বাংলা ব্যাকরণ নিয়ে ভাবনা
বাংলা ব্যাকরণ নিয়ে ভাবনা
সৌভাগ্যক্রমে আমি বাংলা ভাষা বিশারদ নই। অন্যভাবে বলতে গেলে
বলতে হয় আমি বাংলা ভাষার প্যারাড়াইমের কেন্দ্রের লোক নই। আমার অবস্থান
প্যারাড়াইমের পরিধিতে। কাজেই আমার দৃষ্টিতে বাংলা ব্যাকরণের অসঙ্গতি সহজেই ধরা পড়ে
যেটা প্যারাড়াইমের কেন্দ্রে অবস্থিত কারো চোখে না পড়াই স্বাভাবিক।।
আজকের এই লেখার একটি প্রেক্ষাপট আছে। হঠাৎ লক্ষ্য করলাম
কেমন করে যেন সবসময়ের লেখা ‘ঈদ’-কে বলা হলো এখন থেকে ‘ইদ’
লিখতে হবে। আবার যেই গরুর রচনা লিখতে লিখতে হাত ব্যথা হয়ে
গেল তাকে নাকি এখন থেকে ‘গোরু’
লিখতে হবে। সেই অন্বেষণ থেকেই আজকের লেখার উৎপত্তি।
ব্যাকরণ যে কোন ভাষার মেরুদণ্ড। এর মাধ্যমে ভাষা শুদ্বরূপে
বলতে, পড়তে এবং লিখতে পারা যায়। ব্যাকরণের সংজ্ঞা হিসেবে এর থেকে বেশী বলতে চাইনা।
ধ্বনি, বর্ণ, বাক্য,
সন্ধি, সমাস, প্রত্যয়,
বিশেষণ, সর্বনাম, ক্রিয়ার কাল,
ক্রিয়াপদ, পদ, বিভক্তি,
কারক, অনুসর্গ, ও বাংলা বানানের নিয়ম। মোটামুটি এই হচ্ছে বাংলা ব্যাকরণের উপাদান। এই সমস্ত
নিয়ম-কানুনের মাধ্যমেই বাংলা ব্যাকরণের কাঠামো তৈরি হয়।
আমার মূল বক্তব্যে যাবার আগে আরেকটি বিষয় পরিষ্কার করতে
চাই। ইংরেজিতে একটি শব্দ হচ্ছে occult ( occult থেকে occultism)। বাংলায় এর প্রতিশব্দ হচ্ছে গুপ্তবিদ্যা। কিন্তু আমি এই occultism বা গুপ্তবিদ্যাকে অন্য একটি context বা প্রসঙ্গে ব্যবহার
করব। সেই প্রসঙ্গটি বিদ্যা অর্জনের ক্ষেত্রে গুপ্তবিদ্যা। সবখানেই জ্ঞানকে কিছু
লোকের মধ্যে কুক্ষিগত করে রাখার একটা প্রবণতা লক্ষণীয়। যেমন ধর্মের কথাই ধরা যাক।
যারা ধর্মের পুরোহিত তারা প্রায় সব ধর্মেই এমন ভাষায় তাদের প্রার্থনা করে যেটা
সাধারণের কাছে দুর্বোধ্য। হিন্দু পুরোহিতরা সংস্কৃত ভাষায় তাদের প্রার্থনা
পরিচালনা বা কাজ সম্পন্ন করেন। মুসলমান পুরোহিতরা আরবি ভাষা ব্যবহার করেন যেটা
আরবি ভাষী ছাড়া অন্যদের বোধগম্য না। একই ভাবে খ্রিষ্টান পুরোহিতরা ল্যাটিন ভাষায়
(যে ভাষা সাধারণ লোকজন জানে না) তাদের কার্য সম্পাদন করেন। শুধু ধর্ম কেন? ধরা যাক আপনি ডাক্তারি পড়তে গেলেন; সেখানে আপনাকে
মানুষের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের এমন সব বিদঘুটে নাম শিখতে হবে যার অনেকটাই
ল্যাটিন ভাষা থেকে আগত। এই ধরনের প্রবণতা জ্ঞান চর্চার প্রায় সব ক্ষেত্রেই দেখা
যায়। বাংলা ভাষাতেও এই প্রবণতা লক্ষণীয়।
আরেকটি বিষয় পরিষ্কার করতে চাই। সেটি হচ্ছে আমার লেখা পড়ার
পর “অমুকে করেছে বলে আমাকেও করতে হবে” অথবা “এটাই আমরা করে এসেছি কাজেই এভাবেই করতে হবে”, অথবা “এগুলো বাংলা ভাষার অলঙ্কার”, “এটাই আমাদের ঐতিহ্য’ ইত্যাদি,
ধরনের অদ্ভুত অকার্যকর যুক্তির অবতারণা না করা।
শেষে আমাদের বর্তমান ব্যাকরণের মূল প্রণেতা যারা বেশিরভাগ
হিন্দু ব্রাহ্মণ এবং এর ফলে বাংলা ব্যাকরণে সংস্কৃত ব্যাকরণের প্রবল প্রভাবের দিকে
সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেতে চাই। এখানে স্মরণ রাখা দরকার যে হিন্দু ধর্ম এইটি
বর্ণপ্রথা জর্জরিত ধর্ম এবং এই বর্ণপ্রথার প্রভাব বাংলা ব্যাকরণের মধ্যেও
প্রকটভাবে লক্ষণীয়।
বর্তমানে সারা বিশ্বে ২৬-কোটির অধিক লোক দৈনন্দিন জীবনে
বাংলা ভাষায় কথা বলে। এর মধ্যে ১৮-কোটি, অর্থাৎ ৬৯ শতাংশ
বাংলাদেশের বাঙ্গালী। তাছাড়া একমাত্র বাংলাদেশের বাঙ্গালীরা ভাষার জন্য রক্ত
দিয়েছে,
একমাত্র বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। কাজেই এই ভাষার
পরিবর্তন,
পরিবর্ধন, প্রবৃদ্ধি, প্রচার,
ও আধুনিকীকরণ বাংলাদেশের বাঙালীদেরকেই প্রধান ভূমিকা নিতে
হবে।
এখন মূল বিষয়ে আসা
যাক।
বর্তমানের বাংলা ভাষায় অনেক অন্য ভাষা থকে শব্দ দ্বারা
সমৃদ্ধ হয়েছে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংস্কৃত, আরবি, ফার্সি,
তুর্কি, জাপানি, ওলন্দাজ,
পর্তুগিজ, ও ফরাসি। এটি একটি চলমান
প্রক্রিয়া এবং ভাষার বিকাশের সহায়ক।
প্রথমে বর্ণ নিয়ে কথা বলতে চাই। বর্তমানের বাংলা বর্ণ মোট
৫০-টি; ১১-টি স্বরবর্ণ ও ৩৯-টি ব্যঞ্জনবর্ণ।
স্বরবর্ণ
অ আ ই ঈ উ ঊ ঋ এ ঐ ও ঔ (মোট এগারোটি)
(আমরা ছোটবেলা যখন বর্ণমালা শিখেছি তখন ‘ঋ’ বর্ণের পরে বাংলা নয় সংখ্যার মতো দেখতে ‘৯’ (উচ্চারণ লী)-নামে আরেকটি বর্ণ ছিল। জানিনা কবে বাংলা বর্ণমালা থেকে একে বাদ
দেয়া হয়েছে।)
১) অ এবং আ নিয়ে আমার কিছু বলার নেই।
২) ই এবং ঈ: উচ্চারণের দিক থেকে এই দুই বর্ণের কোন পার্থক্য
নেই। যদিও ঈ-র হওয়ার কথা ই-এর দীর্ঘ ধ্বনি, কিন্তু বাস্তবে
বাংলা উচ্চারণে এর কোন প্রভাব নেই অথবা পার্থক্য এত সূক্ষ্ম যে এই ‘ঈ’ বাদ দিলে কোন অসুবিধা হবে বলে মনে হয় না।
এখানে উল্লেখ্য যে বর্তমান বাংলা ব্যাকরণ অনুযায়ী সকল ‘ঈ’ সম্বলিত শব্দ তৎসম (অর্থাৎ সংস্কৃত থেকে আগত শব্দ)। তাছাড়া, সংস্কৃত থেকে আগত শব্দ ছাড়া অন্য কোন ভাষা থেকে আগত, এমনকি বাংলা ভাষার নিজস্ব শব্দেও ‘ঈ’ ব্যবহার করা যাবে না। এই ধরনের উদ্ভট ও বর্ণবাদী নিয়ম আমরা কেন মানবো?
‘ঈ’ যদি বাদ দেয়া হয় তাহলে সব শব্দের বানানে ই-কার (ি) হবে এবং এখনকার কোথায় ই-কার
(ি) আর কোথায় ঈ-কারের (ী) প্রহেলিকা থাকে বাংলা ভাষা মুক্তি পাবে। কাজেই বিনা
দ্বিধায় আমরা ‘ঈ’-কে বাদ দিতে পারি।
৩) উ এবং ঊ: এখানেও ‘ই’ ও ‘ঈ’ নিয়ে উপরোক্ত আলোচনার সবটাই প্রযোজ্য। কাজেই আমারা ‘ঊ’-কে গঙ্গায় বিসর্জন দিতে পারি।
৪) ঋ বা ৃ: এই ঋ (ৃ) একটি অপ্রয়োজনীয় বর্ণ। ‘র’ দিয়েই এর সব কাজ করা যায়। এখনকার নিয়ম অনুযায়ী শুধু সংস্কৃত থেকে আগত শব্দ
ছাড়া অন্য ভাষা থেকে আগত শব্দে এই ঋ-র ব্যবহার বিধেয় নয়। কাজেই বাংলা বর্ণমালা
থেকে ঋ-কে বাদ দেয়া হোক।
৫) ‘ঐ’ ও ‘ঔ’ বর্ণ দুটি সম্ভবত বাদ দেয়া যায় কেননা ‘ঐ’ হচ্ছে ‘অ+ই’
মিলে তৈরি আর ‘ঔ’ হচ্ছে ‘ও+উ’।
কাজেই, এই সংস্কারের পরে বাংলা
বর্ণমালা হবে: “অ আ ই উ এ ও”,
মোট ছয়টি।
ব্যঞ্জনবর্ণ
বর্তমানে বাংলা ভাষার ব্যঞ্জনবর্ণ ৩৯-টি:
ক খ গ ঘ ঙ (‘ক’-বর্গ)
চ ছ জ ঝ ঞ (‘চ’-বর্গ)
ট ঠ ড ঢ ণ (‘ট’-বর্গ)
ত থ দ ধ ন (‘ত’-বর্গ)
প ফ ব ভ ম (‘প’-বর্গ)
য র ল ব
শ ষ স হ
য় ড় ঢ় ৎ :
এই ৩৯-টি
ব্যঞ্জনবর্ণের মধ্যে স্বল্প প্রচলিত এবং বিকল্প থাকায় অনায়াসেই যে সব বর্ণকে বাদ
দেয়া যায় সেগুলো হলো:
১) ‘ঙ’
‘ঙ’-এর বদলে ং ব্যবহার করলে বানানের কিছু জটিলতা দূর করা যায়।
২) ‘ঞ’ এটাকেও সহজেই বাদ দেয়া যায় কারণ এর কার্যত কোন ব্যবহার নেই। যদি থেকেও থাকে, সেটাকে খুব সহজেই ‘য়’ দিয়ে কাজ চালানো যায়।
৩) ‘ন’ ও ‘ণ’ জটিলতা: বর্তমানের বাংলা ব্যাকরণের এক বিশেষ সমস্যা হচ্ছে কোথায় ‘ন’ আরে কোথায় ‘ণ’ হবে। দুটির উচ্চারণে সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে। কিন্তু অন্যদিকে বর্তমান বাংলা
ব্যাকরণ অনুযায়ী ‘ণ’ সম্বলিত প্রায় সব শব্দই সংস্কৃত থেকে আগত। কাজেই ‘ণ’ কে অবশ্যই বাদ দেয়া উচিৎ।
৪) ‘শ’,
‘ষ’,
‘স’
নিয়ে জটিলতা: তাত্ত্বিক ভাবে এদের পার্থক্য হচ্ছে মুখের কোন
স্থান থেকে উচ্চারণ হচ্ছে তার উপর। কিন্তু আমরা যখন শব্দ উচ্চারণ করি তখন ৯৫-ভাগ
ক্ষেত্রে এই পার্থক্য থাকে না। কিছু ভাষা বিশেষজ্ঞ ছাড়া এই নিয়ম কেউ মানে না।
কাজেই বাংলা ভাষাকে প্রাণবন্ত ও সহজে যেন সকলে শিখতে পারে সেই লক্ষে ‘শ’-কে বাদ দিয়ে শুধু ‘স’-কে বর্ণমালায় রাখা। ‘ষ’-র কী হবে?
বর্তমান বাংলা ব্যাকরণ মতে ‘ষ’ যুক্ত সব শব্দই তৎসম শব্দ অর্থাৎ সংস্কৃত থেকে আগত। কাজেই একে বিনা দ্বিধায়
বাদ দেয়া যায়।
কাজেই উপরে উল্লিখিত ৫-টি ব্যঞ্জনবর্ণ বাদ দিলে সংখ্যা
দাঁড়ায় ৩৪-টি।
তৎসম ও অন্য শব্দ (অর্ধ-তৎসম, তদ্ভব,
দেশী, বিদেশী)
যে সব শব্দ সরাসরি সংস্কৃত ভাষা থেকে বাংলা ভাষায় এসেছে
তাদেরকে তৎসম শব্দ বলে।। প্রধানত বর্ণবাদই হিন্দু ব্রাহ্মণ দ্বারা রচিত ব্যাকরণের
প্রভাবে বাংলা ব্যাকরণেও এই বর্ণবাদের ছায়া এখনও অনেকেরই অজান্তে রয়ে গেছে। যেমন
বাংলা ব্যাকরণের মতে ঈ,
ঊ,
ক্ষ এবং এই তিনটি বর্ণ অথবা বর্ণের করচিহ্ন-যুক্ত সব শব্দই
তৎসম। অর্থাৎ তৎসম ছাড়া অন্য কোন শব্দে এ তিনটি বর্ণ ব্যবহার নিষিদ্ধ। এখন নিশ্চয়ই
বুঝতে পারছেন হঠাৎ ‘ঈদের’
বানান ইঁদুরের মতো ‘ইদ’ হয়ে গেল কেন?
এই ধরনের বর্ণবাদ-দুষ্ট বর্ণ ব্যবস্থা অবশ্যই আমাদের পরিহার
করা উচিৎ। কোন বিদেশী শব্দকে যখন বাংলা ভাষায় আত্মস্থ করা হয় তখন নিরপেক্ষভাবে একই
নিয়ম অন্য ভাষা থেকে আগত বিদেশী অথবা দেশী শব্দের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করতে হবে।
বনেদি-উৎস বলে কিছু রাখা যাবে না।
সমাস ও সন্ধি
বাংলা ভাষার সমাস ও সন্ধি ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছে। কিন্তু সমাস
ও সন্ধিতে অনেক ব্যতিক্রম রয়েছে। নিয়মের এই ব্যতিক্রম ভাষার কাঠামোকে শুধু দুর্বলই
করে না যারা ভাষা শিখতে চায় তাদেরকে নিরুৎসাহিত করে। কাজেই এই সমস্ত অসমঞ্জস্য
পরিহার করা উচিৎ।
এ ছাড়াও বাংলা ভাষার অরও বেশ কিছু সংস্কার প্রয়োজন। কী কী
সংস্কার দরকার তার জন্য বিভিন্ন পেশাজীবীদের সমন্বয়ে একটি কমিটি করা দরকার (শুধু
বাংলা বিশারদের দ্বারা হবে না, কেননা তাদের অবস্থান
প্যারাডাইমের কেন্দ্রে। কাজেই তাদের কাছ থেকে নতুন কিছু আশা করা যায় না।)
এখানে মনে রাখতে হবে যে ভাষা শুধু পদ্য ও গদ্য রচনার জন্য না। ভাষার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষে-মানুষে যোগাযোগ। এই একবিংশ শতাব্দীতে ভাষা এইটি প্রযুক্তি। কাজেই ভাষাকে প্রাণবন্ত করার জন্য এবং সবাই যেন সহজেই একে আত্মস্থ করতে পার তার ব্যবস্থা করা। ভাষার দক্ষতার জন্য কাউকে তার জীবনের একটি বড় অংশ যেন ব্যয় করতে না হয় সে ব্যাপারে সচেষ্ট হতে হবে। বাংলা ভাষাকে যদি বর্তমানের অযৌক্তিক বর্ণবাদী বিভিন্ন পরস্পরবিরোধী নিয়ম-কানুনের বেড়াজালে আবদ্ধ করে রাখা হয় তাহলে ক্রমেই এই ভাষা শেখার আগ্রহ তরুণ প্রজন্মের মাঝে হারিয়ে যাবে এবং বাংলা ভাষার মারাত্মক ক্ষতি হবে।
কাজেই সময় নষ্ট না করে বাংলা ভাষাকে রক্ষার জন্য এই
প্রস্তাবিত সংস্কার অত্যন্ত জরুরী।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন