মোহনদাশ করমচাঁদ গান্ধী

 মোহনদাশ করমচাঁদ গান্ধী (মহাত্মা গান্ধী)

আজকের লেখা গান্ধীকে নিয়ে। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, সহ প্রায় সব দেশের শিক্ষিত বা আধা-শিক্ষিত লোকেরা গান্ধীর নামের সাথে পরিচিত।

মোহনদাশ করমচাঁদ গান্ধী গুজরাটের প্রবান্দারে (Probandar) ২ অক্টোবর ১৮৬৯-এ এক বৈশ্য (বেনিয়া বা ব্যবসায়ী) সচ্ছল পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। গান্ধীর বাবা করমচাঁদ গান্ধী ও করমচাঁদ গান্ধীর চতুর্থ স্ত্রী পুতুলবাইয়ের চতুর্থ সন্তান মোহনদাশ করমচাঁদ গান্ধী। গান্ধীর বাবা পেশায় আইনজীবী এবং স্থানীয় শাসকের প্রধানমন্ত্রীর বা পরামর্শকের দায়িত্বে ছিলেন। ১৩-বছর বয়সে গান্ধী প্রায় সমবয়সী (১৪) কাস্তুরবা-র (Kasturba or Kasturbai) সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। গান্ধীর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় নিকটবর্তী রাজকোটে, পরে গান্ধী ভাউনগরের সমালদাশ কলেজে (Samaldas College, Bhaunagar) ১৮৮৭ সালে ভর্তি হন কিন্তু পাঠ সমাপ্ত না করেই এক বছর পরে আইনশাস্ত্র পড়ার উদ্দেশ্যে ১৮৮৮ সালে লন্ডনে যান। তিন বছর পরে ১৮৯১ সালে তিনি ২২ বছর বয়সে আইনজীবী হিসাবে স্বীকৃতি পান। ভারতে ফিরে আইন পেশায় নিয়োজিত হন কিন্তু ভারতীয় আইন সম্পর্কে তার সীমিত জ্ঞান ও মামলা চলাকালীন আত্মবিশ্বাসের অভাবের কারণে বিশেষ সুবিধা করতে পারেননি। বিফলমনোরথ হয়ে গান্ধী তার গ্রামের বাড়ী প্রবান্দরে ফিরে যান। তার অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে যখন গান্ধী উদ্বিগ্ন তখন দাদা আব্দুল্লাহ নামে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মুসলমান ব্যবসায়ী তাকে একটি মামলা লড়ার জন্য ১২-মাসের জন্য ১০৫ ব্রিটিশ পাউন্ডে চুক্তিবদ্ধ করেন (১৮৯৩ সালের ১০৫ পাউন্ডের বর্তমান মূল্য প্রায় ১৩,০০০ পাউন্ডের সমান)।

দক্ষিণ আফ্রিকায় গান্ধী

১৮৯৩ সালে গান্ধী ডারবান, দক্ষিণ আফ্রিকাতে পৌঁছান এবং দাদা আবদুল্লাহ-র আইনজীবী হিসেবে জুন মাসে কাজ শুরু করেন। ১২-মাস থাকার কথা থাকলেও গান্ধী দক্ষিণ আফ্রিকাতে ২২-বছর কাটান।

এখানে উল্লেখ্য যে দক্ষিণ আফ্রিকাতে তখন দু ধরনের ভারতীয়রা থাকত। প্রথম দল হচ্ছে প্রধানত বেনিয়া বা ব্যবসায়ী শ্রেণী আর দ্বিতীয় দল চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক। নাম চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক’ (Indentured labor) হলেও এদের অবস্থা ছিল প্রায় ক্রীতদাসের মতো। এই চুক্তিভিত্তিক শ্রমিকেরা সবাই ছিল নিম্নবর্ণের বা শূদ্র হিন্দু, যারা উচ্চবর্ণের হিন্দুদের কাছে অচ্ছুৎ সম্প্রদায়।

গান্ধী দক্ষিণ আফ্রিকাতে প্রধানত এই বেনিয়া সম্প্রদায়ের স্বার্থ রক্ষার জন্যই আন্দোলন করেন, কিন্তু লক্ষ লক্ষ নিম্নবর্ণের হিন্দু যারা প্রায় ক্রীতদাসের পর্যায়ে ছিল তাদের অবস্থার উন্নতির জন্য তিনি কোন আন্দোলন বা পদক্ষেপ নেননি।

বর্ণবাদে জর্জরিত দক্ষিণ আফ্রিকার প্রধান সমস্যা ছিল সেখানকার স্থানীয় অধিবাসী কালো আফ্রিকান জনগোষ্ঠীকে সাদা চামড়ার ইউরোপীয়রা যেভাবে নির্যাতন করত। গান্ধী দক্ষিণ আফ্রিকায় থাকা কালীন এই সংখ্যাগরিষ্ঠ আফ্রিকানদের জন্য শুধু যে কিছু করেননি তা না, বরং সাদা চামড়াদের মতই কালোদের তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করেন। যেমন ১৮৮৩ সালে গান্ধী নাটাল (Natal) পার্লামেন্টে এক চিঠিতে লিখেন, “এই কলোনিতে (ব্রিটিশ দক্ষিণ আফ্রিকা) একটি সাধারণ ধারণা বিরাজ করে যে ভারতীয়রা স্থানীয় বর্বরদের (savages) তুলনায় কিছুটা হলেও ভাল।

আবার ১৯০৪ সালে জোহানসবার্গের এক স্বাস্থ্য-কর্মীকে লিখেন, “কাউন্সিল কাফিরদেরকে (Kaffir) অবশ্যই কুলিদের বাসস্থানথেকে বিতাড়িত করা উচিৎ কেননা এখানে অধিক সংখ্যক আফ্রিকান ও ভারতীয়রা একসাথে বাস করত। কাফির ও ভারতীয়দের একসাথে মেশানোকে আমি, আমাকে অবশ্যই স্বীকার করতে হবে, আমি খুবই দৃঢ়ভাবে প্রতিরোধে বিশ্বাস করি।

কাফিরশব্দটি দক্ষিণ আফ্রিকার সাদা-চামড়ার লোকেরা স্থানীয় কালো লোকদেরকে এই জাতিগত অপমানজনক নামে সম্বোধন করত, এখন যেমন আমেরিকাতে নিগ্রো (Negro) কথাটি মর্যাদাহানিকর, তেমনই দক্ষিণ আফ্রিকাতে কাফিরশব্দটি একটি অপমানজনক শব্দ হিসাবে ব্যবহার করা হতো।

 এরকম স্থানীয় কালো আফ্রিকানদের প্রতি গান্ধীর বর্ণবাদই মনোভাবের আরও অনেক প্রমাণ আছে।

গান্ধী মহাত্মাহলেন কীভাবে?

অনেক জায়গায় লেখা আছে যে গান্ধীকে মহাত্মা উপাধি দেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এই কথাটা ডাহা মিথ্যা কেননা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও গান্ধী যখন প্রথম ৬ মার্চ ১৯১৫ সালে শান্তিনিকেতনে মিলিত হন, তখন রবীন্দ্রনাথ গান্ধীর সাথে বিশেষ পরিচিত ছিলেন না। মজার ব্যাপার হচ্ছে চার্লস ফ্রিয়ার এন্দ্রুজ-নামে(Charles Freer Andrews) এক ইংরেজ পাদ্রী গান্ধী ও রবীন্দ্রনাথের এই সাক্ষাতের ব্যবস্থা করেন! তাছাড়া ১৯১৪ সালে যখন দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে গান্ধী ভারতে ফিরেন তখন ভারতে তার বিশেষ পরিচিতি ছিল না। কাজেই ১৯১৫ সালে রবীন্দ্রনাথের গান্ধীকে মহাত্মাসম্মানসূচক উপাধি দেবার কোন কারণ নেই।

আসল ঘটনা হলো, ‘গন্ডাল রসশালানামে এক আয়ুর্বেদ ঔষধের প্রস্তুতকারী বা দোকান গান্ধীকে আমন্ত্রণ করে এবং গান্ধীর জন্য একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এই প্রতিষ্ঠানের মালিক রসশালা জিভরাম শাস্ত্রী (Rasasala Jivram Shastri) ২৭ জানুয়ারি ১৯১৫-তে তার স্বগত ভাষণে গান্ধীর দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী সরকারের বিরুদ্ধে সংগ্রামের জন্য তাকে মহাত্মাবলে সম্মানিত করেন। গান্ধী এই মহাত্মা উপাধি বেশ পছন্দ করার ফলে এর পর থেকে তকে খুশী করার জন্য তার সাঙ্গপাঙ্গরা সবাই তাকে মহাত্মা বলে সম্বোধন করতে শুরু করে। এই হলো গান্ধীর মহাত্মা হবার রহস্য। অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন এই আয়ুর্বেদিক প্রতিষ্ঠান হঠাৎ গান্ধীকে আমন্ত্রণ করল কেন। এর কারণ হচ্ছে এই প্রতিষ্ঠান দক্ষিণ আফ্রিকার ভারতীয়দের ব্যবহারের জন্য তাদের উৎপন্ন ঔষধ রপ্তানি করত এবং এই জন্যই গান্ধীকে চিনত। গন্ডাল রাজ্য ছিল ব্রিটিশ-ভারতের অধীনস্থ রাজ্য (Princely Stete) এর রাজধানীর নাম ছিল গন্ডাল শহর।

সার্জেন্ট মেজর মোহনদাশ করমচাঁদ গান্ধী

গান্ধী চরম ব্রিটিশ-প্রেমী ছিলেন। ১৮৯৯-১৯০২ পর্যন্ত বোর যুদ্ধে (Second Boar War) বোর-দের বিরুদ্ধে ব্রিটিশদের সাহায্য করার জন্য গান্ধী নাটাল ভারতীয় অ্যাম্বুলেন্স কোরনামে দক্ষিণ আফ্রিকার ভারতীয়দের দ্বারা অর্থায়িত ও পরিচালিত এইটি সংগঠন সৃষ্টি করেন। এদের কাজ ছিল যুদ্ধে আহত ব্রিটিশ সেনাদের হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা।

১৮৭৯ সালের ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ও স্বাধীন জুলু রাজ্যের (Zulu Kingdom) যুদ্ধে গান্ধী আগ্রাসী ব্রিটিশদের সহায়তা করার জন্য আবার একই কাজ করেন। এই সময় দক্ষিণ আফ্রিকার ব্রিটিশ বাহিনীতে গান্ধী সার্জেন্ট মেজর (Sergeant Major) পদমর্যাদায় কাজ করেন।

এখানেই শেষ না, ১৯১৪ সালে যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয় তখন গান্ধী ভারতে যাচ্ছিলেন। যাত্রা পথে ইংল্যান্ডে কয়েক সপ্তাহ কাটানোর ইচ্ছা ছিল। কিন্তু ইংল্যান্ডে অবতরণ করার প্রায় পরপরই তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার মতো ইংল্যান্ডেও স্থানীয় ভারতীয়দের সংগঠিত করে আরেকটি অ্যাম্বুলেন্স কোরপ্রতিষ্ঠা করেন ও যুদ্ধে ব্রিটিশদের সহায়তা করেন।

১৩ এপ্রিল ১৯১৯ জালিয়ানালা বাগ, অমৃতসর, পাঞ্জাবে এক নৃশংস গণহত্যা ঘটে। অনেক গ্রামবাসী এই বাগে বৈশাখ উৎসব পালনের জন্য জড় হয়। এদের কেউকেউ শান্তিপূর্ণ ভাবে দুইজন ভারতীয় জাতীয়তাবাদী নেতার গ্রেফতার ও নির্বাসনের প্রতিবাদ করছিল। এমন সময় ভারপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার-জেনারেল রেজিনাল্ড ডায়ার তার সেনাবাহিনীসহ বাগে প্রবেশ করে, সব গেট বন্ধ করে দেয়, ও ব্রিটিশ-ভারতীয় সেনাদের নিরস্ত্র জনগণের উপর গুলি চালানোর নির্দেশ দেয় এবং সেনারা গুলি চালায়। ফলে ৩৭৯ মারা যায় ও ১,০০০-রের বেশী আহত হয়। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে গান্ধীর বক্তব্য ছিল, “জেনারেল ডায়ারকে নিরপরাধ মানুষকে গুলি করায় সহায়তা করা আমার পাপ হবেতবে সে যদি কোন শারীরিক অক্ষমতায় ভোগে তাহলে তাকে সেবা যত্ন করে সুস্থ করা ক্ষমার ও ভালবাসার এক নিদর্শন হবে।“ (Gandhi said that “it would be sin for me to serve General Dyer and co-operate with him to shoot innocent men. But it will be an exercise of forgiveness or love for me to nurse him back to life, if he was suffering from a physical malady (sic)”. (Collected Works of Mahatma Gandhi (CWMG) Vol 18, P195, ‘Religious Authority for Non-Cooperation’, Young India, 25 August 1920))

গান্ধী লিখেন যে ডায়ার, “শুধুমাত্র কিছু দেহ ধ্বংস করেছিল কিন্তু অপরপক্ষ দেশের আত্মাকে হত্যার চেষ্টা করেছিল(Gandhi even wrote that Dyer “merely destroyed a few bodies but the others tried to kill the soul of a nation”. He said that “the fury that has been spent upon General Dyer is, I am sure, largely misdirected”. (Collected Works of Mahatma Gandhi, Volume 18, P46, Young India, 14 July 1920))

মনে করেন গান্ধী ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চে ঢাকায় গণহত্যার পরে যদি বলতেন, “টিক্কা খান তো শুধু কিছু দেহ ধ্বংস করেছিল, কিন্তু বাঙ্গালীরা পাকিস্তানের আত্মাকে হত্যা করতে চেয়েছিল। আমার জন্য টিক্কা খানকে নিরপরাধ মানুষকে গুলি করায় সহায়তা করা পাপ হবে। তবে সে যদি কোন শারীরিক অক্ষমতায় ভুগে তাহলে তাকে সেবা যত্ন করে সুস্থ করা ক্ষমার ও ভালবাসার এক আদর্শ নিদর্শন হবে।আমাদের, বাঙ্গালীদের কেমন লাগত? এই হলো মহাত্মার নমুনা!

হিন্দু বর্ণ প্রথার সমর্থক গান্ধী

গান্ধী বিশ্বাস করতেন প্রত্যেক হিন্দুকে অবশ্যই তার বংশগত পেশা পালন করা উচিৎএবং মিশ্র বর্ণের বিয়েকে নিষেধ করেনকেননা তার মতে আত্মার দ্রুত বিবর্তনের জন্য এই মিশ্র বর্ণের বিয়ে রোধ করা প্রয়োজন। 

ভারতের স্বাধীনতায় গান্ধীর অবদান

একটি প্রচলিত স্রুতি বা মিথ (Myth) হচ্ছে যে গান্ধির অহিংসা আন্দোলনের জন্য ব্রিটিশদের ভারত ছাড়তে হয়। এটা একেবারেই সত্য নয়।

কেননা ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতার কয়েকটি কারণ ছিল।

১) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলে ব্রিটেনের অর্থনীতির এমন চরম অবনতি ঘটে যে ব্রিটেনের পক্ষে তার বিশাল সাম্রাজ্য ধরে রাখার মতো অর্থ বা জনবল কিছুই ছিল না। এখানে একটি কথা মনে রাখতে হবে যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ না হলে ভারতে স্বাধীনতা পেতে কম করে হলেও আরও ২৫-৩০ বছর সময় লাগত। কাজের ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতার জন্য সবচেয়ে কৃতিত্ব যার সে হচ্ছে হিটলার।

এখানে উল্লেখ্য যে শুধু ভারত নয়, অর্থনীতির সর্বনাশা ধ্বসের ফলে ব্রিটেনকে ১৯৪৬ সালে জর্ডান, ১৯৪৭ সালে প্যালেস্টাইন, ১৯৪৮ সালে শ্রীলংকা, ১৯৪৮ সালে মায়ানমার, ১৯৫৩ সালে মিশর, এবং ১৯৫৭ সালে মালায়সিয়া। একই কারণে ফ্রান্সকে ১৯৪৯ সালে লাওস, ১৯৫৩ সালে কম্বোডিয়া, এবং ১৯৫৪ সালে ভিয়েতনাম ছাড়তে হয়। নেদারল্যান্ড ইন্দোনেশিয়া ছাড়ে ১৯৪৯ সালে। কাজেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে ব্রিটেনকে এমনিতেই ১৯৪৭ সালে আর্থিক কারণে ভারত ছাড়তে হতো।

২) রাজকীয় ব্রিটিশ-ভারতীয় নৌবাহিনীর বিদ্রোহ। এই বিদ্রোহ ১৯৪৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি ঘটে। বিদ্রোহটি বোম্বেতে (মুম্বাই)শুরু হলেও খুব তাড়াতাড়ি সারা ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়ে। এই বিদ্রোহ ব্রিটিশ সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনী দমন করতে সক্ষম হলেও এই বিদ্রোহটি ব্রিটিশদের জন্য একটি অশনি সংকেত। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ সফলতা দেখেনি প্রধানত ব্রিটিশ-ভারতীয় সেনাবাহিনীর পাঞ্জাবী ও পাঠান সৈন্যরা এই বিদ্রোহের সময় ব্রিটিশদের পক্ষে যুদ্ধ করে। তাছাড়া ব্রিটিশ-ভারতের অনেক রাজা (Princely States) ব্রিটিশদের সৈন্য ও গোলাবারুদ দিয়ে বিদ্রোহ দমনে সহায়তা করে। কিন্তু ১৯২০ সাল থেকে বাঙ্গালীদের শুরু করা ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন দানা বেধে উঠে ও সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়ে।। পরে এই আন্দোলন কংগ্রেসের নেতৃত্বে চলে যায়। 

৩) সুভাষচন্দ্র বসু কর্তৃক ভারতীয় জাতীয় সেনাবাহিনী বা আজাদ হিন্দ ফৌজের প্রতিষ্ঠা। ১৯৪২ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুদ্ধে জার্মান ও জাপানী বাহিনী কর্তৃক ভারতীয় যুদ্ধবন্দিদের সংগঠিত করে এই সেনাবাহিনী তৈরি হয়। এই সেনাবাহিনীর ফলে ব্রিটিশ প্রশাসন প্রচণ্ড উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। তাদের মূল ভয়ের কারণ ছিল ব্রিটিশ-ভারতীয় সেনাবাহিনীতে আবার বিদ্রোহ হবার সম্ভাবনা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ব্রিটিশদের পক্ষে ব্রিটেন থেকে সেনা এনে বিদ্রোহ দমন করা অসম্ভব ছিল।

৪) ভারতের স্বাধীনতার প্রাক্কালে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লিমেন্ট এটলী (Clement Atlee) মন্তব্য করেন, “গান্ধীর অহিংসা-আন্দোলনের প্রভাব ব্রিটেনের ভারতকে স্বাধীনতা প্রদানের সিদ্ধান্তের উপরে বলতে গেলে কোন প্রভাব বিস্তার করেনি।এই কথার সমর্থনে কোলকাতা হাইকোটের প্রধান বিচারপতি ফনি ভূষণ চক্রবর্তী, যিনি অল্প সময়ের জন্য বাংলার গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, A History of Bengal বইয়ের লেখক রমেশ চন্দ্র মজুমদারের প্রকাশককে এক চিঠিতে লেখেন, “……… ড. মজুমদার তার বইয়ের মুখবন্ধে লিখেন যে তিনি মেনে নিতে পারেন না যে প্রধানত ও একমাত্র গান্ধীর অহিংসা-আন্দোলনের ফলেই ব্রিটেন ভারতকে স্বাধীনতা দিতে বাধ্য হয়েছিল। আমি ভারপ্রাপ্ত গভর্নর থাকাকালীন লর্ড এটলী (clement Atlee) ভারত ভ্রমণের প্রাক্কালে কোলকাতা গভর্নরের প্রাসাদে দুই দিন অবস্থান করেন। এই সময় তার সাথে আমার দীর্ঘ আলোচনা হয়। আমি তাকে সরাসরি প্রশ্ন করি যে যখন গান্ধীর ভারত-ছাড়আন্দোলন বেশ কিছুদিন আগে থেকেই মুখ থুবড়ে পড়ে আছে এবং ১৯৪৭ সালে এরকম নতুন কোন ঘটনা বা আন্দোলন ঘটেনি যার ফলে ব্রিটেনের তড়িঘড়ি ভারত ছাড়া প্রয়োজন, এই পরিপ্রেক্ষিতে কেন ব্রিটেন ভারত ছেড়ে যাচ্ছে?

 

এই প্রশ্নের উত্তরে লর্ড এটলী অনেক কারণ দেখান যার মধ্যে প্রধান ছিল সুভাষচন্দ্র বসুর সামরিক কার্যকলাপের ফলে ভারতীয় সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীর সৈন্যদের মাঝে ব্রিটিশদের প্রতি আনুগত্যের ক্ষয়।

আমাদের আলোচনার শেষের দিকে আমি জানতে চাই যে ভারত ত্যাগ করার ব্রিটিশ সিদ্ধান্তের পেছনে গান্ধীর প্রভার কতটুকু ছিল। এর উত্তরে লর্ড এটলী তার ঠোট বেঁকিয়ে ব্যঙ্গাত্মক হাসি সহ চিবিয়ে চিবিয়ে বলেন খু-ব-ই সা-মা-ন্য

সুভাষচন্দ্র বসু ও গান্ধী

 ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে সূর্যের মত দীপ্ত যিনি হয়ে থাকবেন তার নাম নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু। সুভাষচন্দ্র মনে করতেন গান্ধীর অহিংসা নীতি ভারতের স্বাধীনতা দিতে অক্ষম। এই কারণেই গান্ধীর সাথে তার দূরত্ব তৈরি হয়।

 সুভাষচন্দ্র ১৯৩৮ সালে অবিসন্বাদিতরুপে কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হবার পর পরের বছর (১৯৩৯) তিনি ব্রিটিশদেরকে ছয় মাসের সময় দিয়ে ভারত ত্যাগ করার জন্য দেশব্যাপী আন্দোলন করার পরিকল্পনা করেন। এই লক্ষ্য নিয়ে তিনি আবার কংগ্রেসের সভাপতির জন্য পূর্ণ:নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নেন। গান্ধী কিন্তু এতে খুশী হলেন না। গান্ধী তার সম্পূর্ণ শক্তি দিয়ে সুভাষচন্দ্রের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী সিতারামায়া-কে জেতার জন্য সাহায্য করেন। কিন্তু এতদসত্বেও সুভাষচন্দ্র বিজয়ী হন। গান্ধী এই ঘটনার পর প্রকাশ্যেই বলেন যে সিতারামায়ার পরাজয় ছিল তার নিজের পরাজয়। কুচক্রী গান্ধী পরে অবশ্য তার অনুসারী কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্যদের দ্বারা এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করেন যে সুভাষচন্দ্র পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি জাপানীদের সহায়তায় আজাদ হিন্দ ফৌজ সংগঠিত করেন। তার এই বাহিনীর সৈন্যরা ছিল প্রধানত মুসলমান সৈন্য, ও ব্রিটিশ মালয়, সিঙ্গাপুর, ও দক্ষিণ এশিয়ায় কর্মরত শ্রমিক ও মজুর। যদিও যুদ্ধে এই বাহিনী খুব একটা সাফল্য দেখাতে পারেনি, তবুও ব্রিটিশ-ভারতীয় সেনাবাহিনী ও নৌ-বাহিনীর সৈন্যদের উপর এর প্রভাব ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

গান্ধী ও বি.আর. আমবেদকারের সম্পর্ক

ভারতে স্বাধীনতা আন্দোলনের আরেক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম ভীমরাও রামজি আমবেদকার বা বি.আর. আমবেদকার (Bhimrao Ramji Ambedkar)আমবেদকার ছিলেন মাহার-দলিত সম্প্রদায়ের লোক। ভারতে দলিত বলতে বুঝায় হিন্দু সমাজে যারা সবচেয়ে নিম্ন বর্ণের ও যারা হিন্দু সমাজের অন্য তিন বর্ণের কাছে অচ্ছুৎ।

প্রচণ্ড মেধাবী আমবেদকার অর্থনীতিতে কলাম্বিয়া ইউনিভারসিটি ও লন্ডন স্কুল অভ ইকোনমিকস থকে ডক্টরেট ডিগ্রী অর্জন করেন। তিনি ছিলেন অর্থনীতিবিদ, রাজনীতিবিদ, ও সমাজ সংস্কারক। তিনি ভারতের দলিত শ্রেণীর প্রতি ভারতীয় সমাজের বৈষম্য দূরীকরণের লক্ষে দলিতদের অনুপ্রাণিত করেন। তিনি ভারতের সংবিধানের মূল প্রণেতা এবং স্বাধীন ভারতের প্রথম আইন মন্ত্রী।

লন্ডনে এক গোল-টেবিল আলোচনায় গান্ধী ও আমবেদকারের মধ্যে মতপার্থক্য হয়। দুজনেই ভারতীয় দলিতদের প্রতিনিধি বলে দাবি করেন। এই আলোচনা সভা কয়েক সপ্তাহ ধরে চলার পর গান্ধী (এই সময় গান্ধী ৫-৬ মাস ইংল্যান্ডে অবস্থান করেন) অবশেষে মুসলমান ও শিখ সম্প্রদায়ের জন্য আলাদা নির্বাচকমণ্ডলী (Electorate) গঠনের জন্য গান্ধী রাজি হলেও দলিতদের জন্য আলাদা নির্বাচকমণ্ডলী গঠনের রাজি হলেন না। তিনি তার চিরাচরিত পন্থা অবলম্বন করে ঘোষণা করেন, “আমি কামনা করি হিন্দুত্ব মারা যাক কিন্তু অস্পৃশ্যতা বাঁচুক

গান্ধী কোন ভাবেই আমবেদকারকে দলিত সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি স্বীকার করতে রাজি হলেন না, যদিও বেশিরভাগ দলিত সংগঠন তাদের আমবেদকারের প্রতি সমর্থনের ঘোষণার টেলিগ্রাম পাঠান স্বত্বেও।

পরিশেষে গান্ধী বলেন যে, “যারা দলিতদের রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে কথা বলেন তাদের ভারতীয় সমাজের গঠন সম্পর্কে কোন ধারণা নেই, ফলে আমি আমার সম্পূর্ণ শক্তি দিয়ে বলতে চাই যে আমি যদি একমাত্র মানুষ হই তবুও আমি আমার জীবন দিয়ে এর বিরোধিতা করবএই বলে গান্ধী ভারতে উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন।

এই ঘটনার এক বছর পরে, ১৯৩২ সালে, রেমসে ম্যাকডোনাল্ড (Ramsay MacDonnald) ভারতীয় জাতিগত প্রশ্নে ব্রিটিশ সরকারের সিদ্ধান্ত জানান। এই সিদ্ধান্তে দলিতদের একটি ২০-বছরের জন্য পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী দেয়ার কথা বলা হয়। এই সময় গান্ধী পুনার ইয়ারাওয়াদা কেন্দ্রীয় কারাগারে অন্তরীণ ছিলেন। এই সংবাদ শুনার পর গান্ধী ঘোষণা করেন যে দলিতদের জন্য আলাদা নির্বাচকমণ্ডলীর ঘোষণা বাতিল না করা পর্যন্ত তিনি আমৃত্যু অনশন করবেন। ফলে দলিতদের জন্য পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী বাতিল করা হয়। গান্ধীর কারণে দলিতেরা তাদের ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক প্রদত্ত অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। এর পরে আমবেদকার গান্ধীর সাথে পুনা চুক্তি করতে বাধ্য হন।

দুমুখো গান্ধী

গান্ধীর দুমুখো স্বভাবের একটি উদাহরণ দেই। গান্ধী বলেন, “এমন অনেকগুলি কারণ রয়েছে যার জন্য আমি মরতে প্রস্তুত কিন্তু এমন কোনও কারণ নেই যার জন্য আমি হত্যা করতে প্রস্তুতখুব ভাল কথা, কিন্তু আবার এই গান্ধীই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে দুই দুই বার সাধারণ ঘোষণার মাধ্যমে ভারতীয়দের ব্রিটিশদের যুদ্ধে সহায়তা করার জন্য ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেবার জন্য আবেদন করেন!

যৌন বিকৃত মানসিকতার গান্ধী

গান্ধীর এই যৌন বিকৃতির কথা তার আশেপাশের সবাই অবহিত ছিল। এখানে বেশী কিছু বলতে চাই না। শুধু এটুকুই বলব যে গান্ধী একাধিক মহিলার সাথে নগ্ন হয়ে একই বিছানায় শুতেন। এই মহিলাদের মধ্যে তার নাতীর কন্যাও অন্তর্ভুক্ত ছিল। তিনি তার এই যৌন বিকৃত মানসিকতার সাফাই দিতেন এই বলে যে তিনি নগ্ন মহিলাদের সাথে শয়ন করে তিনি নিজের ব্রহ্মচারী সংযম পরীক্ষা করতেন-এটি নাকি ছিল তার এক ধরণের পরীক্ষা (experiment)এরকম অনেক ঘটনা আছে লিখতে গেলে এই লেখাটা বিশাল আকার ধারণ করবে তাই লিখলাম না। উৎসাহ থাকলে লিঙ্কগুলো দেখেন। https://www.quora.com/Did-anyone-think-that-Mahatma-Gandhi-was-a-pervert-Is-that-true, https://madrascourier.com/biography/gandhi-a-sexually-repressed-pervert/, https://www.outlookindia.com/magazine/story/when-gandhi-nearly-slipped/292132, https://www.h-net.org/reviews/showpdf.php?id=42092, ইত্যাদি।

গান্ধী মারা যাবার পরে যখন তাকে ভারতের জাতীর পিতার আসনে উন্নীত করা হয় তখন গান্ধীর অনেক কুকীর্তির প্রমাণ সরিয়ে ফেলা হয়। কিন্তু সমসাময়িক কালে আস্তে আস্তে এই সমস্ত ঘটনা আবার ভেসে উঠছে।

গান্ধীর কল্যাণে ব্রিটিশরা নিরাপদে ও অক্ষত অবস্থায় ভারত ত্যাগ করতে সক্ষম হয়

গান্ধীর এই অহিংসা আন্দোলনের সবচেয়ে সুবিধা ভোগ করে ব্রিটিশরা। আমার মাঝে মাঝে সন্দেহ হয় গান্ধীকে কি ব্রিটিশদের স্বার্থ রক্ষার জন্য আফ্রিকা থেকে ভারতে আনা হয়েছিল? আমার এটা মনে হবার কারণ এই যে বলা হয় পূর্বে উল্লিখিত চার্লস ফ্রিয়ার এন্দ্রুজ নামের পাদ্রি ১৯১৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় যান এবং গান্ধীকে ভারতে এসে আন্দোলনে যোগ দেবার জন্য প্ররোচিত করে কলকাঠি নাড়ার ফলেই গান্ধী দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ভারত ফিরে আসতে প্রলুব্ধ হন। গান্ধী এই পাদ্রীকে বলতেন ক্রিস্টের বিশ্বস্ত দূত” (Christ's Faithful Apostle)এই পাদ্রীর ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনে অবদানের জন্য গান্ধী তাকে নামে দেন দীনবন্ধুযার মানে যে গরিবের বন্ধু

যেখানে ভারতীয়দের সম্পূর্ণ শক্তি দিয়ে সশস্ত্র বিদ্রোহের মাধ্যমে ব্রিটিশদের ভারত থেকে বিতাড়িত কারা উচিৎ ছিল, তার বদলে গান্ধীর কারণে ব্রিটিশরা অক্ষত অবস্থায় ভারত ত্যাগ করতে সক্ষম হয়। যেই ক্ষোভ ও হিংস্রতা ব্রিটিশদের প্রতি পরিচালিত হবার কথা ছিল গান্ধীর কারণে সেই ক্ষোভ ও হিংস্রতা হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায় একে অন্যের প্রতি নিক্ষেপ করে। স্বাধীনতার প্রাক্কালে যতজন হিন্দু ও মুসলমান একে অন্যের হাতে নিহত বা আহত হয় তার গুরুভারের দায়িত্ব গান্ধীকে নিতে হবে।

পরিশেষে আমি মনে করি গান্ধীর মতো একজন ব্রিটিশ প্রেমী, বর্ণবাদী, কুচক্রী, স্বৈর, ব্যাকমেইলার, ও ব্যভিচারী, কোন মাপকাঠিতেই মহাত্মা (যার আত্মা মহৎ) হতে পারে না। 

 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পরিবর্তন ও প্যারাড়াইম

আজিমপুরের দুর্দান্ত যোদ্ধারা, পঞ্চম পর্ব

ধর্মান্ধতা কী?