প্রিয়তমা আমার
প্রিয়তমা আমার
লিপিরা যখন আমাদের পাশের বাসা ভাড়া নেয়, আমি তখন নবম শ্রেণিতে পড়ি। লিপি তখন খুব সম্ভবত পঞ্চম বা ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে।
লিপিদের বাসাটা আমাদের বাসার মতো একতালা, সামনে একটি
সুন্দর ঘাসে মোড়া লন। লিপিরা দুই বোন, লিপি আর ছবি; লিপি,
ছবি থেকে তিন বা চার বছরের ছোট. লিপির কোনো ভাই নেই। এভাবেই
কয়েক বছর কেটে যায়। যতই দিন যেতে থাকে আমি লিপিকে ক্রমেই পছন্দ করতে শুরু করি, এই পছন্দ করাটা লিপি যখন নবম শ্রেণিতে তখন বন্ধুত্বের সম্পর্কে পরিণত হয়।
লিপির সাথে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয় যখন আমি লিপিদের বাসায়
যেয়ে লিপিকে অঙ্ক শেখাতে শুরু করি। লিপি তখন নবম শ্রেণিতে পড়ে। লিপি ভাল ছাত্রী
ছিল এবং সহজেই অঙ্ক বুঝতে পারত। লিপিকে অঙ্ক শেখানোর প্রয়োজন ছিল বলে আমার কিন্তু
মনে হয় না। কিন্তু লিপি নিজেই স্বপ্রণোদিত হয়ে তার মাকে রাজি করিয়েছিল। আমিও লিপির
আরেকটু কাছাকাছি যেতে পারে খুশীই ছিলাম। লিপি ও ছবি দুজনেরই আমাদের বাসায় অবাধ
যাতায়াত ছিল। আমার বাবা ও মা’র কোনো মেয়ে ছিল না বলে
দুজনেই তাদেরকে মেয়ের মতোই স্নেহ করতেন। লিপি ঘন ঘন আসতো, আমি বাসায় না থাকলেও আসতো, মার সাথে গল্প করত। দুই
পরিবারের মাঝে ভাল সম্পর্ক ছিল। মা ভাল কিছু রান্না করলে লিপিদের বাসায় পাঠাতেন, লিপির মা-ও পাঠাতেন।
লিপি শ্যামবর্ণ, ছিপছিপে, মুখ ডিম্বাকৃতি লম্বাটে ধরণের, বড় বড় চোখ, খাঁড়া নাক,
নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় লিপি তখনই লম্বায় প্রায় পাঁচ ফুট চার
ইঞ্চি, অর্থাৎ লিপি দেখতে,
বিশেষ করে আমার চোখে সে ছিল অপূর্ব সুন্দরী। লিপি যে শুধু
সুন্দরী তাই না,
বুদ্ধিমতী ও একই সাথে ইংরেজিতে যাকে বলে witty। একটি উদাহরণ দেই,
একদিন পড়াতে যাবার পর লিপি আমার জন্য কয়েকটা সমুচা আর এক
গ্লাস পানি নিয়ে এলো। প্লেট আর গ্লাস টেবিলে রেখে একটু কাঁচুমাচু হয়ে বলল, ‘একটু ভুল হয়ে গেছে,
পানিটা একটু ভেজা’। আমি একটু অন্যমনস্ক ভাবে
বললাম,
“ও আচ্ছা”। বলেই মনে হলো আরে বলে কী, পানি ভেজা?
তার দিকে তাকাতেই সে খিলখিল করে হেঁসে উঠল। সে মাঝে মাঝে এই
ধরনের দুষ্টামি করত।
লিপির বাবা ছিলেন ব্যবসায়ী। ব্যবসার কাজে ব্যস্ত থাকতেন, বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত হতো। মাঝে মাঝে দেশের বাইরে যেতেন। লিপির মা আমাকে পছন্দ করতেন। আমাকে দেখলেই সস্নেহে আমার ভাল মন্দের খোঁজ নিতেন, কিছু একটা খাওয়ার জন্য সাধতেন। লিপিকে দেখাশোনা করত মূলত তার বড় বোন ছবি। ছবি লিপিকে খুবই স্নেহ করতো। আমার সাথে ছবির ভাল সম্পর্ক ছিল।
আমি লিপিকে সপ্তাহে তিন দিন পড়াতে যেতাম, রবি,
মঙ্গল, ও বৃহস্পতি। লিপি যেন
আমার আসার জন্যই অপেক্ষা করত। আমি পৌছলেই আমাকে নিজের বানানো কিছু খেতে দিত। খাওয়া
শেষ হলে এক কাপ গরম চা। খাওয়া শেষ হলে তবেই পড়া। আমার হালকা পাতলা গড়ন দেখে লিপি
আমাকে মাঝে মাঝে তাল পাতার সিপাই বলত। ছবি সবই খেয়াল করত কিন্তু আমাকে আকার
ইঙ্গিতেও কোনোদিন কিছু বলেনি।
অবশ্য আমাকে অপছন্দ করার কারণ খুঁজে বের করা কষ্টকর। আমি
ভাল ছাত্র,
ছিপছিপে, লম্বা, প্রায় ছয় ফুট লম্বা,
উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ, সবাই বলে দেখতে
আমি সুদর্শন,
ভদ্র ও মার্জিত, সচ্ছল ভদ্র
পরিবারের বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান, সামনে উজ্জ্বল
ভবিষ্যৎ। তাছাড়া খেলাধুলাতেও আমার ভাল দখল ছিল—বিশেষ করে ক্রিকেটে ও
ফুটবলে। আমি ভাল ডিবেটার,
আমি বেশ কয়েক বছর যাবত জুডো শিখি এবং ইতোমধ্যে
ব্ল্যাক-বেল্ট অর্জনে সক্ষম হয়েছি। অনেক মেয়েরাই আমার সাথে সম্পর্ক করতে চাইত
কিন্তু লিপির সাথে পরিচয়ের পর অন্য মেয়ের প্রতি আমার দূর্বলতা হয়নি।
একদিন একটা মজার ঘটনা ঘটে। আমি কলেজ থেকে ফিরছিলাম। তখন
প্রায় সন্ধ্যা হবে,
রাস্তার লাইট জ্বালানো হয়ে গেছে। হঠাৎ দুটি ছেলে আমার পথ
রোধ করে দাঁড়াল। একজন একটু মোটাসোটা, নাদুস-নুদুস
ধরণের, অপরজন একটু খাটো,
গোল মতো মুখ, মধ্যম গড়ন,
বেল বটম প্যান্ট পরা, আর সবচেয়ে
দর্শনীয় হচ্ছে তার চুলের বাহার। সেই সময় ওয়াহিদ মুরাদ নামে পশ্চিম পাকিস্তানি এক
সুদর্শন নায়ক ছিল। সেই নায়ক এক বিশেষ ভাবে তার চুল আঁচড়াত। অনেক ছেলেরাই ওয়াহিদ
মুরাদের অনুকরণে চুল আঁচড়ানোর চেষ্টা করত। আমার সামনে দাঁড়ানো হিরোর চুল ছিল সেই
রকম।
আমাকে থামাতেই আমি কোনো কথা না বলে প্রশ্নবোধক চোখে তাদের
দিকে তাকিয়ে রইলাম। তারা হয়ত মনে করেছিল আমাকে রাস্তায় দাড়া করানোর পর আমি ঘাবড়ে
যাব, জানতে চাইব। আমি কিছুই না করে নির্লিপ্ত ভাবে তাদের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকার পর ওয়াহিদ মুরাদ বেশ একটু ভারিক্কী চাবে জানতে চাইলো, “তুমি লিপিকে চিনো?”
লিপি সুন্দরী মেয়ে এবং তার প্রতি অনেক ছেলেরাই আকৃষ্ট হবে
এটাই স্বাভাবিক। এই ওয়াহিদ মুরাদ নিশ্চয়ই তাদের একজন। আমি মাথা নেড়ে বললাম, “হাঁ,
চিনি”। বলে আবার চুপ করে
দাঁড়িয়ে রইলাম।
আমাকে এরকম
নির্লিপ্ত ও চুপচাপ থাকতে দেখে হয়ত তারা একটু বিচলিত হলো। কী ব্যাপার এর তো এখন ভয়
পাবার কথা,
ভয় পাচ্ছে না কেন? এবার পাশের সেই
গোলগাল ছেলেটা একটু সামনে এসে দুই হাত কোমরে রেখে, মাথাটা একটু ঝাঁকিয়ে আমাকে প্রায় ধমকের সুরেই বলল, “আর লিপিদের বাসায় যাবা না”। এবার আমি জানতে চাইলাম, ‘কেন?”
গোলগাল ছেলেটা উত্তর দিল, “অসুবিধা আছে।“
আমি আবার জানতে চাইলাম, “কী অসুবিধা?”
এইবার ওয়াহিদ মুরাদ বেশ রুক্ষভাবে প্রায় চেঁচিয়ে বলল, “বললাম না অসুবিধা আছে,
ক্ষতি হবে, ক্ষতি হবে”। সে হাত এদিক ওদিক নাড়িয়ে আমাকে সাবধান করে দিল। আমি নির্লিপ্তভাবে চুপ করে
রইলাম। ওরা দুজন চলে যেতে উদ্যত হলে আমি তাদেরকে থামালাম, “একটু এদিকে আস”। তারা দুজন ঘুরে দাঁড়িয়ে মোটামুটি রাগান্বিত ভাবে একটা ভাব নিয়ে দু-পা এগিয়ে
এলো। আমি খুব শান্ত গলায় তাদেরকে জিজ্ঞেস করলাম, “তোমরা আমার ভাল মতো খোঁজ খবর নিয়ে এসেছ তো? ওরা আমার দিকে
জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। দেখো তোমাদেরকে হয়ত কেউ বলে নাই যে আমি জুডোতে
ব্ল্যাক-বেল্ট। আমি চাইলে এখনই তোমাদের দুজনকেই পিটিয়ে এই রাস্তায় শুইয়ে রাখতে
পারি। কিন্তু যেহেতু ধরে নিচ্ছি তোমরা জানো না তাই আজকে ছেড়ে দিলাম। এর পরে যদি
কোনো দিন আবার দেখি তাহলে কিন্তু আর ছাড়ব না। এখন যাও”। আমি এতক্ষণ তাদের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলছিলাম, লক্ষ্য করলাম আমার কথা শেষ হবার আগেই তাদের চোখের উজ্জ্বলতা কেমন যেন মিয়য়ে
গেল। আর কথা না বলে দুজনই ঘুরে হাটতে শুরু করল। তাদেরকে অবশ্য আর কোনো দিন দেখিনি।
লিপিকে এই ঘটনার কথা আমি বলিনি, বলার প্রয়োজন মনে হয়নি।
লিপি যখন স্টার মার্ক পেয়ে মাধ্যমিক পাশ করলো তখন আমি
বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র।
এভাবেই যখন সুখে শান্তিতে আমাদের দিন কাটছিল তখন কি আমরা
কেউ ভাবতে পেরেছিলাম যে শীঘ্রই এক মহাপ্রলয়ে আমাদের সাজানো ফুলের বাগান লণ্ডভণ্ড
হয়ে যাবে?
২৫ মার্চ ১৯৭১-এর কালরাত্রি
২৫-শে মার্চের রাতে প্রচণ্ড গোলাগুলির শুরু হলে লিপিরা সবাই
আমাদের বাসায় চলে আসে কারণ আমাদের বাসার সামনের দিকটা উঁচু দেয়াল ঘেরা ছিল। যাই
হোক রাতটা কোনো রকমে পার হলো। পরের দিন দিন-রাত্রি কারফিউ। ২৭-তারিখে সকালের দিকে
কয়েক ঘণ্টার জন্য কারফিউ তুলে নেয়া হয়। বাবা ও মায়ের অনিচ্ছা স্বত্বেও আমি
পাকিস্তানিদের নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞের নিজে দেখতে বাসা থেকে বের হলাম। ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল, সামসুননাহার হল, ইকবাল হল,
ইত্যাদি দেখে প্রায় দুঘণ্টা পরে বাসায় ফিরি। তখন আমার মাথা
ভোঁভোঁ করছে। প্রতিশোধ ছাড়া অন্য কিছু চিন্তা করতে পারছি না। বর্বর পাকিস্তানিদের
উপযুক্ত জবাব দিতে হবেই।
ফিরে এসে দুইদিন রাগে ও ক্ষোভে অন্য কিছু চিন্তা করতে
পারছিলাম না। লিপি কয়েকবার এসে খোঁজ নিয়ে গেছে, কিন্তু লিপির
সাথে ভালভাবে কথাই বলা হয়নি। তারপরে রেডিওর মাধ্যমে যখন জানলাম প্রতিরোধ যুদ্ধ
শুরু হয়েছে,
তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত নিলাম আমি যুদ্ধে যাব। প্রথমেই লিপিকে
বললাম। লিপি শুনেই কান্নাকাটি শুরু করল। তাকে অনেক বুঝালাম। বললাম দেখ, আমাদের দেশ এখন চরম সঙ্কটে। এখন আমরা যারা সক্ষম তারা যদি এগিয়ে না যাই, তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে কী জবাব দিব? অনেক বুঝানোর পর অবশেষে লিপি খুবই অনিচ্ছায় অনুমতি দিল।
এর পর হচ্ছে বাবা আর মাকে বুঝানো ও অনুমতি নেয়া। বাবাকে
বলতেই বাবা বললেন অবশ্যই যাবে। আমার বয়স থাকলে আমিও তোমার সাথে যেতাম। কিন্তু মা
তার একমাত্র সন্তানকে বিপদে ঠেলে দিতে চাইলেন না। কিন্তু মা আমার স্বভাব জানতেন যে
একবার কোনও সিদ্ধান্ত নিলে আমার নড়চড় হয় না। যাই হোক, পরিশেষে মা-ও আমাকে সম্মতি দিলেন। আমি এপ্রিলের ৩ তারিখে সবার কাছ থেকে বিদায়
নিয়ে চলে গেলাম।
অনেক চড়াই উৎরাই পার হবার পর প্রশিক্ষণ শেষে আমার যুদ্ধ
শুরু হলো। কিন্তু এই ডামাডোলে প্রথম দুই মাস ঢাকায় চিঠি পাঠানো সম্ভব হয়নি। এই সময়
আমরা ছিলাম ভারতের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ও জঙ্গলে। চিঠি পাঠানোর বা পাবার কোনো
ব্যবস্থাই ছিল না। কাজেই ঢকার সাথে কোনো যোগাযোগ সম্ভব হয়নি। লিপির কথা প্রত্যেক
দিন মনে হতো,
কিন্তু আমার কিছু করার ছিল না।
ঢাকায় প্রথম চিঠি পাঠাতে পারলাম অগাস্ট মাসে—দুটি চিঠি,
প্রথমটা লিপিকে আর পরেরটা বাবাকে। ঢাকাগামী এক গেরিলা দলের
মাধ্যমে এই চিঠি পাঠাই,
কিন্তু চিঠির কোনো উত্তর পাইনি। ডিসেম্বরে ঢাকায় ফেরার আগে
কারো সাথে যোগাযোগ করতে পারিনি।
যুদ্ধ শেষে ২৮-সে ডিসেম্বর ঢাকায় ফিরে এলাম। আমি তখন খুবই ক্লান্ত, শীর্ণ,
ও অবসাদগ্রস্ত। এতদিন পর বাসায় ফিরে আসছি, বাবা মা,
লিপির সাথে দেখা হবে এই আনন্দে আমি আত্মহারা হয়ে বাসার দিকে
ছুটছি। যুদ্ধ শেষে বীরের বেশে ছেলে ফিরে আসছে। মা বাবা কতই না খুশী হবেন। কতদিন
পরে আবার লিপিকে দেখতে পাবো। এই সব চিন্তা করতে করতে ক্লান্ত হলেও উদগ্রীব হয়ে
বাসায় ফিরে চলেছি।
বাসায় পৌঁছে দেখি বাসা তালাবন্ধ। আমার একবার মনে হলো নিরাপদ
আশ্রয়ের জন্য বাবা,
মা,
হয়ত অন্য কোথাও গিয়েছেন। কিন্তু, একটু পরেই পড়সিদের কাছ থেকে যা জানতে পারলাম তা-তে
মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। আমার বাবাকে
পাকিস্তানিরা সেপ্টেম্বর মাসের ১২ তারিখে বাসা থেকে ধরে নিয়ে যায়। তারপর থেকে তাঁর
কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। আমার মা, যার আগে থেকেই হার্টের
মামুলি সমস্যা ছিল,
এই কষ্ট সইতে না পেরে বাবার অন্তর্ধানের এক মাসের মধ্যেই
হার্টফেল করে মারা যান।
এদিকে এপ্রিল মাসের শেষের দিকে লিপির বড় বোন ছবি
ইউনিভার্সিটি যাবার পর আর ফিরে আসেনি। অনেক খোঁজাখুঁজি করার পরও কোনো সন্ধান
মেলেনি। ছবিকে হারিয়ে লিপির বাবা-মা প্রায় পাগলের মতো হয়ে যান। এই ঘটনার কিছুদিন
পর হঠাৎ একদিন কাউকে কিছু না বলে, বাড়ি-ঘর সবকিছু ফেলে
সবাইকে নিয়ে উধাও হয়ে যান। তাদের খবর আর পাওয়া যায়নি।
আমার তখন প্রায় পাগলের মতো অবস্থা। আমি মাথার চুল ছিঁড়তে
লাগলাম। নিজেকে দোষ দিতে থাকলাম। আমি যুদ্ধে না গেলে হয়ত আমার বাবা-মা-কে বাঁচাতে
পারতাম। ছবিকেও হয়ত খুঁজে পেতাম। এই যুদ্ধ আমার সবকিছু শেষ করে দিল।
ঢাকায় এখন আমার থাকার যায়গাও নাই। বাসা খালি পড়ে থাকায় সব কিছু লুটপাট হয়ে গেছে। এক পড়শি আমার অবস্থা দেখে তার বাসায় নিয়ে খেতে দিলেন বলে কিছু খাওয়া হলো। আমার এক বন্ধু গ্রিন রোডে থাকত, আমি টেলিফোনে তার সাথে যোগাযোগ করার কিছুক্ষণের মধ্যেই তার গাড়ি নিয়ে এসে আমাকে তার বাসায় নিয়ে গেল। সে আমার বাবা মায়ের কথা জানত।
এ ভবেই মুক্তিযুদ্ধ আমার জীবনের সবকিছু কেড়ে নিলো। আমি মাকে
হারালাম,
বাবাকে হারালাম, এবং আমার প্রেয়সীকেও
হারিয়ে ফেললাম। আমার জীবনের কী-বা বাকী থাকল?
পরে,
অনেক পরে, বাবার অন্তর্ধানের রহস্য
জেনেছিলাম। বাবার আকবর নামে এক পশ্চিম পাকিস্তানি জুনিয়ার পার্টনার ছিল। সেই লোক
পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কিছু অফিসারদের সহায়তায় বাবার ব্যবসা হস্তগত করার জন্য
বাবাকে গুম করে হত্যা করেছিল। আকবর নামের সেই লোক পক্ষাঘাতে পঙ্গু হয়ে গিয়েছিল। মৃত্যুর
আগে সব দোষ স্বীকার করে তার ছেলেদের বলেছিল আমাদেরকে জানাতে। সেই জন্যই আমি ঘটনাটা
জানতে পারি। আমি অনেক খোঁজাখুঁজি করার পরও বাবার মৃতদেহের কোনো হদিশ করতে পারিনি।
এখনও যখন জানতে পারি যে নতুন কোনো ১৯৭১-এর বধ্যভূমিতে সন্ধান পাওয়া গেছে, সাথে সাথে ছুটে যাই যদি বাবার কোনও সন্ধান মিলে।
যুদ্ধ থেকে ফিরে এক বছর কিছু করতে পারিনি। কিছু করতে ইচ্ছা
করেনি। লিপিদের খোঁজার অনেক চেষ্টা করেছি কিন্তু কেউ কিছু বলতে পারেনি। লিপির কথা
আমি ভুলতে পারি না। একা থাকলেই লিপির চেহারাটা ভেসে ওঠে। ইতোমধ্যে আমি একটি ছোট
বাসা ভাড়া করেছি। বাবার ব্যাংকের একাউন্টগুলো একে একে আমার আওতায় এসেছে, কাজেই টাকার চিন্তা নেই।
আগের বাসায় ফিরে যাবার ইচ্ছে আমার নেই। আমি একমাত্র সন্তান
হওয়া স্বত্বেও আমার দায়িত্ব সঠিক ভাবে পালন করতে পারিনি। আমি আবার সেই স্মৃতি ঘেরা
বাড়িতে কেমন করে ফিরে যাই?
মায়ের কবরে প্রায়ই যাই, কবরের পাশে বসে
কাঁদি আর ক্ষমা চাই।
এভাবে এক বছর নিষ্ক্রিয় থাকার পর আবার ইউনিভারসিটিতে ফিরে
যাই এবং আমার সম্পূর্ণ মেধা দিয়ে পড়াশুনায় মন দেই—পড়াশুনার মাঝে সবকিছু ভুলে যেতে চাই। যাই হোক, চার বছর পরে অত্যন্ত ভাল ফলাফল করার ফলে কমনওয়েলথ বৃত্তি নিয়ে যুক্তরাজ্যে
উচ্চশিক্ষার জন্য যাই এবং তিন বছর পরে শিক্ষা শেষে দেশে ফিরে আসি। এখন আমি একটি
আন্তর্জাতিক সংস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করি। আমাদের পৈত্রিক বাসাটা বিক্রি করে
একটি ফ্ল্যাট কিনেছি—সেখান একা থাকি।
বিয়ে আমি করিনি কারণ লিপি সবসময় আমার হৃদয় দখল করে আছে। তার
জায়গায় অন্যকে স্থান কেমন করে দেই? লিপির একটি মাত্র
ছবি আমার কাছে আছে,
সেই ছবিটা যেটা আমি যুদ্ধে নিয়ে গিয়েছিলাম। সেটাই আমার
লিপির একমাত্র স্মৃতি।
এভাবেই বেশ কয়েক বছর কেটে গেল। আমি বেশিরভাগ সময় হয় কাজে
ব্যস্ত থাকি,
বই পড়ি, তাছাড়া আমার সময় কাটানোর
জন্য বেশ কিছু হবি আছে। আমি সাধারণত একা থাকতে পছন্দ করি। আমার অনেকের সাথে পরিচয়
আছে কিন্তু ঘনিষ্ঠ বন্ধু বলে কেউ নেই। তার পরেও সামাজিকতার ব্যাপার আছে, কেউ কোনো অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানালে অনিচ্ছা স্বত্বেও যেতে হয়। অনেকে বলে সময়ে
সব ঠিক হয়ে যায়। কিন্তু আমার তো ঠিক হবার কিছু নেই—আমি তো ঠিকই আছি। মাঝে মাঝে বেঁচে থাকার যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন জাগে, মনে হয় এভাবে বেঁচে থাকা কি খুবই জরুরি?
আমার চাকরির সুবাদে প্রায়ই বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যেতে হয়, লোকজনের সাথে মিশতে হয়। একদিন একটি পাঁচতারা হোটেলে এইটি ককটেল রিসেপশনে গেলাম। বলরুমে ঢুকে আমি একটি কোল্ড-ড্রিঙ্ক নিলাম। অনেক চেনাজানা লোক, কখনো মাথা নেড়ে,
কখনো হ্যালো বলে, কখনো মৃদু হেঁসে
একটু নিরিবিলি জায়গায় দাঁড়ালাম। আমি চারিদিকে তাকিয়ে দেখছি। অনেক পুরুষ ও মহিলা
ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে বলরুমের চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, সবার হাতে পানীয়ের গ্লাস, কারো হাতে সিগারেট। আমি
আস্তে আস্তে আমার কমলার রসে চুমুক দিচ্ছি, বলরুমের চারিদিকে
চোখ বোলাচ্ছি।
কিছুক্ষণ পরে আমার থেকে বেশ দূরে, প্রায় বলরুমের অন্য প্রান্তে, একটি ছোট দলের দিকে চোখ
পড়ল। গাড় মেরুন শাড়ি পরা,
মাথায় খোপা, চিকন লম্বা
গ্রীবা,
গলায় একটি সরু রুপালী চেইনে সাদা পাথরের ছোট প্যেন্ডেন্ট, দুই বাহুতে দুটি সরু রুপালী চুড়ি, শাড়ীর কাপড়ের
ব্লাউজ,
হাতে ঘড়ি নেই, এমন এক মহিলাকে
ঘিরে কয়েকজন নারী ও পুরুষ দাঁড়িয়ে আছে। এ রকম জটলা-মতো করে অনেকেই এই বলরুমে আছে, কিন্তু কেন যেন আমার দৃষ্টি সেই নিদিষ্ট জটলার দিকে আটকে আছে। মহিলার সম্পূর্ণ
চেহারা আমি দেখতে পাচ্ছি না, শুধু চুল আর মুখের বাম
দিকটা দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু মহিলার দাঁড়ানোর ভঙ্গিমা, ঘাড়টা যেমন করে মৃদু বেঁকিয়ে আছে, মাথাটা যে ভাবে
মাঝে মাঝে নাড়াচ্ছে,
এসব দেখে কেন যেন এই মহিলার দিক থেকে চোখ ফেরাতে পারছিলাম
না। মহিলার সম্পূর্ণ মুখটা দেখার জন্য স্থান পরিবর্তন করলাম। এমন জায়গায় দাঁড়ালাম
যেখান থেকে মুখের সামনের অংশ দেখা যায়। কিন্তু আমারে দৃষ্টিকে বাঁধা দিয়ে একজন লোক
দাঁড়িয়ে থাকায় সম্পূর্ণ চেহারা প্রথমে দেখতে পেলাম না। কিন্তু একটু পরেই সেই লোক
একটু সরলেই মহিলার মুখ দেখতে পেলাম।
মনে হলো প্রচণ্ড ইলেকট্রিক শক খেয়ে আমার সমস্ত শরীর অবশ হয়ে
গেল। আমি বিস্ফোরিত নয়নে সেই মহিলার দিকে তাকিয়ে আছি। যা দেখছি বিশ্বাস হতে চাচ্ছে
না। কিছুক্ষণ এক দৃষ্টিতে ঠায় তাকিয়ে রইলাম। কিন্তু আবার সেই লোক আবার স্থান
পরিবর্তন করার ফলে মহিলার মুখ আরে দেখতে পাচ্ছি বা।
এই মহিলা কি লিপি? যেই লিপি আমার
জীবন থেকে পনের বছর আগে হারিয়ে গিয়েছিল সে হঠাৎ এখানে উদয় হবে কেমন করে?
আমি চিন্তা করছি দুজন মানুষ কি দেখতে হুবহু একরকম হতে পারে? কেননা এই মহিলা দেখতে অবিকল লিপির মতো! এই মহিলা কি লিপি? যদিও মহিলা লিপি থেকে আরেকটু লম্বা—প্রায় পাঁচ ফুট নয় ইঞ্চি, মনে হচ্ছে হিল পরে আছে। লিপির একটা আক্ষেপ ছিল যে সে শ্যামবর্ণ কিন্তু এই
মহিলা উজ্জ্বল শ্যামলা, এমন কি আমার থেকেও
উজ্জ্বল রঙ। পনের বছর আগে লিপি ছিল ছিপছিপে কিশোরী, কিন্তু সামনের মহিলা একজন পরিপূর্ণ আকর্ষণীয়া নারী।
আমি নিশ্চিত হবার জন্য আরেকটু মহিলার কাছাকাছি গেলাম। আমার
অন্তরে এখন এক আকাঙ্ক্ষা ও নিরাশার সংগ্রাম চলছে। একবার মনে হচ্ছে এই মহিলা লিপি; আবার পরক্ষণেই মনে হচ্ছে, না, না,
এ লিপি কেমন করে হবে? আমার হৃদপিণ্ড
ধুপ, ধুপ করছে। এই আশা ও নিরাশার দোটানার সন্ধিক্ষণে আমার করণীয় খুঁজে পাচ্ছি লা।
আমার কপাল দিয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে। পকেট থেকে রুমাল বের করে কপাল ও মুখের ঘাম মুছলাম।
আমার ভিতরে ঝড় বেড়েই চলেছে।
অপলক নেত্রে মহিলার দিকে তাকিয়ে আছি। এ সময়ের অনুভূতি অবর্ণনীয়; আমি মনে প্রাণে চাইছি এ যেন লিপি হয়, কিন্তু পরক্ষণেই আশাভঙ্গের এক প্রচণ্ড উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার আসঙ্ক্ষা আমাকে গ্রাস
করতে চাইছে। আমি সাধারণত ধর্মকর্ম করি না। কিন্তু এখন মনেপ্রাণে সৃষ্টিকর্তার কাছে
প্রার্থনা করছি,
যেমন ফাঁসির কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে এক মৃত্যু পথযাত্রি যেভাবে
বিধাতার কাছে জীবন ভিক্ষা করে, আমি সেই ভাবে প্রার্থনা
করতে থাকলাম এই মহিলা যেন আমার হারানো প্রেয়সী লিপি হয়।
মাঝে মধ্যেই আশাভঙ্গের শঙ্কা ও উদ্বেগ আমাকে চরম উদ্বেলিত
করে ফেলছিল। এই মহিলা যদি লিপিও হয়, এত বছর
পর আমাকে যদি চিনতে না পারে? লিপির সাথে আমার
শেষ দেখা ও কথা ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে—আজ থেকে প্রায় ১৫ বছর
আগে। সেই সময় আমি ছিলাম হ্যাঙলা, পাতলা, মাথায় একগাদা অগোছালো লম্বা লম্বা চুল বিশিষ্ট এক তরুণ। আমাকে কি লিপির মনে
রেখেছে?
আমাকে লিপি কি চিনতে পারবে? তার দিকে তাকিয়ে দোদুল্যমান আমি ঠায় দাঁড়িয়ে আছি, কি করব বুঝতে পারছি না।
এমন সময় আমার এক সহকর্মী বন্ধু আমার পাশে এসে দাঁড়াল। কি
ভাই একা একা কেন?
আমি তখনো মহিলার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি দেখে জিজ্ঞাস
করল, “ঐ ভদ্রমহিলাকে চিনেন”?
আমি মাথা নেড়ে অজ্ঞতা জানালাম। “এই মহিলা ব্যাংকের নতুন পরিবেশ পরামর্শক, এক মাস আগে এসেছে, চলেন আপনাকে পরিচয় করিয়ে দেই“। বলেই আমার হাত ধরে নিয়ে
চলল। আমি তার হাতটা ছাড়িয়ে তার পিছু পিছু সেই ছোট জটলার দিকে অগ্রসর হলাম।
সেই সুন্দরী মহিলা তখন অন্যদের সাথে কথা বলছে, মাঝে মাঝে মাথা নাড়াচ্ছে। আমি তার মুখের বাঁদিকটা দেখতে পাচ্ছি। আমারা এগিয়ে
গেলাম। আমার বন্ধু কাছে পৌঁছে হাঁসি হাঁসি মুখে বলে উঠল হ্যালো, মিস চৌধুরী।
মহিলা মুখটা ঘুরিয়ে আমাদের দিকে ফিরে তাকিয়ে স্মিত হেঁসে উত্তর দিলেন, হ্যালো,
মি: আনোয়ার, কেমন আছেন?
এত কাছে থেকে দেখে ও গলার আওয়াজ শুনে আমার কোনোই সন্দেহ রইল
না—এতো আমার লিপি!
কথা শেষে লিপি আমাকে এক-ঝলক দেখে আবার আমার বন্ধুর দিকে চোখ
ফেরালো। কিন্তু পরক্ষণেই আবার আমার দিকে ফিরে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমার মুখের দিকে
তাকিয়ে রইল,
তার মুখের অভিব্যক্তি ক্রমেই পরিবর্তিত হচ্ছে, প্রথমে চোখ ও ভুরু সংকুচিত হয়ে প্রশ্নবোধক, তারপরে ঠোট দুটো
একটু ফাঁক করে অনিশ্চিত ভাব, তারপর চোখ দুটো
প্রস্ফুটিত হয়ে এক ঝিলিক খেলে গেল। এসব ঘটতে ২-৩ সেকেন্ডে লাগল।
লিপিকে চেনার পর থেকেই আমার অন্তরে কালবৈশাখী বয়ে যাচ্ছে, বিদ্যুতের ঝলক যেভাবে বিশ্বকে মুহূর্তের জন্য পরিস্ফুট করে ফেলে, সেভাবে আমার বিভিন্ন স্মৃতিকে একসাথে জাগ্রত করার ফলে আগ্নেয়গিরির উদগিরণের মত
সবকিছু আচ্ছন্ন করে ফেলছে--সব গুলিয়ে ফেলছে, এই পনের বছরের
পুঞ্জিভূত বেদনা শিলাবৃষ্টির মত আমাকে আঘাত করছে, বিভিন্ন অনুভূতি যেন সব একসাথে কুন্ডলী হয়ে কেমন যেন তালগোল হয়ে আছে। আমি এই
অনুভূতিকে কীভাবে বোঝাবো? অত্যন্ত দুর্লভ কিছু
খুঁজে পাওয়ার উল্লাস,
অমূল্য কিছু ফিরে পেয়ে আবার হারানোর আশঙ্কা, নিজের অন্তরের অনেক দিনের পুঞ্জিভূত বেদনার উদগিরণ, এ সব মিলে আমি তখন ভাষা হারা।
আমি একটু হাসির চেষ্টা করে বার্থ হলাম। উদগিরণের পূর্ব
মুহূর্তে আগ্নেয়গিরি যেমন অপ্রকাশিত আবেগ প্রকাশ করতে পারে না কিন্তু অন্তরে
অন্তরে ফুটতে থাকে,
আমার অবস্থা সেরকম। অনেক চেষ্টার পর ভাঙ্গা ভাঙ্গা গলায় মুখ
দিয়ে বেরোল,
“লিপি, আমি রাজা”।
লিপি বড় বড় চোখ করে, মুখটা একটু খুলে
অবাক দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর হঠাৎ সবাইকে
ঠেলে প্রায় দৌড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরল। রাজা, রাজা, ওহ! রাজা,
রাজা; এ ছাড়া লিপি যেন আর কোনও
ভাষা জানে না। সবার সামনে লিপি আমাকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করল।
বলরুমের এই প্রান্তের সবার দৃষ্টি এখন আমাদের দিকে। লিপি আর আমার সে সবে খেয়াল ছিল
না। আমি লিপিকে জড়িয়ে ধরে রুমের এক কোনায়, যেখানে বসার
কয়েকটা খালি চেয়ার ছিল সেখানে বসালাম, আমি পাশে
বসলাম।
কিছুক্ষণ পরে লিপি একটু ধাতস্থ হয়ে কেঁদে কেঁদে বলতে শুরু
করল, “রাজা তোমাকে আমি যে কত খুঁজেছি, কত খুঁজেছি, কত খুঁজেছি,
কিন্তু খুঁজে পাইনি। জানো, ছবিকে ওরা ধরে নিয়ে গেছে, তার কোনো খোঁজ আজও পাইনি,” লিলি ডুকরে কেঁদে উঠলো।
“রাজা তোমাকে দেখে যে আমার ভিতরে কি হচ্ছে তোমাকে বুঝাতে পারবো না। দেখ আমার
বুকটা কেমন ধকধক করছে’। লিপি আমার একটা হাত নিয়ে তার হৃৎপিণ্ডে রাখল। ‘তুমি হঠাৎ যুদ্ধে চলে গেলে। তুমি বেঁচে আছ না মারা গেছ কিছু জানিনা, আমি তোমার অনেক খোঁজ নেবার চেষ্টা করেছি, কিন্তু তোমার
কোনো খোঁজ পাইনি। তুমি তো আমার বড় বোন ছবিকে খুব ভালই চিনতে। কিন্তু যখন ছবিকে
পাকিস্তানিরা রাস্তা থেকে ধরে নিয়ে যাবার পর অনেক চেষ্টা করেও কোনো খোঁজ পাইনি, তখন আব্বা পাগলের মতো হয়ে গেলেন, এই দেশে থাকতে
চাইলেন না। ছবিকে হারিয়ে আব্বা, আম্মা, ও আমি এখানকার সব কিছু ছেড়ে আমার চাচাদের কাছে অ্যামেরিকার চলে যাই। আহ!! রাজা, রাজা,
আজকে আমার যে কি ভাল লাগছে বুঝাতে পারব না, এ অনুভূতি কেউ বুঝবে না। ছবিকে হারানোর পর এত ভাল আমার কখনো লাগেনি”। লিপি আমাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। “তুমি জান না আমার বাঁচার
ইচ্ছা ছিল না। বাইরে থেকে দেখা অবশ্য কেউ আমার ভিতরে কষ্ট বুঝতে পারে না, আমি বুঝতে দেই না।“
লিপি বলেই চলল।
আমি কোনো কথা বলতে পারছিলাম না। আমি কি স্বপ্ন দেখছি? এটা কি সত্যি সত্যিই হচ্ছে? এই কি আমার প্রাণপ্রিয়
লিপি? আনন্দে,
খুশীতে, কেমন যেন ভয় পেতে লাগল; আবার যদি লিপি হারিয়ে যায়? এত সুখ কি আমার সহ্য হবে? যার অভিজ্ঞতা শুধু দু:খ, কষ্ট, ও বঞ্চনা তার কী এত সুখ সইবে?
লিপি এখনও আমাকে জড়িয়ে ধরে আছে, আমার কাঁধে মাথা রেখে লিপি বিড়বিড় করে বলেই যাচ্ছে, “আমার দিন যে কীভাবে কেটেছে তুমি বুঝবা না। আমার যে কি কষ্ট কেউ বুঝবে না।
ছবিকে যে আমি কী ভালবাসতাম সেতো তুমি জানো। জানো, ছবিকে হারিয়ে বাবা বেশী দিন বাঁচেননি। আমরা অ্যামেরিকা পৌছার তিন বছরের মাথায়
বাবা মারা গেলেন।“
লিপি আবার ডুকরে কেঁদে উঠল। লিপি বলতে থাকল, “তার এক বছরের মাথায় মা’ও মারা যান। জানো এই পৃথিবীতে আমার কেউ নেই। আজকে তোমাকে ফিরে পেয়ে আমি যেন
প্রাণ ফিরে পেলাম। অনেকদিন পরে আজকে প্রাণভরে নিশ্বাস নিতে পারছি, ফুলের সুমিষ্ট গন্ধ পাচ্ছি। বলত, এই মুক্তিযুদ্ধ
আমার সব কিছু কেড়ে নিলো কেন? কী করেছিলাম আমরা?” লিপি কাঁদতে কাঁদতে আমার কাছে কৈফিয়ত চাইল।
আমি কী উত্তর দিব? আমি উত্তরে
লিপিকে আরও জোরে আঁকড়ে ধরলাম। যেন লিপিকে ছেড়ে দিলে লিপি আবার হারিয়ে যেতে পারে।
লিপির কথা শুনে আমার চোখে থেকে টপ টপ করে পানি পড়ছে। আমি কথা বলতে পারছিলাম না।
গলাটা কেমন যেন রুদ্ধ হয়ে ছিল। এভাবে লিপি কিছুক্ষণ আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে রইল।
কিছুক্ষণ পরে আমি কণ্ঠস্বর খুঁজে পেলাম। লিপি আমি যুদ্ধ থেকে ফিরে তোমাদের খোঁজে
সম্পূর্ণ ঢাকা শহর চষে বেড়িয়েছি। তোমার দুই বান্ধবী যাদেরকে আমি চিনতাম তারও কিছু
জানাতে পারেনি। তোমার স্কুলে গিয়েছি, তোমার হেড-মিস্ট্রেস সাথে কথা বলেছি—কেউ কিছু বলতে পারেনি অথবা চায়নি। আমি তো মনে করেছিলাম তোমাকে আমি চিরদিনের
জন্য হারিয়ে ফেলেছি।
“এবার তোমার কথা বল,
“চাচা, চাচী কেমন আছেন?” লিপি জানতে চাইল।
আমি লিপিকে এই মুহূর্তে বাবা, মা সম্পর্কে কিছু বলে লিপির কষ্ট বাড়াতে চাইলাম না। বললাম,”এখন থাক,
পরে বলব। এখন শুধু তোমার কথা শুনি, আমার কথা পরে হবে”।
আমি লিপিকে সে কী করে, কোথায় থাকে, ইত্যাদি কিছুই জানতে চাইলাম না। আমার কাছে এ সবের কোনোই গুরুত্ব নেই। আমার
লিপি আমার কাছে ফিরে এসেছে এর থেকে আমার জীবনের চাওয়ার আর কী থাকতে পারে? মনে হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ আমার সব কিছুই কেড়ে নিয়েছিল, আজ লিপিকে ফিরে পেয়ে সেই ব্যথাটা যেন অনেকটাই কমে গেল। লিপিকে ফিরে পেয়ে আবার
বাঁচাটা প্রয়োজনীয় হয়ে উঠলো। যাক সব কিছু হারিয়ে যায়নি, লিপি তো ফিরে এসেছে।
হঠাৎ মনে পড়ল লিপিকে আমি কোনো দিন বলিনি, “লিপি,
আমি তোমাকে ভালবাসি”। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হলো
দুজনের হৃদয় যেখানে কথা বলে সেখানে ভাষার কি প্রয়োজন আছে?
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন