ম্যাট্রিক্স সিন্ড্রোম
ম্যাট্রিক্স সিন্ড্রোম
কিছু কিছু উপলব্ধি আকস্মিকভাবে হয়। এটাকে ইংরেজিতে eureka
(ইউরেকা) বলে। এই ইংরেজি শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ আমার জানা নেই।
আমাদের মনে অনেক বিক্ষিপ্ত চিন্তা থাকে এবং অনেক সময় মস্তিষ্কে পুঞ্জীভূত এই বিক্ষিপ্ত
খণ্ড খণ্ড চিন্তা হঠাৎ জোড়া লেগে একটি সুস্পষ্ট ধারনার জন্ম দেয়। আগের ধোয়াসা ভাবটা
কেটে দিনের আলোতে পরিস্ফুট হয়ে ওঠে।The Matrix,
আনেকেই হয়ত The Matrix নামে ১৯৯৯
সালে মুক্তিপ্রাপ্ত হলিউডের একটি সিনেমা দেখেছেন। প্রথমবার দেখার সময় মুগ্ধ চিত্তে
সিনেমাটি দেখি। সিনেমাটি আমার খুবই ভাল লাগে। ভাল লাগার অনেক কারণের মধ্যে প্রথম কারণ
ছিল সিনেমার action scenes, বা বাংলায় “মারামারির
দৃশ্য” বলা যেতে পারে। হলিউডের মতো জায়গাতেও এই দৃশ্যগুলি যুগান্তকারী
ছিল। এই সিনেমাটা তিন চার বার দেখার পরে আমার কেমন যেন একটু অস্বস্তি হতে থাকে। অনুভূতিটা
অনেকটা কাউকে খুব পরিচিত মনে হলেও অনেক চেষ্টার পরও চিনতে না পারলে যেরকম অনুভূতি হয়, সে রকম।
প্রায়ই সিনেমাটির বিষয়বস্তু নিয়ে একান্তে ভাবতাম, কেন যেন
মনে হতো কিসের সাথে খুব মিল আছে বলে মনে হচ্ছে কিন্তু ঠিক বুঝতে পারছি না।
সিনেমার প্লট বা গল্প এরকম। ২৪০০ সালের ঘটনা, Artificial Intelligence বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (কৃবু)পৃথিবী দখল করে নিয়েছে। পৃথিবীর সব সম্পদ শেষ হয়ে গেছে। অধিকাংশ মানুষ বেঁচে নেই, কৃবু মেরে ফেলেছে। শহর, নগর, বন্দর, জনপদ সব নিশ্চিহ্ন। বাড়ি, ঘর, দালান, কোঠা প্রায় সবই ধ্বংসপ্রাপ্ত। এখন পৃথিবীতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার রাজত্ব।
এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বা কৃবু’র একটি বিশাল
সমস্যা--বিদ্যুৎ, বিদ্যুৎ ছাড়া কৃবু’র অস্তিত্ব
সম্ভব না। পৃথিবীতে এখন জ্বালানী হিসেবে ব্যাবহারের জন্য কিছুই অবশিষ্ট নেই, সব শেষ।
এই পরিপ্রেক্ষিতে কৃবু এক অভিনব পন্থা উদ্ভাবন করেছে। প্রত্যেক মানুষের শরীর ১১০ ভোল্ট
বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে সক্ষম। বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধানের জন্য কৃবু বড় বড় কাঁচের পাত্রে
লক্ষ লক্ষ মানুষকে অন্তরীণ করে রেখেছে। তাদের শরীরে বিভিন্ন নল লাগানো থাকে যার মাধ্যমে
শরীরে খাবার ও পুষ্টি সরবরাহ করা হয়। কাঁচের পাত্রে জন্মানো মানুষ যখন মারা যায় তখন
তাদের শরীরকে আবার প্রক্রিয়াজাত করে কাঁচের গোলকের মানুষের খাবার ও পুষ্টি হিসেবে ব্যবহার
করা হয়। কিন্তু এখানেও আরেকটা সমস্যার সৃষ্টি হয়।
দেখা যায় কোনো ধরণের আশা বা উদ্দেশ্য ব্যতিরেকে গোলকের মানুষ বাঁচে না, খুব শীঘ্রই মারা যায়। এই সমস্যা সমাধানের জন্য কৃবু কম্পিউটারে একটি কৃত্রিম জগত তৈরি করেছে এবং কাঁচের পাত্রে জন্মানো প্রত্যেক মানুষের মস্তিষ্কে বিভিন্ন যন্ত্রপাতির সাহায্যে সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে এই কৃত্রিম পৃথিবীর সাথে যুক্ত করেছে। ফলে, কাঁচের পাত্রে জন্মানো প্রত্যেকে মনে করে যে সে ২১০০-সালের পৃথিবীতে সাধারণ মানুষের মতো পরিবার, পরিজন, বন্ধু, বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন, চাকরি বাকরি, ইত্যাদি সব সহ জীবন যাপন করছে। কিন্তু এই কৃত্রিম পৃথিবীর কোনো বাস্তব অস্তিত্ব নেই।
প্রত্যেক সিনেমায় যেরকম থাকে, এখানেও অল্প
কিছু মানুষ যারা কৃবু-দের সর্বগ্রাসী আগ্রাসন থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পেরেছিল, তারা কৃবু’দের কবল
থেকে পৃথিবীকে মুক্ত করার জন্য এক অসম যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। ছবির নায়ক এই দলের সাথে
যোগ দিয়ে কৃবুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সামিল হয়। এই হলো এই সিনেমার মূল কাহিনী।
যাই হোক, সিনেমাটা যখন সপ্তম-বার
দেখছি, অনেকবার দেখার ফলে যখন খুব একটা মনোযোগ দিচ্ছিলাম না, ঠিক তক্ষনি
বুঝতে পারলাম কেন আমার অস্বস্তি হচ্ছিল, কেন মনে
হচ্ছিল কিসের সাথে যেন সিনেমার ঘটনার আশ্চর্য মিল আছে, কিন্তু ঠিক
কিসের সাথে এতদিন বুঝতে পারছিলাম না। এতক্ষণে মিলটা কোথায় বুঝতে পারলাম।
আমি শিউরে উঠলাম বুঝতে পেরে যে আমি বা আমরা সবাই নিজেরাই একই
রকমের একটি ম্যাট্রিক্সের ভিতরে বাস করছি। আমাদের ম্যাট্রিক্সের কেন্দ্রে মানুষের জিন
(gene)। এই জিনের একটি মাত্র উদ্দেশ্য, নিজের বেঁচে
থাকা ও প্রসার ঘটানো। জিন মরতে চায় না, চায় অমরত্ব।
আমরা স্বতন্ত্র মানুষেরা আসলেই এই সিনেমার কাঁচের পাত্রে জন্মানো মানুষের মতো। আমরা
হচ্ছি জিনের বেঁচে থাকার মাধ্যম—আমাদের ছাড়া জিন
বাঁচতে পারে না। কাজেই জিন চায় মানুষ যেন বেঁচে থাকে, শুধু বেঁচে
থাকলেই হবে না, মানুষের মধ্যে সবচেয়ে সমর্থ যে সেই যেন বাঁচে, যারা দুর্বল
তাদের জীবিত রাখতে জিনের কোনো উৎসাহ নেই কারণ দুর্বল মানুষ জিনের বেঁচে থাকা বা প্রবৃদ্ধিতে
সহায়ক নয়।
একটু গভীর ভাবে চিন্তা করলে বুঝা যায় যে আমাদের পৃথিবী আসলেই
বাস্তব নয়। পৃথিবী সম্পর্কে আমাদের ধারণার মূলে আমাদের পঞ্চেন্দ্রিয়-দৃষ্টি, ঘ্রাণ, স্রবণ, স্পর্শ, ও স্বাদ।
এই পাঁচটি ইন্দ্রিয়লব্ধ সংকেত মস্তিষ্কদ্বারা প্রক্রিয়াজাতকরণের ফলে আমাদের উপলব্ধির
সৃষ্টি হয়। কাজেই আমরা আশেপাশের যা কিছু দেখি বা উপলব্ধি করি বাস্তবে তা আসলে কী সেটা
আমরা জানি না এবং সঠিক জানার কোনো সম্ভাবনাও নেই। অনেকেই বলতে পারেন যে বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব
উন্নয়নের ফলে মানুষ ইন্দ্রিয়ের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করার জন্য অনেক যন্ত্র উদ্ভাবন
করেছে এবং নতুন নতুন আবিষ্কারের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত সীমাবদ্ধতাকে কাটিয়ে উঠছে। কিন্তু
তার পরেও আমাদের ইন্দ্রিয় ও মস্তিষ্কের ধারণ ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাকে সম্পূর্ণ কাটিয়ে
ওঠা কোনভাবেই সম্ভব নয়।
আমরা চারটি মাত্রায়
(dimension) সীমাবদ্ধ। বিজ্ঞানী ও অঙ্কবিদরা অবশ্য অঙ্কের
মাধ্যমে চার দেয়ালের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করতে পারেন, কিন্তু সেটা
অংক বা কম্পিউটার মডেলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ; এদের বাস্তব
অস্তিত্ব আমাদের উপলব্ধির আওতার বাইরে। এখানে স্মরণ রাখা উচিৎ যে আমাদের মস্তিষ্ক বা
brain বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সব সমস্যার সমাধান করার জন্য বিকশিত হয়নি, বরং এর মূল
উদ্দেশ্য হচ্ছে বেঁচে থাকার জন্য দৈনন্দিন জীবনের সমস্যার সমাধান, যেমন, খাদ্য সংগ্রহ, পশুপাখির
আক্রমণ থেকে রক্ষা, বিরূপ আবহাওয়া থেকে নিরাপত্তা, নিরাপদ থাকার
জায়গা, শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা, শিকারের
গতিবিধি পর্যবেক্ষণ, ইত্যাদি ছিল প্রধান উদ্দেশ্য।
জিনের বেঁচে থাকার ও প্রবৃদ্ধির সহায়ক সব কিছুই মানুষ সমাজের
কাছে ভাল বলে বিবেচিত, এবং যে সব জিনিস জিনের জন্য ক্ষতিকর, মানুষ সমাজে
সেটা ‘খারাপ’ ও বর্জনীয়।
উপরে উল্লিখিত গল্পে যেমন আশা ও উদ্দেশ্য ছাড়া কাঁচের গোলকে জন্মানো মানুষ বাঁচতে চায় না, একই ভাবে পৃথিবীর মানুষকেও বাঁচতে চাইলে অবশ্যই ভাবতে হবে জীবনের নিশ্চয়ই উদ্দেশ্য আছে। মানুষের জন্য অর্থহীন বা উদ্দেশ্যহীন জীবনের ধারণা খুবই পীড়াদায়ক। কাজেই মানুষেরা নিজেরাই নিজেদের কল্পনা প্রসূত “মেট্রিক্স” তৈরি করে নিয়েছে—এই মেট্রিক্সের নাম সমাজ।
মানুষ বাঁচার তাগিদে বিভিন্ন জিনিস তৈরি করে এবং নিজেকে এই সব
নিজেদের তৈরি করা জিনিস দিয়ে পরিবৃত করে। আমাদের আশেপাশের সব কিছুই কারো না কারো তৈরি
করা, যেমন আমার টেবিল, টেবিলের
উপরে গ্লাস, লাইট, বাল্ব, বোতল, স্যান্ডেল, ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন, টিসু-পেপার, ঔষধ, ফ্যান, মোমবাতি, ইত্যাদি
সব। ফলে, ধারণা জন্মে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সব কিছুই নিশ্চয়ই কারো তৈরি করা।
পৃথিবী কে বানিয়েছে?, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কে বানিয়েছে?, আমাকে কে
বানিয়েছে?, ইত্যাদি।
যদি প্রশ্ন করা হয় মানব সমাজ কে তৈরি করেছে। উত্তর নিশ্চয়ই হবে
মানুষ। আমাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কে সৃষ্টি করেছে? উত্তর হবে
অবশ্যই মানুষ। প্রাথমিক পর্যায়ে এই সব মানুষ সৃষ্ট ব্যবস্থা সবার কাছেই মোটামুটি বোধগম্য
ছিল। কিন্তু কালের বিবর্তনে সভ্যতার উন্নয়নের চাহিদার সাথে পাল্লা দিয়ে আজকে এমন অবস্থার
সৃষ্টি হয়েছে যে শুধু সাধারণ মানুষ নয়, বিশেষজ্ঞের
কাছেও আর বোধগম্য নেই। ফলে আমরা দেখি সমস্যা সমাধানের জন্য একেক ওস্তাদ একেক রকমের
সমাধান হাজির করেন। তাছাড়া কীভাবে খুবই সাধারণ, সকলের কাছে
বোধগম্য একটি ব্যবস্থা বা সিস্টেম কালের বিবর্তনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্রমশ জটিল থেকে জটিলতর
সিস্টেমে রূপান্তরিত হতে পারে তার সবচেয়ে উৎকৃষ্ট উদাহরণ আমাদের বর্তমান বিশ্বব্যাপী
সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা।
জিন প্রাণীকে বিভিন্নভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। যেমন উদাহরণ স্বরূপ বাচ্চাদের কথাই ধরা যাক। সব মানুষই বাচ্চাদেরকে দেখলে নরম হয়ে যায়, নিজের অজান্তেই কেমন যেন একটা মমতায় আপ্লূত হয়ে ওঠে। শুধু মানুষের বাচ্চা কেন, যে কোনো প্রাণীর বাচ্চা দেখলেই এই অনুভূতি হয়। এটা যে শুধু মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ তা নয়, অনেক পশুর মধ্যেও এই প্রবণতা লক্ষণীয়। এটা কেন হয়? নিশ্চয়ই এটার উদ্দেশ্য যারা শিশু ও যাদের নিজেদেরকে রক্ষা করার উপায় নেই তাদেরকে বেড়ে উঠার সুযোগ করে দেয়া। শিশু অবস্থায় যদি বেশীর ভাগ প্রাণীরা মারা যায় তাহলে জিনের উদ্দেশ্য অর্জিত হবে না।
তাহলে দেখা যাচ্ছে জিনগত-ভাবে আমাদেরকে জিন নিয়ন্ত্রণ করছে।
কেমন করে? নিশ্চয়ই যখন আমরা কোনো মানুষ বা পশুর বাচ্চা দেখি তখন আমাদের
শরীরে কিছু নিদিষ্ট হরমোনের নিঃসরণের ফলে আমাদের মনোভাব কোমল হয়ে ওঠে। একই ভাবে আমাদের
অনেক আবেগ, অনুভূতি, রাগ, ঈর্ষা, ঘৃণা, অধিকাংশই
জিনগত ও পরিবেশগত করণের সমন্বয়ের ফল।
সামাজিক (পরিবেশগত) ভাবে যদি শেখানো হয় অমুক ধরনের মানুষ বা
তমুক ধরণের পশু অপবিত্র তখন সে সব মানুষের বা পশুর বাচ্চা দেখলে হয়ত মন করুণ হবার বদলে
ঘৃণার সৃষ্টি করতে পারে।
যৌনতার ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। এখানেও বিশেষ হরমোনের নিঃসরণের কারণে পরুষ ও নারী একে অপরের প্রতি আকৃষ্ট হয়। জিন এভাবে তার স্থায়িত্ব ও প্রচার নিশ্চিত করে।
আমাদের শরীর জিনের ৪০০-কোটি কোডের সমন্বয়ে তৈরি ও নিয়ন্ত্রিত জৈবিক-যন্ত্র যার একমাত্র ও প্রধান উদ্দেশ্য জিনের বেঁচে থাকা ও প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা। জিনের স্বতন্ত্র মানব দেহের বা মানুষের প্রতি কোনো আগ্রহ নেই; জিনের একমাত্র আগ্রহ নিশ্চিত করা যেন মানুষ একটি প্রাণীর প্রজাতি হিসেবে বেঁচে থেকে জিনকে চিরস্থায়ী করতে পারে।
মানুষের রাগ, ঈর্ষা, ঘৃণা, লোভ, লালসা, চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি, প্রেম, ভালবাসা, ইত্যাদির
মূলে বেঁচে থাকার তাগিদ এবং এর মূল চালিকা শক্তি মানুষের জিন। জিনের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে
দেখলে কে কীভাবে বাঁচল, চুরি করে না ডাকাতি করে, সেটা বিবেচ্য
নয়, বিবেচ্য হচ্ছে এইসব পন্থায় জিনের দীর্ঘমেয়াদী বেঁচে থাকা নিশ্চিত
হয় কি না।
জিন কিন্তু চুপচাপ বসে নেই। প্রতিনিয়ত জিনের সূক্ষ্ম পরিবর্তন হচ্ছে, বিজ্ঞানের ভাষায় এই পরিবর্তনকে mutation (মিউটেশন) বলে। যে সমস্ত মিউটেশন জিনের বেঁচে থাকার সম্ভবতাকে পাকাপোক্ত বা শক্তিশালী করে, সেগুলি পরবর্তী প্রজন্মের মাঝে সঞ্চারিত হয়। আবার যে সমস্ত মিউটেশন ক্ষতিকারক, সেটা প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে নিজে থেকেই কিছুদিন পর বিলুপ্ত হয় এবং পরবর্তী প্রজন্মে সেই দূষিত জিন সঞ্চারিত হয় না।
তবে, আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রভূত উন্নতির ফলে প্রকৃতির (অথবা
জিনের) এই নিয়ম মানুষ মানছে না। ফলে, দীর্ঘ মেয়াদে
এর ফল কী হবে বলা খুব মুশকিল। হয়ত এমন দিন আসবে যখন জিনকে মানুষ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।
তবে মনে রাখতে হবে যে জিনের বর্তমান অবস্থায় পৌঁছাতে ৩০০-কোটি বছর সময় লেগেছে আর মানুষের
বিজ্ঞানের বয়স সর্বসাকুল্যে ৫,০০০-বছরের বেশী না।
কাজেই জিনকে পরিবর্তনের নেতিবাচক ফলাফল কী হতে পারে সেটা খুবই গুরুত্বের সাথে বিবেচনা
করা উচিৎ। কিন্তু মানুষের সমস্যা হলো নিজের সংক্ষিপ্ত জীবন, ফলে অসহিষ্ণু
মানুষ তার জীবদ্দশায় সব অর্জন করতে চায়, ফলস্বরূপ
চরম হঠকারী কিছু করার প্রবল সম্ভাবনা থাকে।
এবার মানুষ বা হোমো সাপিয়েন-দের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য পর্যালোচনা
করা যাক। প্রাণিকুলের মাঝে হোমো সাপিয়েনই একমাত্র প্রজাতি যে অন্য সমস্ত প্রাণিকুলের
উপরে নিজের শ্রেষ্ঠত্বই শুধু দাবি করে না, একই সাথে
অতিপ্রাকৃত উৎস থকে উদ্ভূত বলেও দাবী করে।
আরেকটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে নিজের যে কোনো চরম ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড বিভিন্ন অজুহাতে স্ব-প্রতারণার মাধ্যমে ন্যায্যতা দিতে পারে।
মানুষের বিভিন্ন ধর্মীয় মতবাদের মূলে মানুষের অতি সংক্ষিপ্ত
জীবন এবং অবধারিত মৃত্যু। বেশিরভাগ মানুষের পক্ষে মৃত্যুই যে চূড়ান্ত পরিণতি এবং তার
পরে যে আর কিছু নেই কথাটা গ্রহণ করা খুবই সমস্যাপূর্ণ ও ভয়ের। যেমন করেই হোক, মানুষ চিরজীবন
বাঁচতে চায়, মরার পরেও বাঁচতে চায়। মানুষের এই দুর্বলতা থেকেই সব ধর্মের
উৎপত্তি।
গৌতম বুদ্ধ নির্বাণ লাভ করা বলতে কী বুঝাতে চেয়েছিলেন সেটা আমি
আমার নিজের মতো করে বুঝার অনেক চেষ্টা করেছি। এখন আমি যতটুকে বুঝি, তাঁতে মনে
হয় বুদ্ধ গভীর ধ্যানের মাধ্যমে বুঝতে পেরেছিলেন যে পৃথিবীতে হিংসা, বিদ্বেষ, ঝগড়া, বিবাদ, যুদ্ধ, বিগ্রহ, ইত্যাদির
মূলে মানুষের অন্ত-নিহিত এমন একটা কিছু আছে যেটা মানুষকে এই সমস্ত কাজে প্রলুব্ধ করে।
বুদ্ধ নিশ্চিতভাবে ‘জিন’ সম্পর্কে হয়ত জানতেন না, কিন্তু এরকম
কিছুর অস্তিত্ব অনুভব করতে পেরেছিলেন। তার মতে এই নেতিবাচক শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার
একমাত্র উপায় হচ্ছে ব্রহ্মচর্য, অর্থাৎ কোনো সন্তান
না নেয়া, কেননা সন্তানের মাধ্যমে এই নেতিবাচক শক্তি চিরজীবী হয়ে ওঠে।
আমাদের ব্যক্তিগত পূর্বজন্ম না হলেও জিনের পুনর্জন্ম ঠিকই আমাদের সন্তানদের মাধ্যমে
হয়। এবং এই পুনর্জন্ম ঠেকানোর একমাত্র উপায় ব্রহ্মচর্য। যতদিন মানুষ থাকবে, ততদিন এই
নেতিবাচক শক্তির প্রভাবে হিংসা, বিদ্বেষ, খুনাখুনি, যুদ্ধ, ইত্যাদি
থাকবে। একমাত্র পরিত্রাণ হচ্ছে জিনকে প্রসার লাভ করতে না দেয়া। আমি গৌতম বুদ্ধের ‘নির্বাণ
লাভ করা’ বলতে এটাই বুঝি। মানুষের কার্যকলাপ শুধু মানুষের ক্ষতি করে না, মানুষের
কার্যকলাপের ফলে অন্য সব জীবরাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়, মানুষ পরিবেশের
ক্ষতি করে এবং মানুষের কার্যকলাপ সবার জন্যই অভিশাপ।
মেট্রিক্স সিনেমায় এজেন্ট স্মিথ (Agent
Smith) হচ্ছে যাকে বাংলায় বলে খলনায়ক। এজেন্ট স্মিথ মেট্রিক্সের ভিতরে
একটি কম্পিউটার প্রোগ্রাম যার প্রধান দায়িত্ব মেট্রিক্সকে যে কোনো ধরণের হুমকি থেকে
রক্ষা করা। স্মিথ, যখন নিও (নায়কের নাম) তার হাতে বন্দি তখন নিওকে এই কথাগুলো বলে, “আমার এখানে
সময়কালে আমি একটি জিনিস বুঝতে পেরেছি। তোমরা মানুষেরা কোন শ্রেণীর জীব সেটা খুঁজতে
যেয়ে বুঝতে পারলাম তোমরা আসলে স্তন্যপায়ী (Mammal) জীব না, কারণ সব
স্তন্যপায়ী জীব তার পরিবেশের সাথে স্বাভাবিক ভাবেই একটি ভারসাম্য বজায় রাখে। কিন্তু শুধু তোমাদের ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম। তোমরা
একটি জায়গায় যেয়ে শুধু বাড়তেই থাকো, বাড়তেই থাকো, যতক্ষণ না
সব ধরণের প্রাকৃতিক সম্পদ নিঃশেষ না হয়। তোমাদের বাঁচার একমাত্র উপায় হচ্ছে এক জায়গার
সম্পদ নিঃশেষ হলে আরেক জায়গায় বিস্তার করা। তোমাদের মতো এই পৃথিবীতে আরেক শ্রেণীর জীব
আছে যারা ঠিক তোমাদের মতোই বিস্তার লাভ করে। তাদের নাম কী জানো? তাদের নাম
ভাইরাস। কাজেই মনুষ্যজাতি এই পৃথিবীর বুকে একটি ব্যাধি, ক্যান্সারের
মতো একটি ব্যাধি। তোমরা হচ্ছ
আর আমরা হলাম তার ঔষধ।“
আমার এই লেখা শেষ করব ‘দি ম্যাট্রিক্স’ সিনেমার
আরেকটি উদ্ধৃতি দিয়ে। সিনেমায় সাইফার নামে একটি চরিত্র আছে যে নায়ক ও তার সঙ্গীদের
দলেই ছিল কিন্তু পরে কৃবু-র কাছ থেকে ঘুষ নিয়ে নায়কের দলের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে।
তার বিশ্বাসঘাতকতার কারণ সম্পর্কে সে বলেছিল, “এত কষ্ট
করে স্বাধীনভাবে জীবন যাপনের কী দরকার, যেখানে আমি
কৃবু’র অধীনে ম্যাট্রিক্সে ফিরে সুখে শান্তিতে জীবন যাপন করতে পারি?”
একই ভাবে আজকে অনেকেই বলতে পারেন ভাই এতসব চিন্তা করে কী লাভ, যেভাবে চলছে ভালই তো চলছে, পরিবর্তনের কী দরকার?” কথাটা অবশ্য একেবারেই উড়িয়ে দেবার মতো না, তাই না?
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন