আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কী হওয়া উচিৎ ১?

 

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কী হওয়া উচিৎ ১?

গতকালকে খাবার টেবিলে আমার স্ত্রীর সাথে এখনকার শিশুদের কী শিক্ষা দেওয়া উচিৎ সে বিষয়ে আলোচনা হচ্ছিল। আজকে যে শিশু প্রাথমিক পর্যায়ে (Play Group) ভর্তি হবে, সে ১৮-বছর পরে কর্মজীবনে প্রবেশ করবে। যে ভাবে উন্নত প্রযুক্তির বলে ব্যবসা, বাণিজ্য, জীবনযাপন, ও কর্মসংস্থানের পরিবর্তন হচ্ছে, সেটা লক্ষ্য করলে আজ থেকে ১৮/২০ বছর পরে কী হবে তা এখন সঠিক ভাবে নির্ণয় করা প্রায় অসম্ভব। কাজেই গতানুগতিক শিক্ষা, যেটা প্রধানত মুখস্থ বিদ্যার উপর নির্ভরশীল তা হয়ত ভবিষ্যতে খুব কাজে আসবে না।

বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা একটি শিল্প-ভিত্তিক সমাজব্যবস্থাকে সহায়তা ও গতিশীল করার জন্য সাজানো। একজন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত শিক্ষা শেষে কোন বৃহৎ শিল্পে অথবা অফিসে চাকুরীতে নিযুক্ত হবে এটাই সর্ব স্বীকৃত। কাজেই শিক্ষা সমাপ্তের পর এদের খুব কম সংখ্যক নিজেরা উদ্যোক্তা হতে পারে। যেহেতু গত ১০০-বছরে এই অবস্থার খুব একটা পরিবর্তন হয়নি, ফলে নতুন কিছু চিন্তা করার প্রয়োজন পড়েনি।

 কিন্তু এখন ক্রমেই বুঝা যাচ্ছে যে এই অবস্থার বৈপ্লবিক পরিবর্তন ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। যে সমস্ত প্রযুক্তি এই পরিবর্তনকে তরান্বিত করছে সেগুলো হচ্ছে, ১) কম্পিউটার প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান উন্নতি ও শক্তিবৃদ্ধি, ২) অন-লাইন বাণিজ্যের আবির্ভাব ও বাধাহীন প্রবৃদ্ধি, ৩) কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আবির্ভাব ও বিকাশ, ৪) রোবট প্রযুক্তি, ইত্যাদি।

১) কম্পিউটার প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান উন্নতি

গর্ডন মূর ১৯৬৫ সালে এক ভবিষৎবাণী করেন। তিনি বলেন প্রত্যেক দুবছর পরপর কম্পিউটার চিপ দিগুণ শক্তিশালী হবে। এই ২০২০-সালেও মূরের ভবিষৎবাণীর কার্যকারিতা দেখা যাচ্ছে।

কম্পিউটার শক্তিশালী হলে কি হয়। কয়েকটা উদাহরণ দেওয়া যাক:

ক) অ্যামেরিকার, রাশিয়া, বা অন্যান্য উন্নত দেশের পারমানবিক পরীক্ষার প্রয়োজন কেন এখন হয় না জানেন? এর কারণ তারা এরই মধ্য পারমানবিক বোমার বিস্ফোরণের কম্পিউটার মডেল তৈরি করে ফেলেছে কাজেই আগের মতো আর বোমা ফাটিয়ে তার কার্যকারিতা দেখার কোন প্রয়োজন হয় না। সুপার কম্পিউটারের মাধ্যমেই এই কাজ করা সম্ভব হয়। অন্যদিকে উত্তর কোরিয়ার এই ধরনের প্রযুক্তি না থাকায় তাদেরকে সেই পুরনো পন্থাতেই পারমানবিক পরীক্ষা দ্বারা বোমার কার্যকারিতা নির্ধারণ ও উন্নতি করতে হয়।

খ) ঔষধ শিল্প: নতুন ঔষধ তৈরি ও বাজারজাতকরণের জন্য অনেক ধাপ অতিক্রম করতে হয়। একটি বড় কাজ হচ্ছে ঔষধ সম্পর্কে গবেষণা। শক্তিশালী কম্পিউটারের সাহায্যে এই গবেষণার সময়কে অনেক কমিয়ে আনা সম্ভব। এই মুহূর্তে কভিড-১৯-এর ভ্যাকসিন তৈরির জন্য এক আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা চলছে। এই প্রতিযোগিতায় সেই প্রথম সাফল্য পাবে যে সবচেয়ে  দ্রুত তাদের গবেষণা শেষ করতে পারবে। সাফল্য অনেকাংশেই নির্ভর করবে কার কম্পিউটিং শক্তি কত বেশী।

গ) আবহাওয়ার পূর্বাভাস: আবহাওয়ার সঠিক পূর্বাভাস করা অনেক কঠিন কাজ কেননা পূর্বাভাসের জন্য অনেক কিছুর সমন্বয়ে বহু হিসাব কষতে হয়। আমেরিকার জাতীয় আবহাওয়া সেবা (National Weather Service) বিভিন্ন উপায়ে প্রাপ্ত ডাটা যেমন, আবহাওয়া বেলুন, বয়া, রাডার, ইত্যাদি থেকে প্রতি সেকেন্ডে হাজার হাজার ডাটা সংগ্রহ করে এবং সুপার-কম্পিউটারের  সাহায্যে এই ডাটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে এমন পূর্বাভাস দিতে পারে যেটা পাঁচ দিনের পূর্বাভাসের ক্ষেত্রে ৯০% সঠিক।

ঘ) এ ছাড়াও গুগল, অ্যামাজন, আপেল, ইত্যাদি কোম্পানি তাদের বিশ্বব্যাপী ব্যবসা পরিচালনায় সুপার-কম্পিউটারের সাহায্য ছাড়া সম্ভব না।

২) অন-লাইন বাণিজ্যের আবির্ভাব ও বাধাহীন প্রবৃদ্ধি: কালকেই খবরে দেখলাম মাইক্রোসফট তাদের সব দোকান বন্ধ করে দিচ্ছে। অন-লাইন বাণিজ্যের প্রসারের ফলে অনেক ব্যবসা ও বাণিজ্য ক্রমেই অন-লাইন নির্ভর হয়ে পড়বে। আমার নিজের কথাই বলতে পারি-শুধু শাকসবজি ও মাছ মাংস ছাড়া অন্য সব কিছুই অন-লাইনে কেনাকাটা করি। এই প্রবণতা ক্রমেই বিস্তৃতি পাবে এবং এক সময় প্রায় সব কিছুই অন-লাইন ছাড়া পাওয়া যাবে না।

৩) কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আবির্ভাব ও বিকাশ: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (Artificial Intelligence) প্রভাবে আগামী বিশ বছরে প্রথমত যে সমস্ত চাকুরী থাকবে না বলে ভবিষ্যতবাণী করা হচ্ছে সেগুলো হলো:

ক) গাড়ি চালক বা ড্রাইভার, খ) কৃষিজীবী, গ) মুদ্রণ ও প্রকাশনা, ঘ) ব্যাংকের কোষাধ্যক্ষ, ঙ) ট্র্যাভেল এজেন্ট, চ) এসেম্বলি শিল্পের শ্রমিক, ছ) আদানপ্রদানকারী, জ) রেস্টুরেন্টের ওয়েটার বা বার-টেন্ডার, ঝ) ব্যাংকের টেলার, ঞ) সামরিক পাইলট ও সৈন্য, ট) ফাস্টফুডের কর্মচারী, ঠ) টেলি-মার্কেটিং এজেন্ট ড) হিসাবরক্ষক, ঢ) শেয়ার ব্যবসায়ী, ণ) নির্মাণ শ্রমিক, ত) সাংবাদিক, থ) সামাজিক মাধ্যম বিশেষজ্ঞ, দ) খেলার রেফারি, ধ) সাধারণ ডাক্তার, ন) আইনজীবী, ইত্যাদি। এর পরের ধাপে আরও অনেক পেশা বা ব্যবসা আস্তে আস্তে উধাও হয়ে যাবে। যেমন এখনই ভবিষ্যতবাণী করা যায় যে ব্যাংকের শাখা সম্ভবত অদূর ভবিষ্যতে আর থাকবেনা। একই পথে হয়ত বীমা কোম্পানিও যাবে। ক্রমশ অন-লাইনের কেনাকাটা বাড়তে থাকবে এবং এখনকার মতো দোকান ভিত্তিক লেনদেন কমতে থাকবে। অনেক অফিসের বেশিরভাগ লোকজনের অফিসে যাবার প্রয়োজন হবে নাবাসা থেকেই কাজ করতে পারবে। স্কুল, কলেজ, ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ক্রমশই অন-লাইন নির্ভর হয়ে পড়বে।

অবশ্য এটা স্মরণ রাখতে হবে যে পৃথিবীর সব যায়গায় একই সাথে ও একই গতিতে এই ভবিষৎবাণীর প্রতিফলন হয়ত দেখা যাবে না। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে এর পূর্ণ প্রভাব পড়তে হয়ত আরও কিছু সময় লাগবে।

এবার আমাদের বর্তমানের শিক্ষা ব্যবস্থার কিছু দিক নিয়ে বলতে চাই। এখন মোটামুটি একবার বিশ্ববিদ্যালয়য় বা কলেজ থেকে পাশ করার পর সবাই একটি ভাল চাকুরী পেতে চায় এবং একবার একটি ভাল চাকুরী পেলে অনেক সময় সারা জীবন সেই চাকুরীতেই থাকে। এর একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ সরকারী চাকুরী। এই চাকুরী চলাকালীন সময়ে নতুন শিক্ষা বা জ্ঞান অর্জনের খুব একটা প্রয়োজন হয় না। কিন্তু ভবিষ্যতে এই সব পেশা ভিত্তিক বেশীর ভাগ চাকুরী হয়ত থাকবে না এবং এর বদলে প্রকল্প বা উদ্দেশ্য ভিত্তিক কাজের জন্য সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য চুক্তিভিত্তিক কর্মসংস্থানের  সুযোগ থাকবে এবং একজনকে বিভিন্ন কাজ করার সক্ষমতা থাকতে হবে কেননা জীবিকা অর্জনের জন্য একই সময় বিভিন্ন ধরণের একাধিক কাজ করার সক্ষমতা থাকতে হবে। এর ফলে সবাইকে একটানা দক্ষতা বৃদ্ধির ব্যবস্থা করতে হবে। বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই এই সব কাজের জন্য অফিসে যেতে হবে না, নিজের বাসায় বসেই এই সমস্ত কাজ করা যাবে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে উপরে উল্লিখিত প্রেক্ষাপটের আলোকে একজন চার বছরের শিশু যখন প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষাব্যবস্থায় প্রবেশ করবে তাকে কী শেখাতে হবে যাতে আগামী বিশ বছরের মধ্যে সে যেন উপার্জনক্ষম হয়?

এই প্রশ্ন উত্থাপিত হলেই প্রথমেই সবাই যে কথা বলেন সেটা হলো আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে সৃজনশীল করতে হবে--আমাদের শিশুদের সৃজনশীল করে গড়ে তুলতে হবে। এটা প্রায় সকলেই স্বীকার করেন যে সৃজনশীলতা একটি উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত গুণ। যেমন আমি চেষ্টা করলেও হুমায়ূন আহমেদ হতে পারবো না। আবার এ বিষয়ে অনেক বিজ্ঞানী বলেন যে শিশুরা জন্মের পর স্বভাবতই সৃজনশীল থাকলেও বেড়ে উঠার সাথে সাথে তাদের এই জন্মগত সৃজনশীলতা ক্রমাগত হারাতে থাকে। এই সৃজনশীলতার অবক্ষয়ের কারণ কী? জীবনের অভিজ্ঞতা, স্কুলের প্রভাব, ব্যর্থতার ভয়; ছোটবেলা থেকে কোমল-মতি শিশুদের যখন নিজস্ব কোন চিন্তার বিস্তার হয়নি, তখন কোন বিশেষ মতবাদে জোরপূর্বক দীক্ষিত করা; পরিবারের বাইরের পরিবেশের প্রভাব, সমাজের প্রভাব, আত্মীয়স্বজনের প্রভাব, ইত্যাদির ফলে সৃজনশীলতার অবক্ষয়ের কারণ বলে ধারণা করা হয়। এ নিয়ে অবশ্য অনেক আলোচনা, সমালোচনা, ও মতভেদ আছে। কিন্তু ধারণা করা হয় যে শিশুকাল থেকে চেষ্টা করলে একজনকে সৃজনশীল করে গড়া যায়। একটি কথা অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে শুধু সৃজনশীল শিক্ষা দিয়ে সৃজনশীল মানুষ গড়া যাবে না। স্কুলে শিশুকে সৃজনশীল শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে কিন্তু বাসায় এক কট্টর রক্ষণশীল পরিবেশ, তাহলে সৃজনশীলতা ও রক্ষণশীলতার দোটানায় শিশুটি শুধু চরম বিভ্রান্তিতেই পড়বে না, এর ফলে শিশু তার মানসিক ভারসাম্য হারাতে পারে। সৃজনশীলতা ও রক্ষণশীলতার একে অপরের পরিপন্থী

এখন দেখা যাক সৃজনশীলতা মানে কী। আমার বর্তমান ধারণা সৃজনশীল হচ্ছে সে যে ঝুঁকি নিতে ভয় পায় না, যে দৃঢ় চিত্তে ভয় বা সন্দেহকে উপেক্ষা করে এগিয়ে যেতে পারে, যে কোন গৎবাঁধা ছকে কাজ করে না, যে খুবই সাধারণ স্থানেও অনুপ্রেরণার সন্ধান করতে পারে, যে উদ্ভট প্রশ্ন করতে ভায় পায় না, যে প্রতিষ্ঠিত মতামতকে চ্যালেঞ্জ করতে পিছপা হয় না ও যে গণ্ডি অতিক্রম করতে দ্বিধা করে না, সে-ই সৃজনশীল। কাজেই যে সমস্ত শিক্ষা, সমাজ ব্যবস্থা, রাজনীতি, ইত্যাদি একটি শিশুকে উপরি উল্লিখিত গুণাবলীতে ক্রমশ দীক্ষিত করে একজন পূর্ণাঙ্গ সৃজনশীল মানুষে রূপান্তর করতে পারে সেটাই হলো আমাদের কাঙ্ক্ষিত সৃজনশীলতা তৈরির উপায়। শুধু স্কুলের সৃজনশীল শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে সৃজনশীল মানুষ গড়া সম্ভব না।

কাজেই বুঝা যায় যে কাউকে সৃজনশীল-ভাবে তৈরি করা চাট্টিখানি কথা না। সৃজনশীলতার জন্য সবাইকেই: স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, পরিবার, সমাজ, রাজনীতিবিদ সহ অন্য সকলকে এগিয়ে আসতে এসে একযোগে ও সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।

কিন্তু একটি প্রশ্ন করতেই হয়-আমাদের বর্তমান সমাজ কি বেশিরভাগ লোক সৃজনশীল হোক এটা কি চাইবে? কেন চাইবে না বুঝতে পারছেন কি?

আজকের এই লেখা এখানেই শেষ করতে হচ্ছে কেননা ইতিমধ্যে চার পাতা লেখা হয়ে গেছে। যদিও আমার আসল কথা এখনও আলোচনা কারা হয়নি। কী শিক্ষা দিতে হবে? এ নিয়ে অবশ্য অনেক মতভেদ থাকবে। আমি আমার মতামত এর পরের লেখায় প্রকাশ করব বলে আশা করি।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পরিবর্তন ও প্যারাড়াইম

আজিমপুরের দুর্দান্ত যোদ্ধারা, পঞ্চম পর্ব

আজিমপুরের দুর্দান্ত যোদ্ধারা, চতুর্থ পর্ব