অমরত্ব

 

অমরত্ব

 অমরত্ব কী? কোন নশ্বরের পক্ষে কি অবিনশ্বর হওয়া সম্ভব? আমরা জানি জন্ম মানেই মৃত্যু। মুদ্রার এক পিঠ যদি হয় সৃষ্টি তাহলে অপর পিঠ অবশ্যই ধ্বংস। জন্মালে মরতেই হবে। কিছু সৃষ্টি হলে বা করলে তার ধ্বংস অবধারিত এটাই জগতের নিয়ম এবং এর ব্যত্যয় এখনো হয়নি। কিছু কিছু জীব অবশ্য আছে যারা অনেক দিন বাঁচতে পারে কিন্তু তার পরেও মরতে হয়। একটা জীবের কথা আমি জানিএক ধরনের জেলি ফিস (jelly fish)--যেটা অনির্দিষ্ট কালের জন্য বাঁচতে পারে, কিন্তু তার পরেও সম্পূর্ণ অমর না। বিজ্ঞানের উন্নতির ফলে হয়ত একদিন মানুষের আয়ুষ্কাল অনেক বৃদ্ধি পাবে কিন্তু অমরত্ব হয়ত লাভ করতে পারবেনা। পাঁচশত বা এক হাজার বছর বাঁচলেও না। চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতির সাথে সাথে মানুষের আয়ুষ্কালের অনেক বৃদ্ধি হয়েছে। ১৯০০ সালের দিকে যেখানে মানুষের গড় আয়ু ছিল মাত্র ৩১ বছর সেখানে এখন ২০১৭-সালে গড় আয়ু বেড়ে ৭২ বছর হয়েছেকিছু কিছু উন্নত দেশে এটা আরও বেশী। আমরা কিন্তু গড় আয়ুর এই বৃদ্ধিতেও সন্তুষ্ট না। আমরা আরও বেশী বাঁচতে চাই। মানুষ মৃত্যুকে ভয় করে, মৃত্যু অবধারিত জেনেও মরতে ভয় পায়। সে জন্যই মনে হয় মানুষের গড় আয়ুষ্কাল বেড়ে ১,০০০ বছর হলেও মানুষ আরও বাঁচতে চাইবে। কিন্তু এই জৈব রাসায়নিক শরীর নিয়ে মনে হয় না অমরত্ব লাভ করতে পারবে। কোন দিন যদি এই জৈব রাসায়নিক শরীর পরিবর্তন করে অন্য কোন ধরনের, যেমন ডিজিটাল বা আরও উন্নত প্রযুক্তিতে রূপান্তর করতে পারে, তাহলে হয়ত অপার্থিব অমরত্ব লাভ করতে পারে।

 আমাদের এখনও অনেক কিছুই অজানা। যেমন টিকটিকির লেজ খোয়ালে আবার লেজ গজায় কিন্তু মানুষের কোন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ খোয়ালে কেন আবার গজানো যাবে না? এর সব রহস্য আমাদের জিনের ৪০০ কোটি সমাহারে মধ্যে লুকানো। বিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যে ৪০০ কোটি জিনের সমাহারের বিন্যাস করেছেন। এখন বিজ্ঞানীরা এই ৪০০ কোটি সমাহারের প্রত্যেকটির কী কাজ করে সেটা বের করার প্রচেষ্টা করছেন। মানুষের জিন তার এই রহস্য সহজে উধঘাটন করতে দিতে চাচ্ছে না। কিন্তু বিজ্ঞানীরাও নাছোড়বান্দা, কাজেই মনে হয় না খুব বেশী দিন এই রহস্য ধরে রাখতে পারবে। আমাদের জিনের এই ৪০০ কোটির সমাহার আশ্চর্যজনকভাবে একটি খুবই জটিল কম্পিউটারের প্রোগ্রামের মতোকাজেই অদূর ভবিষ্যতে বিজ্ঞানীরা জিনের অন্তর্নিহিত অর্থ উদঘাটনে সক্ষম হবেন বলেই আমার ধারণা।

 আমরা যখন জানতে পারব তখন কী হতে পারে? তখন সম্ভবত অনেক কিছুই সম্ভব হবে যেমন চিরযৌবন লাভ করা অথবা কোন কোন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ খোয়া গেলে আবার গজানো, যে কোন রোগবালাই থেকে মুক্ত থাকা, মাছের মতো পানিতে ডুবে সাতার কাটা, এবং অনেক কিছু যেটা এখন আমাদের কল্পনাও করতে পারি না। কিন্তু এত সবের পরেও খুব সম্ভবত অমরত্ব সম্ভব হবে না। কেননা তার পরেও অনেক কারণে, যেমন কোন ধরনের দুর্ঘটনায় মৃত্যু হোলে হয়তো ঠেকান যাবে না।    

 মানুষের পক্ষে শারীরিক অমরত্ব লাভ করতে না পারলেও কিছু লোকের পক্ষে আপেক্ষিক অ-শারীরিক অমরত্ব মনে হয় অর্জন করা সম্ভব।

 তাহলে কারা এরা?

 আমার ধারনা এরা সেই সব সৃজনশীল মানুষ যারা এমন কিছু সৃষ্টি করেন যেটা হাজার হাজার বছর পরেও মানুষকে অনুপ্রাণিত করে, প্রেরণা যোগায়, উদ্বেলিত করে, বিস্ময়ে মানুষ তাদের সৃষ্টি কর্ম দেখে, পড়ে, ও শুনে চমৎকৃত হয়।

 এরা হচ্ছে কবি, সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, গায়ক, সঙ্গীত লেখক ও পরিচালক, চিত্রশিল্পী, সিনেমার নায়ক, সিনেমার পরিচালক, ফটোগ্রাফার, স্থপতি, নাট্যকার, নাট্যশিল্পী, চিন্তাবিদ, দার্শনিক, বিজ্ঞানী, বিশিষ্ট সেনাপতি ও রাষ্ট্রনায়ক, সমাজ সংস্কারক, ও ধর্ম প্রচারক। অবশ্য এদের সবাইকেই তাদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে বিশেষ নৈপুণ্য দেখাতে হবে। এই ধরনের লোকদের যে প্রতিভা সেটা সাধারণত কোনো স্কুল বা কলেজে শেখা যায় না। বিধাতা কিছু মানুষকে এই গুনাগুণ দিয়েই মর্তে পাঠান। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা এই প্রতিভাকে কোন কোন ক্ষেত্রে আরও শানিত করতে পারেকিন্তু অনেকের বেলায় তার দরকার হয় না।

 কিন্তু এত সবের পরেও সব অমরত্ব হচ্ছে আপেক্ষিক। উদাহরণ স্বরূপ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অনেক আদ্ভুত সুন্দর স্থাপনার অস্তিত্ব দেখা যায় যেগুলো কে বা কারা বানিয়েছিল তা আমরা জানি না। আবার অনেক সময় আমরা জানতে পারি কোন রাজা, মহারাজা, বাদশাহ, সুলতান, বা ফারাওয়ের আমলে তৈরি হয়েছে কিন্তু কোন শিল্পী, স্থপতি, কারিগর এসব বাস্তবায়ন করেছে সেটা আমাদের জানা হয়ে ওঠেনি। এখন পর্যন্ত মানব সভ্যতার জানা ইতিহাস, খুব টানাটানি করলে, ১০,০০০ বছর পর্যন্ত যেতে পারে।

 কালের গহ্বর এক সময় সবকিছুকেই গ্রাস করে, কেননা সময়ের মতো সময় তো আর কারো নেই।   

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পরিবর্তন ও প্যারাড়াইম

আজিমপুরের দুর্দান্ত যোদ্ধারা, পঞ্চম পর্ব

আজিমপুরের দুর্দান্ত যোদ্ধারা, চতুর্থ পর্ব