জীবের উদ্দেশ্য কী?
জীবের উদ্দেশ্য কী?
মাঝে মাঝেই প্রশ্ন যাগে জীব বা জীবনের উদ্দেশ্য কী? কেন কোন জীব মরতে চায় না, বাঁচতে চায়? কিন্তু জীব মরতে না চাইলেও মরতে হয়। কখনো একটি নিসৃষ্ট সময় অতিক্রম করার পর, কখনো অন্য জীবের খাদ্য রূপে, কখনো মারামারি করে, আবার কখনো কোন দুর্ঘটনায় বা অসুখ-বিসুখে মরতে হয়। এই বাস্তবতা প্রায় সব জীবের বেলায় প্রযোজ্য।
জীবের জীবনচক্র পর্যালোচনায় করলে দেখি, জন্ম হয়,
ক্রমশ প্রাপ্তবয়স্ক হয়, নিজেরা বাচ্চার
জন্ম দেয়,
একটি নিদিষ্ট সময় অতিবাহিত হলে মারা যায়। কিন্তু নিজে মারা
গেলেও সে তার নিজের শূন্যস্থানই শুধু পূরণ করে না, বরং বেশ কিছু বেশী জীব রেখে যায়, ফলে জীবের সংখ্যা
বাড়তে থাকে। মানুষের সংখ্যা ধরলে দেখতে পাই পৃথিবীতে ১৮০৪ সালে জনসংখ্যা ছিল মাত্র
১০০ কোটি,
২০২০ সালে জনসংখ্যা ৮-গুন বৃদ্ধি
পেয়ে প্রায় ৮০০ কোটির কাছাকাছি!
মানুষ জন্মের পর অসহায় থাকার ফলে অভিভাবকের পরিচর্যায় আস্তে
আস্তে বেড়ে ওঠে। এটা অবশ্য মানুষ ছাড়াও বেশীরভাগ পশুপাখির বেলায়ও প্রযোজ্য। প্রায়
সবাই তাদের বাচ্চাদের বেড়ে উঠায় সহায়তা করে। অবশ্য এর ব্যতিক্রম আছে। অনেক প্রাণী
ডিম দেয় কিন্তু ডিমের পরিচর্যা করে না। কিন্তু এদের ডিমের সংখ্যা এত বেশী থাকে যে অনেক
ডিম বিভিন্ন কারণে ধ্বংস হলেও অনেক বেঁচে যায়। কিন্তু যাদের ডিমের বা বাচ্চার
সংখ্যা সীমিত তাদেরকে সাধারণত বাচ্চা বা ডিমের পরিচর্যা করতে দেখা যায়। এটা তো
গেলো জীবনচক্রের কথা। কিন্তু এই বেঁচে থাকার প্রবণতার উদ্দেশ্য কী? কেন জীব বাঁচতে চায়?
এখানে লক্ষণীয় যে স্বতন্ত্র জীব মারা গেলেও সমষ্টিগতভাবে
বৃদ্ধি পেতে থাকে। এই বৃদ্ধির প্রবলতা নির্ভর করে প্রধানত দুটি গুনকের উপরে—খাদ্য ও পরিবেশ। পর্যাপ্ত খাদ্য ও অণুকুল পরিবেশ থাকলে সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি
পায় আর উল্টো হলে বিপরীত দিকে যায়।
পৃথিবীর বয়স প্রায় ৪৫৩ কোটি বছর, পৃথিবীতে প্রাণের প্রথম অস্তিত্ব টের পাওয়া যায় ৩৭০ কোটি বছর আগে। প্রথম ৮০
কোটি বছর পৃথিবীতে জীবনের কোন অস্তিত্ব ছিল না। কারণ হয়ত তখন জীবনের অণুকুল পরিবেশ
ছিল না।
বিভিন্ন জীবের মাঝে একটি মাত্র সাধারণ যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া
যায়--বেঁচে থাকা ও বংশ বৃদ্ধি করা। তাহলে কি বেঁচে থাকাই জীবের অন্তর্নিহিত
উদ্দেশ্য?
বেঁচে থাকা ও বংশ বৃদ্ধি করা—নিজ প্রজাতির সংখ্যা বাড়ানো?
তাই যদি হয় তাহলে জীবের নিদিষ্ট কোন প্রজাতি কতদিন পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে পারে তার উপরেই কি সাফল্যের সূচক নির্ভর করে? যে প্রজাতি যতদিন সাফল্যের সাথে পৃথিবীতে তার অবস্থান ধরে রাখতে পারে সেটাই সেই প্রজাতির সাফল্যের মাপকাঠি?
পৃথিবীতে ডাইনোসর বলে এক শ্রেণীর প্রাণীর আবির্ভাব হয়েছিল
প্রায় ২৪ কোটি বছর আগে। তারা দাপটের সাথে পৃথিবীতে ১৭.৫০ কোটি বছর বাস করে। ৬.৭
কোটি বছর আগে কোন একটি ঘটনায় পৃথিবী থেকে তারা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। ধারণা করা হয়
কোন ধূমকেতুর সাথে পৃথিবীর সংঘর্ষের ফলে ডাইনোসরেরা নিশ্চিহ্ন হয়।
এখন আশা যাক মানুষের আবির্ভাব কবে হলো? আমাদের প্রজাতিকে জীব বিজ্ঞানীরা হোমো সে-পিয়ান (homo sapien) বা আধুনিক মানুষ নামে চিহ্নিত করেন। জীবাশ্ম রেকর্ড থেকে দেখা যায় যে মাত্র
১৯৬,০০০ বছর আগে পৃথিবীতে আধুনিক মানুষের আবির্ভাব ঘটে। এখন পর্যন্ত আমাদের জানা
মতে মানব সভ্যতার বয়স মাত্র ১৫,০০০ বছর, যদিও তথ্য প্রমাণ সাপেক্ষে এটা আরও বাড়তে পারে। ধরে নিলাম মানব সভ্যতার বয়স ৩০,০০০ বছর,
যদিও এই সংখ্যাতে পৌঁছানোর সম্ভাবনা ক্ষীণ। এখানে উল্লেখ্য
যে প্রায় মানুষের মত দেখতে নিয়ানডার্থাল নামে আরেক প্রজাতির মানুষ ছিল। এদের
বাসস্থান ছিল প্রধানত ইউরোপ ও এশিয়ার দক্ষিণ ও মধ্য অঞ্চলে। প্রায় ৩০,০০০ বছর আগে পৃথিবী থেকে এরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।
তুলনা করার জন্য আরেকটি জীবের কথা বলা যাক। এটি একটি অতি
পরিচিত পোকা এবং যেটাকে আমরা প্রায় সবাই ঘৃণা করি—তেলাপোকা।
তেলাপোকার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এরা খুবই সহজে যে কোন পরিবেশের
সাথে অভিযোজন (adaptation)
করতে পারে। মানুষ যাকে ময়লা আবর্জনা মনে করে এরা সেখানে
স্বাচ্ছন্দ্যে বাস করতে পারে। এদের এই খুবই উন্নত অভিযোজন ক্ষমতার ফলে এখন
পৃথিবীতে প্রায় ৪,৬০০ প্রজাতির তেলাপোকা আছে। এবং এরা ৩২ কোটি বছর যাবত পৃথিবীতে দাপটের সাথে
বেঁচে আছে। আমাদের প্রতিনিয়ত এদের ধ্বংস করার চেষ্টা করা স্বত্বেও এরা টিকে আছে।
এরা যে কোন পরিবেশে টিকতে পারে। প্রচণ্ড গরমে ও প্রচণ্ড ঠাণ্ডা, উভয় পরিবেশেই এরা বাঁচতে পারে। এবং ধারণা করা যায় মানুষ যদি কোন কারণে
ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় তাহলেও এরা ঠিকই বেঁচে থাকবে।
কাজেই তেলাপোকাকে আমরা যতই ঘৃণা বা তুচ্ছ তাছিল্ল করি না
কেন, স্থায়িত্বের দিকে থেকে তেলাপোকা হচ্ছে এই পৃথিবীর এক অন্যতম দীর্ঘজীবী সফল প্রাণী।
স্থায়িত্বের মাপকাঠিতে বিচার করলে তেলাপোকার সাফল্য মানুষের চেয়ে অনেক বেশী।
মানুষের সাফল্য কী? আমারা এই বিগত
১৯৬,০০০ বছরে অনেক উন্নতি করেছি। একসময় জঙ্গলে থেকে ফলমূল ও উচ্ছিষ্ট খাওয়া থেকে
শুরু করে আজকের এই নগর সভ্যতার শহর, বন্দর, রাস্তাঘাট,
দালান-কোঠা, অট্টালিকা, আকাশ-ভ্রমণ,
পরিবার, সমাজ, শিক্ষা,
অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, আইন-কানুন,
চিকিৎসা, গাড়ি, রেল,
বিমান, মহাকাশ যাত্রা, ইত্যাদি সবই হয়েছে। কিন্তু একটু চিন্তা করলে বুঝা যায় এই সবের চূড়ান্ত
উদ্দেশ্য বংশবৃদ্ধি বা মানুষ প্রজাতির স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা।
মানব সভ্যতার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষ যেন নিরাপদে, অণুকুল পরিবেশে,
স্বাচ্ছন্দ্যে মানুষ বংশ বিস্তার করতে পারে। আমারা আমাদের
আশেপাশে যা কিছু দেখি তার সবই এই নিমিত্তে তৈরি করা।
উপরোক্ত আলোচনাকে যদি যুক্তিযুক্ত বলে মনে হয় তাহলে বংশবৃদ্ধি করে প্রজাতির স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা ছাড়া কোন জীবের, মানুষ সহ, অন্য কোন অর্থবহ মানে নেই।
যেহেতু মানুষ চিন্তা ও কল্পনা করতে পারে, এই অর্থহীন জীবন ধারণাকে মানে নিতে চায় না। কি, আমার জীবনের কোন অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য নেই? তা কেমন করে হয়—এত সব আয়োজন শুধু প্রজনন ও বংশবৃদ্ধি? নাহ!, তা কেমন করে হয়?
কাজেই আমরা আমাদের এই অর্থহীন জীবনকে অর্থবহ করার জন্য অনেক
গল্প, প্রবাদ,
শ্রুতি, ইত্যাদি দিয়ে আমাদের চারিদিকে
একটি বলয় তৈরি করি, ঠিক ডিম যেভাবে একটা বাহ্যিক শক্ত আবরণ
দ্বারা ভিতরের নরম কুসুমকে ঘিরে রাখে, মানুষও তেমনি
গল্প, প্রবাদ,
শ্রুতি, ঐতিহ্য, ইত্যাদি কাল্পনিক ধরনা দ্বারা জীবনের এই অর্থহীন বাস্তবতা থেকে মুক্তি পেতে
চায়।
জীবন হচ্ছে বেঁচে থাকার সংগ্রামের নাম। এই সংগ্রামে চূড়ান্ত
সাফল্য বলে কিছু নেই—সবই আপেক্ষিক সাফল্য। এই বেঁচে থাকার প্রতিযোগিতায় সে-ই সফল যে সবচেয়ে বেশী
সময় পৃথিবীর রঙ্গমঞ্চে অবস্থান করতে পারে। এই বিচারে অবশ্য মানুষের সাফল্য খুবই
সামান্য।
বাংলা একটি বাউল গান আছে না, “একটি চাবি মাইরা দিলা ছাইড়া জনম ভরি চলিতেছে” জীবের অবস্থা আসলে সেরকম।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন