আমি ও আমি

 

আমি ও আমি

আপনার কি কখনো মনে হয়েছে আমাদের দুটি আমিরয়েছে? একটি বাহিরের আমি’, যেই আমিটা সবাই দেখতে পারে, যেটা দেখে মানুষ একজনের সম্পর্কে ধারণা করে, যেটা আমার শিক্ষা, পরিবেশ, সমাজ, বিচার, বুদ্ধি, ইত্যাদি দ্বারা গঠিত। যেই আমিসবাইকে দেখাই, অনেক সময় অন্যদের দেখিয়ে আত্মপ্রসাদ লাভ করি, সেই আমি।

এই বাইরের আমিছাড়া আমার ভিতরে আরেকটি আমিআছে। সেই আমিযুক্তি মানে না, যেই আমিকখনো ভীষণ নরম ও মোলায়েম; যেই আমিসিনেমার করুণ দৃশ্য দেখলে চোখের পানি ধরে রাখতে পারে না এটা জানার পরও যে এটা অভিনয়। যেই আমিআবার কখনো কখনো ভীষণ নিষ্ঠুর, আবার কখনো ভয়ানক কদর্য, ঈর্ষান্বিত, কুসংস্কারে জর্জরিত, লালসা-পূর্ণ, ভীতু, লোভী, ও রক্ষণশীল।

এই ভিতরের আমিকে বাইরের কেউ চেনে না, কারণ বাইরের কাউকে আমরা সাধারণত এই ভিতরের আমিকে দেখাই না। আমরা নিজেও যে খুব চিনি তাও না। একবার মনে হয় বুঝি আবার কখনো কখনো মনে হয় একেবারেই অচেনা। এই ভিতরের আমিকে আমরা বাইরের আমিদিয়ে ঢেকে রাখার চেষ্টা করি, কাউকে দেখাতে চাই না। ভিতরের আমিকে বাহিরের আমিদিয়ে যে শুধু ঢেকেই রাখি তাই না, সময় সময় যুক্তি দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করারও চেষ্টা করি। অবশ্য কখনো কখনো ভিতরের আমিক্ষণিকের জন্য হলেও অন্যদের কাছে অসাবধানতা-বসত অথবা দুর্বল মুহূর্তে ধরা দেয়। যারা খুব কাছে থেকে দীর্ঘদিন ধরে লক্ষ্য করে তারা বুঝতে পারে।

কিছু কিছু দুর্যোগপূর্ণ সময়ে, যখন সামাজিক নিয়ম-কানুন, শিষ্টাচার, এ অনুশাসন ভেঙ্গে পড়ে, যেমন যুদ্ধ-বিগ্রহ, দাঙ্গা, ভয়ানক প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারি, অতিমারি, ইত্যাদি, তখন অনেক মানুষের ভিতরের আমিবাহিরের আমিকে ভেদ করে পরিস্ফুট হয়ে ওঠে। অনেক সাধারণ মানুষ তখন অমানুষ হয়ে ওঠে এবং খুন, ধর্ষণ, লুটপাট, ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া, মানুষকে অযথা অত্যাচার করা ইত্যাদি ঘটতে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করে না।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অত্যাচারের কথাই ধরা যাক। যারা অত্যাচার করেছে তাদের মা, ভাই, বোন, এরা ছিল না? নিশ্চয়ই ছিল কিন্তু তা স্বত্বেও নিরীহ আবালবৃদ্ধবনিতা কেউ তাদের অত্যাচার থেকে রেহাই দেয়নি। কারণ তাদেরকে বুঝানো হয়েছিল স্বাধীনতাকামীরা ইসলামের শত্রু, দেশের শত্রু, ভারতীয় অনুপ্রবেশকারী কাজেই এদেরকে নির্মূল করা সব মুসলমানের দায়িত্ব এবং এই দায়িত্ব পালনে খুন, ধর্ষণ, গণহত্যা, অত্যাচার সবই জায়েজ। তার মানে হচ্ছে যদি পরিস্থিতি তৈরি করা যায়, তাহলে সাধারণ মানুষের আদিম প্রবৃত্তিকে জাগ্রত করে লেলিয়ে দেয়া খুব সহজে সম্ভব।

প্রায় একই ধরণের ঘটনা পৃথিবীর প্রায় সর্বত্র দেখা যায়: উদাহরণস্বরূপ ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, লাওস, চীন (জাপানীদের দ্বারা), বসনিয়া, আরমেনিয়া, কসোভো, ইরাক, ইরান, লেবানন, প্যালেস্টাইন, আফ্রিকা ও ল্যাটিন অ্যামেরিকার বিভিন্ন দেশ, ও আমেরিকা (রেড ইন্ডিয়ানদের ধ্বংস করা), ইত্যাদি জায়গায় হয়েছে।

 এখন প্রশ্ন হলো ভিতরের আমিও বাহিরের আমিকখন গঠিত হয়?

লক্ষণীয় যে সব মানব শিশুর জন্ম অন্য স্তন্যপায়ী জীবের তুলনায় আগেহয়। অর্থাৎ একজন পরিপূর্ণ মানব হিসাবে কাজ করতে হলে শিশুর পরিচর্যা করতে হয়, বেঁচে থাকা ও সমাজে টিকে থাকার জন্য অনেক কিছু শিখাতে হয়। অন্য স্তন্যপায়ীদের বেলা, যেমন গোরুর বাচ্চা জন্মের কিছুক্ষণের মধ্যেই দৌড়াতে শুরু করে কিন্তু মানুষের বাচ্চা সেটা করতে পারে না।

সদ্যপ্রসূত শিশুদের জন্মের সময় তাদের মস্তিষ্কে একজন প্রাপ্তবয়স্কের তুলনায় দুইগুণ বেশী নিউরন থাকে যদিও বড় হবার সাথে সাথে বিভিন্ন কারণে অনেক নিউরন ঝড়ে পড়ে। শিশুর জন্মের তিন বছর শেষে শিশুর মস্তিষ্কের আয়তন বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়। কাজেই জন্মের প্রথম তিন বছর শিশুর বিশেষ যত্ন নেয়া দরকার। একজন শিশুর ৬০% শক্তি (যেটা খাদ্য, বিশেষ করে মায়ের দুধ থেকে আসে) মস্তিষ্কের দ্রুত উন্নয়নে ব্যবহার হয়। পক্ষান্তরে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মাত্র ২৫% শক্তি মস্তিষ্ক ব্যবহার করে।

জন্মের পর শুধু প্রবৃত্তি বা instinct ছাড়া মানব শিশুদের মস্তিষ্কে আর কিছু থাকে না। বেড়ে উঠার সাথে সাথে মা, বাবা, ভাই, বোন, এবং অন্য আত্মীয়-স্বজন, পাড়াপড়শি, ইত্যাদির কাছ থেকে শিশু শিক্ষা লাভ করে এবং আমিক্রমে ক্রমে গড়তে থাকে। কাজেই আমিশুধু জিন বা DNA দ্বারা গঠিত হয় না, শিশুর বেড়ে উঠার পরিবেশের উপর বহুলাংশে নির্ভরশীল। তার পরেও, যখন একই পরিবারের পিঠাপিঠি দুই ভাই একই পরিবেশে বেড়ে ওঠার পরেও একজন খুবই সাহসী ও অন্যজন কম সাহসী হয় তখন তো মনে হয় জিন বা DNA-র প্রভাবে এই তারতম্য হয়ে থাকে। কাজেই ধারণ করা সঙ্গত হবে যে জিন ও পরিবেশে উভয়ের প্রভাবেই প্রথম আমিগঠিত হয়।

তাছাড়া, শিশুর মন অনেকটা নরম কাদার মতো। সেই সময় শিশুকে যে শিক্ষা দেয়া হয়, অথবা পৃথিবী সম্পর্কে যে ধারণা দেয়া হয়, শিশুর মস্তিষ্কে সেটা প্রায় স্থায়ী ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় এবং প্রথম আমির উপরে এর প্রচণ্ড প্রভাব থাকে।

এবার দ্বিতীয় আমির কথায় আসা যাক। একজন শিশু যখন ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠে, পৃথিবী সম্পর্কে নিজস্ব ধারণা জন্মাতে থাকে, তার শিক্ষার পরিবেশ, সমাজব্যবস্থা ও সমাজ সম্পর্কে তার যে নিজস্ব ধারণা গড়ে ওঠে, সমাজের চোখে ভাল-মন্দের পার্থক্য, দৃষ্টিভঙ্গি, শাস্তি, ও পুরষ্কার, ইত্যাদির সমন্বয়ে দ্বিতীয় আমিগড়ে ওঠে। অবশ্য এই উপাদানগুলোর কিছুটা প্রথম আমিতেও সন্নিবেশিত হয়।

এখানে আরেকটা বিষয় লক্ষণীয় যে একেকজন মানুষ একেক পরিবেশ ও স্রোতা/দর্শকের ভিত্তিতে কোন আমিদেখায় তা বহুলাংশে নির্ভর করে। অন্যভাবে বলতে গেলে মানুষের রঙ্গমঞ্চ পরিবর্তনের সাথে সাথে, একই লোক বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করে।  যেমন সমমনা বন্ধুদের সাথে যে আমিদেখায়, গুরুজনদের সামনে সেটা দেখায় না। তখন তারা কৃত্রিম আচরণ করে, অথবা করতে শেখে বা করতে বাধ্য হয়, অথবা সমাজ এই কৃত্রিম আচরণ করতে অনুপ্রাণিত করে। যেমন আমাদের সমাজের এরকম একটি উদাহরণ হচ্ছে গুরুজনদের সামনে অতীব সুবোধ অভিনয় করা, যেন একজন ধরা মাছ উল্টে খেতে জানে না। গুরুজনরা যে এক অভিনয় বুঝেন না তা কিন্তু নয়। তার পরেও এই অভিনয় করতেই সমাজ শেখায়। এ অভিনয় থেকেই ক্রমে বাহ্যিক এক কৃত্রিম আবরণে দ্বিতীয় আমিতৈরি হয়। সমাজই শিক্ষা দেয় এই কৃত্রিম আমিসৃষ্টিতে, সমাজই এই কৃত্রিম আচরণ শেখায়।

আমাদের দেশের আদিবাসীরা প্রকৃতি ও পরিবেশের সাথে মানানসই জীবন যাপনের ফলে তাদের জীবন অনেক স্বচ্ছ ও সরল। তাদের ভিতরের ও বাহিরের আমির মধ্যে পার্থক্য থাকলেও সামান্য থাকে। জীবনের জন্য যত বেশী সংগ্রাম, দুই আমির জটিলতা ততই বেশী। অবশ্য এখন অনেকে বলেন যে বাঙ্গালীদের আগ্রাসনে যতই দিন যাচ্ছে, এই পাহাড়িরাও বেঁচে থাকার সংগ্রামে ক্রমশই তাদের সেই স্বাভাবিক সরলতা হারিয়ে ফেলছে।

আমাদের গ্রামের লোকেরা বেশিরভাগ অশিক্ষিত হবার ফলে তাদের প্রথম ও দ্বিতীয় আমির মধ্যে পার্থক্য কম। ভদ্রলোকেরাএদেরকে সেজন্য অসভ্য বলে। একজন লোক ভদ্র, নম্র, মিষ্টভাষী, ধন্যবাদ দিতে জানে, সামাজিক নিয়ম-কানুন সম্পর্কে সজাগ, চেনা কারো সাথে দেখা হলে শুভেচ্ছা বিনিময় করে, ইত্যাদি বাহ্যিক গুনে সমৃদ্ধ হলে তাকে ভদ্রলোকবলে। কাজেই ভদ্র সমাজ অভদ্রদেরকে স্বাগত জানায় না, বরং এড়িয়ে চলে। এখনকার সমাজে একমাত্র অর্থ ও ক্ষমতা অথবা উভয়ের সংমিশ্রণ এই ভদ্র/অভদ্র প্রতিবন্ধকতা ভাঙতে পারে।

আমার অবশ্য একটা সন্দেহ আছে। আমাদেরকে কি শুধু দুটো আমি’, না আরও বেশী আমিআছে? এটা নিয়ে আমার দ্বিধাদ্বন্দ্ব আছে। কখনো কখনো মনে হয় আছে, আবার কখনো মনে হয় নেই। একটা উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা পরিষ্কার হবে। ১৯৭১-সালে আমাদের কোম্পানিতে মৃদুভাষী, লাজুক, ও চুপচাপ স্বভাবের মুজিব নামে EPR-এর নায়েক ছিল। প্রথম দেখায় তার সম্বন্ধে আমার এই ধারণা জন্মেছিল। কিন্তু একদিন যুদ্ধের সময় যখন তাকে দেখলাম তখন সে একজন সম্পূর্ণ ভিন্ন মানুষ। ভদ্র, নম্র, লাজুক, ও চুপচাপের বদলে প্রচণ্ড উদ্দীপ্ত, ভয়ানক মারমুখী, সিংহের মতো ক্ষিপ্ত। এখন প্রশ্ন হচ্ছে তার যে এই যে নতুন রূপ দেখলাম সেটা কী প্রথম আমিনা দ্বিতীয় আমি’, না তার আরেকটি আমিছিল যেটা শুধু বিশেষ কিছু সময়েই প্রকাশিত হতো? এরকম আরও আমিকি আছে? এরকম কি আরও আমিআছে যেটা শুধু বিশেষ কিছু মুহূর্তে সক্রিয় হয়?

এখন আরেকটা প্রশ্ন এসে যায়, বিবেক কী? বিবেক কি শুধুই একজন মানুষের নৈতিকতার প্রতিফলন। এই নৈতিকতার জন্ম কেমন করে হয়? বিবেক বলতে সাধারণত, অন্যায়, অবিচার ও জুলুমের প্রতিবাদ করা, কারো উপরে জুলুম বা অন্যায় না করা, অভাবগ্রস্ত বা বিপদগ্রস্ত লোককে সাহায্য করা, ইত্যাদি গুনকে নির্দেশ করে। প্রশ্ন, এই বিবেক কোথায় থাকে? আমার ধারণা বিবেক প্রথম ও দ্বিতীয় আমি উভয়েই ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে। কিন্তু আমাদের মনে রাখা উচিৎ যে আমাদের মস্তিষ্ক প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে ফলে আমাদের চিন্তাধারারও বিবর্তন হচ্ছে। আগে অনেক কাজকে নৈতিক মনে হলেও নতুন জ্ঞান আহরণের ফলে এখন আর নৈতিক মনে হয় না। আবার এর উল্টোটাও হতে পারে। আমার ধারণা বিবেক হচ্ছে প্রথম আমিও দ্বিতীয় আমির মধ্যে বিভেদের ফসল। একটি আমির কাজকে যখন আরেকটি আমিবর্জন করতে বলে, সেটাই বিবেক।

আমার আরও মনে হয় বিবেকের আস্তর খুবই হালকা এবং খুব সহজেই বিভিন্ন কারণে ভেঙ্গে পড়ে অথবা এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করা যায় যখন বিবেক নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে।

হিটলারের কথাই ধরা যাক: হিটলারের জার্মানি যখন ইহুদীদের নিধন করছিল তখন বেশীরভাগ জার্মান নাগরিক হিটলারের কাজকে সমর্থন করেছিল। তখন তাদের বিবেক কোথায় ছিল? পূর্ব পাকিস্তানে যখন পাকিস্তানী সেনাবাহিনী হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে, তখন পশ্চিম পাকিস্তানিদের বিবেক কোথায় ছিল? এরকম হাজার হাজার উদাহরণ পৃথিবীর সর্বত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। কাজেই দেখা যায় মানুষ বিভিন্ন অজুহাতে বিবেকের বাধানিষেধকে নির্দ্বিধায় অতিক্রম করতে দ্বিধা করে না। 

 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পরিবর্তন ও প্যারাড়াইম

আজিমপুরের দুর্দান্ত যোদ্ধারা, পঞ্চম পর্ব

আজিমপুরের দুর্দান্ত যোদ্ধারা, চতুর্থ পর্ব