আমাদের সাংস্কৃতিক মুলের সন্ধানে

আমাদের সাংস্কৃতিক মুলের সন্ধানে

আমার মধ্যে একটি ধারনা ক্রমেই বদ্ধমূল হয়েছে যে একটি জনগোষ্ঠী  উদ্ভূত নূতন বৈজ্ঞানিক,  প্রযুক্তিগত, পরিবেশগত, অন্যান্য নূতন সুযোগ সুবিধা কিভাবে এবং কতটুকু সাফল্যের সাথে আত্মস্থের মাধ্যমে নিজেদের সমস্যা সমাধানে ও সমাজের মৌলিক পরিবর্তনে সক্ষম সেটি সেই জনগোষ্ঠীর ঐতিহাসিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, কৃষ্টি-গত উত্তরাধিকারের উপর নির্ভরশীল। উল্লিখিত গুণাবলীর কারণে কোন কোন জনগোষ্ঠী খুব সহজেই সাফল্যের সাথে নূতন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, জ্ঞান, ইত্যাদি থেকে সুবিধা নিতে সক্ষম হয় এবং অন্য একটি জনগোষ্ঠী কিছু মৌলিক গুণাবলীর অভাবে অন্যদের মতো সঠিক সুবিধা নিতে বার্থ য়ে অন্যদের তুলনায় পিছিয়ে পড়ে

বেশ কিছু দিন থেকে আমি আমাদের বাঙালীদের সমাজ সংস্কৃতির মূল চালিকা শক্তির উপাদান গুলোকে সনাক্তকরণ তার ফলে সেগুলো আমাদের বাঙালীদের আচার, আচরণ, ব্যবহার, সাংস্কৃতিক, উদ্যম, স্পৃহা, আকাঙ্ক্ষা, সহমর্মিতা, ধর্ম, শিক্ষা, ইত্যাদিতে কিভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে সেটা বোঝার চেষ্টা করছি

জেলে, তাতি, জোলা, কামার, কুমার, চাষিরাই ছিল আজকের বাংলাদেশের আদি বাসিন্দা। অসংখ্য নদী, নালা, খাল, বিল পরিবেষ্টিত অত্যন্ত উর্বর মাটিতে খুব সহজেই খাদ্য শস্য উৎপাদন করা যেত। চারিদিকে অসংখ্য নদী, নালা, খাল, বিল পরিবেষ্টিত হওয়াতে এই দুর্গম এলাকাতে যাতায়াত ব্যবস্থার অসুবিধার ফলে এলাকার লোকজনের একটি নিদৃষ্ট সীমিত গণ্ডীর বাইরে একে অন্যর সাথে বিশেষ যোগাযোগ ছিলনা। এর প্রমাণ বাংলাদেশ একটি অত্যন্ত ছোট এলাকা হলেও অসংখ্য আঞ্চলিক ভাষার উপস্থিতি। একটি বড় নদীর দুই পাড়ের ভাষার পার্থক্য দেখলেই বোঝা যায় যে দুই পাড়ের লোকের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল না।

যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতা ও একটি নিদৃষ্ট গণ্ডীতে আবদ্ধ থাকায় এখানে নিজস্ব কোন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান হয়নি। বেশীর ভাগ লোক বিভিন্ন খণ্ড খণ্ড ছোট জনগোষ্ঠীতে বিভক্ত ছিল। সহজে খাদ্য উৎপাদন; নদী, নালা, খাল, বিলের অফুরন্ত মাছের সমারোহের ফলে লোকজনের খাওয়া দাওয়ার কোন সমস্যা ছিল না। মানুষের খাওয়া দাওয়ার সমস্যা না থাকায় এলাকা ছেড়ে বাইরে যাওযারও কোন প্রয়োজন বা প্রবণতাও ছিল না। তাছাড়া, নদী, নালা, খাল, বিল, ইত্যাদি পরিবেষ্টিত হওয়ায় বহিঃশত্রুর আক্রমণের আশংকা বলতে গেলে ছিলই না। কাজেই লোকজন মোটামুটি সুখে শান্তিতেই খেয়ে দেয়ে এই এলাকায় বাস করত।

এই এলাকা বেশ দুর্গম বলে অনেক লোক ভারতবর্ষের অন্যান্য জায়গা থেকে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে অথবা ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় ভারতবর্ষ ভারতবর্ষের বাইরে থেকে এই এলাকায় সাঙ্গপাঙ্গ ননিয়ে আশ্রয় নিতে আসে। এদের সাথে আরও যোগ বিভিন্ন ধর্ম প্রচারে আসা মানুষ।

বাইরে থেকে যারা এই অঞ্চলে আসে তারা প্রায় সবাই শিক্ষা, দীক্ষা, ধ্যান, ধারনা, যুদ্ধবিদ্যা, বৈজ্ঞানিক জ্ঞান, অর্থনীতি ইত্যাদি বিষয়ে স্থানীয় সরল, সোজা,  অশিক্ষিত লোকজনের তুলনায় অনেক অগ্রসর হবার কারণে স্থানীয়দের উপরে সহজেই প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হয়। আস্তে আস্তে এই বহিরাগতরা স্থানীয় লোকজনকে সংগঠিত করার মাধ্যমে মাঝারি মাপের এলাকা জুড়ে রাষ্ট্র সাদৃশ্য রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক সংগঠন গড়ে তোলে এবং এর নেতৃত্বে নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করে

এই বহিরাগতদের আগমনের ফলে এই এলাকার লোকজনের অবস্থার তেমন কোন উন্নতিতো হলই না, বরং এই বাইরে থেকে আসা লোকজন শাসনের নামে শোষণ করতে থাকে। এক সময় বাংলায় বৌদ্ধধর্ম প্রসার লাভ করলেও পরে হিন্দু ধর্ম বৌদ্ধদর্মের যায়গা দখল করে নেয় এই এলাকার বেশীর ভাগ মানুষ ছিল নিম্নবর্নের হিন্দু সম্প্রদায়ের। উচ্চবর্নের হিন্দুরা এদেরকে মানুষ হিসেবেই গন্য করত না। ইসলাম ধর্ম প্রচারকরা সহজেই এই সরল সোজা জাত-পাতের অভিশাপে জর্জরিত নিষ্পেষিত জনগণের মাঝে ধর্ম প্রচার করে তাদেরকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করতে পেরেছিলেন। ধর্মান্তরিত হলেও এই এলাকার স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সামাজিক-অর্থনৈতিক অবস্থার বিশেষ কোন উন্নতি হয়নি। আগে যেমন নদী, নালা, খাল, বিলে পরিবেষ্টিত ছিলএখনও তাই রইলতাদের অবস্থার বিশেষ কোন উন্নতি হল নাউচ্চবর্নের হিন্দুদের আধিপত্য নূতন আগত মুসলমান অভিজাতরা দখল করে নেয়।

এই আবহমান সামাজিক-রাজনৈতিক-পারিপার্শ্বিক ইতিহাসিক ঐতিহ্য ও বিবর্তন এখানকার মানুষের একটি অনন্য মনস্তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের জন্ম দিয়েছে। আমার ধারনায় এই বৈশিষ্ট্যগুলো নিম্নরূপ:

১। সংকীর্ণচিন্তার পরিধি:

আমাদের এই এলাকার লোকজন খুব লম্বা পরিকল্পনা করতে অভ্যস্ত এর প্রধান কারণ কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি সমাজ ব্যবস্থা এবং অত্যন্ত সুরক্ষিত ভৌগলিক অবস্থান। একটি কৃষিনির্ভর সমাজে একবার শস্য বোনার পর বেশ কিছু দিন কিছুর করার থাকে না ঐতিহ্যগত এখানকার কৃষি প্রাকৃতিক উপর নির্ভরশীল। সঠিক সময়ে বৃষ্টি হলে, অতি বৃষ্টি প্লাবন না হলেই সাধারণত ভাল ফসল পাওয়া যায়। এখানে এর পরের বছর কি হবে, অথবা তার পরের বছর কি হবে তা পূর্বনির্ধারিত হওয়ায় চিন্তা করার প্রয়োজন হয় না।

তার উপর চারিদিকে নদী, নালা, খাল, বিল, ইত্যাদি দিয়ে ঘিরে থাকায় এখানে বহিঃশত্রুর আক্রমণের সম্ভবতাও খুবই ক্ষীণ। অন্যদিকে একটি সমতল ভূমির জনগোষ্ঠী যাদের চারিদিকে ধরনের কোণ প্রাকৃতিক বাধা নেই যাদেরকে যে কোন দিক থেকে শত্রুর আক্রমণের আশঙ্কার যুদ্ধের জন্য সদা প্রস্তুত থাকতে হয়, তাদের অবশ্যই বাঁচার তাগিদে (ভবিষ্যৎ) পরিকল্পনা থাকতে হবে। কি ভাবে রক্ষাব্যবস্থা উন্নত করা যায়, কি ভাবে অস্ত্রশস্ত্র উন্নত করা যায়; শত্রুর আক্রমণ খুবই তীব্র হলে কথায় লুকানো যাবে কোন দিন দিয়ে পালানো যাবে, ইত্যাদির (পূর্ব) পরিকল্পনা ছাড়া সাফল্য সম্ভব না। একই ভাবে, যারা কৃষি নির্ভর নয় এবং যাদের জীবিকা গো-চরণ বা অন্য গৃহপালিত পশুর রক্ষণাবেক্ষণের উপর নির্ভরশীল, অথবা যাদের জীবিকা লুন্ঠনমূলক তাদেরও সাধারণ জীবন যাপন করার জন্য মধ্যবর্তী দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার প্রয়োজন।

কাজেই, কৃষি নির্ভরতা চারিদিক থেকে নদী, নালা, খাল, বিল, ইত্যাদি প্রাকৃতিক বাধা দ্বারা সুরক্ষিত হওয়ার ফলে আমাদের এই এলাকার লোকজনের তাদের জীবন যাপনের জন্য খুব পরিকল্পিত হওয়ার প্রয়োজন হয়নি।

২। গ্রাম ভিত্তিক চিন্তা:

যেহেতু গ্রামই মানুষের মূল সামাজিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু, সেহেতু মানুষ তার গ্রামের বাইরে কি হচ্ছে তা যেমন জানতে পারে না, তেমনি জানাতে চাওয়ার ইচ্ছাও নেই এর বিপরীতে যারা গোষ্ঠীগত বা Tribal তাদের চিন্তার পরিধি অপেক্ষাকৃত ব্যাপক কারণ একটা গোষ্ঠী বা ট্রাইব জনসংখ্যায় সাধারণত একটি গ্রামের তুলনায় অনেক বড় হয়ে থাকে এবং একটা গোষ্ঠীর ব্যাপ্তি অনেক গ্রাম জুড়ে হয়ে হতে পারে।

কাজেই, এই এলাকার মানুষের মধ্যে গ্রাম ভিত্তিক  চিন্তাধারা থাকাই স্বাভাবিক। এই কারণে এখানকার মানুষের স্বজনপ্রীতির প্রবণতা থাকবে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় পরিবার পরিজন, পাড়া পড়সি, এবং নিজের গ্রামকে প্রাধান্য দেওয়া হবে। আপনার দেশ কোথায়?” এজন্যই হয়ত এত ঘন ঘন শোনা যায়। এই “দেশ” বলতে বাংলাদেশ বুঝায় না বরং কোন এলাকার বা গ্রামের সেটি বুঝায়।

৩। সিদ্ধান্ত গ্রহণে গণতান্ত্রিক পন্থা পরিবর্তে স্বৈর-তান্ত্রিক পন্থার প্রবণতা:

একটি দুর্গম প্রযুক্তি হীন কৃষি নির্ভর সমাজে যেখানে সমষ্টিগত সিদ্ধান্তের উপরে বাঁচা-মরা নির্ভর করে না কেননা কৃষি কাজের জন্য সমষ্টিগত সিদ্ধান্তের প্রয়োজন হয় না। কিন্তু যারা কৃষি ছাড়া অন্য উপায়ে, যেমন গোচারণ, শিকার, লুন্ঠন, বা অন্য উপায়ে জীবিকা উপার্জন করে,  তাদের মধ্যে সমষ্টিগত গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তের প্রয়োজন হয়। উদাহরণ হিসেবে আমরা যুদ্ধকে নিতে পারি। যারা যুদ্ধ করবে তাদের প্রত্যেকের গোষ্ঠী বা ট্রাইবের জন্য নিজের জীবন বিসর্জনের অঙ্গিকার ছাড়া যুদ্ধে জয় সম্ভব না। কাজেই এই ধরনের সমাজের সিদ্ধান্তে সাধারণত গণতান্ত্রিক পন্থা প্রবণতা লক্ষণীয়।

তাছাড়া, এই এলাকার জনগণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বহিরাগত দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় গণতান্ত্রিক ধারনার পরিশীলন বা চিন্তা ভাবনা চর্চা ছিল না।

অনেকেই মনে করেন যে গণতান্ত্রিক পন্থার উৎপত্তি হচ্ছে বাঁচার তাগিদে একে অপরের উপর নির্ভরশীলতা। মানুষকে জোর করে অনেক কাজ করানো যায় কিন্তু সবচেয়ে উত্তম পন্থা হচ্ছে যদি মানুষকে বুঝান যায় যে কাজটি তার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। আমাদের এলাকার মতো উপদ্রব হীন, কৃষি নির্ভর, বহিরাগত নিয়ন্ত্রিত সমাজ ব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক চিন্তাভাবনার বিকাশ না হওয়াই স্বাভাবিক।

) গুরুত্বপূর্ণ বা জটিল প্রতিষ্ঠানের অনুপস্থিতি:

সভ্যতার বিকাশের সাথে সাথে গুরুত্বপূর্ণ বা জটিল কাজের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সংগঠনের প্রয়োজন হয়। অথবা বলা যেতে পারে প্রাতিষ্ঠানিক সাহায্য ছাড়া এককভাবে গুরুত্বপূর্ণ বা জটিল কাজ সম্ভব হয় না

আমাদের দেশ যেহেতু অসংখ্য ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন গ্রামের সমষ্টি ফলে এখানে জটিল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বা ব্যবসা বাণিজ্যও গড়ে ওঠেনি।

অর্থনৈতিক সামাজিক ব্যাপ্তি একে অন্যের পৃষ্ঠপোষক; অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের স্বল্পতার জন্য সামাজিক ভাবেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।

আমাদের এখানে কিছু কিছু পুরানো জনপদের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় যে এখানে কিছু উন্নত জনপদ ছিল। কিন্তু কালের গর্ভে তার সামাজিক বা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের নিদর্শন প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।

) আগ্রাসী হবার প্রবণতা:

এই এলাকার মানুষেরা স্বভাবত ভীতু, মোটামুটি শান্তিপ্রিয়, এবং আগ্রাসী না। একটা গ্রাম ভিত্তিক সমাজে যেখানে খওয়া পরার সমস্যা নেই, সেখানে আগ্রাসী হবার কারণও থাকে না।

সাহসী হবারও কোন প্রয়োজন নেই কারণ এই সমাজে জীবন যাপনের জন্য সাহসের প্রয়োজন হয় না।

অপরপক্ষে, যে সমস্ত জনগোষ্ঠী আমাদের মত নদী, নালা, খাল, বিল, ইত্যাদি দ্বারা সুরক্ষিত নয় সর্বদা শত্রুর আক্রমণের আশঙ্কায় থাকতে হয়, তাদেরকে প্রতিরক্ষার প্রস্তুতি থাকতে হয়। যুদ্ধের জন্য সাহসী লোকের প্রয়োজন হয়। এই ধরনের জনগোষ্ঠীতে সাহসীদের জন্য আলাদা সম্মান বিশেষ সুযোগ সুবিধা দেওয়া হয়।

আমাদের উপকুলের অধিবাসীরা অবশ্য এই ধাঁচের ব্যতিক্রম। উপকুল এলাকার প্রতিকুল প্রকৃতির সাথে নিরন্তর সংগ্রামের মাঝে গড়ে উঠা এলাকার মানুষেরা অভ্যন্তরের জনগোষ্ঠীর তলনায় অনেক বেশী সাহসী।

সাধারণত এই এলাকার লোকেরা শান্তিপ্রিয় হলেও বাঁচার সংগ্রাম যখন তীব্র থেকে তীব্রতর হয় তখন এই শান্ত জনগোষ্ঠীও ক্রমশ আগ্রাসী হয়ে উঠতে পারে।

ভীতুদের একটা সাধারণ প্রবণতা হচ্ছে দল বেধে সাহস দেখানো। যখন একা থাকে তখন খুবই বিনয়ী ভীরু কিন্তু দলে ভারী হলে দুর্বল প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অত্যন্ত হিংস্র হতেও দেরি লাগে না।। এটি সাহসের লক্ষণ-তো নয়ই বরং এটি চরম ভীরুতার নির্দেশন।

) বোধশক্তি (Intellectuality)

যে কৃষিভিত্তিক সমাজের বর্ণনা উপরে দেওয়া হয়েছে সেখানে কৃষিকাজ করার পর অফুরন্ত সময় থাকবে এবং এই সময় কাটানোর জন্য বিভিন্ন ব্যবস্থাও থাকবে। ধারণা করতে অসুবিধা হবার নয় যে একটি বিশাল সময় পাড়াপড়শিকে নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা বা সমালোচনায় ব্যয় হবে।

বাকি সময় গান, বাজনা, ধর্ম চর্চা, পালা, পার্বণ, ইত্যাদিতে ব্যয় হবে। যেহেতু কৃষিকাজ প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল, প্রকৃতিকে নিয়ে বিভিন্ন গান, পালা, এমনকি ধর্মীয় ভাবেও প্রকৃতির বন্দনা হতে পারে।

অন্যদিকে, একটি যুদ্ধপ্রিয় সমাজে তাদের সময়ের একটি  বিশাল অংশ কিভাবে উন্নত মানের অস্ত্রশস্ত্র উৎপাদন বা নিজেদের প্রতিরক্ষার উন্নতিতে ব্যয় করা হবে। এবং এই করনেই একটি যুদ্ধপ্রিয় সমাজে বিজ্ঞানে চর্চায়  গুরুত্ব দেওয়া হবে ফলে প্রযুক্তিগত-ভাবে কৃষি-প্রধান জনগোষ্ঠীর তুলনায় অনেক এগিয়ে থাকবে।

) কর্তৃপক্ষের প্রতি সম্মান (Respect for authority)

এমন একটি জনগোষ্ঠী যারা আবহমান কাল থেকে অন্যদের দ্বারা শাসিত শোষিত, তারা কর্তৃপক্ষের প্রতি ভয়ে খুবই শ্রদ্ধাশীল থাকবে যতক্ষণ কর্তৃপক্ষ কঠোর এবং সক্রিয় ভাবে কর্তৃত্ব বজায় রাখবে। কর্তৃত্ব যদি কঠোর সক্রিয় ভাবে প্রতিষ্ঠিত করা না হয়, তাহলে প্রচণ্ড অবজ্ঞায় আইন অমান্য করা হবে। কারণ আইন মানার কারণ ভয়, আইনের প্রতি শ্রদ্ধা নয়।

আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা উচিত যে যারা প্রাতিষ্ঠানিক প্রজাপীড়ক, তাদের পীড়নের একটি বিশেষ সামাজিক অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য থাকে। এজন্য তাদের পীড়নের একটি সীমা থাকে এবং সাধারণত এই সীমা লঙ্ঘন করা হয় নয়া। পীড়নের উদ্দেশ্য শোষণ চিরস্থায়ী করা। কিন্তু শোষিত যখন শাসক হয় তখন তাদের পীড়নের কোন সীমা থাকে না। এর মূল কারণ তাদের নিপীড়ন শোষণের জন্য না হয়ে প্রতিহিংসাবশত হয়ে থাকে।

) সামাজিকীকরণ (Socializing)

এই এলাকার জনগোষ্ঠীর প্রচুর সময় থাকবে গাল, গল্প, ইত্যাদি করার জন্য এবং গ্রামের সবাই সবাইকে চিনবে জানবে। আলোচনার বিষয়ের মধ্যে থাকবে ফসল সংক্রান্ত আলোচনা; পাড়া প্রতিবেশীদের নিয়ে আলোচনা, ধর্ম নিয়ে আলোচনা, গ্রাম্য রাজনীতি, ইত্যাদি।

) কর্মস্পৃহা (Industriousness):

গ্রাম কেন্দ্রিক কৃষি নির্ভর অর্থনীতি, চারিদিকে নদী, নালা, খাল, বিল, ইত্যাদি দ্বারা সুরক্ষিত; নদীর পলিমাটি দ্বারা লালিত অত্যন্ত উর্বর জমির জনপদের বাসিন্দাদের খুব পরিশ্রমী হওয়ার খুব প্রয়োজন হয় না।

বীজ ফেললেই ফসল আর পানিতে জাল ফেললেই মাছ, এমন যায়গায় লোকজন পরিশ্রম বিমুখ হওয়াই স্বাভাবিক।

 

তাছাড়াও, এখানকার আদি বাসিন্দারা ছিল নিম্ন বর্ণের হিন্দু এবং হিন্দু বর্ণপ্রথার চাপে নিষ্পেষিত শোষিত। মুসলিম ধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়ার পরও বিদ্যা বুদ্ধিতে অনেক উন্নত বহিরাগতদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি সমাজ ব্যবস্থায় এই আদিবাসীদের খুব একটা লাভ হয়নিধম্মের পরিবর্তন অর্থনৈতিক উন্নতিতে কোন প্রভাব বিস্তার করেনি। শোষিত নিষ্পেষিত মানুষ শোষিত নিষ্পেষিতই রয়ে যায়।

কাজেই, যেখানে নিজের শ্রমের বিনিময়ে নিজের অবস্থার উন্নতি করা যায় না সেখানে মানুষ খুব পরিশ্রমী কেন হবে?

 


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পরিবর্তন ও প্যারাড়াইম

আজিমপুরের দুর্দান্ত যোদ্ধারা, পঞ্চম পর্ব

আজিমপুরের দুর্দান্ত যোদ্ধারা, চতুর্থ পর্ব