চাইনিজ লাইট-মেশিনগানের একটি ড্রাম ম্যাগাজিন ও দুটি গ্রেনেড।
তাছাড়া প্রত্যেকের ব্যাগে কিছু ব্যান্ডেজ ও অন্যান্য ফার্স্ট এইডের জিনিস নেয়া
হলো। ক্যাপ্টেন রানার কোম্পানিতে কোনো ডাক্তার না থাকলেও দুজন প্যারামেডিক ছিল, যারা যুদ্ধাহতদেরকে কীভাবে প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে হয় সেটা জানত।
একবার মনে হলো আমার .৩২ রিভলভার সাথে নেই। কিন্তু পরক্ষণেই সেটাকে
বাতিল করে দিলাম। এই .৩২ রিভলভার এই যুদ্ধে কোনো কাজেই আসবে না।
দেখতে দেখতে সন্ধ্যা হয়ে এলো। রাতের খাবার শেষ হবার প্রায়
সাথে সাথেই অন্ধকারের চাদর সবকিছু ঢেকে ফেলল। তাঁবুর ফাঁক দিয়ে এক চিলতে আকাশ দেখা
যাচ্ছিল। পরিষ্কার মেঘমুক্ত আকাশে অনেক তারা জ্বলজ্বল করছে। বাসার কথা মনে হলো, বিশেষ করে মায়ের কথা। মায়ের মমতাময়ী মুখটা মনে পড়ল। আমি মাকে যখন জানালাম যে
আমি যুদ্ধে যাচ্ছি তখন আমার কথা শুনে মায়ের সদা হাস্যজ্জল মুখটা কেমন যেন নিমিষে মলিন
হয়ে গেল সেটা চোখে ভেসে এলো। মা কিছুক্ষণ করুণ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আমাকে
জড়িয়ে ধরলেন। আমার মা আমাকে খুব ভাল করেই চিনতেন, তিনি জানতেন যে আমি যদি কোনো সিদ্ধান্ত নেই তাহলে কেউ আমাকে ফেরাতে পারবে না।
অনেকক্ষণ পরে আমাকে যখন ছাড়লেন তখন তার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। পরে অনেক কষ্টে বললেন, “যাও বাবা,
সাবধানে থেকো, আমি তোমার জন্য
দোয়া করব। মায়ের কথা শুনে আমার চোখে পানি আসার উপক্রম দেখে আমি তাড়াতাড়ি মাকে
সালাম করে ঘর থেকে বের হলাম। বিদায়ের মুহূর্তে আমি মায়ের সামনে কাঁদতে চাইনি।
বাবা বসার ঘরে খবরের কাগজ পড়ছিলেন। বাবাকে বলার পর বাবা
গম্ভীরভাবে আমাকে কিছুক্ষণ দেখলেন, তারপর তিনি চেয়ার
থেকে উঠে কাছে এসে কাঁধে হাত দিয়ে বললেন, “নিশ্চয়ই যাবে, তোমার পূর্বপুরুষেরা সবাই যোদ্ধা ছিলেন, তুমি তাদের
বংশধর। যাও গাজি হয়ে ফিরে এসো। বাবা বললেন, “একটু অপেক্ষা কর।“ বাবা শোবার ঘরে গিয়ে তার মানিব্যাগ নিয়ে এসে ২০০-টাকা বের করে আমাকে দিয়ে
বললেন,
“এটা রাখ, পথে দরকার লাগবে।“ আমি বাবাকে সালাম করে বাসা থেকে বেরিয়ে গেলাম। আমি বাবা-মার একমাত্র সন্তান।
আমরা বন্ধুরা অন্ধকারে কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলতে বলতে শুয়ে পড়লাম। আগামী কালকে প্রথম অপারেশনে যাব, অজানা আশঙ্কায় রাতে ঘুম আসতে সময় লাগল।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন