আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কী হওয়া উচিৎ ২?
আমাদের
শিক্ষাব্যবস্থা কী হওয়া উচিৎ ২?
এর আগের পর্বে
বর্ণনা করেছিলাম সৃজনশীল শিক্ষার প্রেক্ষাপট, প্রয়োজনীয়তা ও সম্ভাব্য প্রতিবন্ধকতা সম্পর্কে। এই লেখায়
সৃজনশীল শিক্ষার একটি কাঠামো তৈরির প্রয়াস থাকবে। প্রথমেই কয়েকটি স্তম্ভ বা খুঁটি
দাঁড়া করাতে চাই। এই স্তম্ভগুলোকে অবলম্বন করেই সৃজনশীল শিক্ষার কাঠামো তৈরি হবে।
এখন দেখা যাক এই স্তম্ভগুলো কী কী?
১) কোন সমস্যা
সমাধানের জন্য কিভাবে সমস্যাকে বিশ্লেষণ করে সমাধান করতে হয় শিখতে হবে। যদি
যুক্তিযুক্ত সমাধান খুঁজে না পেলে সমাধানের কাছাকাছি পৌঁছান যায় এমন বিকল্প খুঁজে
বের করার সামর্থ্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৈরি করতে হবে কেননা অনেক সময় কোন বিশেষ সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান না ও থাকতে পারে। এই সমস্যা সমাধানের
দক্ষতা অর্জন অবশ্য একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। কাজেই একদম প্রাথমিক
স্তর থেকে ধীরে ধীরে এই সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।
২) শিশুদের
প্রাথমিক স্তর থেকে নিজস্ব চিন্তা ভাবনা করতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। শিশুর
অনুসন্ধিৎসু মনকে বাধাগ্রস্ত করা যাবে না। প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার এক মারাত্মক
দুর্বলতা হচ্ছে কম শিক্ষিত বা কম অভিজ্ঞ শিক্ষকের দ্বারা
প্রাথমিক পর্যায়ের শিশুদের শিক্ষার ব্যবস্থা করা। মুখস্তবিদ্যার শিক্ষাব্যবস্থায়
এই পদ্ধতি কাজ করলেও যখন শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য পরিবর্তিত হয়ে সৃজনশীল শিক্ষার দিকে
ঝুঁকবে তখন সবচেয়ে শিক্ষিত, শিশু শিক্ষায়
প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত,
অভিজ্ঞ, ধৈর্যশীল ও সংবেদনশীল
শিক্ষক/শিক্ষিকার মাধ্যমে শিক্ষা দিতে হবে। আমার কেন যেন মনে হয় শিক্ষিকারা এই
কাজের জন্য বিশেষ উপযোগী।
৩) গণিত, বীজগণিত, জ্যমিতি, ত্রিকোণমিতি, ক্যালকুলাস, ইত্যাদি জানতে হবে।
একজনের ভবিষ্যৎ পেশা যাই হোক না কেন এই সব বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা ও ব্যবহারিক জ্ঞান
থাকতে হবে।
৪) কী ভাবে
গুছিয়ে ও স্পষ্ট ভাবে কথা বলতে হয়, অথবা লিখতে, বা উপস্থাপন করতে হয় সেই বিষয়ে বিশদ সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।
৫) কম্পিউটার
ব্যবহার এখন একটি অতি সাধারণ সক্ষমতা। কী ভাবে কম্পিউটার প্রোগ্রামিং করতে হয় এবং
অন্তত যে কোন একটি প্রোগ্রামিং ভাষায় দক্ষতা অর্জন করতে হবে। ভার্চুয়াল-রিয়েলিটি, রবোটিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
ইত্যাদি সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকতে হবে এবং স্কুলে/কলেজে এ বিষয়ে একাধিক প্রকল্প
সম্পন্নের অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হবে।
৬) কম্পিউটার
সংক্রান্ত আনুষঙ্গিক বিষয় জানতে হবে।
৭) ফটোগ্রাফি
জানতে হবে। কেমন করে ভিডিও তৈরি করতে হয় সে সম্পর্কে বুৎপত্তি থাকতে হবে।
৮) সোশাল-মিডিয়া
কেমন করে নিপুণভাবে ব্যবহার করতে হয় জানতে হবে।
৯) ইন্টারনেট বা
ক্লাউড থেকে সঠিক তথ্য কী ভাবে আহরণ, সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ করতে হয় জানতে হবে।
১০) পৃথিবী
সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে। পদার্থবিদ্যা, রসায়নবিদ্যা, ভূগোল, পরিবেশ, সাহিত্য, চারুকলা, রান্না, সংগীত সহ অন্যান্য সব
বিষয়ে শিক্ষার্থীদের মৌলিক শিক্ষা দিতে হবে। নিজ নিজ প্রবণতা, উৎসাহ, ও মেধার ভিত্তিতে
শিক্ষার্থীরা নিজেরা কী কী বিষয়ে বিশেষজ্ঞটা অর্জন করতে চায় সেটা ঠিক করবে। এখানে
একটা বিষয় বলা প্রয়োজন যে ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রে একেকজনকে একাধিক বিষয়ে
দক্ষতা থাকতে হবে যেন প্রয়োজন হলে অন্য কাজও করতে পারে। সব সময় নতুন
বিষয়ে দক্ষতা অর্জনের চেষ্টা চিরজীবন যেন চালিয়ে যেতে পারে সে বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করতে
হবে।
১১) মানুষে-মানুষে সম্পর্ককে কী ভাবে স্থাপন, প্রতিপালন, ও উন্নয়ন করা যায় শিক্ষার্থীদের শেখাতে হবে।
১২) সব জীবের
প্রতি সহানুভূতি জাগিয়ে তুলতে হবে।
১৩) জাতি, ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণী, ও জাতের ভেদাভেদ শেখান
যাবে না। সবাইকেই সমানভাবে সম্মান করতে শেখাতে হবে।
১৪) অনমনীয় শৃঙ্খলা শেখানো যাবে না। যে কোন বিষয়ে অনমনীয়তা পরিহার করতে হবে। আলাপ, আলোচনা, ও যুক্তির মাধ্যমে শৃঙ্খলার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরতে হবে। জোর করে শৃঙ্খলা চাপিয়ে দিয়ে শিশুর অনুসন্ধিৎসু মনকে দমিয়ে দেওয়া যাবে না।
উপরে উল্লিখিত
গাইডলাইন অনুসরণের মাধ্যমে কী ভাবে স্কুলে পাঠদান করা হবে সেটি নির্ধারণ করতে হবে।
একটি শিশুর বিকাশে প্রাথমিক স্তর থেকে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত সময় সবচেয়ে
গুরুত্বপূর্ণ। কাজেই স্কুলে কী শেখান হবে সেটাই গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে।
এখানে আরেকটা কথা
বলে রাখা ভাল। এই লেখাটি ২০২০ সালের জুনের শেষে লেখা। আজ থেকে ৫ বছর পরে হয়ত অনেক
কিছুর পরিবর্তন হবে এবং তখনকার পরিপ্রেক্ষিতে আবার নতুন করে অনেক কিছুর সংযোজন
করতে হতে পারে।
এখন স্কুলের জন্য
কিছু পরামর্শ সুপারিশ করছি।
১) কোন ক্লাসেই
কোন পাঠ্যসূচি থাকবেনা। তার বদলে শিক্ষাবর্ষ শেষে একজন শিক্ষার্থী কী কী কাজ বা
দক্ষতা অর্জন করতে হবে সে দিকে নজর দেওয়া হবে। কাজেই পাঠ্যসূচির বদলে সময়ের সাথে দক্ষতা অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে।
২) গতানুগতিক
পাঠ্যপুস্তক ভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম চলবে না। পাঠ্যপুস্তক থাকবে না। প্রত্যেক
বিষয়ে শিক্ষকদের ব্যবহারের জন্য লিখিত নির্দেশিকা থাকবে এবং শিক্ষকরা এই
নির্দেশিকার মাধ্যমে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করবে। প্রত্যেক বছর পর্যালোচনা
পূর্বক পাঠ্যসূচির/নির্দেশনার পরিবর্তন, পরিবর্ধন, ও সংশোধন করতে
হবে। কেননা ভবিষ্যতে পরিবর্তন এতটাই গতিশীল হবে যে অর্জিত জ্ঞানের মেয়াদ সীমিত হয়ে
পড়বে এবং প্রতিনিয়ত নিজের জ্ঞানকে হালনাগাদ করতে হবে।
৩) ইন্টারনেট, ভিডিও, অডিও, কম্পিউটার গেইম, বিভিন্ন
খেলা, ইত্যাদির সমন্বয়ে শিক্ষার মাধ্যম তৈরি করতে হবে। এর
উদ্দেশ্য হচ্ছে দৈনন্দিন শিক্ষার মাধ্যমেই শিক্ষার্থীদের উপরিউক্ত বিষয়ে দক্ষতা
অর্জনে সহায়তা করা।
৪) প্রাথমিক স্তর
হতে উচ্চতর স্তর পর্যন্ত কী ভাবে বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া হবে তা নির্ধারণ করা
হবে। এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে চাই না কারণ আমি শিক্ষা বিশারদ নই।
৫) পরীক্ষা থাকবে কিন্তু পরীক্ষার ফলাফল শিক্ষার্থীদেরকে জানানো হবে না। পরীক্ষার উদ্দেশ্য হবে শিক্ষকরা যেন প্রত্যেক শিক্ষার্থীর অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে পারে। শিক্ষক ও স্কুল কর্তৃপক্ষের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে প্রত্যেক শিশুর স্বাভাবিক প্রবণতা কোন কোন বিষয়ে দৃশ্যমান সেটা চিহ্নিত ও লিপিবদ্ধ করা, অভিভাবকদেরকে এ বিষয়ে অভিহিত করা এবং সে সব বিষয়ে দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করা। শিশুর সুশম সৃজনশীল শিক্ষায় পিতা ও মাতাকে অবশ্যই সম্পৃক্ত করতে হবে।
৬) গতানুগতিক চাকরী অনেক সংকুচিত হয়ে পড়ার ফলে যে সমস্ত পেশা আগে বিবেচনায় আসেনি, অথবা যে সব নতুন পেশার সৃষ্টি হবে সে সব নিয়ে ভাবতে হবে এবং সেগুলোকে শিক্ষাব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে।।
৭) একটি উৎপাদন ভিত্তিক সমাজব্যবস্থায় একজনের সামাজিক মর্যাদা নির্ভর করে উৎপাদন প্রক্রিয়ার কোন স্তরে তার অবস্থান; অবস্থান যত উপরের স্তরে, সামাজিক সম্মান তত বেশী। এই অবস্থান অবশ্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে হতে পারে। যেমন একজন পদস্থ সরকারী কর্মকর্তা বা রাজনীতিবিদ প্রত্যক্ষভাবে উৎপাদন প্রক্রিয়ার সাথে সম্পৃক্ত না থাকলেও বিভিন্ন অনুমতি, আদেশ, নির্দেশ, বাধা-নিষেধ ইত্যাদি তাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবার ফলে পরোক্ষভাবে উৎপাদন প্রক্রিয়ার উপরে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে।
৮) ধারণা করা যায় ভবিষ্যতে এই সামাজিক মর্যাদার স্তরবিন্যাসের আবার আমূল পরিবর্তন হবে। একটু পিছনে দেখলেই বুঝতে পারব যে গত ১০০-বছরে সামাজিক মর্যাদার মাপকাঠি কী ভাবে বিবর্তিত হয়েছে। আগে সামাজিক মর্যাদার নির্ণায়ক ছিল নবাব, জমিদার, খান বাহাদুর, রায় বাহাদুর, ইত্যাদি নির্ভর। তার কিছুদিন পরে সেটার পরিবর্তন হয়ে সরকারি চাকুরীজীবী, রাজনীতিবিদ, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বা অন্য পেশাজীবীদের হাতে চলে যায়। এই সময় ব্যবসায়ী, ঠিকাদার, মিল মালিক, ইত্যাদির সামাজিক মর্যাদা খুবই নীচের স্তরে ছিল। বর্তমানে আবার এটি পরিবর্তিত হয়ে বণিক/ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, রাজনীতিবিদ, সরকারি কর্মচারী, পেশাজীবী, ইত্যাদির উপরে নির্ভরশীল। মূল কথা হচ্ছে সম্পদের পরিমাণ ও ক্ষমতাই হচ্ছে সামাজিক মর্যাদার নির্ণায়ক।
৯) আমারা যতই
শিল্পযুগ (Industrial
Age) থেকে তথ্যের যুগে
বা জ্ঞানের যুগে (Information Age) ধাবিত হব, ততই শিল্পযুগে
গড়ে উঠা সামাজিক স্তরের পরিবর্তন হবে। একটি উদাহরণ দিয়ে বুঝানোর চেষ্টা করা যাক।
অ্যামাজন (Amazon)
নামে একটি
কোম্পানির কথাই ধরা যাক। ১৯৯৪-সালে প্রতিষ্ঠিত অ্যামাজনের ২০১৮-সালের বার্ষিক
রাজস্ব ২৩২ বিলিয়ন ডলার (১৯,৭২০০০ কোটি
টাকা)। অ্যামাজন কোন দ্রব্য তৈরি করে না। অ্যামাজনের প্রধান পণ্য সেবা। গুগল (Google) সম্পর্কেও একই কথা বলা
যায়। এর সাথে যদি আমরা এর আগের প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি যেমন ১০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী আই
বি এম (IBM)-এর সাথে তুলনা করি তাহলে
দেখি IBM ৭৭-বিলিয়ন ডলারে আটকে
আছে!
উপরের আলোচনা
থেকে বুঝা যাচ্ছে যে সৃজনশীল কর্মক্ষম মানুষ তৈরি করতে হলে আমাদের সবাইকে এগিয়ে
আসতে হবে। শুধু স্কুল বা কলেজের একার পক্ষে এ কাজ সঠিক ভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব না কারণ এটা তাদের একার দায়িত্ব না।
মা ও বাবা একটি
শিশুর বিকাশে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শিশু তার মা এবং বাবাকেই আদর্শ
বিবেচনা করে এবং তাদের অনুকরণের চেষ্টা করে। তাই মা ও বাবাকেও এই ব্যাপারে
সংবেদনশীল করে তুলতে হবে।
উপরোক্ত
সুপারিশসমূহ একদিনে বাস্তবায়ন করা যাবে না। কমপক্ষে পাঁচ থেকে দশ বছর মেয়াদের
পরিকল্পনার প্রয়োজন হবে এবং এর অপরিসীম জটিলতার কারণে একাধিক প্রকল্পের মাধ্যমে পরিকল্পিত ভাবে ধাপে ধাপে এর বাস্তবায়ন করতে হবে।
এই রূপান্তরের
জন্য নতুন প্রাণচঞ্চলে উদ্দীপ্ত, দেশপ্রেমে
উদ্ভাসিত, শিক্ষিত, স্বার্থত্যাগী, কলুষযুক্ত, ও সাহসী তরুণদের
নেতৃত্বের প্রয়োজন। অত্যন্ত দুঃখের সাথে স্বীকার করতে হচ্ছে বর্তমানের এই বস্তাপচা, দুর্নীতিবাজ, অশিক্ষিত, স্বার্থপর, স্বজনপ্রীতিতে দুষ্ট
নেতৃত্বের দ্বারা সমাজের এই মৌলিক পরিবর্তন সম্ভব না।
লেখা যখন প্রায় শেষ তখন নিজের লেখা পড়ে মনে হচ্ছে যে যেখানে আমরা সমাজের সহজ সমস্যাগুলো যেমন দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, আইনের শাসন, রাজনৈতিক স্বেচ্ছাচার, ক্ষমতার অপব্যবহার, ইত্যাদির সমাধান করতেই বার্থ সেখানে উপরে উল্লিখিত বৈপ্লবিক পরিবর্তনের কল্পনা করাও হয়ত আকাশ কুসুম চিন্তার সামিল। আমরা যে দুর্নীতি, অযোগ্যতা ও উন্নাসিকতার পাহাড় গড়েছি সেই মাপকাঠিতে বিচার করলে প্রস্তাবিত রূপান্তর প্রায় অসম্ভব বলেই মনে হয়। কিন্তু আশা খুবই ক্ষীণ হলেও আশা তো ছাড়া যায় না।
কী বলেন?
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন