আজিমপুরের দুর্দান্ত যোদ্ধারা, তৃতীয় পর্ব

আজিমপুরের দুর্দান্ত যোদ্ধারা, তৃতীয় পর্ব

প্রত্যেক দিন সূর্য উঠার আগেই ক্যাম্পের সবাই ঘুম থেকে ওঠে। আমাদেরও এখন অভ্যাস হয়ে গেছে। একটা কারণ অবশ্য সন্ধ্যার পরপরই ঘুমিয়ে পড়া। সংকট-কালীন যুদ্ধরত সৈন্যদের সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় স্ট্যান্ড-টু/স্ট্যান্ড-ডাউন একটি রুটিন। স্ট্যান্ড-টু/স্ট্যান্ড-ডাউন শেষে হাত, মুখ, ইত্যাদি ধোয়া শেষে নাস্তা করার পর আমরা তাঁবুতে ফিরে এলাম।

প্রশিক্ষণের পর আজকেই আমাদের প্রথম অভিযান। বাহির থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া দৃশ্যমান না হলেও বুঝতে অসুবিধা হয় না যে আমরা সবাই উত্তেজনায় টানটান হয়ে আছি। কেউ খুব কথাবার্তা বলছে না। সাধারণত বন্ধুরা একসাথে বসলে যে রকম কথাবার্তা হয় এখন সেটা অনুপস্থিত।

আমার মনে হলো দলের এই উত্তেজনা কমানো দরকার। আমি মাহতাবকে বললাম, “এই মাহতাব দেখছ সবাই কিরকম মনমরা হয়ে আছে? কিছু jokes শোনাও তো।

মাহতাব আমার কথা শুনে বিছানায় নড়েচড়ে বসল। আমরা সবাই মাহতাবের দিকে ফিরে বসলে, মাহতাব কৌতুক বলা শুরু করল।

কৌতুক শুধু বললেই হয় না, কেমন করে কৌতুকটা বলতে হয় সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। মাহতাব কৌতুক বলার সময় নিজে কখনো হাসত না, বরং মুখটা এমন গোবেচারার মতো করে রাখত যে মনে হতো অন্যেরা কেন হাসছি সে বুঝতে পারছে না।

সে শুরু করল, আমাদের পাশের ফ্ল্যাটের রহিম চাচা ও চাচিকে তো তোমরা সবাই চিনো। চাচির সাইজের কথা তো মনে আছে? একদিন চাচা আর চাচির ভিষণ ঝগড়া লেগেছে। এক পর্যায়ে চাচি ভীষণ রেগে, তার সেই বিশাল গদার মতো হাত দিয়ে চাচার গালে প্রচণ্ড এক থাপ্পড় মারলেন। চাচার তো প্রায় মাথা ঘুরে পড়ে যাবার উপক্রম।

চাচা একটু ধাতস্থ হয়ে, ভীষণ রেগে চিৎকার করে বললেন, “এটা কী সত্যি সত্যি মারলা না ইয়ার্কি করলা।চাচি এই কথা শুনে তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠে বলে উঠলেন, “সত্যি সত্যি মেরেছি!চাচা তখন চিৎকার করে উত্তর দিলেন, “তাহলে আজকে বেঁচে গেলা, আমি এসব ব্যাপারে ইয়ার্কি একদম পছন্দ করি না।

তার বলা শেষ হলে আমরা সবাই হাসতে হাসতে তালি দিয়ে তাকে উৎসাহ দিলাম। মাহতাব আবার শুরু করল।

মনে পড়ে আমাদের হানিফ (হানিফের দিকে নির্দেশ করে বলল) একবার রুবি নামের এক মেয়েকে প্রায় বিয়ে করে ফেলেছিল?” সবার চোখ এখন আমাদের দলের রোমান্টিক হিরো হানিফের দিকে। দেখে বুঝা যায় বেচারা হানিফ এখন একটু অস্বস্তিতে আছে।

মাহতাব একটু থেমে আবার শুরু করল, হানিফ রুবিকে বলল, “আমাদের বিয়ের এই খবরটা বিয়ের আগের দিন পর্যন্ত কাউকে আমরা জানাব না। খবরটা শুধু বিয়ের আগের দিন আমরা সবাইকে জানাব এবং এটা একটা Surprise হবে।

রুবি উত্তরে বলল, “আমি শুধু একজনকে এই খবরটা জানাতে চাই।

হানিফ একটু আশ্চর্য হয়ে প্রশ্ন করল: কেন?

রুবি বলল, “৩২ নম্বর বিল্ডিঙের হিরু আমাকে একদিন বলেছিল, কোন গাধাই নাকি আমাকে বিয়ে করবে না। তাই ওকে জানাতে হবে।

বিয়েটা সেখানেই ভেঙ্গে গেল।

আমরা সবাই হো হো করে হেঁসে উঠলাম।

দুটো কৌতুক শোনার পর আমাদের গুমোট ভাবটা কেটে গেছে। মাহতাব আবার শুরু করল।

আরেকটা হানিফের প্রেমের গল্প (বেচারা হানিফ)। হানিফ এক মেয়ের সাথে প্রেম করার চেষ্টা করছে।

হানিফ মেয়েটাকে বলল, “আমি তোমাকে খুব ভালবাসি

উত্তরে মেয়ে বলল, “ধুর!

হানিফ তো এত সহজে ছাড়ার ছেলে না, “এক মুহূর্তও বাঁচতে পারব না তোমাকে ছাড়া।

মেয়ে আবার বলে, “ধুর!

হানিফ ও নাছোড়বান্দা, “মরতেও পারি তোমার জন্য।

মেয়ে শুধু বলে, “ধুর!

হানিফ এবার মেয়েটিকে বলে, “একটা সুন্দর সোনার আংটি কিনেছি তোমার জন্য।

এবার মেয়েটির চোখ চকচক হয়ে উঠল, খুবই উৎসাহিত হয়ে জিজ্ঞেস করল,

সত্যি?”

হানিফ মেয়েটির চোখের দিকে তাকিয়ে উত্তর দিল, “ধুর।

মেয়ের সাথে হানিফের প্রেম আর গড়ায়নি।

আমরা সবাই হানিফের দিকে তাকিয়ে যখন অট্টহাসিতে ব্যস্ত তখন ক্যাপ্টেন রানার ব্যাটম্যান আমাদেরকে খবর দিল, “ক্যাপ্টেন সাহেব আমাদের সালাম দিয়েছেন।

হাসতে হাসতেই আমরা সবাই ক্যাপ্টেনের তাঁবুর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম।

পৌঁছে দেখি আজকে সন্ধ্যায় যে ৫০-জনের দল অভিযানে যাবে তাদের অনেকেই ক্যাপ্টেনের তাঁবুর সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আমরা সবাই তাদের সাথে সামিল হলাম।

একটু পরেই ক্যাপ্টেন তাঁবু থেকে বের হয়ে সবাইকে তার সামনে বসতে বললেন। ক্যাপ্টেন নিজেও মাটিতে বসলেন, তার সামনে বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও আশেপাশের এলাকার হাতে আঁকা মানচিত্র; ক্যাপ্টেনের হাতে একটা লম্বা বাঁশের ছড়ি।

আমারা সবাই বসলে ক্যাপ্টেন রানা বলতে শুরু করলেন, “আমরা ঠিক সন্ধ্যা সাতটার সময় ক্যাম্প থেকে যাত্রা করব। বিদ্যুৎ কেন্দ্র আমাদের ক্যাম্প থেকে প্রায় ১০-মাইল হলেও যেহেতু আমাদেরকে ঘোরা পথে জঙ্গলের ভিতর দিয়ে যেতে হবে, ফলে দূরত্ব প্রায় ১৫-মাইলের মতো হবে। রাতে জঙ্গলের ভিতর দিয়ে অতিরিক্ত গোলাবারুদ সহ যাবার ফলে ঘণ্টায় ২ মাইলের বেশী যাওয়া সম্ভব হবে না। কাজেই রাত ২টা থেকে ৩টার মাঝামাঝি সময়ে লক্ষ্যবস্তুর কাছাকাছি পৌঁছব।ক্যাপ্টেন রানা একটু থেমে তার ম্যাপের দিকে নির্দেশ করে বললেন, “এটা হচ্ছে বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও আশেপাশের এলাকার মানচিত্র।

এটা বিদ্যুৎ কেন্দ্র, কেন্দ্রটি আয়তকার, রাস্তার দিকে ৫০০ গজ, আর গভীরতা ৬০০ গজ। কেন্দ্রের উত্তর দিকে আরেকটি দেয়াল ঘেরা জায়গা আছে যেখানে জেনারেটরের ডিজেল তেল মজুত রাখা হয়। এখানে তিনটি ট্যাংক আছে, দুটি বড় ও একটি ছোট। বড় দুটির প্রত্যেকটিতে ৫,০০০-গ্যালন ও ছোটটায় ২,০০০-গ্যালন জ্বালানী থাকে। এই ট্যাংক থেকে পাইপের মাধ্যমে জেনারেটরের জ্বালানী সরবরাহ করা হয়। বিভিন্ন ট্যাংকার এই জ্বালানী তেল সরবরাহ করে। কিন্তু এখন নিরাপত্তার জন্য সন্ধ্যার পরে বিদ্যুৎ কেন্দ্রে কোনো তেল সরবরাহ হয় না। আমাদের মূল লক্ষ্য এই জ্বালানী ট্যাংকগুলো, মূল বিদ্যুৎ কেন্দ্র না,“

ক্যাপ্টেন দম নেবার জন্য একটু থামলেন।

আবার ম্যাপের দিকে ছড়ি দিয়ে দেখিয়ে বলতে শুরু করলেন, “এখানে হচ্ছে তিনটি ট্যাংক, তারপরে দেয়াল ঘেরা মূল বিদ্যুৎ কেন্দ্র, তারপরে আরেকটি দেয়াল ঘেরা শ্রমিকদের থাকার জায়গা। তারপরে তিনটি পাঁচতলা ভবন ইঞ্জিনিয়ার ও অন্যান্য কারিগরি লোকদের জন্য। এর পরে আরেকটি দেয়াল ঘেরা এলাকা আছে যেখানে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বড় কর্তারা থাকেন। এগুলো সবই স্বয়ংসম্পূর্ণ দোতালা বাসা, প্রত্যেক বাসার সামনে সুন্দর ফুলের বাগান আছে।

এবার বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কথা বলি, সবাই মন দিয়ে শুনেন। এই কেন্দ্রের দায়িত্বে একজন সুবেদারের নেতৃত্বে ৩০ জন পাকিস্তানি সৈন্য ও ৩০-জন রাজাকার আছে। পাকিস্তানিদের সবার অস্ত্র চাইনিজ, রাজাকারদের ৩০৩ রাইফেল ও স্টেনগান। প্রত্যেক আট ঘণ্টা পর পর শিফট পরিবর্তন হয়, প্রত্যেক শিফটে দশ জন পাকিস্তানি সেনা ও দশ জন রাজাকার পাহারা দেয়।

এখানে দুটি পর্যবেক্ষণ-মাচা (Observationn Tower) আছে; প্রত্যেক পর্যবেক্ষণ-মাচার উচ্চতা ২৫-গজ, এবং প্রত্যেক মাচায় একটি করে সার্চ লাইট ও লাইট-মেশিনগান থাকে। সব সময় একজন সেনা ও একজন রাজাকার এই মাচায় পাহারায় থাকে।

এই পর্যবেক্ষণ মাচা ছাড়াও দুটি বাঙ্কার আছে। ব্যাংকারগুলো বেশ পাকাপোক্ত। প্রত্যেক বাঙ্কারে চারজন থাকে, দুই জন সেনা ও দুইজন রাজাকার। আমাদের খবর হলো পাকিস্তানি সেনারা বাঙ্কারে ঘুমায় আর রাজাকাররা জেগে পাহারা দেয়। একটি বাঙ্কার বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মূল ফটকের সামনে, আরেকটি যেখানে জ্বালানী মজুত রাখা হয় তার সামনে। বাকী দুজন সৈন্য ও দুজন রাজাকার মূল ফটকের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকে।

পাকিস্তানি সেনারা এখানে থাকে না। বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দশ মাইল উত্তরে পাকিস্তানি ঘাটি আছে। এই ঘাটিতে প্রায় ১০০-জন সেনা ও দুটো ১০৫ mm আর্টিলারি গান (কামান) আছে। এখান থেকে প্রত্যেক দিন তিনবার পিকআপ ট্রাকে এই সেনাদের অদলবদল হয়। সকাল ৭টা, বেলা ৩-টা, ও রাত ১১-টা হচ্ছে শিফট পরিবর্তনের সময়।

রাজাকাররা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পেছনে তাঁবুতে থাকে। অবশ্য এই রাজাকারদেরকে নিয়ে আমি চিন্তিত না কারণ গোলাগুলি শুরু হলেই এই রাজাকাররা পালাবে। রাজাকারদের সাথে পাকিস্তানি সেনা রাখার প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে রাজাকাররা যেন পালাতে না পারে।এখন কার কী দায়িত্ব বুঝিয়ে দিচ্ছি।

প্রথমে সোহেল তোমাদের ১৪-জনের দল। তোমরা সাতজন করে দুটো দলে ভাগ হয়ে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উভয় পাশে রাস্তা ব্লক করার দায়িত্ব তোমাদের। কোনো মানুষ বা যানবাহন যেন তোমাদের প্রতিরোধ ভেদ করে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দিকে আসতে না পারে। তোমরা রাস্তার পাশে ট্রেঞ্চ তৈরি করে সেখানে পজিশন নেবা। বুঝতেই পাচ্ছ যে যদি কোনো ভাবে শত্রু তোমাদের বাঁধা অতিক্রম করে আসতে পারে তাহলে আমাদের সমূহ বিপদ হবে। তোমাদের উভয় দলের কাছে একটি লাইট-মেশিনগান যেন থাকে। বুঝতে পেরেছ?” আমার দিকে তাকিয়ে ক্যাপ্টেন রানা জানতে চাইলেন।

উত্তরে আমি তাকে তিনি আমাকে যে নির্দেশ দিলেন সেটাই পুনর্ব্যক্ত করলাম। আমার কথা শুনে ক্যাপ্টেন সন্তুষ্ট হলেন।

আবার তিনি অন্য ৩৬-জনকে উদ্দেশ্যে বললেন, “বাকী ৩৬-জন ১২-জন করে তিন ভাগে বা সেকশনে ভাগ হবে। প্রথম সেকশনের দায়িত্বে আমি থাকব। আমাদের কাছে দুটি লাইট-মেশিনগান, একটি রকেট লাঞ্চার, ও একটি দুই-ইঞ্চি মর্টার থাকবে। দুটো রকেট লাঞ্চার থাকলে ভাল হতো, আমরা দুটো বাঙ্কারকে একসাথে আক্রমণ করতে পারতাম। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে আছে মাত্র একটা। কাজেই আমাদের প্রাথমিক কাজ হবে জ্বালানী ট্যাংকের সামনে যে বাঙ্কার সেটাকে ধ্বংস করা। এর জন্য রকেট-লাঞ্চার ব্যবহার করব।

একই সাথে এর সংলগ্ন যে পর্যবেক্ষণ-মাচা আছে সেটাকে লাইট-মেশিনগান দিয়ে নিষ্ক্রয় করতে হবে। একাজে বাঙ্কারে রকেট হামলার সাথে সাথেই পর্যবেক্ষণ-মাচায় একটি লাইট-মেশিনগান ও অন্য অস্ত্র সমেত গুলি করে মাচায় যে দুজন থাকবে তাদেরকে নিশ্চিহ্ন করতে হবে। আরেকটি লাইট-মেশিনগান যেই বাঙ্কারে রকেট হামলা হয়েছিল সেটাকে গুলি করতে থাকবে কেননা রকেট হামলার পরও ভিতরে কেউ বেঁচে থাকতে পারে। নিশ্চিন্ত হবার জন্য, যদি প্রয়োজন হয়, আমি বাঙ্কারের ভিতরে দুটি গ্রেনেড ফেলতে চাই। এই কাজ ও আমি করব।

বাঙ্কার ও পর্যবেক্ষণ-মাচা ধ্বংসের পর বিস্ফোরক দিয়ে দেয়ালের একটি অংশ ভেঙ্গে ভিতরে ঢুকব। তারপরের কাজ রকেট-লাঞ্চার দিয়ে সবচেয়ে দূরে যে ৫,০০০-গ্যালনের ট্যাংকে সেটাকে ধ্বংস করা। এখানে রকেট বিস্ফোরণের সাথে সাথে জ্বালানী তেলে আগুন লেগে যাবে। একটি বড় ট্যাংকে যদি আগুন লাগে তাহলে সহজেই অন্য ট্যাংকে আগুন ছড়িয়ে পড়বে, আমাদের কিছু করতে হবে না।

রকেট-লাঞ্চার আমি চালাব। আমি দেয়াল ভাঙ্গার পর ভিতরে ঢুকব আমার সাথে সুলেমান, কামরুল ও কামরুলের সহযোগী লাইট-মেশিনগান নিয়ে থাকবে। চার জনের বেশী ভিতরে ঢুকার দরকার নেই।

একনাগাড়ে কথা বলে ক্যাপ্টেন একটু থেমে আবার শুরু করলেন,“সুবেদার পাশার দায়িত্ব হবে পর্যবেক্ষণ মাচা ধ্বংস করা। তার সাথে একটি লাইট-মেশিনগান সহ ছয় জন থাকবে। পাশা সাহেব আপনার উপরে অনেক দায়িত্ব, যদি সময় মতো এই পর্যবেক্ষণ মাচা ধ্বংস করা না যায় তাহলে আমরা যারা ভিতরে ঢুকব তারা নির্ঘাত মারা যাব। দেয়াল ভাঙ্গার দায়িত্বে থাকবে হাবিলদার মাসুম। পাশা সাহেব, মাসুম বুঝতে পারছেন?”

সুবেদার পাশা ও হাবিলদার মাসুম দুজনেই উত্তরে জী স্যার, বুঝেছি বলল।এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চারিদিকে উচ্চ ক্ষমতার লাইট লাগান আছে। প্রথম আক্রমণের, অর্থাৎ আমার রকেট নিক্ষেপের সাথে সাথে এই সব লাইট ধ্বংস করতে হবে। এটা আমাদের সবার দায়িত্ব। এই আলো যদি থাকে তাহলে শত্রু আমাদেরকে সহজেই টার্গেট করতে পারবে।

ক্যাপ্টেন এবার সুবেদার মতিনের দিকে তাকালেন, “মতিন সাহেব আপনার দলের কাজ হবে দ্বিতীয় বাঙ্কার যেটা মূল ফটকের সামনে সেটাকে ধ্বংস করা। যদি ধ্বংস করা নাও যায় তাহলে তাদেরকে ব্যস্ত রাখা, যেন বাঙ্কার অথবা মূল ফটক দিয়ে কেউ বের হতে না পারে।

নায়েব-সুবেদার হান্নান আপনার দলের কাজ হবে দ্বিতীয় পর্যবেক্ষণ মাচা যেটা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পেছন দিকে, সেটাকে ধ্বংস করা। কিন্তু মনে রাখবেন এই পিছন দিকেই রাজাকারদের থাকার জায়গা। আমাদের প্রাথমিক উদ্দেশ্য সফলের পর দরকার হলে আমরা আপনার দলকে সাহায্য করতে পারি।। এই কাজ করার জন্য আপনার দলকে অভিযান শুরুর আগেই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পেছনে অবস্থান নিতে হবে। আমার রকেট নিক্ষেপের সাথে সাথেই আপনারা গুলি শুরু করবেন। মনে রাখবেন এই অতর্কিত হামলার সঠিক সুযোগ নিতে হলে আমাদের টাইমিং পারফেক্ট হতে হবে।তার কথা শেষ হলে তিনি সবাইকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে দেখতে লাগলেন। কিছুক্ষণ পর বললেন, “সবাই বুঝতে পেরেছেন?”

সোহেল তুমি বলো তোমার দলের কী দায়িত্ব?” আমার দিকে তাকিয়ে ক্যাপ্টেন জিজ্ঞাস করলেন। আমি আগের মতো ক্যাপ্টেনকে বুঝিয়ে বললাম। ক্যাপ্টেন সব কমান্ডারকেই একই প্রশ্ন করলেন। কেউ ভুল করলে শুধরে দিলেন।পরে আমার দিকে ঘুরে বললেন, “সোহেল একমাত্র তোমার দলকে ট্রেঞ্চ খুড়তে হবে। তোমাদেরকে চারটা বেলচা (spade) দেয়া হবে ট্রেঞ্চ খোঁড়ার জন্য।তিনি সুবেদার মেজরের দিকে ফিরে বললেন, “বশীর সাহেব, ওদেরকে মিটিং শেষ হলেই চারটি বেলচা দিয়ে দিবেন।

মাসুম (হাবিলদার মাসুম এই কোম্পানির বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ) তোমার সব বিস্ফোরক, ডেটোনেটার, ডেটনেটিং-কর্ড, সব ঠিক আছে তো? দেয়ালে বিস্ফোরক কেমন করে লাগাবে?” ক্যাপ্টেন জানতে চাইলেন। মাসুমের উত্তর শুনে খুশী হয়ে বললেন, “ভাল, ভাল, তোমার উপর এই অভিযানের সাফল্য বহুলাংশে নির্ভর করছে। ঠিক সময়ে যদি দেয়াল ভাঙ্গা না যায় তাহলে আমাদের অভিযান বিফল হবে।

ঠিক আছে এখন যেয়ে বিশ্রাম করো, আজকে রাতে কারো ধুম নেই,” ক্যাপ্টেন উঠে দাঁড়ালেন। তার দেখাদেখি আমরা সবাই উঠে আমাদের তাঁবুর দিকে রওয়ানা দিলাম।

তাঁবুতে বসে আছি এমন সময় সুবেদার মেজর বশীর এক সহকারী সহ আমাদের তাঁবুতে এলেন। সাথের লোকের সাথে চারটা ছোট বেলচা ও দুটি তিন ব্যাটারির টর্চ-লাইট। আমাদেরকে জিনিসগুলো দিয়ে বললেন, “এগুলো আজকে তোমাদের কাজে লাগবে। মিশন থেকে ফিরে এগুলো অবশ্যই ফেরত দিবা।কথা শেষ হলে তিনি চলে গেলেন। সুবেদার মেজর বশীর এই কোম্পানির সবচেয়ে বয়স্ক ব্যক্তি, সবাই তাকে সম্মান করে।

আমরা ১৪-জনের সবাই গোল হয়ে বসলাম। আমাদেরকে দুটো ৭-জনের দলে ভাগ হতে হবে। আমি বললাম, “একটি দলের দায়িত্বে আমি থাকব আর অন্যটির দায়িত্বে থাকবে সেলিম।

প্রথম দলে:

১. সোহেল, দলনেতা; ২. কবীর, LMG; ৩. ইদ্রিস, কবীরের সহকারী; ৪. রফিক, আমাদের মাঝে সবচেয়ে ছোট, ফলে আমার সাথে রাখলাম; ৫. টুটুল, ৬. মাহতাব, ও ৭. সবুজ

দ্বিতীয় দলে:

১. সেলিম, দলনেতা; ২. সারোয়ার, ৩. টনি, ৪. হানিফ, বাচ্চুর সহকারী; ৫. বাচ্চু, LMG; ৬. মোসলেম, ও ৭. রহিম।

যাবার সময় আমি সামনে থাকব। আমার সাথে টর্চ-লাইট থাকবে। আমার ঠিক পেছনে কবীর, কবীরের পেছনে কবীরের সহকারী ইদ্রিস, তার পেছনে রফিক, টুটুল, মাহতাব, ও সবুজ।

আমি সেলিমকে জিজ্ঞাস করলাম, তুমি কীভাবে কে কোথায় থাকবে ঠিক করেছ?

সেলিম বলতে শুরু করল, “আমি সবার সামনে থাকব…“ কথা শেষ হবার আগের তাকে আমি থামিয়ে দিলাম। তুমি সবচেয়ে পেছনে থাকবে। তোমার আর আমার মাঝে অন্য সবাই থাকবে। দ্বিতীয় টর্চ তোমার কাছে থাকবে। তোমার সামনে বাচ্চু LMG নিয়ে থাকবে। বাকী গুলো তুমি ঠিক করো।সেলিম আবার কথার যুক্তি বুঝতে পেরে প্রতিবাদ করল না। এভাবের ঠিক হলো যাবার সময় আমরা কীভাবে যাব। এটা করার উদ্দেশ্য ছিল আমারা সবাই যেন জানি আমাদের সামনে ও পেছনে কে থাকবে, কেননা জঙ্গলের ঘুটঘুটে অন্ধকারে যে কেউ হারিয়ে যেতে পারে।

এবার আমদের দুটি দল কে কোন দিকে অবস্থান নিবে সেটা ঠিক করলাম। ক্যাপ্টেন রানা জানিয়েছিলেন যে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পূর্ব দিকে প্রায় দশ মাইল দূরে পাকিস্তানি ঘাটি আছে এবং সেদিক থেকেই শত্রুর আসার সম্ভাবনা বেশী। ফলে আমার দল পূর্ব দিকে অবস্থান নিবে। সেলিমের দল দক্ষিণ দিকে থাকবে। কেউ দ্বিমত না করাতে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হলো।

আমরা সবাই বন্ধু, দলনেতা হিসেবে যে কোন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত সবার সাথে পরামর্শ করে করলে পরে ঝামেলা হয় না। আমরা কেউ সেনাবাহিনীর সদস্য না, ফলে সেনাবাহিনীতে যেভাবে সিদ্ধান্ত নেয় সেভাবে সিদ্ধান্ত নিলে দলের অনেকেই মানবে না। কেননা আমরা সবাই একে অপরের বন্ধু, সবাই একই রকম গুরুত্বপূর্ণ।

কোনো কোনো সময়, বিশেষ করে কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজের সময়, সময় কেন যেন খুব দ্রুত শেষ হয়ে যায়; ঘড়িতে দেখি প্রায় সাড়ে-বারোটা বাজে, খাবার সময়।

আমরা সবাই উঠে ছড়াতে গিয়ে হাত মুখ ধুয়ে খাবার লাইনে যোগ দিলাম। খাওয়া শেষ করতে করতে দেড়টা বেজে গেল। আমি সবাইকে বললাম সম্ভব হলে একটু ঘুমিয়ে নিতে। আমিও শুয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু ঘুমা তো আসতেই চায় না, এক অজানা উত্তেজনায় শরীরের সব কিছু যেন কেমন টানটান হয়ে আছে।

কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম জানি না। আমাকে কে যেন ধাক্কা দিয়ে ঘুম ভাঙল, ঘড়িতে তখন সাড়ে-পাঁচটা। একটু পরেই খাবার দেয়া হবে, তাই তাড়াতাড়ি হাত মুখ ধুয়ে কাপড় পড়ে প্রস্তুত হলাম। প্রায় সাথে সাথেই খাওয়া দেয়া হলো। আজকে আমারা যারা অভিযানে যাব তাদের স্ট্যান্ড-টু/স্ট্যান্ড-ডাউন করতে হবে না। সাতটা বাজার ১৫-মিনিট আগেই আমরা সবাই যাত্রার জন্য অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে প্রস্তুত। তখনই সবাইকে মাঠে জড় হবার ডাক এলো। আমরা সবাই তাঁবুর সামনের ফাঁকা জায়গায় তিন লাইন করে দাঁড়ালাম।

ক্যাপ্টেন রানা এসে সবার উদ্দেশ্যে একটা ছোটখাটো বক্তৃতা দিলেন, “আমরা ঠিক সাতটার সময় রওয়ানা দিব। যাবার আগে কিছু কথা বলতে চাই। এই অভিযানের সাফল্য নির্ভর করছে সবার নিজ নিজ দায়িত্ব সঠিক ও নির্ভুল ভাবে পালন করার মাধ্যমে। সবাই যেন দলের অন্য সদস্যদের প্রতি খেয়াল রাখে। আমরা অনেকেই এর আগে একসাথে অনেক অপারেশন করেছি তাই আমি জানি আপনারা সবাই নিজ নিজ দায়িত্ব সঠিক পালন করবেন।

আমাদের সাথে আজকে যারা প্রথমবার অভিযানে যাচ্ছে, তাদেরকে বলতে চাই জীবন মৃত্যু আল্লাহর হাতে, ইনশাআল্লাহ, আমরা সফল হয়ে ফিরে আসব। মনে রাখবেন আমাদের আজকের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হচ্ছে অতর্কিত গোপন হামলা, কাজেই আক্রমণের আগ পর্যন্ত কোন ভাবেই শত্রুকে আমাদের উপস্থিতি বুঝতে দেয়া যাবে না, শত্রু যদি বুঝে ফেলে তাহলে আমাদের আক্রমণ শুধু ব্যর্থই হবে না, আমাদের অনেকে হতাহত হতে পারে। কাজেই গোপনীয়তা রক্ষা করা ভীষণ জরুরী।

আমাদের যাবার সময় হয়ে আসছে।

খোদা হাফেজ, জয় বাংলা, জয় বাংলা।

তার সাথে সাথে আমরা সবাই জয় বাংলা, জয় বাংলা স্লোগানে চারিদিক কাঁপিয়ে তুললাম।

ঘড়িতে সাতটা বাজার সাথে সাথে ক্যাপ্টেন রানার নির্দেশে আমরা যাত্রা শুরু করলাম। আজকে ৬:২৬ মিনিটে সূর্যাস্ত হলেও এখনও কিছু আলো রয়ে গেছে।

আমাদের ক্যাম্প থেকে সীমান্তের দূরত্ব প্রায় এক মাইল। সীমান্ত অতিক্রম করার পর কিছুদূর গেলেই চা-বাগান, সীমান্ত ঘেঁষে সব চা-বাগান এখন জনশূন্য, পাকিস্তানিদের ভয়ে প্রায় সবাই এখন ভারতে শরণার্থী।

দেখলাম আমাদের সাথে দুইজন গাইড় আছে। একজন সামনে ক্যাপ্টেন রানার সাথে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, আরেকজন সবার শেষে। তাছাড়াও আমাদের দুজন হাফ-ডাক্তারও (paramedic) আমাদের দলে আছে। ফলে আমাদের লোক সংখ্যা ৩০-জনের বদলে ৩৪-জন। আমাদের ১৪-জনের অবস্থান দলের মাঝখানে। আমরা সুশৃঙ্খল ভাবে এগিয়ে যাচ্ছি।

এখন সূর্য ডুবে গেছে, চারিদিকে অন্ধকারের কালো চাদরে ঢাকা। গত ২৪-তারিখে অমাবস্যা ছিল, অমাবস্যার পাঁচ দিন পরও তার রেশ রয়ে গেছে। কিছুক্ষণ পরে আমারা চা-বাগানে ঢুকলাম। চা-বাগানে ঢুকেই এক অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর দৃশ্যে মন জুড়িয়ে গেল। হাজার হাজার জোনাকি পোকা সারা বাগানে তাদের বিস্ময়কর আলোকসজ্জায় সম্পূর্ণ বাগানকে সাজিয়ে রেখেছে। এত সুন্দর দৃশ্য আমি কখনো দেখিনি। আমরা সবাই কিছুক্ষণ এই অভাবনীয় সৌন্দর্য মন্তে মুগ্ধের মতো উপভোগ করলাম।

ভাগ্য ভাল যে চা-বাগানে রাস্তা আছে কাজেই অন্ধকারেও যেতে অসুবিধা হচ্ছে না। কিন্তু চা-বাগান শেষ হলেই জঙ্গলের শুরু, সেখানে কোন রাস্তা নেই, জঙ্গল ভেঙ্গেই যেতে হবে। আমাদের সামনের কয়েকজনের কাছে কিছু লম্বা দাঁও দেখেছিলাম জঙ্গল কাটে রাস্তা করার জন্য। এটা অবশ্য ভালই কেননা দলের পেছনের লোকেরা এই তৈরি করা রাস্তা দিয়ে পথ না হারিয়ে সহজেই যেতে পারবে।

কিছুক্ষণ পরে চা-বাগান শেষ হলে আমরা জঙ্গলে ঢুকলাম। এখন চারিদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার, ভাল করে সামনের লোককেও দেখা যায় না। কিন্তু একটু পরে দেখলাম চোখ কেমন যেন অন্ধকারের সাথে মানিয়ে নিলো। এখন সামনের লোককে আবছা আবছা দেখতে পাচ্ছি।

এই অন্ধকার রাতে জঙ্গলে হাটতে গিয়ে আমি সহ অনেকেরই শরীরের অনেক যায়গার কেটে গেল, কিন্তু তখন কিছু বুঝতে পারিনি।

এভাবে অনেকক্ষণ, ঠিক বলতে পারব না কতক্ষণ, তবে বেশ কয়েক ঘণ্টা হাটার পরে একটু পরিষ্কার মতো জায়গায় পৌঁছলাম, জঙ্গলের পাশে এক চিলতে জায়গা। জঙ্গলে দীর্ঘক্ষণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ সহ হাটার ফলে আমরা খুবই ক্লান্ত। আমরা সবাই ধপাস করে মাটিতে বসে পড়লাম। সবাই হাঁপাচ্ছি, শুধু কবীর ছাড়া। এই কবীরকে মনে পড়ে না কখনো ক্লান্ত হতে দেখেছি।

ক্যাপ্টেন রানা জানালেন এই যায়গাই যেখান থেকে আমরা লক্ষ্যবস্তুর আশেপাশে পূর্বনির্ধারিত জায়গায় অবস্থান নিব এবং অপারেশন শেষে সবাই এই জায়গায় জড় হয়ে একসাথে ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে যাত্রা করব।

এখান থেকে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দূরত্ব প্রায় আধা-মাইল। লক্ষ্য করলাম পশ্চিম দিকের আকাশ কেমন যেন উজ্জ্বল হয়ে আছে, বুঝতে অসুবিধা হলো না সেটাই বিদ্যুৎ কেন্দ্র, আমাদের আজকের লক্ষ্যবস্তু।

ক্যাপ্টেন বললেন কেউ যদি সিগারেট, পানি ইত্যাদি খেতেে চায় তাহলে এখনই সময়। এখান থেকে যাত্রা করার পর আর ধূমপান করা যাবে না। আমরা সবাই আমাদের চারমিনার ধরালাম। দেশলাইয়ের আলোতে দেখলাম ঘড়িতে এখন রাত দুটো।

প্রায় দশ মিনিট বিশ্রামের পর এবার যাবার পালা। এখান থেকে সবাই আলাদা হয়ে লক্ষ্যবস্তুর দিকে যাবে। প্রথমে ক্যাপ্টেন তার দলবল নিয়ে চলে গেলেন। এর পর আমরা ১৪-জন একসাথে রওয়ানা দিলাম, যদিও কিছুক্ষণ পরে আমাদেরকে দুই ভাগ হয়ে অবস্থান নিতে হবে।

আমরা যতই আগাচ্ছি, আলো ততই বাড়ছে। কিছুক্ষণ পরে আমরা এমন জায়গায় পৌঁছলাম যেখান থেকে দূরে বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্পষ্ট দেখা যায়। পরিকল্পনা মতো যে যার অবস্থানে যাব। যাবার আগে আমি সবাইকে স্মরণ করিয়ে দিলাম যে ক্যাপ্টেনের রকেট ছোড়ার আগে কেউ যেন গুলি না করে ও ট্রেঞ্চ খুড়ার সময় যেন শব্দ না করে। এখন থেকে আর সিগারেট খাওয়া যাবে না।

আমি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বাম দিকে, অর্থাৎ উত্তর দিকে আর সেলিম তার দলবল নিয়ে দক্ষিণ দিকের উদ্দেশ্যে অগ্রসর হলাম।

কিছুক্ষণ হাটার পর আমরা আমাদের যেখানে অবস্থান নেবার কথা, বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উত্তর দিকে প্রায় ৩০০-গজ দূরে রাস্তার পাশে ঝোপ-ঝাড়ের পেছনে সুবিধামতো একটি জায়গা ট্রেঞ্চ খোঁড়ার উপযুক্ত বলে মনে হলো। ট্রেঞ্চ কতটুকু লম্বা ও গভীরতা কত হবে আগেই ঠিক করে রেখেছিলাম। যেহেতু আমাদের ট্রেঞ্চ খুবই স্বল্প সময় ব্যবহার হবে, ফলে একটি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ট্রেঞ্চের যে মাত্রা (dimsnsion) হয় সেরকম হবার প্রয়োজন নেই। আজকের ট্রেঞ্চ দৈর্ঘ্যে ৯-ফুট, প্রস্তে ৩-ফুট, ও গভীরতায় ৪-ফুট হলেই যথেষ্ট।

এখানে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য বেশ ভালই আলো আছে। আমরা অবশ্য শঙ্কিত নই যে বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে কেউ আমাদের দেখে ফলার ভয় ছিল না কেননা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে আলো এত তীব্র যে সেখান থেকে এই অপেক্ষাকৃত অন্ধকার জায়গার কিছু দেখা যাবে না।

আমার পালাক্রমে দুইজন দুইদিক থেকে পরিখা খুড়তে শুরু করলাম। বৃষ্টিতে ভেজা মাটি বেশ নরম, ফলে খুড়তে অসুবিধা হলো না। একটি মাত্র অসুবিধা ছিল, অভ্যস্ত না হবার ফলে পরিখা খোঁড়া শেষ হলে কয়েকজনের হাতে ফোস্কা দেখা গেল। পরিখা খুড়তে দুই ঘণ্টা লাগল।

সাধারণত পরিখার গভীরতা ৫ থেকে ৫.৫ ফুটের মতো হয় যেন পরিখায় দাঁড়িয়ে গোলাগুলি করা যায়। আমাদের পরিখার গভীরতা যেহেতু চার ফুট, পরিখা থেকে গুলি করতে হলে আধা দাঁড়ান, আধা বসা অবস্থায়, অথবা হাটু গেড়ে গুলি করতে হবে। আমরা যেহেতু পরিখা স্বল্প সময়ের জন্য ব্যবহার করব তাই অসুবিধা হবে না।

আমার ইচ্ছা ছিল একবার সেলিমের অবস্থান দেখে আসি, কিন্তু এখন আক্রমণের পূর্ব মুহূর্তে বেশী নড়াচড়া করে শত্রুর দৃষ্টি আকর্ষণ করা ঠিক হবে না। আমি সবাইকে অস্ত্রশস্ত্র ঠিক আছে কী না পরীক্ষা করে দেখতে বললাম। এখন আমাদের দল প্রস্তুত।

পরিখার সবচেয়ে ডানে আমি, আমার পরে কবীর, তার লাইট-মেশিনগান পরিখার উপরে বাইপড়ে (bipod) দাঁড়ানো, গুলি ছোড়ার জন্য প্রস্তুত। কবীরের পাশে তার সহকারী ইদ্রিস, ইদ্রিসের পরে যথাক্রমে রফিক, টুটুল, মাহতাব, ও সবুজ। লাইট-মেশিনগান ছাড়া আমাদের সবার কাছেই স্টারলিং সাব-মেশিনগান , শুধু মাহতাবের কাছে SLR রাইফেল। আজকে যেহেতু খুব কাছাকাছি থেকে যুদ্ধ করতে হবে তাই আমাদের সাব-মেশিনগান ভাল কাজে দিবে। রাইফেলের তুলনায় সাব-মেশিনগানের রেঞ্জ (range) অনেক কম। ৯mm সাব-মেশিনগান সর্বোচ্চ ২৫০ গজের ভিতরে সবচেয়ে ভাল কাজ করে। রাইফেলে সহজেই ৫০০ গজ দূরের নিশানাকে গুলি করা যায়।)

আমরা এখন আক্রমণ শুরুর অপেক্ষা করছি যদিও আক্রমণে আমাদের সক্রিয় কোনো অবদান থাকার কথা না যদি না কোনো যানবাহন পূর্ব বা পশ্চিম দিক থেকে আসে তাহলে আমাদের কিছু অবদান থাকতে পারে। তা না হলে আমরা শুধু নীরব দর্শক হয়েই থাকব। আমরা সবাই চাচ্ছিলাম আক্রমণে যেন আমাদেরকে সম্পৃক্ত করা হয়, কিন্তু ক্যাপ্টেন রানা আমরা নতুন যোদ্ধা হওয়াতে আমাদের নিরাপত্তার জন্যই হয়ত মোটামুটি নিরাপদ রাখতে চেয়েছেন।

এখন প্রায় সাড়ে-চারটা বাজে। আজকে সূর্যোদয় ৫:২৬ মিনিটে, ভোর হতে এখনও প্রায় এক ঘন্টা বাকী। আমাদের সবাই এখন প্রস্তুত হয়ে উদগ্রীবে আক্রমণের অপেক্ষা করছে।

ঠিক এই সময় আমাদের ডান দিক থেকে একটি গাড়ির হেড-লাইট দেখতে পেলাম। একটু পরে বুঝলাম একটা জিপ। আমি এখন দোটানায়, ক্যাপ্টেন রকেট ছোড়ার আগেই কি আমরা গুলি শুরু করব? এরকম ঘটনার কথা আগে মাথায় আসেনি। আবার গুলি না করলে জিপটা হয়ত অতর্কিতে ক্যাপ্টেনের দলের সামনে পড়ে যাবে এবং ক্যাপ্টেন তাঁর দল সহ সমূহ বিপদের সম্মুখীন হবেন। আবার অপর দিকে আমারা আগে গুলি ছুড়লে ক্যাপ্টেনের অতর্কিত হামলা আর হবে না। ভীষণ কঠিন সিদ্ধান্তকী করি?

জিপটা ক্রমেই এগিয়ে আসছে, ক্ষণেই আমাদের সামনে চলে আসবে। আমি তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত নিলাম, গুলি ছুড়ব, কোনো ভাবেই এই জিপকে আমাদের প্রতিবন্ধকতা পার হতে দিব না। আমি ফিস ফিস করে সবাইকে আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হতে বললাম।

জিপ ঠিক আমাদের সামনে-আমাদের থেকে জিপের দূরত্ব মাত্র ২০-গজ হবে-আসার সাথে সাথেই আমরা সবাই একযোগে জিপকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে শুরু করলাম। কাঁকতলিয় ভাবে প্রায় একই সাথে রকেট বিস্ফোরণের আওয়াজ পেলাম। কবীর উত্তেজনায় পরিখা থেকে লাফ দিয়ে উঠে জিপের দিকে গুলি ছুড়তে ছুড়তে দৌড়ে গেল। তার দেখাদেখি আমরা সবাই পরিখা থেকে উঠে গুলি করতে পরতে জিপের দিকে ধেয়ে গেলাম।

জিপে ছয় জন আরোহী ছিল, সামনে ড্রাইভারের পাশে একজন, পেছনে চার জন। আমাদের এত কাছ থেকে অতর্কিত আক্রমণে জিপের কেউ গুলি করার সুযোগ পেল না। জিপের ছয় জনের মধ্যে পাঁচ জন গুলিতে একেবারে ঝাঁজরা হয়ে গেছে। কিন্তু পেছনের একজন লাফ দিকে জিপ থেকে নেমে দৌড়ে পালিয়ে গেছে। তাকে এই অন্ধকারে খুঁজে তাকে পাবার সম্ভবনা ক্ষিণ বলে আমরা খুজিনি।

জিপটা রাস্তার পাশে একটা ছোট নালার মতো ছিল, খুব সম্ভবত বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের জন্য, সেখান কাত হয়ে পড়ে আছে।

জিপে অস্ত্রর মধ্যে তিনটে AK-47 রাইফেল, তিনটি SKS রাইফেল। আমি প্রথমেই একটি AK-47 দখল করলাম। সামনে বসা লোকটা মনে হয় কোন অফিসার হবে কেননা তার কোমরে চামড়ার হোলস্টারে একটি চাইনিজ পিস্তল। আমি তার গুলির ভেস্ট (vest) ও হোলস্টার সহ পিস্তলটা দখল করলাম। তারপরে তার পকেটে একটা মানিব্যাগ পেয়ে আমার পকেটে ঢোকালাম। অন্যরাও যে যা পরল অস্ত্র ও গোলাবারুদ দখল করল। জিপটা রাস্তায় পাশে রেখেই আমরা আবার আমাদের পূর্বের অবস্থানে ফিরে গেলাম। ইতোমধ্যে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জ্বালানিতে আগুন লেগে চারিদিক দিনের মতো আলো হয়ে আছে, সর্বত্র প্রচণ্ড গোলাগুলি হচ্ছে, কিছু এলোপাথাড়ি গুলি আমাদের মাথার উপর দিয়ে শোঁ শোঁ করে যাচ্ছে।

ক্যাপ্টেন রানা তার দলের সবাইকে যথাস্থানে বসিয়ে আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হলেন। তার দলে নিজে সহ মোট তের জন। আছে দুটি চাইনিজ-লাইট-মেশিনগান, একটি রকেট লাঞ্চার, একটি ২-ইঞ্চি মর্টার, ও বিস্ফোরক।

ঝোপের আড়াল থেকে ক্যাপ্টেন রকেট ছোড়ার জন্য প্রস্তুত হলেন, বাঙ্কারে নিশানা ঠিক করলেন, ট্রিগারে আঙ্গুল, ট্রিগারে চাপ দিতে যাচ্ছেন ঠিক সেই সময়ে ডান দিক থেকে প্রচণ্ড গোলাগুলি আওয়াজ এলো, একই সাথে ক্যাপ্টেনের আঙ্গুলও ট্রিগারে চেপে বসল। এন্টি-ট্যাংক রকেট বাঙ্কারে লেগে প্রচণ্ড শব্দে বিস্ফোরিত হলো। প্রায় সাথে সাথে সবাই গুলি করতে শুরু করল।

ক্যাপ্টেন রকেট-লঞ্চার সুলেমানকে ফেরত দিয়ে নিজের AK-47 দিয়ে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বাহিরের সব লাইট লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে শুরু করলেন।

এখন চারিদিকে ভয়ানক গোলাগুলির আওয়াজ। বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রায় সব আলো নেভানো। দুটি পর্যবেক্ষণ-মাচাই ধ্বংসপ্রাপ্ত। দ্বিতীয় বাঙ্কার পুরপুরি ধ্বংস না হলেও ভিতর থেকে কেউ গোলাগুলি করছে না। গোলাগুলি শুরুর প্রথম মিনিটেই এই সব ঘটনা ঘটল।

ক্যাপ্টেন রানা মাসুম, কামরুল, গফুরকে নিয়ে দেয়ালের ভিতরে ঢুকার জন্য প্রস্তুত হলেন। হাবিলদার শহীদকে বললেন বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভিতরে এলোপাথাড়ি ২-ইঞ্চি মর্টার দিয়ে গোলা নিক্ষেপ করতে যাতে পাকিস্তানিরা মনে করে আমরা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভিতর ঢুকব।

মাসুম ও মাসুমের সহকারী মালেক অভিজ্ঞ হাতে সহজেই আগে থেকে প্রস্তুত করা বিস্ফোরক দেয়ালে লাগিয়ে ফিউজে আগুন ধরিয়ে দিল, প্রায় ১০ সেকেন্ড পরে প্রচণ্ড বিস্ফোরণের সাথে দেয়ালের একটি অংশ ভেঙ্গে পড়ল। সাথে সাথে ক্যাপ্টেন রানা তার দলবল সহ ভিতরে ঢুকলেন। ইতোমধ্যে রকেট-লঞ্চার আবার লেন্স-নায়েক সুলেমানের থেকে নিজের হাতে নিয়েছেন। ভিতরে ঢুকে সুলেমান একটা রকেট লাগিয়ে দিলে ক্যাপ্টেন সবচেয়ে দূরের বড় জ্বালানী ট্যাংক লক্ষ্য করে ট্রিগারে চাপ দিলেন। রকেট ট্যাংকে লাগার সাথে সাথে বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হয়ে আগুন লাগলে তাড়াতাড়ি সবাই দেয়ালের ফুটা দিয়ে বের হয়ে এলো।

আগুন ক্রমেই বাড়ছে, চারিদিকে আগুনের লাল আলো কেমন যেন এই ভৌতিক পরিবেশের জন্ম দিয়েছে।

সুবেদার মতিন তার দলের উপরে অর্পিত দায়িত্ব সঠিক ভাবে পালন করেছেন। যদিও বাঙ্কার পুরপুরি ধ্বংস হয়নি, তাহলেও বাঙ্কারের ভিতর থেকে কেউ গোলাগুলি করেনি।

নায়েব-সুবেদার হান্নান হচ্ছেন সুবেদারদের মধ্যে সবচেয়ে চটপটে। তার কাজ ছিল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পেছনে যে পর্যবেক্ষণ মাচা সেটাকে ধ্বংস করা। তার পাশেই আবার রাজাকারদের ক্যাম্প। তারও বিশেষ কোনো অসুবিধা হয়নি। আমাদের এই আচমকা আক্রমণ পুরপুরি সফল হলো।

বেচারা সেলিম ও তার দল কোন একশন করার সু্যোগ পেল না।

আমাদের পরিকল্পনা ছিল অপারেশন পাঁচ মিনিটে শেষ করা, কিন্তু দেখলাম দুই মিনিট বেশী সময় লেগেছে।

কোনো ঝামেলা ছাড়াই সবাই আমাদের পূর্ব নির্ধারিত জায়গায় পৌঁছলাম। তার পরে আগের মতো আমাদের ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম, শুধু একটি ব্যতিক্রম ছাড়া। এবার আমরা সবার পেছনে। সেলিম আমাদের ১৪-জনের দলের সবার সামনে আর আমি সবার পেছনে।

প্রায় দুই ঘণ্টা পরের কথা, আমারা তখন জঙ্গলের ভিতর দিয়ে যাচ্ছি। সবুজ ঠিক আমার সামনে হাঁটছে। আমার কেন যেন মনে হলো কেউ আমাদের পিছু পিছু আসছে। আমি সবুজকে আমার সন্দেহর কথা জানালাম। সবুজ বলল, “আপনারা আগে বাড়েন, আমি একটু এখানে কোথাও জঙ্গলে লুকিয়ে দেখি।আমি বললাম, “আমিও তাহলে তোমার সাথে থাকি।কিন্তু সবুজ রাজি হলো না, “না, আপনার থাকার দরকার নেই, বেশী লোক থাকলে ধরা পড়ার সম্ভাবনা বেশী, আপনি আগে বাড়েন, কিছু সন্দেহজনক দেখলে আমি দৌড়ে এসে আপনাকে জানাব।আমি আর কিছু না বলে আবার হাটতে শুরু করলাম। সবুজ জঙ্গলে হারিয়ে গেল।

প্রায় ১৫-মিনিট পরে, সবুজকে হন্তদন্ত হয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে ফিরে আসতে দেখে থামলাম। সবুজ কাছে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে জানাল যে আমার সন্দেহ ঠিক। খুব সম্ভবত কিছু রাজাকার আমাদের পিছু নিয়েছে। আমি দৌড়ে লাইনের মাঝামাঝি ক্যাপ্টেন রানাকে জানালাম। আমি বললাম, আপনারা যান, আমি আমার দল নিয়ে এই ব্যাটাদের জন্য একটা এম্বুশ পাতছি। ক্যাপ্টেন রানা সবাই মিলে এম্বুশ পাততে চাইলেন। আমি উত্তর বললাম যে সবাই থাকলে শত্রুর আমাদেরকে দেখে ফেলা সম্ভব, কাজেই শুধু আমরা থাকলে অনেক সুবিধা হবে। আমার বাঁধা পেয়ে ক্যাপ্টেন মেনে নিলেন, তারা আবার হাটতে শুরু করলেন।

আমি সবাইকে রাস্তার বাম পাশে ঘুপটি দিয়ে বসতে বললাম। এইবার সবচেয়ে সামনে সেলিমকে রাখলাম। বেচারার আজকে কোনো একশন করার সুযোগ হয়নি এবং আমি সেলিমকে যতটুকে চিনি ব্যাপারটা সে একদম ভাল ভাবে নিবে না। কাজেই এইবার তাকে একটা ভাল সুযোগ দেয়া উচিৎ।

বেশীক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না। প্রায় ১৪-১৫ জন রাজাকারের একটি দলকে খুবই সমর্পণে আসতে দেখলাম। এই কয়েকজন রাজাকার আমাদের ৫০-জনের দলকে কী করবে বুঝতে পারলাম না। এদের বেশীরভাগের হতে ৩০৩ রাইফেল, কয়েকজনের কাছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্টেনগান (Stengun)মনে মনে ঠিক করলাম এদের সবাইকে মারব না, কিছু ধরব, ধরলে অনেক খবর পাওয়া যাবে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই রাজাকারের দল আমাদের সামনে এলো। আমরা তাদেরকে ঠিক আমাদের সামনে আসতে দিলাম তারপর সবাই গুলি শুরু করলাম। বেচারাদের নিজেদের বাঁচানোর কোনো সুযোগই ছিল না। যেগুলো পালাতে চেষ্টা করল তারা সবাই মারা গেল অথবা গুরুত্বর আহত হলো। কিছু অস্ত্র ফেলে দুই হাতে মাথা ঢেকে মাটিতে শুয়ে রইল। কিছু গুরুত্বর আহত ছিল, তাদেরকে আমাদের কিছু করার ছিল না।

চার রাজাকারকে আমরা দৌড়ে পাকড়াও করলাম। এখন ব্যাটাদের বাঁধা উচিৎ, কিন্তু বাঁধার জন্য দড়ি দরকার, এখানে দড়ি কোথায় পাব? সবুজ, জঙ্গলের ভিতর থেকে কিছু শক্ত লতা নিয়ে হাজির, আমরা সেই লতা দিয়ে তাদের হাত বাঁধার পর একজনের সাথে আরেকজনকে শিকলের মতো বাঁধলাম। তারপরে তাদেরকে আমাদের দলের মাঝখানে রেখে আবার যাত্রা শুরু করলাম। ঠিক মতো চলার জন্য রাইফেলের বাট দিয়ে কয়েকজনকে গুতা দিতে হলো।

এদের সাথে যে ৩০৩ রাইফেল ও অন্যান্য অস্ত্রগুলোর দখল করার উৎসাহ ছিল না তাছাড়া এগুলো বহন করবে কে? এই মান্ধাতা আমলের অস্ত্রগুলো ভেঙ্গে জঙ্গলে ফেলে দিলাম, শুধু একটি ব্যতিক্রম ছাড়া। একজনের কাছে এ ক্যানভাসের খাপ সহ একটি স্মিথ এন্ড ওয়েসন .৩৮ রিভলভার পেলাম। একমাত্র সেটাই আমাদের সাথে নিলাম।

কিছুদূর যাবার পর দেখি ক্যাপ্টেন রানা উদ্বিগ্ন হয়ে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন। আমি কাছে যেয়ে ঘটনা জানালাম ও বন্দিদের দেখালাম। ক্যাপ্টেন সাহেব খুশী হয়ে আমার পিঠ চাপড়ে দিলেন। আমরা আবার চলতে শুরু করলাম।

বেশ কিছুক্ষণ হাঁটার পরে আমরা চা-বাগানে প্রবেশ করলাম। হাঁটতে হাঁটতে আমি বিভিন্ন চিন্তা করছিলাম। হঠাৎ থমকে দাঁড়ালাম, আরে একি করছি আমরা? আমরা কি এই রাজাকারগুলোকে আমাদের ক্যাম্পে নিয়ে যাব? তারপর রাখব কোথায়? এরা তো সবাই আমাদের ক্যাম্প চিনে ফেলবে, আমাদের কতজন লোক আছে, কয়টা তাঁবু আছে, কী কী অস্ত্র আছে সবই জানবে? এদেরকে জিজ্ঞাসাবাদের পর সবাইকে বা কাউকে কি ছেড়ে দিব? ছেড়ে দিলে সে যদি আবার পাকিস্তানিদের কাছে ফিরে যেয়ে আমাদের সব খবর পাকিস্তানিদের দেয় তখন? এদের চোখ বেঁধে নিয়ে গেলেও কোন লাভ হবে না, যখন টয়লেটে যাবে তখন কী করব? না কোনো ভাবেরই এদেরকে আমাদের ঘাটিতে নেয়া যাবে না। নিজেকে নিজের গালি দিতে ইচ্ছা করল।

আমি দৌড়ে আবার ক্যাপ্টেন রানাকে ধরলাম। আমি তাকে সমস্যা বললে তিনি কিছুক্ষণ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। বুঝলাম তিনি আমার কথা চিন্তা করছেন, তিনি নিজেও হয়ত ব্যাপারটা ভাবেননি।

একটু চুপ থেকে আমাকে জিজ্ঞাস করলেন, “তাহলে কী করা যায়?” আমি আগেই ঠিক করে রেখেছিলাম। উত্তরে বললাম, “এদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে এখানেই করতে হবে। তাছাড়া তারা আমাদেরকে অনুসরণ করছিল, এমন না যে আমরা তাদেরকে অন্য কোথাও থেকে ধরেছি। সুযোগ পেলে এরা আমাদেরকে হত্যা করতে দ্বিধা করত না। কাজেই এদের কাউকেই আমি নিরপরাধ মনে করি না। জিজ্ঞাসাবাদের পর যাদেরকে সন্দেহ হবে তাদেরকে এখানেই মেরে ফেলতে হবে। যদি কাউকে কোনো কারণে নিরপরাধ মনে হয় তাহলে কিছু উত্তমমধ্যম দিয়ে ছেড়ে দেয়া যেতে পারে। আমার কথা শুনে তিনি আমার দিকে কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। বেশ কিছুক্ষণ চিন্তার পর বললেন, “তুমি ঠিকই বলেছ।

সুবেদার পাশা কাছেই ছিলেন, তাকে তিনি ডাকলেন। সুবেদার পাশা কাছে এলে বললেন, “আপনি ওদের (আমাকে নির্দেশ করে) দল ছাড়া বাকী সবাইকে নিয়ে ক্যাম্পে ফিরে যান। রাজাকারদের ক্যাম্পে নেবার দরকার নেই।

ক্যাপ্টেনের নির্দেশে সুবেদার পাশা তাঁর লোকজন নিয়ে চলে গেলেন। আমরা ১৫-জন চার জন রাজাকার সহ চা-বাগানে রয়ে গেলাম।

আমি দলের কয়েকজনকে আমাদেরকে ঘিরে পজিশন নিতে বললাম যেন কেউ হঠাৎ হামলা করতে না পারে।

আমি সেলিমকে আমাদের সাথে যোগ দিতে বললাম। সেলিমকে সমস্যার কথা জানালাম। সেলিম আমার সাথে একমত হলো।

আমি সবুজকে একজন রাজাকারকে আমাদের সামনে নিয়ে আসতে বললাম। সবুজ ও টনি হাত বাঁধা অবস্থায় এক রাজাকারকে আমাদের সামনে নিয়ে এলো।

লোকটার বয়স ৩৫-৩৭ হবে, প্রথমেই চোখে পড়ে তার ছোট ছোট লাল লাল চোখ যেটা কখনই স্থির থাকে না, সব সময় চারিদিক ঘুরছে, লক্ষ্য করছে। তাকে দেখে ভয় পেয়েছে বলে আমার মনে হলো না। উচ্চতা ৫ ফুট ২ ইঞ্চির মতো, সরু ঠোট, নাকটা মনে হয় ভাঙ্গা, একদিকে একটু হেলান। খাকী রঙের নোংরা পোশাক, পায়ে গেরুয়া রঙের ক্যানভাসের ফিতা আলা জুতা। কোমরে একটা মোটা বেল্ট, বেল্টের সাথে কাপড়ের তৈরি গুলি রাখার বেল্ট, এখন বেল্টে গুলি নেই কারণ আমরা সব গুলি নিয়ে নিয়েছি। লোকটাকে কেমন ক্রুর ও হিংস্র মনে হয়। মনে পড়ল এর কাছেই রিভলভার ছিল।

আমি ক্যাপ্টেনের দিকে চাইলাম। তিনি আমার দিকে মাথা নেড়ে বললেন, “শুরু কর।

আমি খুব নরম গলায় বললাম, “তোমার নাম কী?” লোকটা কোনো উত্তর দিল না। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, “তোমার নাম কী?” কোন জবাব নেই। সেলিম এতক্ষণ পাঁশ থেকে দেখছিল। সে হঠাৎ "শালা বাহেনচোদ" হুঙ্কার দিয়ে রাজাকারের মুখে এক লাথি মারলে রাজাকার মাটিতে ছিটকে পড়ল। মুখ দিয়ে রক্ত পড়ছে। শালা মুখ দিয়ে কথা না বাহির হলে মুখ সিলাই করে দিব, শালা কুত্তার বাচ্চা। সেলিম অকথ্য ভাষায় কিছুক্ষণ গালাগালি করল

সেলিমের লাথি খেয়ে এতক্ষণ পরে রাজাকার মুখ খুলবে বলে মনে হলো। সে মাটিতে পড়া অবস্থায় আমদের দিকে থুথু ছিটিয়ে চিৎকার করে বাংলা-উর্দু মিশ্রিত ভাষায় চিৎকার করে বলল, “শূয়রের বাচ্চারা, মার মার শালার বাচ্চারা মার আমাকে, আমার বউ, বাচ্চা, আম্মা, আব্বা, সবাইকেই তো তোরা মারছিস, আমাকেও মেরে ফেল। আমি বেঁচে থাকলে তোদের সবাইকে এক এক করে জবাই করব।তার এই আকস্মিক আক্রমণাত্মক উগ্রতায় আমরা সবাই হকচকিয়ে গেলাম। একজন বন্দির কাছ থেকে এরকম প্রতিক্রিয়া আশা করিনি। কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাঁর দিকে চেয়ে রইলাম। রাজাকার আমাদের দিকে কটমট করে প্রচণ্ড ঘৃণার দৃষ্টিতে অগ্নিবর্ষণ সহকারে চিৎকার করে অকথ্য গালি দিতে থাকল।

সেলিম তাকে আরও কিছুক্ষণ লাথি, ঘুষি মারল, কিন্তু যত মার খায় ততই আমাদের অকথ্য গালাগালি করে। সে তার নামটা পর্যন্ত আমাদের বলল না।

১৯৭১ সাল কারো জন্য ভাল ছিল নাবাঙ্গালী, বিহারি, হিন্দু, মুসলমান, কারো জন্য না। সবার মাঝেই প্রিয়জনকে হারানোর বেদনা। আমরা কী হয়েছে বুঝতে পারলাম। তাছাড়া এই লোকের কাছ থেকে যে কিছু বের করা যাবে না সেটাও বুঝতে অসুবিধা হলো না।

সবুজকে ডেকে এই রাজাকারকে আবার আলাদা করে বেঁধে রাখতে বলে আরেকজনকে আনতে বললাম। সবুজ ও টনি রাজাকারকে ধরাধরি করে ছেঁচড়াতে ছ্যাঁচড়াতে নিয়ে গেল।

একটু পরেই দ্বিতীয় রাজাকারকে নিয়ে ফিরে এলো। এই লোক দেখতে সাধারণ বাংলাদেশের লোকের মতো। উচ্চতা ৫ ফুট ১ ইঞ্চি, খাকী পোশাক, পায়ে আগের জনের মতো জুতা। তার চোখের ভাষা থেকে বুঝা যাচ্ছে সে প্রচণ্ড ভয়ে আছে। ভয়ার্ত দৃষ্টিতে আমাদেরকে দেখছে।

সে আসার সাথে সাথেই সেলিম এক লাথিতে তাকে মাটিতে ফেলে দিল। আমি সেলিমের দিকে মাথা নাড়ালাম।

এই শূয়রের বাচ্চা তোর নাম কী?” সেলিম গর্জে উঠল। মাটিতে পড়া রাজাকার ভয়ে কুণ্ডুলী পাকাতে শুরু করল। সে মনে হয় আরেকটা লাথি খাবার আশা করছে। এই ব্যাটা নাম বলসেলিম আরেকটা লাথি মারতে উদ্যত হলে রাজাকার কাঁপা কাঁপা গলায় উত্তর দিল, “স্যার, আমার নাম মজিদ। হুজুর আমাকে মাইরেন না। মোবারক আমাগো হগলরে জোর কইরা ধইরা আনছে। না আইলে হে আমাগো হগলরে মাইরা ফালাইত। হুজুর আমাকে মাফ করি দেন।

মোবারক কার নাম, আমরা একটু আগে যাকে এখানে এনেছিলাম?” আমি একটু শান্ত কণ্ঠে প্রশ্ন করলাম। জী, হুজুর, সে বিহারি, সে হগল বাঙ্গালীরে মাইরা ফেলাইতে চায়। আমাগো কয়েকজনরেও সে মাইরা ফেলাইছে। পাকিস্তানিদের লগে তার খুব খাতির। আমাগো কয়েকজনরে মাইরা ফেলার পরেও হেরা তারে কিছু কয়নাই।লোকটা এই কথা বলেই সেলিমের পা ধরে হাউমাউ জরে কাঁদতে শুরু করল।

সেলিম তাকে অশ্বত্থ করে বলল, “আচ্ছা, তোকে আর মারব না। আমি কিছু প্রশ্ন করব ঠিক উত্তর দিবি। আমরা অনেক কিছুই জানি, বুঝতে পারছোছ তো? এখন বল বিদ্যুৎ কেন্দ্রে মোট কতজন পাকিস্তানি সেনা ছিল? তোরা রাজাকার কতজন ছিলি?”

হুজুর, পাকিস্তানিরা হেয়ানে থাকত না। দশ জন করি পাহারা দিতে আইত। ডিউটি শেষ হইলে চইলা যাইত। এই ভাবে প্রত্যেক দিনে তিনবার আইত জাইত।

এখনে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নিরপত্যার দায়িত্বে কে ছিল?”

হুজুর এক সুবেদার। সে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অফিসাররা যেহানে থাকে সেই কটারে (কোয়াটারে) থাকত।

আজকে আমাদের আক্রমণে কতজন পাকিস্তানি সৈন্য মারা গেছে?

হুজুর, হেইডা তো জানি না। আমরা বাইরে আমাগো তাঁবুতে ঘুমচ্ছিলাম, গুলির শব্দ হুনার লগে লগে আমরা সবাই পালাই-ছিলাম। ঐ হ্যালা মোবারক আমাগো টোকাই জোর করি ধরি আনছে।

একটু থেমে আবার শুরু করল, “বিদ্যুৎ কেন্দ্রের আক্রমণে আমরা যারা বাইরে ছিলাম তারা কেউ মরে নাই। কিন্তু জঙ্গলের ভিতরে অনেকেই মারা গেছে আর অল্প কয়েকজন পালাইছে।

জঙ্গলে তোরা কতজন ছিলি

১৬-১৭ জন। বাকী-জনরে মোবারক খুঁজি পায় নাই।

সেলিম এবার একবার ক্যাপ্টেন রানার দিকে তারপর আমার দিকে তাকাল।

এবার আমি প্রশ্ন করলাম, “তোমাকে আমরা যদি ছেড়ে দেই তাহলে তুমি কী করবা?”

হুজুর, কী করতাম কেমনে বলুম। ফিরলে তো পাকিস্তানিরা মাইরাও ফেলতে পারে। মোবারক হেগো খুব পেয়ারা লোক ছিল। আমি আর রাজাকারি করতাম না। দেশে চলি যাব।

আমার পরের প্রশ্ন, “তোমার দেশ কোথায়, দেশে কে কে আছে?”

হুজুর, দেশে বাবা, মা, পরিবার, এক ছেলে আর দুই মেয়ে আছে। আমার বাড়ি সরাইল।

আমি সবুজকে একপাশে সরিয়ে নিচু গলায় এই লোককে আলাদা করে রাখতে বললাম কেননা আমি চাচ্ছিলাম না তারা একে অপরের সাথে কথা বলুক। পরের জন কে নিয়ে আসতে বললাম।

একটু পরে সবুজ তৃতীয় রাজাকারকে নিয়ে এলো।

তোর নামে কী, দেশ কোথায়?” সেলিম খেঁকিয়ে উঠল।

ছার, আমার নাম আশরাফ আলী, দেশ ছার হালুয়াঘাট।

হারামজাদা তোর বাড়ি হালুয়াঘাট হলে এখানে কী করিস?”

ছার, এখানে কাজ করতে আইছিলাম। রাজাকারের কাজ ছাড়া অন্য কাজ পাই নাই। আমাদের তো ছার কোনো জমি-জমা নাই, দেশে টাকা না পাঠাইলে বউ বাচ্চায় খাইব কী?”

কয়জন বাঙ্গালী মারছোস?”

ছার, আল্লার কসম, একজনকেও মারি নাই। আমাদের দলের একমাত্র মোবারক ছার বাঙ্গালী পাইলেই মাইরা ফেলত। আমারা রাজাকারদের কয়েকজন হের কথা না শুনায় তাদেরও সে মাইরা ফেলছে।

তোদের দলের মজিদকে যে আমরা ধরছি সে কী রকম লোক?”

ছার, মজিদ ভাল লোক? হে বাঙ্গালীর ক্ষতি করে না।

হুম, তোমরা শালা সব ধোয়া তুলশী পাতা, ভাজা মাছটাও উল্টায় খেতে পার না,” সেলিম গালি দিয়ে গজ গজ করতে থাকল।

তোমার আর মজিদের মধ্যে মাত্র একজনকে ছাড়ব আরেক জনকে মেরে ফেলব। কাকে ছাড়ব, তোমাকে না মজিদকে?”

এইবার রাজাকার সেলিমের পা ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। ছার, আমারে মাইরা ফেললে আমার ছেলে, মেয়ে, পরিবারের কী হইব? হেরাও তো ছার মারা যাবে। ছার আমরা গরীব মানুষ, চাইরটা টাকার জন্য রাজাকারি করি। ছার, কান ধরতেছি, আর রাজাকারি করবাম না। ছারগো আমারে মাইরা ফেলেইয়েন না। ছার, আপনে যা বলবেন তাই করব কিন্তু ছার মাইরা ফেলাইয়েন না। ছার, ছারগো।সে এমন করে সেলিমের পা ধরে আছে যে সেলিম চেষ্টা করেও তার পা ছাড়াতে পারছে না।

এই হারামজাদা পা ছাড়, পা ছাড়, নাইলে এখানেই তোকে গুলি করব,” সেলিম তার স্টারলিং দিয়ে মাথায় গুঁতা দিল। লোকটা ভয়ে সেলিমের পা ছেড়ে দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে সেলিমের দিকে হাত জোড় করে মাটিতে পা ছড়িয়ে বসে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকল।

আমাদের সমস্যা হচ্ছে আমরা আগে এই ধরণের পরিবেশের সম্মুক্ষিণ হইনি। মানুষকে কী ভাবে সঠিক জিজ্ঞাসাবাদ করতে হয় সেটাও জানা নেই। এ ব্যাপারে আমরা একেবারেই অনভিজ্ঞ। ক্যাপ্টেন রানাকেও এ ব্যাপারে অভ্যাস আছে বলে মনে হলো না। তারা কী সত্যি বলছে না মিথ্যা বলছে আগা মাথা কিছুই বুঝছি না। যদিও মনে হচ্ছে, পরের দুইজন মোটামুটি সত্যি কথাই বলছে। তারা যে একবারে ফুলের মতো পবিত্র তা হয়ত না। কিন্তু তাদেরকে কিছু না জেনে মেরে ফেলা অন্যায় হবে।

সবুজকে আগের মতো একে ফেরিয়ে শেষ রাজাকারকে নিয়ে আসতে বললাম।

চতুর্থ রাজাকার আসতেই সেলিম তাকে মাটিতে বসতে বলল। আগের তিনজনের মতো একেও জিজ্ঞাসাবাদ করে তেমন কোনো তথ্য বের করা গেল না। এরা আসলে কিছুই জানে না। মোবারক হয়ত অনেক কিছুই জানে, কিন্তু তার বাঙ্গালীদের প্রতি ঘৃণা এতই প্রবল, মনে হয় না তাকে টলান যাবে।

সবুজ নিয়ে চতুর্থ রাজাকারকে নিয়ে গেল। আমরা তিনজন কিছুক্ষণ আলোচনার পর সিদ্ধান্ত নিলাম। তিনজনকে ছেড়ে দিব। কিন্তু মোবারককে জীবিত রাখা যাবে না। জীবিত থাকলে সে অনেক নিরীহ বাঙ্গালীকে হত্যা করবে।

আমার মোবারকের জন্য দুঃখ হচ্ছিল। পিতা, মাতা, মা, বোন, ছেলে, মেয়ে, স্ত্রী হারিয়ে সে প্রায় উন্মাদ কুকুরের মতো। পাগলা কুকুরকে যেমন জীবিত রাখা যায় না, মোবারককেও সে কারণেই মরতে হবে। কে মোবারককে মারবে?

সেলিম এগিয়ে এলো, সেই মারবে।

সবুজ আর টনি মোবারককে ধরে নিয়ে এলো। সেলিম মোবারককে জঙ্গলের ভিতরে নিয়ে যেতে বলল। মোবারক ততক্ষণে বুঝতে পেরেছে আজকেই তার শেষ দিন। সে ক্রমাগত আমাদেরকে অকথ্য গালিগালাজ করতে থাকল। সবুজ ও টনি তাকে টেনে হিঁচড়ে জঙ্গলের ভিতরে নিয়ে চলল, পেছনে স্টারলিং হাতে সেলিম।

কিছুক্ষণ পর তারা জঙ্গলে হারিয়ে গেল। জঙ্গল থেকে একটু পরে স্টারলিং-এর একটা ছোট বার্স্ট শুনতে পেলাম। সেলিম, সবুজ, ও টনি জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এলো। সবার মুখ গম্ভীর।

আমি এগিয়ে গিয়ে সেলিমের কাঁধে হাত রাখলাম। কী বা বলল?

বাকী তিনজনকে ছেড়ে দিব, কিন্তু ছাড়ার আগে একটু পেটান দরকার। আমি সবুজকে ডেকে সবাইকে বলতে বললাম গাছে ডাল ভেঙ্গে এই তিনজনকে পেটাতেখুব বেশী না, আজকের দিলের কথা যেন মনে থাকে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই পেটানোর কাজ শেষ হলে তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হলো।

এখানে আমাদের অনেক সময় নষ্ট হয়ে গেল।

আমরা যখন ক্যাম্পে ফিরলাম তখন সময় তিনটে। পৌঁছেই সবাই ছড়াতে গোছল করতে গেলাম আর তখনই আবিষ্কার করলাম প্রত্যেকের শরীরের বিভিন্ন কাটাছেড়ার চিহ্ন। গোছলের পর খাবার জন্য প্রস্তুত হলাম। আজকের খাবার বেশ ভাল। বুটের ডাল দিয়ে খাসির মাংস, সাদা আটার রুটি, সবজি ভাজি। সবার প্রচণ্ড খিদে ছিল; সবাই পেট ভরে খেয়ে আবার তাঁবুতে ফিরে এলাম। গতরাতে আমরা কেউ ঘুমাই নাই তাই সময়ক্ষেপণ না করে সবাই শুয়ে পড়লাম এবং কিছুক্ষণের মাঝেই ঘুমিয়ে পড়লাম।

ঠিক সাতটায় ঘুম ভাঙল, দেখলাম আমাদের জন্য খাবার আলাদা করে রাখা হয়েছে। ইতোমধ্যে গতরাতের সব অভিযাত্রী ঘুম থেকে উঠেছে। হাত মুখ ধুয়ে আমরা খাবার জন্য লাইনে দাঁড়ালাম। রাতের খাবারও বেশ ভাল, আলু দিয়ে মুরগীর মাংস, সবজি ভাজি, ও ভাত। এই প্রথম ভাত পেলাম। গোগ্রাসে আমাদের খাওয়া শেষ করলাম।

খাওয়া শেষে আমি সিগারেট টানতে টানতে ক্যাপ্টেন রানার তাঁবুর দিকে রওয়ান দিলাম। পৌঁছে দেখি ক্যাপ্টেন সাহেব সুবেদার-মেজর বশীরের সাথে কথা বলছেন।

তাকে সলাম দেবার পর প্রথমেই বললাম যে আজকের খাওয়া খুবই চমৎকার ছিল। জবাবে ক্যাপ্টেন সুবেদার-মেজরকে দেখিয়ে বললেন যে আজকের খাবারের সম্পূর্ণ কৃতিত্ব তাঁর। আমি সুবেদার-মেজরকে ধন্যবাদ দিলাম। একটু পরে বশীর সাহেব চলে গেলান।

আমি সাথে করে আমদের দখল করা পিস্তলটা নিয়ে এসেছিলাম। ক্যাপ্টেন কে বললাম, “রানা ভাই আমরা গতরাতে এই পিস্তলটা দখল করেছি। জিপে ছয়জন ছিল তাঁর মধ্যে পাঁচজন নিহত হয়েছে আর একজন অন্ধকারে পালিয়েছে। সামনের সিটে এক লোক বসে ছিল, মনে হয় অফিসার হবে, তাঁর কাছে এই পিস্তল ছিল। তাছাড়া তাঁর পেন্টের পকেটে এই মানি-ব্যাগটা ছিল; আমি মানি ব্যাগটা বের করে ক্যাপ্টেনকে দিলাম।

তিনি খুব মনোযোগের সাথে ব্যাগটা নিলেন। কালো চামড়ার ব্যাগ। ব্যাগের ভিতরে তিন চারশো পাকিস্তানি টাকা, একটা পরিচয় পত্র, ও একজন মজিলা/মেয়ের ছবি। পরিচয় পত্রে নাম লেফটেন্যান্ট মুরাদ খান, ফ্রন্টিয়ার ফোর্স রেজিমেন্ট। ছবিটা হয়ত স্ত্রী বা প্রেমিকারজানা নেই। ক্যাপ্টেন ব্যাগটা রেখে দিলেন।

কিন্তু পিস্তলটা আমাকে ফেরত দিয়ে বললেন, “আমি পিস্তল ব্যবহার করি না, তাছাড়া

তোমরা যুদ্ধে এটা দখল করেছ, এটা তোমরা রাখ,” বলে তিনি পিস্তলটা আমাকে ফিরিয়ে দিলেন। আমি তাকে আমাদের দখল করা অন্য অস্ত্রের কথা জানালাম। তিনি দখল করা অস্ত্রের একটা তালিকা দিতে বললেন সেক্টর হেডকোয়াটেরে পাঠানোর জন্য। আরও কিছুক্ষণ কথা বলার পর আমি আমাদের তাঁবুতে ফিরে এলাম।

এখন বেশ রাত হয়েছে, সাড়ে-আটটার মতো। তাঁবুতে ফিরে নিজেদের মধ্যে কিছু কথা বলে শুয়ে পড়লাম। শুধু সেলিমকে কেমন যেন গম্ভীর ও মনমরা মনে হলো। এর আগে আমরা কয়েকজন ডাকাতকে গুলি করে মেরেছিলাম। কিন্তু তখন আমাদের চারিদিকে এই ডাকাতদের হতে বীভৎসভাবে নিহত অনেক শরণার্থীর মৃতদেহ ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। কাজেই তখন ডাকাতদেরকে গুলি করে প্রাণদণ্ড কার্যকর করা মানসিকভাবে সহজ ছিল।

গতকালের ও আজকে সকালের ঘটনাগুলো সিনেমার মতো চোখে ভেসে আসতে থাকল। এই সিনেমা দেখতে দেখতে কিছুক্ষণেই ঘুমের কোলে আত্মসমর্পণ করলাম।


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পরিবর্তন ও প্যারাড়াইম

আজিমপুরের দুর্দান্ত যোদ্ধারা, পঞ্চম পর্ব

আজিমপুরের দুর্দান্ত যোদ্ধারা, চতুর্থ পর্ব