অচেনা হৃদয়
আমি ব্যাংক কর্মকর্তা, ঢাকায়
হেড-অফিসে বসি। অফিসের কাজে মাঝে মাঝেই চট্টগ্রাম যেতে হয়। সাধারণত প্লেনেই যাওয়া
হলেও মাঝে মাঝে ট্রেনে যেতে ভাল লাগে, বিশেষ করে
রাতের ট্রেনে। রাতে টেনের ছন্দময় ঝাঁকুনির সাথে ঝক-ঝক-ঝক-ঝক করে ট্রেন যে কত গল্প
বলে, কিছু কিছু লোক আছে যারা ট্রেনের এই ভাষা
বুঝতে পারে। আর বলবেই না কেন, ট্রেনে কতো লোক যায়, কতো গোপন
কথা হয়, সে সবি তো ট্রেন শুনতে পায়। আমার ট্রেনে
চড়তে ভাল লাগে। বেশ ধীরে সুস্থে ভ্রমণ করা যায়, প্লেনের
মতো তাড়াহুড়ো করতে হয় না।
এক শীতের রাতে আমি চট্টগ্রাম যাবার জন্য
টিকিট কাটালাম। ট্রেনে ভ্রমণের সময় ট্রেন ছাড়ার বেশ কিছু সময় থাকতেই আমি স্টেশনে
পৌঁছতে পছন্দ করি কেননা শেষ মুহূর্তে পৌঁছে কয়েকবার বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে।
যাই হোক, ট্রেন
ছাড়ার প্রায় আধা-ঘণ্টা আগে স্টেশনে পৌঁছে নির্দিষ্ট কামরা খুঁজে মালপত্র নিয়ে
উঠলাম। মালপত্র বলতে অবশ্য একটি ছোট ব্যাগ, একটি
অফিসের কাগজপত্র সহ ব্রিফকেস, ও একটি সুট ক্যারিয়ার। আগামীকাল সকালে
পৌঁছেই এক মিটিঙে যেতে হবে, এই সুট তখন প্রয়োজন হবে। আমার চিটাগাঙে
প্রায়ই আসতে হয় বিধায় আমার কিছু কাপড় চট্টগ্রামের অফিসেই থাকে। কাজেই সাধারণ
কাপড়-চোপড় ঢাকা থেকে নিয়ে আসার ঝামেলা নেই। কামরায় ঢুকে দেখলাম নীচের একটা সিটের
আমার নামে বরাদ্দ করা।
একটু পরেই এ্যাটেন্ডেন্ট এসে একটা বিছানা পেতে দিল সাথে ছোট একটি বালিশ। আমি আমার ব্যাগ থেকে একটি বালিশের কাভার সহ বিছানার চাদর ও একটি পাতলা পশমের কম্বল আমার ব্যাগ থেকে বের করে এ্যাটেন্ডেন্ট-কে বিছিয়ে দিতে বললাম আর তার দেয়া চাদর ও কম্বল ফিরিয়ে নিতে বললাম। আমি রাতে ট্রেনে ঘুমানোর জন্য প্রায় প্রস্তুত হয়েই এসেছিলাম।
এক কামরাটা নতুন বলে মনে হলো কারণ পুরনো
শীততাপনিয়ন্ত্রিত কামরায় কেমন যেন একটা গুমোট ভ্যাপসা গন্ধ জমে থাকে। আজকের এই
কামরায় সেরকম কিছু পেলাম না। আমার আয়োজন শেষ হবার পর দেখলাম তখনও ট্রেন ছাড়তে
প্রায় পনের মিনিটের সময় আছে। আমার ব্রিফকেসে আজকের একটা খবরের কাগজ ছিল, বের করে
চোখ বুলাতে থাকলাম। ট্রেন ছাড়ার যখন প্রায় দশ মিনিট বাকী তখন কামরার দ্বিতীয়
যাত্রীর আগমন হলো; চাদর মোড়ানো পায়জামা-পাঞ্জাবি পরা এক
নাদুসনুদুস মধ্য বয়সী লোক, সাথে একটি বড়সড় সুটকেস ও একটি ব্যাগ। তিনি
এসে আমার পাশের সীটটা দখল করলেন। প্রায় সাথে সাথেই আরেকজনে আগমন হলো, প্যান্ট, শার্ট, ও সোয়েটার
পরা এক ভদ্রলোক, সাথে শুধু একটা ব্যাগ।
কামরাটা এখন মোটামুটি ভর্তি, শুধু উপরের
একটি বার্থ খালি। মনে করলাম ঐ বার্থটা হয়ত খালিই থাকবে। কিন্তু ট্রেন ছাড়ার প্রায়
পূর্ব মুহূর্তেই হন্তদন্ত হয়ে আরেকজনকে একটি সুটকেস, দুই কাঁধে
দুই ব্যাগ ঝুলিয়ে প্রবেশ করতে দেখলাম। সুটকেস ও ব্যাগ দুটো নামিয়েই সে আবার হনহন
করে বেরিয়ে গেল এবং প্রায় সাথে সাথেই এক ভদ্রমহিলা সমেত ফিরে এলো।
ভদ্রমহিলা কামরায় ঢুকেই নাক-মুখ কুঁচকিয়ে
বিরক্তি প্রকাশ করলেন। নীচের দুটো বার্থকেই দখল দেখে মেজাজ ঠাণ্ডা রাখতে ব্যর্থ
হয়ে বলে উঠলেন, “ধুত্তুরি, আমাকে এখন
উপরে উঠতে হবে নাকি? সাথে যেই লোক ছিল তাকে বেশ ঝাড়ি দিয়ে
বললেন, “কি করেন আপনারা ঠিক মতো টিকিট কাটতে পারেন
না? স্টুপিড যতসব।” সাথের লোক
বেশ কাঁচুমাচু হয়ে বলল, “আপা, ইদের সময়
তো, টিকিট পাওয়াই যায় না। “আপা” কিন্তু
গজগজ করতে করতে আমার পাশের নাদুসনুদুস ভদ্রলোকের দিকে তাকালেন। কিন্তু ভদ্রলোক “আপাকে” খেয়াল
করছেন বলেই মনে হচ্ছে না। তিনি আপন মনে খাতায় কি যেন লিখছেন। এবার “আপা” আমার দিকে
ভ্রু কুঁচকে, এমন ভাবে তাকালেন যে আমার মনে হলো তার
দৃষ্টির যদি সেরকম ক্ষমতা থাকতো তাহলে হয়তো টর্নেডো যেমন খড়কুটাকে উড়িয়ে নিয়ে যায়
আমার ও সেই অবস্থা হতো।
আমি “আপার” দৃষ্টি
বাণে বিদ্ধ হয়ে, পাখী যেরকম তীর বিদ্ধ হয়ে লুটিয়ে পড়ে, আমিও কিছু
না বলে পাশে দাঁড়ানো এ্যাটেন্ডেন্টকে ইশারা করলাম আমার বিছানা উপরের খালি বার্থে
সরাতে। এ্যাটেন্ডেন্ট তাড়াতাড়ি আমার বিছানা সরিয়ে “আপার” বিছানা করে
দিল। “আপা” খুশী হয়ে
তার সদ্য বিজিত বিছানায় বসলেন। আমি কথা না বাড়িয়ে আমার বার্থে উঠে যখন ঘুমানোর
চেষ্টা করছি তখন ট্রেন ছাড়ল।
খুব ভোরে আমার ঘুম ভাঙল, তখনও সূর্য
পুরাপুরি ওঠেনি। তাকিয়ে দেখি কামরার অন্য সবাই ঘুমাচ্ছে। আমি খুব সপ্তপর্ণে শব্দ
না করে বার্থ থেকে নামলাম, আমার ব্যাগে থেকে একটি প্রসাধন সামগ্রীর
ছোট ব্যাগ বের করে বাথরুমে গেলাম। একটু ফ্রেশ হয়ে, দাঁত মেজে
মুখ ধুয়ে আবার বার্থে উঠে শুয়ে পড়লাম—নীচে এখন
বসার যায়গা নেই।
যাই হোক, আস্তে
আস্তে সবাই ঘুম থেকে জেগে উঠল। প্রথমেই ‘আপা” তার
প্রসাধন সামগ্রীর ডাব্বা আর এক সেট কাপড় নিয়ে বাথরুমে গেলেন। এখন পুরোপুরি সকাল
হয়ে গেছে। শীতের সকাল, চারিদিক এক অস্বচ্ছ সাদা চাদরে ঘেরা।
বাইরে অস্পষ্ট কিছু বাড়িঘর ও গাছপালা দেখা যাচ্ছে। আমি আমার কম্বলকে চাদরের মতো
জড়িয়ে নীচে নামে এসে নাদুসনুদুস যে সিটে শুয়ে ছিলেন সেখান বসলাম। তিনি তখন
বাথরুমে। “আপাকে” দেখলাম রূপ
চর্চা করছেন।
রাতে “আপাকে” ভাল করে
দেখা হয়নি। আপার বয়স কত হবে? আমার অবশ্য মেয়েদের বয়স অনুমানে প্রায়
সবসময় ভুল হয়—আনুমানিক ২৮-৩০? মেকআপ
ছাড়াই ফর্শা, প্রথমেই দৃষ্টি কাড়ে দুটি বড়বড় কালো চোখ, লম্বা
প্রায় পাঁচ ফুট চার ইঞ্চি, ঘন কালো লম্বা চুল এখন একটা ক্লিপ দিয়ে
আটকানো, কানে দুটো সাদা পাথরের স্টাড (দুল) ছাড়া
শরীরে অন্য অলংকার নেই, আকর্ষণীয় শরীরের গঠন, মেনিকিউর
করা হাতের ও পায়ের নখ, একটি সালোয়ার কামিজ ও ওড়না পরা। সব মিলে “আপা” সুন্দরী।
এতক্ষণে “আপার” হালকা
মেকআপ শেষ। তিনি প্রসাধনের ডাব্বা বন্দ করে তার পাশে রাখলেন। ইতোমধ্যে চতুর্থ
ব্যক্তি বাথরুম থেকে ফিরে এসেছেন। এসে আমারা দুজন যে সিটে বসে ছিলাম সেখানে বসলেন, “আপার” সিটে বসার
মনে হয় সাহস হলো না। কিছুক্ষণ পরে এ্যাটেন্ডেন্ট জানতে চাইল আমরা কেউ চা খাব কি
না। আমার নাস্তার আগে চা খাবার অভ্যাস নেই বলে হাত নেড়ে না সংকেত করলাম। আমার
পাশের দুজন চা চাইলেন। “আপাও” চা চাইলেন
না।
আমাদের কামরার কারো সাথে “আপার” কোন কথা
হয়নি। “আপা” এখন আনমনে
জানালা দিয়ে বাইরের দৃশ্য উপভোগ করছেন। মনে হলো “আপা” গভীর ভাবে
কিছু ভাবছেন। এই ভোর সকালে মুখটা কেমন যেন মলিন হয়ে আছে।
ট্রেন স্টেশনে থামলে নামার তোড়জোড় শুরু
হলো। আমি চুপচাপ আমার সিটে বসে রইলাম। প্রথমেই “আপা” তার
বোচকা-বুঁচকি সহ নেমে গেলান, একটু পরেই অন্য দুজন নামলেন। প্রায় সাথে
সাথেই আমার অফিসের এক স্টাফ কামরায় প্রবেশ করে সালাম দিয়ে আমার মালামাল নিয়ে
রওয়ানা হলো। স্টেশনের বাহিরে অফিসের গাড়ি অপেক্ষা করছিল। আমি হোটেল আগ্রাবাদের
দিকে যাত্রা করলাম।
এইবারের চট্টগ্রাম সফরটা একটু লম্বা, প্রায় সাত
দিনের। সকালে উঠে অফিস যাই, সাধারণত দুপুরের খাবার সারি আগ্রাবাদ
হোটেলের ভিতরে মানিনী নামে একটি চাইনিজ রেস্তোরাতে। প্রায়ই একা থাকি। রাতের খাবার
হয় রুম সার্ভিসে অথবা মাঝে মাঝে সহকর্মীদের বাসায় দাওয়াতে। এইভাবে প্রথম দুই দিন
কেটে গেল।
তৃতীয় দিন দুপুরের খাবার জন্য আবার
মানিনীতে ঢুকলাম, অদূরে একটি টেবিলে দুজনকে দেখলাম, বাকী সব
চেয়ার টেবিল খালি, অবশ্য এখন মাত্র বেলা একটাে। আমি এক কোনায়
নিরিবিলিতে একটি টেবিলে বসলাম। এখান থেকে প্রায় সম্পূর্ণ রেস্তোরার ভেতরটা দেখা
যায়। আমার এখানে নিত্ত দিনের খাওয়া, একটা সুপ, একটা চিকেন
চোও-মিন, ও সাথে কোক অর্ডার করে অপেক্ষা করছি, মাঝে মাঝে
কোকে চুমুক দিচ্ছি আর অযথা রেস্তোরার মেনুটা নেড়েচেড়ে দেখছি। এমন সময় চার জন মহিলা
কথা বলতে বলতে রেস্তোরায় প্রবেশ করলো। আমার টেবিলটা দরজার কাছে থাকায় আমি তাদেরকে
স্পষ্ট দেখতে পেলাম। সবাই প্রায় সমবয়স্ক, বেশ ভাল
সাজগোজ করা। কিন্তু সবার শেষে যিনি ঢুকলেন তাকে দেখে একটু অবাক হলাম-আরে এ-যে সেই
ট্রেন “আপা।”
আজকে অবশ্য আমার কাপড় চোপড় অন্য রকম।
ট্রেনে আমি পায়জামা পাঞ্জাবী পরে ছিলাম। আজকে আমার পোশাক একটি নীল সুট, সাদা সার্ট, মেরুন টাই, সাদা
পকেট-রুমাল, ও বাদামী অক্সফোর্ড জুতা। “আপা” আমার দিকে
ক্ষণিকের জন্য তাকিয়ে সবার সাথে রুমের অন্য পাশে একটি টেবিলে বসলেন। “আপা” আমি স্পষ্ট
দেখতে পাচ্ছি তিনিও সম্ভবত আমাকে দেখতে পাচ্ছেন।
একটু পরেই আমার খাওয়া এলে আমি খেতে শুরু করলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই খাওয়া শেষ হলে বিল চুকিয়ে বেরিয়ে আসলাম। রিসেপশন থেকে ঘরের চাবি নিয়ে রুমে গেলাম। দাঁত মেঝে ও কয়েকটা দরকারি টেলিফোন সেরে আবার যখন নীচে রিসেপশনে চাবি ফিরিয়ে দিতে এসেছি, ঠিক তখনই “আপার” দল রেস্তোরা থেকে বেরিয়ে এলো। এবার দেখলাম এরা সবাই আমাকে কেমন যেন একটু ভাল কেরেই মেপে দেখল। চাবি দিয়ে আমি হোটেল থেকে বেরিয়ে এলাম। ড্রাইভার গাড়ি বারান্দায় অপেক্ষায় ছিল। আমি গাড়িতে উঠার সময় দেখলাম ‘আপার’ দল গাড়ির অপেক্ষা করছে।
মাঝে একদিন রোববার ছিল, আমাদের
সাপ্তাহিক ছুটি। আমার অনেক সখের মধ্যে একটি হচ্ছে পাখি শিকার করা। এখানে আমার এক
পাখী শিকারি সহকর্মী আছে, আমরা আগেই ঠিক করে রেখেছিলাম যে রোববারে
আমারা রাঙ্গামাটি যাব ঘুঘু শিকার করতে। রাঙ্গামাটি যাবার পথে রাস্তার দুপাশে অনেক
ঘুঘু পাওয়া যায়। ঘুঘু শিকারের জন্য সবচেয়ে ভাল অস্ত্র হচ্ছে পয়েন্ট-টুটু (.২২)
রাইফেল। আমরা দুটো পয়েন্ট টুটু রাইফেল নিয়ে রাঙ্গামাটি যাত্রা করলাম। পথে অনেক
ঘুঘু শিকার হলো। রাঙ্গামাটি যখন পৌঁছলাম তখন প্রায় বেলা দেড়টা। আমরা পর্যটনের
মোটেলে দুপুরের খাবার সেরে রাঙ্গামাটি শহরে কয়েকটা চক্কর মেরে আবার চিটাগাঙের দিকে
রওয়ান হলাম। অনেক ঘুঘু শিকার হয়েছে, আমার
শিকারের সঙ্গীর বাসায় রাতে ঘুঘু খাওয়ার দাওয়াত।
আমরা যখন প্রায় আধা রাস্তা পার হয়েছি, এমন সময় দেখি একটি টয়োটা গাড়ি চাকা পাংচার হয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। দুইজন মহিলা গাড়ির বুট থেকে স্পেয়ার চাকা বের করার চেষ্টা করছে কিন্তু দেখে মনে হচ্ছে এই কাজে তারা একেবারেই অনভিজ্ঞ। একটু ভাল করে দেখি দুজনের একজন সেই ট্রেন “আপা।”
আমাদের দুজনেরই তখন শিকারের পোশাক। আমি পরে আছে একটি তামাক রঙের সাফারি সুট ও বুট জুতা। এখন বেশ রোদ বলে চোখে সানগ্লাস। আমার সহকর্মীও প্রায় কাছাকাছি পোশাক পরে আছে। আমি ড্রাইভারকে গাড়ি থামাতে নির্দেশ দিলাম। আমাদের গাড়িতে অন্য গাড়ির সামনে রাস্তার পাশে থামল। আমি গাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে সোজা “আপার” কাছে গিয়ে বললাম, “আপনারে সরেন, আমরা করে দিচ্ছি।“ “আপা” আমার দিকে তাকিয়ে কিছু হয়ত বলতে চাচ্ছিলেন কিন্তু শেষ মুহূর্তে কিছুই বললেন না। আমি আমাদের ড্রাইভারকে বললাম চাকাটা বদলিয়ে দিতে। নির্দেশমতো ড্রাইভার সিদ্ধহস্তে চাকা বদলানোর কাজ শুরু করল।
“আপা” ও তার বন্ধু দাঁড়িয়ে চাকা বদলানোর কাজ দেখছিল। আমি ‘আপার’ দিকে তাকিয়ে বললাম, “আপনার সাথে আমার ট্রেনে দেখা হয়েছিল, মনে আছে?” “আপা” একটু সলজ্জ হাঁসার চেষ্টা করে বললেন, “হ্যাঁ, মনে আছে।” আমার তখন মনে হচ্ছিল যে বলি তুমি না চাইতেই আমি আমার সিট তোমাকে দিয়েছিলাম কিন্তু প্রতিদানে তুমি আমাকে ধন্যবাদটুকুও দেও নাই।
আমি তাকে আমার পরিচয় দিলাম, “আমার নাম সেলিম।“ “আপা” এইবার একটু কৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে উত্তর দিলেন, “আমি সালমা আর ও আমার বন্ধু কোয়েল। আমরা রাঙ্গামাটি গিয়েছিলাম লং-ড্রাইভে।” “সাথে কোনো ড্রাইভার নেননি কেন, গাড়ির তো অন্য সমস্যাও হতে পারত?” আমি বেশ উপদেশমূলক ভাবে সালমাকে মৃদু তিরস্কার করলাম। সালমা একটু সলজ্জ হেঁসে বলল, “হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন, ভুল হয়ে গেছে।“
এর মধ্যে চাকা বদলানো শেষ হলে আমি ও আমার বন্ধু বিদায় নিয়ে চট্টগ্রামের দিকে আবার যাত্রা করলাম। পেছনে পেছনে দেখলাম সালমাদের গাড়ি আসছে।
আমাকে গাড়ি আগ্রাবাদে নামিয়ে চলে গেল। কথা রইল সন্ধ্যায় গাড়ি এসে আমাকে আবার নিয়ে যাবে। বাসায় একটা ছোট খাট পার্টির আয়োজন হচ্ছে বলে ধারণা হলো।
এর পর আরও কয়েকদিন কেটে গেছে, এবার ঢাকায় ফেরার পালা। এবার ট্রেনে না, প্লেনে ফিরছি। ফ্লাইট সন্ধ্যা ছ’টায়। আমি সাড়ে পাঁচটার মধ্যে চেক-ইন শেষ করে ভিতরে বসে আছি। কিছুক্ষণ পরে দেখি সালমা এসে উপস্থিত। আমার পাশে অনেকগুলো চেয়ার খালি ছিল, কিন্তু সালমা ঠিক আমার পাশের চেয়ারে বসলো। বসেই আমি কিছু বলার আগে বলে উঠল, “সেলিম সাহেব, আমার একটা কথা আপনাকে বলার আছে।“ আমি উত্তর না দিয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম।
সালমা আজকে একটি হালকা নীলের উপরে ছোট ছোট গোলাপি পলকা ডটের প্রিন্টেড কামিজ ও নীল রঙের সালওয়ার পরে আছে। সাথ আছে একটি গোলাপি রঙের ওড়না। চুলগুলো ঝুটি করে বাঁধা, কানে সোনার ছোট টপ, গলায় সোনার সরু চেইন, দুই হাতে একটি করে সোনার চুড়ি, হাতে সাদা-সোনায় সাদা পাথরের আংটি, হাতে একটি মেয়েদের ছোট ঘড়ি। শরীর থেকে মৃদু সুগন্ধির আভাষ পাওয়া যাচ্ছে।
“দেখুন ঐ দিন ট্রেনে আমার ব্যাবহার দেখে আপনার আমাকে খুবী রুঢ় মনে হতে পারে। আপনি আপনার যায়গাটা না চাইতেই আমাকে দিলেন কিন্তু আমি আপনাকে একটা ধন্যবাদ পর্যন্ত দিলাম না।“ সালমা একটু থামল। আবার দম নিয়ে শুরু করল, “সেদিন একটি বিশ্রী ঘটনার ফলে ঝগড়া করে বাসা থেকে বের হয়েছিলাম। আমার মনটা খুবই তিক্ত ও খারাপ ছিল। কিছুই ভাল লাগছিল না। আমি সাধারণত এরকম ব্যবহারে অভ্যস্ত নই। আমাকে প্লিজ ক্ষমা করে দেবেন। I am sorry. আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর উত্তরে বললাম, “আমাদের সবারই কোনো কোনো সময় খারাপ যায় এবং তখন আমরা সকলেই হয়ত আমাদের স্বাভাবিক ব্যবহার করতে পারি না। সত্যি কথা বলতে কী আপনাকে আমার arrogant মনে হয়েছিল। কিন্তু আপনি এখন যেহেতু ব্যাপারটা বুঝিয়ে বললেন ফলে আমি আপনার সম্পর্কে আমার মতামত পরিবর্তন করলাম। আমাদের সবারই কিছু কিছু পরিস্থিতিতে এরকম হতে পারে।“
“ঠিক আছে, আগের ঘটনা সব মিটে চুকে গেল, এবার আপনার সম্পর্কে বলেন।“ আমার কথা শুনে সালমা একটু হাসে বলল, “আমার সম্পর্কে আর কী বা বলব? আমার নাম সালমা ইসলাম, আমি বনানীতে থাকি। আমার বাবা মা-ও ঢাকায় থাকেন। আমার বিয়ে হয়েছিল কিন্তু বিভিন্ন করণে তিন বছরের মাথায় বিয়ে ভেঙ্গে যায়। এক সময় একটি আন্তর্জাতিক NGO-তে কাজ করতাম কিন্তু বিয়ের পর ছেড়ে দিয়েছিলাম।“ আমি সালমার খোলাখুলি কথা বলার ধরণ দেখে আশ্চর্য হলাম। মেয়েরা সাধারণত প্রথম সাক্ষাতেই এত খোলাখুলি কথা বলে না। কিন্তু সালমাকে ব্যতিক্রম মনে হলো।
“আমার আর আপনার মধ্যে এক আশ্চর্য মিল দেখতে পাচ্ছি। আপনার মত আমারও বিয়ে হয়েছিল। আমার বিয়েও তিন বছর টিকেছিল। এখন গোয়াল পোড়া গোরু যেমন সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়, আমার অবস্থা সে রকম।“ আমার কথা শুনে সালমা হো হো করে হেঁসে উঠল। প্লেনের যাত্রার সময় ঘোষণা করা হলে আমি সালমাকে আমার কার্ড বের করে পেছনে আমার বাসার নাম্বারটা লিখে দিলাম। সালমাকে বললাম, “আপনার নাম্বার বলেন, আমি লিখে রাখি।” সালমা তার টেলিফোন নাম্বার দিল।
আমরা ডিপারচার গেট দিয়ে বেরিয়ে প্লেনে উঠে আমাদের স্ব-স্ব নির্ধারিত আসনে বসলাম। সালমার সিট আমার থেকে বেশ পিছনে ছিল। কাজেই প্লেনে কোনো কথা হলো না। প্লেনে শুধু একটি কথাই মনে হলো, এই টেলিফোন নাম্বার দেওয়া-নেওয়া একটু বেশী বেশী হয়ে গেল না? এর দরকার ছিল কি? কি জানি মানুষের মন কখন কী ভাবে কাজ করে।
আমার সাথে যেহেতু একটি ব্রিফকেস ছাড়া অন্য কিছু ছিল না, ঢাকা বিমানবন্দরে অবতরণ করার পরেই আমি খুব দ্রুতই বেরিয়ে যেতে পারলাম। এখানেও সালমার সাথে কোন কথা হয়নি।
এখানেই ঘটনার শেষ হতে পারত আরেকটি ঘটনা না ঘটলে।
প্রায় এক মাস পরের ঘটনা। এদিকে চট্টগ্রাম থেকে ফেরার পর আমার একটি ছোট পদোন্নতি হবার কারণে আমাকে একটি ডিপার্টমেন্টের দায়িত্ব নিতে হয়। ফলে কাজের চাপ প্রচণ্ড বৃদ্ধি পায়। প্রায় রাতেই বাসায় ফিরতে ফিরতে প্রায় ১০-১১-টা হয়ে যায়। এই গত এক মাসে সালমার সাথে মাত্র দুবার কথা হয়েছে। দুবারই সালমাই অফিসে টেলিফোন করেছিল। আমি অফিসের কাজে ব্যস্ত থাকায় কথা বেশিদূর গড়ায়নি। কথা দিয়েও আমার সালমাকে এখনও টেলিফোন করা সম্ভব হয়নি।
এই সময় একদিন জ্বর হলো সাথে একটু কাশি। ঠাণ্ডা লেগেছে মনে করে প্যারাসিটামল খেলাম। কিছুক্ষণ পর জ্বর কমে গেল। কিন্তু কাশিটা রয়েই গেল। প্রথম দিন এভাবেই গেল। দ্বিতীয় দিন বুকে একটু ব্যথা অনুভব করলাম, বিশেষ করে নিঃশ্বাস নেবার সময়। জ্বরটা বেড়ে গেল সাথে বমি বমি ভাব। আমার বাসায় আমি ও আলি ছাড়া আর কেউ নেই (আলি আমার অনেক দিনের বিশ্বস্ত কাজের লোক)। আমি ব্যাংকের ডাক্তারকে আমাকে বাসায় এসে দেখে যেতে অনুরোধ করলাম। তিনি ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই এসে আমাকে পরীক্ষা করলেন এবং কিছু টেস্ট করতে বললেন। “মনে হয় ঠাণ্ডা জ্বর, ঠিক হয়ে যাবে,” ডাক্তার মন্তব্য করে একটা প্রেসক্রিপশন লিখে দিয়ে বললেন, “আমি এই ঔষধ আপনাকে পাঠিয়ে দিচ্ছি। আপনার রক্ত নেবার জন্য একজনকে পাঠিয়ে দিব। আপনাকে কোথাও যেতে হবে না।” আলিকে ডাক্তার তার ফোন নাম্বার দিয়ে বললেন, “কোন সমস্যা হলে এই নাম্বারে আমাকে জানাবে।” ডাক্তার সাহেব বিদায় নিয়ে চলে গেলেন।
তৃতীয় দিন, বুকের ব্যথাটা বাড়ল, সাথে একটু শ্বাসকষ্ট অনুভব করলাম। খাবার কোন রুচি নেই, সবকিছু কেমন বিস্বাদ লাগে। তারপর কখন যে আমি জ্ঞান হারিয়েছি আমি জানিনা।
যখন চোখ খুললাম তখন আমি হাঁসপাতালে, মুখে অক্সিজেন মাস্ক লাগানো, হাতে স্যালাইন ড্রিপ। খুবই দুর্বল লাগছে, ঘরে বিছানার পাশের একটি চেয়ারে কে যেন বসে আছে, ঘাড়টা একদিকে হেলানো, চোখ বন্ধ। মনে হয় ঘুমিয়ে আছে। একটু পরে সালমাকে চিনতে পারলাম। কিন্তু সালমা এখানে কীভাবে?
কিছুক্ষণ পরে এক নার্স ঘরে প্রবেশ করলে সালমা চেয়ারে নড়েচড়ে বসলো। আমার চোখ খোলা দেখে সালমার মুখে হাঁসিতে ভরে উঠলো। সালমা তার হাত আমার হাতের উপরে রাখল, কোন কথা বলল না। নার্স আমার টেম্পারেচার, রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ, রক্তচাপ, ইত্যাদি পরীক্ষা করার পর বললেন, “আজকে আপনি অনেক ভাল, কয়েক দিনেই বাসায় ফিরতে পারবেন।“ নার্স চলে গেলেন।
আমার মুখে মাস্ক লাগানো থাকায় কথা বলতে পারছিলাম না। শ্বাস কষ্ট এখন হচ্ছে না দেখে মুখ থেকে মাক্সটা সরালাম। একটু অবাক হয়েই কাঁপা কাঁপা গলায় সালমাকে জিজ্ঞাস করলাম, “আপনি এখানে?” সালমা উত্তরে বলল, “সে কথা পরে হবে, আপনি এখন কেমন আছেন? যেমন সবাইকে ভয় ধরিয়ে দিয়েছিলেন।” “আমি কয়দিন হাঁসপাতালে?, আজকে কত তারিখ?, কী বার?” আমাকে থামিয়ে সালমা বলে উঠলো, “এত কথা বলবেন না। আপনার এখন বিশ্রাম দরকার। আজকে চারদিন হলো আপনি হাঁসপাতালে। আজকে ১২ মার্চ, শনিবার। আর কোন কথা বলবেন না।” এই বলে সালমা মুখের মাস্কটা আবার পরিয়ে দিল। আমি আপত্তি করলাম না। আমার চোখটা নিজে থেকেই বুজে এলো, আমি আবার ঘুমিয়ে পড়লাম।
পরের বার যখন চোখ খুললাম তখন মনে হলো সকাল। হাঁসপাতালের এই কেবিনগুলোতে একজন এ্যাটেন্ডেন্টের থাকার জন্য একটা ডিভান আছে। পাস ফিরে দেখলাম, সালমা ডিভানে ঘুমিয়ে আছে। গায়ে একটা পাতলা চাদর, মাথাটা আমার দিকে ফেরা, কোন মেকআপ ছাড়া শুকনা ক্লান্ত মুখ। আমি তখন চিন্তা করছি সালমা এখানে কীভাবে এলো।
একটু পরেই সালমার ঘুম ভেঙ্গে গেল, আমার চোখ খোলা দেখে তার মুখটা একটা নির্মল হাঁসি দেখে আমার মনটা যেন কেমন ভাল হয়ে উঠল। সালমা উঠে আমার কাছে এসে একটা হাত ধরে বলল, “আজকে কেমন লাগছে?” আমি মাস্ক লাগানো অবস্থায় একটু হাঁসার চেষ্টা করে বার্থ হয়ে মাথা ঝাঁকিয়ে ভাল আছি বুঝাতে চাইলাম। তার পরেই মাস্কটা খুলে বললাম, “আজকে অনেক ভাল, কিন্তু আপনি এত কষ্ট করছেন কেন, এখানে তো অনেক নার্স আছে, ডাক্তার আছে আমার তো কোনো অসুবিধা হচ্ছেনা। সালমা একটু হেঁসে বলল, “ঠিক আছে সে সব পরে দেখা যাবে, আমার কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। আর নার্সরা সবসময় থাকে না, একজনের সবসময় আপনার সাথে থাকা উচিৎ। আর এসব করে আমার অভ্যাস আছে।” সালমা একটু থেমে আবার জিজ্ঞেস করলো, “আপনার কিছু খাওয়া দরকার। এখানে হটপটে কিছু পরিজ আছে, খাবেন?” আমার খাবার রুচি ছিল না, মাথা নেড়ে না বললাম। কিন্তু সালমা নাছোড়বান্দা, “আপনার কিছু সলিড খাওয়া দরকার, এক কয়েকদিন তো শুধু লিকুইড ও স্যালাইনের উপর আছেন। একটু খান প্লীজ, জানি আপনার রুচি নেই তবুও কিছু জোর করে হলেও খেতে হবে।
“ সালমা হটপট খুলে ঢাকনাটা টেবিলে রেখে আমার পাশে চেয়ারে বসে কিছু পরিজ চামচ দিয়ে উঠিয়ে আমার মুখের সামনে ধরল। অগত্যা আমি চামচ থেকে একটু খেলাম, ভাগ্য ভাল পরিজের কোন স্বাদ নেই। কীরকম ঘাস ঘাস মতো মনে হলেও খেতে পারলাম। সালমা জোর করে প্রায় আধা বাটির মতো আমাকে খাওয়ালো। তারপরে একটা কাপড় গরম পানিতে ভিজিয়ে আমার মুখ, কপাল, ও গলা মুছে দিল।
আমি এখন আগের থেকে ভাল, মুখে মাস্ক নেই, নিজেই আলাদা অক্সিজেন ছাড়া নিঃশ্বাস নিতে পারছি। রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ প্রায় সাধারণ সময়ের কাছাকাছি, কাশি একটু আছে, কিছু আগের মতো না, এখন কফ নেই। সালমা এখনও আমার পাশে চেয়ারে বসে আছে।
“আপনি আমার জন্য এত কষ্ট করছেন দেখে আমার খারাপ লাগছে। আপনার এই ঋণ আমি তো কোনো দিন শোধ করতে পারব না।” আমার কথা শুনে একটু হেঁসে সালমা জবাব দিন, “এই ঋণ শোধ করতে হবে না। এটা হচ্ছে ট্রেনে আপনাকে ধন্যবাদ না দেবার খেসারত।,” আমি কিছু না বলে সালমার দিকে তাকিয়ে রইলাম।
কিন্তু সালমার দিকে তাকিয়ে আমার মিলির কথা মনে পড়ল। মিলির সাথে আমার দুই বছর প্রেমের পরে বিয়ে হয়। মিলি সুন্দরি ও স্মার্ট মেয়ে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নে মাস্টার্স শেষে একটি ঔষধ কোম্পানিতে কাজ করত। বিয়ের এক বছর পর্যন্ত ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দঘন কিছুদিন। আমরা দুজনে দেশে বিদেশে অনেক জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছি। এই সময় মিলি ছিল এক আদর্শ সহধর্মিণী। আমি আমার স্ত্রী ভাগ্যের জন্য খুবই গর্বিত ছিলাম।
কিন্তু এই সুখময় জীবন এক বছর পরেই আস্তে আস্তে পাকা সুস্বাদু ফল যেমন পচে দু:গন্ধ ছড়ায়, তেমনই মিলি’র যেন কীরকম পরিবর্তন হতে শুরু করলো। আমি ব্যাংকে চাকরি করি এবং আমার অনেক মহিলা সহকর্মী আছে। মিলি কেন যেন আমাকে সন্দেহ করতে শুরু করল, যেটা সে আমাকে আগে কখনো করেনি। ক্রমেই এই সন্দেহের মাত্রা বাড়তেই থাকল এবং এক সময় এমন পরিস্থিতি হলো যে মিলি অফিসে এসে সিন ক্রিয়েট করতে শুরু করলো। সে সবাইকে সন্দেহ করে। সে আমার পাশে কোন মহিলা আসলেই সন্দেহ করে। এমনকি আমার বন্ধু বা সহকর্মীদের স্ত্রীরাও তার সন্দেহের বাইরে না। বাসায় প্রায়ই এই নিয়ে চ্যাঁচামেচি করত। এমন পরিস্থিতি হলো যে আমার পক্ষে বাসায় থাকা ভীষণ কঠিন হয়ে উঠল। আমার বাসায় ফিরতেই ভয় লাগতো। ফলে আমিও আরও বেশী অফিসের কাজে ডুবে রইলাম। ক্রমেই বাসায় ফিরতে অনেক রাত হতো। পেছনে ফিরে তাকালে মনে হয় এই দেরী করে ফেরাও হয়তো মিলির সন্দেহের আগুনে ঘি ঢালার কাজ করেছিল। এর পরে যোগ হলো জিনিষ পত্র ভাঙ্গা। প্লেট, বাসন, টিভি, কিছুই বাদ রইলো না।
আমার শুভাকাঙ্ক্ষীরা মনোবিজ্ঞানীর পরামর্ষ নিতে বললেন। কিন্তু মিলি কিছুতেই যাবে না, অনেক চেষ্টা করার পরও গেল না। এভাবে দুবছর পর আমি বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন করি।
আমি সালমার দিকে তাকিয়ে আছি, কিন্তু সালমার বদলে মিলিকে যেন দেখতে পাচ্ছি। একটা ঘটনা মনে পড়ল, আমাদের বিয়ের কয়েক মাস পরের ঘটনা, আমরা কক্সবাজারে গিয়েছিলাম। মিলি ও আমি সমুদ্রে স্নান করেতে গেলাম। মিলি কোমর পানিতে দাঁড়িয়ে ঢেউয়ের সাথে খেলছে, এমন সময় হঠাৎ একটা বড় ঢেউ এসে মিনিকে ভাসিয়ে নেবার উপক্রম করল। মিলি ভাল সাঁতার জানতো না। আমার মিলির কাছে পৌছতে একটু সময় লাগলো কিন্তু এরই মধ্যে মিলি নাস্তানাবুদ। আমি মিলিকে কোলে করে করে ডাঙ্গায় নিয়ে আসলাম। খুব বেশী কিছু না হলেও মিলি খুব ভয় পেয়েছিল। আমার গলা জড়িয়ে ধরে ছিল। মিলি আমার গলাটা আঁকড়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে আমকে আকুতি করতে থাকলো, “প্লীজ প্রমিজ কর, প্লীজ প্রমিজ কর, তুমি আমাকে ছেড়ে কখনো যাবে না। প্লীজ প্রমিজ কর।” আমিও মিলিকে কথা দিলাম আমি তাকে ছেড়ে কোথাও যাব না। কিন্তু সেই কথা তো আমি রাখতে পারিনি।
কিন্তু আমার কী করার ছিল, আমি তখন কী করতে পারতাম? আমার যদি অঢেল সম্পত্তি থাকত তাহলে হয়ত চাকরী ছেড়ে আমি মিলির কাছে সারাক্ষণ থাকতে পারতাম। কিন্তু আমার মতো একজন চাকুরীজীবীর পক্ষে তা কি সম্ভব? চাকুরীই আমার উপার্জনের একমাত্র সম্বল। মিলি যখন আমার অফিসে গিয়ে চেঁচামেচি শুরু করলো, তখন আমি খুবই ভয় পেয়েছিলাম। একদিন আমার বস আমাকে তার রুমে নিয়ে কিছু একটা করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। “কোন কিছু করো” বললেও এটা আসলে ছিল একটা সূক্ষ্ম সাবধান-বানী।
কিন্তু নিজেকে যতই সান্ত্বনা দিতে চাই না কেন, একটা অপরাধবোধ সব সময় যেন আমাকে কুড়েকুড়ে খায়। আমি বুঝে পাই না আমি কি করবো।
সালমা আমার দিকে তাকিয়ে ছিল, কিন্তু সে মনে হয় আমার চোখ দেখে বুঝতে পারছিল যে আমি গভীর চিন্তায় মগ্ন। এমন সময় ডাক্তার এলেন। আমি ডাক্তারের দিকে ঘুরে তাকালাম। ডাক্তার প্রথমে আমার পালস, রক্তচাপ, ইত্যাদি দেখার পর জিজ্ঞাস করলেন, “কেমন লাগছে এখন? আপনাকে সম্ভবত কালকে ডিসচার্জ করা যেতে পারে। এখন খিদে কেমন আছে?” আমি ডাক্তারের কথার উত্তর দিলাম। ডাক্তার সালমাকে বললেন, “উনি যেন এখন একটু ভাল মতো খাওয়াদাওয়া করেন খেয়াল রাখবেন, এখন উনার প্রচুর পুষ্টিকর খাবার দরকার।“ উপদেশ শেষে ডাক্তার তার দলবল সহ চলে গেল।
ডাক্তার চলে যেতেই সালমা একটি ফ্লাক্স থকে কিছু চিকেন সুপ একটি বাটিতে ঢেলে আমার সামনের চেয়ারে বসলো। চামচ দিয়ে আমাকে সুপ খাওয়াতে শুরু করল। “এখন খাব না, খাব না, এসব বলা যাবে না। শুনলেন তো ডাক্তার কি বললেন।“ সালমা বেশ জোরের সাথেই বলল। আমি কথা না বলে সুপ খেতে থাকলাম। দেখলাম খেতে খারাপ লাগছে না। মুখের স্বাদ কিছুটা ফিরে এসেছে।
পরের দিন আমি হাসপাতাল থেকে আমার ফ্লাটে ফিরলাম। এখনও প্রচণ্ড দুর্বল, সাহায্য ছাড়া হাটা চলা করতে কষ্ট হয়। আমি কিছু দিনের জন্য একজন নার্স রাখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সালমা শুনে আমার প্রস্তাব নাকচ করে দিল। “না না নার্স-টার্স লাগবেনা, আমি দেখাশুনা করব। আমি অবশ্য সেটা চাইছিলাম না। আমি এমনিতেই সালমার কাছে অনেক ঋণগ্রস্ত, আর ঋণ বাড়াতে চাই না। কিন্তু সালমা কোনো ভাবেই নার্স রাখতে দিবে না। সে-ই আমার দেখাশুনা করবে।
বিকেলবেলা দেখলাম সালমা একটি সুটকেস নিয়ে হাজির, “কাপড় চোপড় নিয়ে এলাম, আপনার কোন অসুবিধা হবে না তো?” মনে মনে ভাবলাম আমার অসুবিধা হলেই বা কে শুনে? আমি একটু হেঁসে উত্তর দিলাম, “না না অসুবিধা কেন হবে।”
এর পর সালমা আবার ফ্লাটে সাত দিন থাকলো। আমি কি খাব, কখন বিশ্রাম নিব, ইত্যাদি সবই এখন সালমার সিদ্ধান্তে হয়। ইতোমধ্যে আমার স্বাদ ফিরে এসেছে, প্রচুর খিদেও বেড়েছে, এবং সালমার তত্বাবধানে রান্নাও বেশ সুস্বাদু।
যাই হোক, অষ্টম দিনে, অনেক দিন পর, আমি অফিসে গেলাম। অসুখের ফলে আমার ওজন প্রায় দশ কেজির মতো কমে গেছে। আমি সুস্থ হবার পর সালমা তার নিজের বাসায় ফিরে গেছে। এখন দিনে বেশ কয়েকবার ফোন করে, আমার খবরাখবর নেয়, ও বিভিন্ন উপদেশ দেয়।
আমি হাঁসপাতাল থেকে ফেরার পর মিলির খোঁজ শুরু করলাম। আমি এতটুকুই জানতাম যে ডিভোর্সের পর মিলিকে তারা আমেরিকা প্রবাসী বড় বোন তার কাছে নিয়ে গেছেন। কিন্তু মিলি ঢাকায় ফিরেছে কি না তা জানা ছিল না। মিলির কিছু বান্ধবীকে আমি চিনতাম, তাদের টেলিফোন নাম্বার সংগ্রহ করে তাদের একজনকে টেলিফোনে কথা বলে জানতে পারলাম যে মিলি মাস তিনেক আগে ঢাকায় ফিরে এসেছে। এখন তার বাবা-মার সাথে তাদের ধানমন্ডির বাসায় আছে। ধানমন্ডির বাসার টেলিফোন নাম্বার আমি জানতাম। কিন্তু সাথে সাথে টেলিফোন করার সাহস সঞ্চার করতে পারলাম না। টেলিফোন করে কী বলব?
আবার এদিকে সালমার যে আমার প্রতি দুর্বলতা আছে সেটা খুবই পরিস্ফুট। সালমার ব্যাপারে আমি কী করব বুঝতে পারছি না। কিন্তু হাসপাতালে কয়েক দিন থাকার পর আমি বুঝতে পেরেছি মিলিই আমার একমাত্র ভালবাসা। মিলির যায়গাটা আমি কি আর কাউকে দিতে পারব—সালমাকে? একটি তালাবন্ধ ঘরের ভিতরে কী আছে সেটা যেমন বাহিরে থেকে বুঝা যায় না, ঠিক তেমনই হৃদয়ের ভিতরের চাপা অনুভূতিকে অনেক সময় বুঝা যায় না। কেবলমাত্র যখন অন্য কেউ হৃদয়ের বন্ধ দরজা খুলে প্রবেশ করতে চায় তখনই বুঝা যায় হৃদয়কে ইতোমধ্যে বিশেষ কেউ দখল করে আছে কি না। দখল করে থাকলে অন্য কারও স্থান সেখানে হয় না।
কার হৃদয় যে কিভাবে কাজ করে, তা হয়তো যার হৃদয় সে নিজেও জানেনা। মস্তিষ্কের দ্বারা হৃদয় নিয়ন্ত্রিত হয় না, হৃদয়ের নিয়ন্ত্রণ মস্তিষ্কের বাইরে অজানা কোথাও।
হ্যাঁ, মিলির সাথে আমার বিবাহ বিচ্ছেদ হয়েছিল, কিন্তু বিবাহ বিচ্ছেদ তো সুধুই একটি আনুষ্ঠানিকতা, এটা তো মনের কথা না। মিলিকে আমার ফিরে পেতেই হবে। মিলিকে কি আমি বুঝাতে পারব, যে সে ছাড়া আমার হৃদয়ে আর কেউ কখনো ছিল না, এখনো নেই? মিলি যদি সায় না দেয় তখন আমি কী করবো?
সালমাকে একটা কথা বলেছিলাম যে গোয়াল পোড়া গোরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পার। কথাটা কি মিলি ও আমার বেলায় প্রযোজ্য? বিয়ের প্রথম বছর আমরা যেভাবে দুজন দুজনকে সমস্ত সত্ত্বা দিয়ে ভালবেসেছিল তার যে সুমধুর স্মৃতি সেটা কী কয়েক জনমেও আমি ভুলতে পারবো? এখন যদি আমি আবার মিলির কাছে ফিরে যাই তাহলে মিলি নিশ্চয়ই বুঝতে পারবে যে আমার সম্পর্কে তার ধারণা ভুল ছিল।
কিন্তু আমি কোনো ভাবেই বুঝতে পারছিলাম না যে মিলি আমাকে সন্দেহ করতে শুরু করল কেন। মানুষ তো শুধু শুধু কিছু করে না। মিলির আমাকে সন্দেহ করার নিশ্চয়ই কোনো কারণ ছিল। আমি মিলিকে অনেকবার এ ব্যাপারে জিজ্ঞাস করেছিলাম কিন্তু মিলির উত্তর ছিল, “আমি সব জানি।“ এখন কেউ যদি সব জানে তাহলে তো কোনো আলোচনা করা যায় না। মিলি আমাকে কোনো দিন বলেনি সে আমাকে কেন সন্দেহ করত।
সালমাকে আমার মনের অবস্থাটা খুলে বলা উচিৎ, তা না হলে সালমার প্রতি অবিচার করা হবে। এবং যত দ্রুত করা যায় সেটাই ভাল। সালমাকে আমি নিজে থেকে জড়াইনি। সে নিজেই নিজেকে জড়িয়েছে। কিন্তু তা’বলে তো তার সাথে অবিচার করা যায় না। আমার মন যদি অন্য কারো দখলে থাকে তাহলে সালমাকে আমার মনের কথা বুঝিয়ে বলা উচিৎ। কিন্তু এ সমস্ত স্পর্শকাতর বিষয় আলোচনার কোন অভিজ্ঞতা তো আমার নেই?
এখন যখন পিছনে ফিরে তাকাই তখন বুঝতে পারি যে মিলিকে ছাড়ার পর আমি এক মুহূর্তের জন্যও শান্তিতে নেই। এটাকে আমি বিভিন্ন ভাবে নিজের কাছে অস্বীকার করতে চেয়েছি কিন্তু নিজের অজান্তেই বিবেক আমাকে প্রতিনিয়ত তাড়া করে বেড়িয়েছে। মিলির সাথে কি আমি অবিচার করেছি?
আমার বিয়ের স্মৃতি মনে হলেই এক মিশ্র প্রতিক্রিয়া হয়। একদিকে প্রচণ্ড সুখময় স্মৃতি, অন্যদিকে প্রিয়তমার প্রতিনিয়ত সন্দেহের তীব্র হূল। এই দুয়ের সংঘর্ষে আমরা দুজনেই ক্ষতবিক্ষত। মানুষ কোনো কোনো সময় হয়ত প্রচণ্ড বেদনায় সুখের স্মৃতি ভুলে যায়, তখন শুধু বেদনাই সব কিছু গ্রাস করে ফেলে। এই ক্ষত শুকাতে সময় লাগে, আবার কোনো কোনো সময় এই ক্ষত চিরদিন থেকে যায়, একটি টিউমারের মতো। এই গত কয়েক দিনে বুঝতে পেরেছি এই ক্ষত সারানোর একমাত্র উপায় হচ্ছে মিলিকে আবার ফিরে পাওয়।
ছয়টা বাজে। সালমা এক কাপ চা নিয়ে সোফায় বসে আছে, সামনের টিভিটা খোলা, কিন্তু সালমা টিভি দেখছে না। সালমা গভীর চিন্তায় মগ্ন। সেলিমকে সালমা কোনো ভাবেই বুঝতে পারছে না। মানুষটা যে ভাল সেটা এই কয়দিনে সালমা বুঝতে পেরেছে। কিন্তু সেলিমের কোথায় যেন একটা কিছু আটকে আছে, কিছু একটা বেদনা চাপা পড়ে আছে, বেহালার তার ছিঁড়ে গেলা যে রকম বেসুরো হয়, সেলিমের সালমার সাথে আচরণ ও অনেকটা সে রকম। হাসপাতালে সালমা অনেকবার দেখেছে সেলিম কেমন যেন উদাস হয়ে কী সব ভাবে। তখন তাকে দেখলে কষ্ট হয়। তাকে সান্ত্বনা দিতে ইচ্ছে করে। কিন্তু সালমা যতই ঘনিষ্ঠ হবার চেষ্টা করছে সেলিম কিন্তু সেরকম প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। কেমন যেন নির্লিপ্ত। কেন যেন সালমাকে দূরে সরিয়ে দিতে চাইছে। সালমা আশা করেছিল তাদের সম্পর্ক ইতোমধ্যে আপনি থেকে তুমি তে আসবে। কিন্তু সেলিম কখনই সে চেষ্টা করেনি। সালমার চেষ্টা স্বত্বেও তাদের দুজনের সম্পর্ক প্রথমে যেখানে ছিল সেখানেই রয়ে গেছে।
সালমার নিজের জীবনেরও খুব সুখের নয়। বেশ সচ্ছল পরিবারের মেয়ে সে, পড়াশোনায় ভাল ছিল, নিজের নামে বাবার দেয়া ফ্ল্যাট আছে। তার বিয়ে হয়েছিল, সবাই যাকে বলবে, ভাল পাত্রের সাথে। উচ্চশিক্ষিত, ভদ্র, নম্র, উচ্চবিত্ত ব্যবসায়ী পিতার একমাত্র ছেলে। চার ভাই-বোনেরে মাঝে সবচেয়ে ছোট। এর থেকে ভাল পাত্র আর কী হতে পারে। সালমার মত দিতে দেরী হয়নি। খুব ধুমধামের সাথে বিয়ে হয়েছিল।
বিয়ের প্রথম রাতেই বুঝেছিল যে তার স্বামী একটু মেয়েলি ধাঁচের। কিছুদিনের মধ্যেই বুঝতে পারলো যে তার স্বামীকে নিয়ন্ত্রণ করে প্রধানত তার মা ও বোনেরা। তাদের মত-ই তার স্বামীর মত—তার নিজের মত বলে কিছুই নেই। সালমা কী রঙের শাড়ি পড়বে সেখানে ও শাশুড়ি বা ননদেরা নাক গলাবে। সালমার শাশুড়ির মতামতের বাহিরে কোনো কিছু করা যাবে না। কোথাও বেড়াতে গেলে শাশুড়ির অনুমতি নিতে হবে। কিছুদিনের মধ্যেই সালমার প্রাণ ওষ্ঠাগত। সালমা ধারণা মা এবং বোনদের প্রচণ্ড প্রভাবের কারণেই তার স্বামীর নিজস্ব ব্যক্তিত্ব তৈরি হতে পারেনি। সালমা স্বাধীনচেতা মেয়ে, এ ধরনের পরিবেশে সে বড় হয়নি। কাজেই মাঝে মাঝেই শাশুড়ির সাথে মতের অমিল হতে থাকে। স্বামীকে বললে বলে, “মা-তো আমাদের খারাপ চান না, একটু মানিয়ে চললেই তো হয়।“
তারপর শাশুড়ি তার চাকরির পেছনে লাগেন। চাকরি করলে ছেলের ঠিক মতো দেখাশোনা হয় না। তাছাড়া এ পরিবারের বউরা চাকরি করে না, ইত্যাদি বলে ভাল চাকরিটা ছাড়াতে বাধ্য করলেন। সালমা স্বামীকে বলেছিল তাদের নিজের ফ্লাটে গিয়ে উঠতে, কিন্তু তার স্বামী মা-বোনদের ছেড়ে যেতে রাজি হয়নি।
সালমা এ বিষয়ে বাবা মায়ের কাছে মুখ খুলতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু তারাও সালমাকে উপদেশ দিয়েছেন “একটু মানিয়ে চলতে।” সালমার জীবনটা কি সবার সাথে মানিয়ে চলার জন্য? সব সময় পরের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতে হবে? নিজের বলে কিছু থাকবে না? হয়তো প্রাচীনকালে কোনো একসময় নারীদেরকে এভাবেই জীবন কাটাতে হোতো, কিন্তু এই একবিংশ শতাব্দীতে মেয়েদেরকে সেটা মেনে নিতে হবে কেন? জীবন অনেক বিশাল, এক ক্ষুদ্র প্রকোষ্ঠে আবদ্ধ থাকার জন্য নয়।
সালমার স্বামীর সব বোনদের বিয়ে হয়ে গেলেও প্রায় সময়েই এক বা একাধিক বোন বাপের বাড়িতে এসে থাকে। মনে হয় এখানে তারা যেরকম স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে স্বামীর বাড়িতে হয়ত সেটা হয়ে ওঠে না। শুধু শাশুড়ি থাকলেও সেটাকে হয়তো মানিয়ে নেওয়া যেতে পারতো। কিন্তু এই মা মেয়েদের সম্মিলিত উপদ্রবকে সামলানো সালমার পক্ষে সম্ভব হয়নি।
ছেলেদের তুলনায় এই সমাজে মেয়েদের অনেক সমস্যা, চাইলেই হুট করে কিছু করা যায় না। পরিবারের কথা চিন্তা করতে হয়, সমাজের কথা চিন্তা করতে হয়। তার পরেও সালমা স্বামীর একটু সহযোগিতা পেলে হয়ত মানিয়ে নিতে পারত, কিন্তু তার মেরুদণ্ডহীন স্বামী ন্যূনতম সহযোগিতাও করেনি। তিন বছরের মাথায় সালমা হাঁপিয়ে ওঠে। বাবার বাড়িতে চলে যায়-আর ফিরে যায়নি।
সালমার জামাইও শুধু কিছু দায়সারা গোছের অনুরোধ ছাড়া ফেরানোর বিশেষ কোনো উদ্যোগ নেয়নি। বিচ্ছেদের এক বছর পরে শাশুড়ি তার প্রাক্তন স্বামীকে আবার বিয়ে করিয়েছে।
সালমা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে দেখে চা ঠাণ্ডায় বরফ হয়ে গেছে। চা খেতে আর ইচ্ছে করলো না। মাথাটা একটু ব্যথা করছে। সালমা শোবার ঘরে যেয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিল।
পরের দিন রোববার, সাপ্তাহিক ছুটির দিন। ছুটির দিনে সেলিম সাধারণত একটু দেরিতে ঘুম থেকে ওঠে। সাড়ে আটটায় ঘুম থেকে উঠে নাস্তা শেষ করতে করতে সাড়ে ন’টা বেজে গেল। গত কয়েক দিন থেকেই সেলিম মিলিকে টেলিফোন করার মানসিক প্রস্তুতি নিচ্ছিল। আজকে সেই নির্ধারিত দিন।
দুরুদুরু বক্ষে সেলিম টেলিফোন ডায়াল করল। মিলি যদি কথা বলতে না চায়? যদি টেলিফোনই না ধরে? তাহলে আমি কী করব? এই সব দু:চিন্তা করতে করতে অপর প্রান্তে রিং শুনতে লাগলো। ছয়টা রিঙের পর ফোনের অন্য প্রান্ত থেকে এক মেয়েলি গলা ভেসে এলো। “হ্যালো, কে” গলাটা মিলির মায়ের। আমি প্রায় কাঁপা কাঁপা গলায় উত্তর দিলাম, “জী, আসসালামুয়ালাইকুম আম্মা, আমি সেলিম।” উত্তর দেওয়ার সাথে সাথে আমার ভয় হতে লাগলো, যদি মিলির আম্মা আমাকে ধমক দিয়ে ফোন রেখে দেন? অন্য প্রান্ত থেকে কিছুক্ষণ নীরবতা। এদিকে আমার কপাল থেকে টস টস করে ঘাম ঝড়ে পড়ছে। বেশ কিছুক্ষণ পর মিলির আম্মা একটু দ্বিধা মিশ্রিত অনিশ্চিত স্বরে উত্তর দিলেন, “হাঁ, বলো, কিছু বলবে?” “আম্মা, আমি একটু মিলির সাথে কথা বলতে চাই,” আমি ভয়ে ভয়ে উত্তর দিলাম। অপর প্রান্তে বেশ কিছুক্ষণ নীরবতার পর মিলির মা উত্তর দিলেন, “ধরো, দেখি মিলি কথা বলতে চায় কী না?” টেলিফোন টেবিলে রাখার আওয়াজ পেলাম।
আমি টেলিফোন ধরে দাঁড়িয়ে আছি। মিলি যদি টেলিফোন ধরতে না চায়, তাহলে আমি কী করব? আমার বুকের ধড়ফড়ানি এখন আমি নিজেই শুনতে পাচ্ছি। বেশ কয়েক মিনিট নীরবতা, হয়ত ৩-৪ মিনিট হবে, কিন্তু আমার কাছে মনে হচ্ছে অনন্তকাল। সময় এই রকমই উলটাপালটা ব্যাবহার করে। কিছুর জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করার সময়, সময় যেন শেষ হতেই চায় না, আবার যখন কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজের সময় নিদিষ্ট করা থাকে তখন সময় মনে হয় মুহূর্তেই ফুরিয়ে যায়।
কিছুক্ষণ পর অপর প্রান্তে কেউ ফোন টেবিল থেকে উঠল বলে মনে হয়। আমি চরম উৎকণ্ঠায় উদগ্রীব হয়ে আছি কি উত্তর আসে। অপর প্রান্ত থেকে মিলির মার গলা ভেসে এলো, “মিলির এখন মাথা ব্যথা করছে, বিছানায় শুয়ে আছে, এখন টেলিফোন ধরতে পারবে না? “আম্মা, প্লীজ আরেকবার একটু দেখেন না, প্লীজ, আমি শুধু মিলির সাথে সামান্য কথা বলতে চাই,” আমি কণ্ঠের আকুতি ঝরে পড়ল।মিলির মা কিছুক্ষণ চুপ থেকে একটু ইতস্তত: করে বললেন, “আমি তো ওকে বললাম তোমার কথা, কিন্তু সে তো কথা বলতে চাইল না, আচ্ছা ধরো, আরেকবার দেখি।”
আবার কিছুক্ষণের নীরবতা। একটু পরে মিলির মা টেলিফোনের ওপর প্রান্ত থেকে বললেন, “না, মিলি এখন তোমার সাথে কথা বলতে পারবে না, বিরক্ত করতে মানা করেছে,” এক কথা বলেই মিলির মা টেলিফোন রেখে দিলেন। আমি অপর প্রান্তে টেলিফোনটা ধরে কিছুক্ষণ পক্ষাঘাতগ্রস্তের মতো দাঁড়িয়ে রইলাম। এখন কী করবো? সাথে সাথেই সিদ্ধান্ত নিলাম।
কাপড় পরে গাড়ি বের করে ধানমন্ডির দিয়ে রওয়ান দিলাম। মিলি যে ফোন ধরবে না, আমি আগেই আন্দাজ করেছিলাম। তবুও একটি ক্ষীণ আশা ছিল—যদি ধরে।
রোববার বলে রাস্তায় যানবাহন কম। কিছুক্ষণের মধ্যেই ধানমন্ডি পাঁচ নাম্বার রাস্তায় পৌঁছলাম। মিলিদের বাসাটা বেশ অনেকটা যায়গা নিয়ে, একটা দোতালা বাসা, সামনে গাড়ি বারান্দা, বেশ বড় একটা লন। ধানমন্ডির প্রায় সব বাসাই দেখতে এরকম।
গাড়ি বারান্দায় কোন গাড়ি ছিল না, আমি পৌঁছে
গাড়ি থেকে নেমে কলিং বেল চাপলাম। ভিতরে কোথায় ক্রিং ক্রিং আওয়াজ ভেসে আসলো।
কিছুক্ষণ পর অচেনা এক লোক দরজা খুলল, মনে হয়
বাসার কাজের লোক হবে।
“আমি মিলির সাথে দেখা করতে এসেছি,” আমি ঘোষণা করলাম। লোকটা আমাকে একটু পর্যবেক্ষণ শেষে বলল, “জী, আসেন।” আমাকে একতালার ড্রইং রুমে নিয়ে বসাল। মিলিদের বাসাটা দোতালা, নীচে বসার ঘর, খাবার ঘর, রান্না ঘর, অতিথিদের ঘর, আর একপাশে কাজের লোকের থাকার জায়গা। সব শোবার ঘর দোতালায়।
কিছুক্ষণ পরে মিলির মা এলেন, আমাকে দেখেই ভ্রু কুঁচকিয়ে বিরক্ত হয়ে বললেন, “ও তুমি, কী চাও?” আসসালামোয়ালাইকুম আম্মা, আমি মিলির সাথে দেখা করতে এসেছি। মিলিকে দয়া করে বলেন যে তার সাথে দেখা না করে আমি এখান থেকে যাব না,” আমি খুবই দৃঢ় কণ্ঠে আমার উদ্দেশ্য ঘোষণা করলাম।
মিলির মা কিছুক্ষণ আমার দিকে অবাক হয়ে চেয়ে রইলেন। তারপর কিছু না বলেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেলান। আমি চুপচাপ সোফায় বসে রইলাম। কিছুক্ষণ পরে মিলির মা মিলির বাবাকে নিয়ে ঘরে ঢুকলেন। আমি মিলির বাবাকে সালাম দিলাম। মিলির বাবা বেশ উদ্বিগ্ন ভাবে আমাকে প্রশ্ন করলেন, “কী সেলিম, কী হয়েছে?” “আব্বা কিছু হয়নি, আমি মিলির সাথে একটু কথা বলতে এসেছি।” মিলির বাবা বেশ অস্বস্তিতে পড়লেন বলে মনে হলো। একটু আমতা আমতা করে বললেন, “মিলি তো তোমার সাথে কথা বলতে চায় না। তুমি বাবা আবার কেন বিরক্ত করতে এসেছ? মিলিকে একটু শান্তিতে থাকতে দেও।”
“আমি ঠিক করে এসেছি যে মিলির সাথে দেখা না করে আমি যাব না,” আমার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ উত্তর। মিলির বাবা একটি সোফায় ধপ করে বসে পড়লেন। “কী সব ঝামেলা, তোমরা যে কী সব করো, সবাইকে বিপদে ফেলো।” মিলির বাবা বিড়বিড় করে অভিযোগ করতে থাকলেন। “আব্বা, যা হয়েছে তার জন্য আমি ক্ষমা চাচ্ছি, আপনাদেরকে কষ্ট দেয়া আমার উদ্দেশ্য কখনই ছিল না। জানি আপনারা অনেক কষ্ট পেয়েছেন, আমি তার জন্য বারবার মাফ চাইছি,” আমি খুবই বিনীত ভাবে বললাম।
মিলির বাবা মিলির মায়ের দিকে তাকালেন, তিনি তখনো দাঁড়িয়ে আছেন। “যাও মিলিকে বলো, আর কী করবা,” মিলির মা কিছু না বলে বেরিয়ে গেলেন। এখন এই কক্ষে এক অস্বস্তিকর নীরবতা। আমি চুপ করে বসে আছি, মিলির বাবা আমার অদূরে আরেকটি সোফায় বসে আছেন, তার মুখে এক বেদনার অভিব্যক্তি ফুটে আছে দেখে খুব খারাপ লাগল।
অনেকক্ষণ পরে মিলির বাবা সোফা থেকে উঠে বললেন, “দেখি কী হচ্ছে,” এক কথা বলে তিনিও কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলেন। এখন আমি একা বসে চিন্তা করছি, মিলি কি আসবে? মিলি না এলে আমিও এখান থেকে নড়ব না। দেখা না করে আমি আজকে এখান থেকে যাবই না। এভাবে আরও দশ-পনের মিনিট পরে মিলি ও মিলির মা কক্ষে প্রবেশ করলেন। মিলিকে আমি প্রায় তিন বছর পরে দেখলাম। মিলি অনেক শুখিয়ে গেছে, গম্ভীর মুখ, একটু রাগান্বিত মনে হচ্ছে। মিলি আমাকে এক পলক দেখে আবার চোখ ফিরিয়ে নিলো। “কী চাও তাড়াতাড়ি বলো,” বেশ রুষ্ট কণ্ঠে মিলি জানতে চাইল। “আমি তোমার সাথে একটু একা কথা বলতে চাই,” আমি মিলির মায়ের দিকে তাকালাম। মিলির মা মিলির দিকে তাকিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
এখন ঘরে শুধু মিলি ও আমি। মিলি চুপ করে মাথা নিচু করে বসে আছে।
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে বসে মিলিকে দেখতে থাকলাম। মিলি আমার থেকেই একটু দূরে একটি সোফায় মুখ নিচু করে বসে আছে। মিলিকে আগের থেকেও বেশী সুন্দর লাগছে। মিলি কোনো গয়না পরে নেই। গলা হাত সবই খালি।
আমি দূরের সোফা থেকে উঠে মিলির পাশের সোফায় বসলাম। মিলি মাথা না তুলেই আমার দিকে ঘুরাল, পরক্ষণেই আবার মুখটা আগের জায়গায় ফিরিয়ে নিলো। আমাকে প্রথমে যে এক ঝলক দেখেছিল তারপর আর আমার দিকে ফিরে তাকায়নি।
“মিলি, তোমাকে এত কষ্ট দেবার জন্য আমি খুবই দুঃখিত, প্লীজ আমাকে ক্ষমা করে দিও। তোমার কথা আমি কখনো ভুলতে পারি না। তোমার সাথে বিচ্ছেদ হবার পর থেকে আমি এক ফোটা শান্তিতে নেই। সব সময় তোমাকে হারানোর ব্যথা আমাকে কুরে কুরে খাচ্ছে।
আমি এখনো জানিনা, তুমি হঠাৎ আমাকে কেন সন্দেহ করতে শুরু করলে। আমি এই চিন্তা করতে করতে অনেক রাত অনিদ্রায় কাটিয়েছি, কিন্তু রহস্যের কোনো কূলকিনারা পাইনি। তুমি বুদ্ধিমতী মেয়ে, তোমার তো অকারণে আমাকে সন্দেহ করার কথা না। নিশ্চয়ই তুমি কিছু দেখেছো বা শুনেছ। আমি জানতে চাই তুমি কী কারণে আমাকে সন্দেহ করতে। কেননা আমি জানি যে আমি এমন কোনো কাজ করিনি যার জন্য তুমি আমাকে অবিশ্বাস বা সন্দেহ করতে পারো। আমার হৃদয় সব সময় তোমারি ছিল, এখনও তোমারি আছে। আমার জীবনের সবচেয়ে সুখের সময় ছিল তোমার সাথে, বিশেষ করে বিয়ের পরের এক বছর। তার পরেই তুমি কেমন যেন বদলে যেতে থাকলে। তুমি আর আগের মতো রইলে না। সন্দেহ করে আমাকে দূরে সরিয়ে দিলে। তোমাকে এখানে বসে আমি আমার মনের সব কথা বলতে পারব না। আমাদের অন্য কোথাও নিরিবিলিতে বসতে হবে,” আমি থামলাম।
মিলি, চুপ করে মাথা নিচু করে বসে রইল, আমি তার মুখ দেখতে পারছিলাম না ফলে তার মুখের অভিব্যক্তি বুঝতে পারলাম না।
“মিলি, কিছু বলো,” আমি অনুনয় করলাম।
“আমার কী বলার আছে? তুমিই তো সব সম্পর্ক চুকিয়ে দিলে, এখন আবার সম্পর্ক গড়ার কী দরকার? জীবনের যে অধ্যায় শেষ তাকে নিয়ে আবার ঘাটাঘাটি কেন?” বলে মিলি আবার আগের মতো কার্পেটের দিকে তাকিয়ে রইল।
“না, মিলি আমাদের সব সম্পর্ক শেষ হয়নি, আমার হৃদয়ে শুধু তুমিই আছো। কিন্তু আজকে আমার সব কথা বলে শেষ করা যাবে না। তোমার সেই যায়গাটার কথা মনে আছে যেখানে বিয়ের আগে আমরা দেখা করতাম, সেই সাতমসজিদ রোডের দোকানটা?”
আমার প্রশ্নের উত্তরে মিলি চুপ করে রইল, কোন উত্তর দিল না।
“মিলি, তুমি আমার কথা শুনছো?” মিলি তার মাথাটা একটু উপর নীচ করে বুঝাল সে শুনছে। পরশুদিন বেলা এগারোটায় কি আমারা সেখানে যেতে পারি? আমি তোমাকে বাসা থেকে তুলে নিতে পারি। যাবে,” আমি চরম আকুতিতে মিলির কাছে জানতে চাইলাম।
মিলি অনেকক্ষণ কিছুই বলল না। কিছুক্ষণ পরে মুখ উঠিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “ঠিক আছে যাব, কিন্তু তোমাকে উঠাতে হবে না, আমি নিজেই যেতে পারব।” আমার বুকে থেকে একটা বিশাল পাথর যেন নেমে গেল। আমি এতক্ষণ মিলির দিকে ঝুঁকে বসে ছিলাম, এখন সোফাতে সোজা হয়ে বসলাম।
“আমি আজকেই তোমাকে একটা চিঠি পাঠাব, আমার সব কিছু বর্ণনা করে। মুখের ভাষায় অনেক কথা বলা যায় না, যেটা লিখে বোঝান সহজ,” আমি প্রথম সাক্ষাতে মিলিকে আর বিরক্ত করতে চাইলাম না। মিলির নিশ্চয়ই অনেক কিছু চিন্তা করার আছে। আমি আমার পকেট থেকে একটা ছোট নোটবই বের করে রেস্তোরার নাম ও টেলিফোন নাম্বার লিখে কাগজটা ছিঁড়ে মিলিকে দিলাম। আজকে তাহলে আমি যাচ্ছি, পরশুদিন এগারোটার সময় দেখা হবে। আব্বা, আম্মাকে আমার সালাম দিও। খোদা হাফেজ,“ কথা শেষ হলে আমি উঠে দাঁড়ালাম, মিলি সোফাতে বসে রইল। আমি বেরিয়ে বাসার দিকে চললাম।
আজকে আমার খুব ভাল লাগছে। মিলির সাথে দেখা করার পর অনেকদিন পরে যেন সব কিছু ভাল লাগছে। রাস্তায় এখন অনেক ট্রাফিক, কিন্তু তা স্বত্বেও গাড়ি চালাতে ভাল লাগছে। সিডি-তে একটা গান ছাড়লাম, “আজি এ বসন্তে এত ফুল ফুটে…,” মনে হলো গান যেন আমার মনের কথা বলছে। কোন কোন সময়ে গান যেন মানুষের হৃদয়ের অপ্রকাশিত ভাষার প্রতিফলন হয়ে ওঠে।
বাসায় যখন পৌঁছলাম তখন প্রায় দুটো বাজে। একটু হাত মুখ ধুয়ে, খাওয়া শেষ করে, মিলিকে চিঠি লিখতে বসলাম।
চিঠিতে মন উজাড় করে বিস্তারিত সব কিছু বললাম। আমার মনের অবস্থা, মিলির প্রতি আমার ভালবাসা, আমাদের বিচ্ছেদের প্রেক্ষাপট, বিচ্ছেদের পর আমার প্রতিক্রিয়া, সালমার সাথে আমার পরিচয়, আমার অসুখের পর সালমার সেবাযত্ন, ইত্যাদি সবই বিস্তারিত লিখলাম, কোনো কিছুই বাদ দিলাম না। কিন্তু একটা প্রশ্নের উত্তর আমি জানতে চাইলাম—মিলি আমাকে সন্দেহ করতো কেন। প্রায় ছয় পাতা লম্বা চিঠি সেদিন সন্ধ্যায় ড্রাইভারকে দিয়ে মিলিদের বাসায় পৌঁছে দিলাম।
দুর্বলতার অজুহাতে পরের কয়েকদিন আমি ছুটি নিয়েছিলাম। সালমাকে আমার সাথে দুপুরে আমার বাসাতে খেতে বলেছিলাম। সালমা বেলা একটার দিকে বাসায় এলো। শুভেচ্ছা বিনিময়ের পর আলিকে খাওয়া দিতে বললাম। খাওয়া শেষ হলে আমারা দুজন ড্রইংরুমে বসলাম। ইতোমধ্যে আলি কফি দিয়ে গেল। আমি নিজেই সালমাকে কফি ঢেলে দিলাম। কফি শেষ হলে সালমাকে বললাম, “সালমা আজকে আপনার সাথে আমার খুবই গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে।”
সালমা আমার দিকে চোখ বড় বড় করে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। সালমাকে আমার মিলির প্রতি ভালবাসার কথা জানালাম। সালমার বড় বড় চোখ দুটো কেমন বিষণ্ণতায় ভারে উঠল, আমার দিকে খুব করুণ চোখে তাকিয়ে রইল।
“আপনাকে নিয়ে আমি যখন ভাবছি, তখনই বুঝতে পারলাম যে মিলির প্রতি আমার ভালবাসার একবিন্দু ক্ষয় হয়নি। মিলিকে আমি এখনো ভালবাসি। আমি বুঝতে পারলাম আমার পক্ষে মিলির জায়গায় অন্য কাউকে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব না।“ সালমার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। ব্যাগ থেকে টিসু বের করে সালমা চোখ মুছল। আমার একজনকে কষ্ট দিতে খুবই খারাপ লাগছিল। সালমা এমনিতেই দুঃখী মেয়ে, আমি তার দুঃখ বাড়ানোর কারণ হলাম। কিন্তু আমি অনন্যোপায়, আমি কী করে সালমাকে ঝুলিয়ে রাখি? সালমাকে বাস্তবটাই বলা উচিৎ।
সালমা কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলো। কী যেন গভীর ভাবে চিন্তা করছে। কিছুক্ষণ পরে গাঝাড়া দিয়ে নড়েচড়ে বসলো। আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমাকে সরাসরি কথাটা বলার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। এতে আপনার কোনো দোষ নেই, কিছু দোষ থাকলে সেটা আমার।“
“সালমা নিজেকে দোষ দিবেন না। এটা দোষ গুণের কথা না। আপনাকে আমি যতটুকু দেখেছি ও চিনেছি, আপনি একজন খুবই ভাল মানুষ। আপনাকে জীবন সঙ্গিনী হিসেবে পেলে যে কোনো পুরুষই ধন্য হবে। কিন্তু আমাদের ভাগ্য সময় সময় আমাদেরকে বঞ্চনা করে। আমরা দুজনেই ভাগ্যের এই বঞ্চনার শিকার। আমি চেষ্টা করছি ভাগ্যর এই বঞ্চনাকে শুধরাতে, আপনি যদি দোয়া করেন তাহলে নিশ্চয়ই পারবো। কিন্তু আপনি যদি আমার প্রতি রাগ করেন, আমাকে দোষারোপ করেন তাহলে হয়তো আমার পক্ষে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌছা সম্ভব হবে না। প্লীজ, আমাকে ভুল বুঝবেন না। আমি আপনাকে আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু মনে করি এবং চিরকাল করব। আপনি আমার জন্য যা করেছেন সেই ঋণ কোনো দিন শোধ করা যাবে না। ভবিষ্যতে আপনার সকল দুঃখ কষ্টে আমাকে স্মরণ করবেন, আমি আপনার পাশে থাকবো।“
আমার কথা শেষ হবার পর সালমা কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল। এখন মুখটা ভাবলেশহীন। কিছুক্ষণ পর সালমা বলল, “আমি এখন আসি।“ সে সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালো। আমি তাকে তার গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিলাম। নিচে নেমে দেখলাম এখন গোধূলি, সূর্যাস্তকালের আভায় আকাশের মেঘগুলো কেমন যেন লাল, হলুদ ও বেগুনী রঙের ছটার মিশ্রণে বিশ্বকে বিষণ্ণ করে রেখেছে--সালমা চলে গেল।
পরের দিন সকালে একটু সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠলাম। আজকের দিনটা আমার জীবনের এক অতিগুরুত্বপূর্ন দিন। আমি আশা করছি আজকে মিলির সাথে আমার ভুল বুঝাবুঝির অবসান হবে। মিলিকে আমি আবার আমার জীবনে ফিরে পাব।
আজকে কী কাপড় পড়ব সেটা গত রাতেই ঠিক করে ইস্ত্রি করে রাখা ছিল। মিলি বলত যে আমাকে সাদা শার্ট ও কালো পেন্টেই সবচেয়ে মানায়, তাই আজকে আমার পরনে কাফ-লিঙ্ক লাগানো একটি সাদা শার্ট, কালো প্যান্ট, কালো মোজা, এক জোড়া কাল অক্সফোর্ড জুতা।
মিলি আর আমার মিলিত হবার কথা এগারোটার সময়। আমি সাড়ে নটার সময় নিজেই গাড়ি চালিয়ে বের হলাম। মনটা খুব ফুরফুরে, শুধু মিলির সাথে দেখা না, সালমার সাথে যে একটা ভুল-বুঝাবুঝির সম্ভাবনা ছিল সেটাও কাটিয়ে উঠতে সমর্থ হয়েছি। এখন শুধু মিলির সম্মতি। মিলি নিশ্চয়ই আমার চিঠি পড়েছে এবং আমার মনের অবস্থা বুঝতে পেরেছে। চিঠি পড়ার পর আমার যদি কোন বিচ্যুতি থেকেও থাকে তাহলে নিশ্চয়ই ইতোমধ্যে ক্ষমা করে দিয়েছে। সকালটাও রৌদ্রোজ্জ্বল, রোধ সহজেই মানুষের মনকে চাঙ্গা করে ফেলে।
আমি রাস্তায় একটা ফুলের দোকানে থামলাম। মিলি লিলি ফুল পছন্দ করে। আমি এক গুচ্ছ বিভিন্ন রঙের লিলি কিনে আবার গন্তব্যে রওয়ানা হলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম-ঘড়িতে এখন বেলা সাড়ে দশটা, মিলি আসার এখনো তিরিশ মিনিট সময় বাকী। মিলি আর আমি আগে যখন এখানে আসতাম তখন মিলি এখানকার চিকেন পাকোড়া খুব পছন্দ করত। আমি ঢুকেই প্রথমে এক প্লেট চিকেন পাকোড়া প্রস্তুত করে রাখতে বললাম যেন অর্ডার করার সাথে সাথেই পাওয়া যায়।
এখন এগারোটা বাজতে পাঁচ মিনিট বাকী, আমি একতলা রেস্তোরা থেকে ফুটপাথে বেরিয়ে এলাম। সকাল এগারোটার দিকে এই রেস্তোরায় সাধারণত বেশী লোক থাকেনা। কাজেই গাড়ি রাখার যায়গাগুলো খালি। মিলির গাড়ি রাখতে সমস্যা হবে না। আমি ব্যাকুল হয়ে মিলির আসার জন্য অপেক্ষা করছি। দেখতে দেখতে এগারোটা বেজে গেল। এখন অবশ্য রাস্তায় অনেক ভিড়, নিশ্চয়ই মিলি ভিড়ে আটকে আছে। এখনি চলে আসবে।
আমি অস্থির ভাবে রেস্তোরার সামনে ফুটপাতে পায়চারি করছি। এমন সময় রেস্তোরার ভিতর থেকে একজন বেয়ারা এসে জানালো যে আমার টেলিফোন এসেছে। আমি প্রায় দৌড়ে ভিতর ঢুকে টেলিফোনটা নিলাম। আশা করছিলাম হয়তো মিলি, একটু দেরি হবে জানাতে টেলিফোন করেছে। মিলিদের ধানমন্ডির বাসা থেকে এ যায়গাটা বেশী দূরে না। টেলিফোনের অপর প্রান্ত থেকে মিলির মা’র গলা ভেসে আসলো। “সেলিম, মিলির মনে হয় তোমার সাথে দেখা করার কথা ছিল। আজকে সে দেখা করতে পারবে না।“ কথাটা বলেই মিলির মা ফোনটা কেটে দিলেন, আমাকে কোন প্রশ্ন করার সুযোগ না দিয়েই।
মুহূর্তেই আমার সব আশা, উদ্দীপনা, উৎসাহ, সব কিছুই যেন কর্পূরের মতো উবে গেল। আমার চোখে পানি আসছিল, আমি চোখ ঢাকার জন্য সানগ্লাসটা পরলাম। তাড়াতাড়ি বিল চুকিয়ে দিলাম, ম্যানেজার বলল, স্যার, পাকোড়াটা প্যাকেট কেরে দেই?” আমি কোনো উত্তর না দিয়ে বেরিয়ে এলাম।
আমার মনে হচ্ছিল চিৎকার করে কাঁদি। এখন আমার চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি পড়ছে। কেন, মিলি, কেন? কেনো তুমি এলে না? আমি তো চিঠিতে তোমাকে সবকিছু জানিয়েছিলাম, তারপরেও কি তুমি আমাকে ক্ষমা করতে পারলে না? তুমি যদি আমার হৃদয় দেখতে চাইতে, আমি বুক চিরে তোমাকে তাই দেখাতাম। কিন্তু তুমি কথা দিয়ে এলে না কেন? আমি কিছুতেই নিজেকে মানাতে পারছি না। যেই রোদকে আগে উজ্জ্বল ও প্রাণবন্ত মনে হচ্ছিল, সেই সূর্যই এখন দোজখের লু-হাওয়া বলে মনে হলো।
আমি গাড়ি স্টার্ট দিয়ে উদ্দেশ্যবিহীন ভাবে গাড়ি ছুটালাম। বাসায় যাবার ইচ্ছে ছিল না। কোথায় যাব? ঠিক করতে পারলাম না। সাতমসজিদ থেকে ধানমন্ডি ২৭ নাম্বার রাস্তা দিয়ে মিরপুর রোডে পৌঁছে বাম দিকে মোড় নিলাম। একটু সামনেই বিজয় সরণী মোড়। এখন লাল সিগনাল জ্বলে আছে। আমার গাড়িটা সবার সামনে। আমি বিজয় সরণী হয়ে বিমানবন্দরের দিকে যাব।
আমার চোখ এখন পানিতে ভিজে আছে, মুছেও লাভ হচ্ছে না। পরক্ষণেই আবার ভিজে যাচ্ছে। ফলে আমি সামনের সব কিছুই একটু ঝাপসা দেখতে পাচ্ছি। মিলি তোমার কি আমার উপরে এতই রাগ। তুমি আমার দিকটা একবার ও দেখলে না?
তুমি তো এরকম ছিলে না মিলি। আমি তোমার কাছে যা জানতে চেয়েছিলাম সেটাও তো তুমি আমাকে জানালে না। কী কারণে আমার উপরে এই রাগ তার কারণ তো তুমি আমাকে বলবে, তুমি কেন আমাকে সন্দেহ করতে আমাকে কখনো বলোনি। শুধু সন্দেহই করে গেছ। তোমার সন্দেহ যে সম্পূর্ণই মিথ্যা হতে পারে সেটা কী কখনো ভেবে দেখেছ? আমি যখন এই সব চিন্তা করছি, তখন লাল লাইট সবুজ হলো।
এখানে কয়েকজন ট্রাফিক পুলিশ দাঁড়িয়ে থাকে। সিগনাল সবুজ হবার সাথে সাথে প্রবল বেগে হাত নাড়িয়ে অপেক্ষমাণ গাড়ি গুলোকে যেতে বলল। আমি বেশ জোরেই গাড়ি ডানদিকে মোড় নিলাম। আমি বিজয় সরণিতে পৌছা মাত্রই মিরপুরের দিকে থেকে আসা দুটি বাস ‘কে কার আগে যাবের প্রতিযোগিতায়’ প্রচণ্ড গতিতে বিজয় সরণীতে ঢোকার জন্য যখন বাম দিকে টার্ন নিচ্ছিল, একটি বাস ভারসাম্য হারিয়ে অন্য বাসের সাথে ধাক্কা লেগে বাসটি আমার গাড়ির ডান দিকের চাকায় হুমড়ি খেয়ে পড়ল, ঘটনাটি মুহূর্তে ঘটে গেল, আমার কিছু করার ছিল না। বাসের সাথে ধাক্কায় আমার হালকা গাড়ি ছিটকে ডানদিকের ট্রাফিক-আইল্যান্ডে আছড়ে পড়ল। আমার আর কিছু মনে নেই।
মিনি নিজের শোবার ঘরে শুয়ে আছে। আজকে মিলির সেলিমের সাথে দেখা করার কথা ছিল, সেই পুরনো জায়গায় সেখানে জীবনের অনেক মধুর স্মৃতি জড়িয়ে আছে। গতকালকে সেলিমের লিখা চিঠিটা মিলি বেশ কয়েকবার মনোযোগ দিয়ে পড়েছে। কিন্তু মিলির বিচ্ছেদের সেই দুর্বিষহ অভিজ্ঞতা ভুলে যেতে চেয়েছিল। সেলিমের চিঠি আবার সব যেন মনে করিয়ে দিল।
মিলি সেলিমকে মনে প্রাণে ভালবাসত কিন্তু যখন শুনল যে সেলিমের অন্য মহিলাদের সাথে সম্পর্ক আছে তখন সে প্রায় উন্মাদের মতো হয়ে যায়। তার সেলিমের সাথে অন্য কারো সম্পর্ক থাকবে সে মেনে নিতে পারেনি। সেলিম তার চিঠিতে বারবার জানতে চেয়েছে মিলি কোন কারণে সেলিমকে সন্দেহ করতো। সেলিম আগেও এই প্রশ্ন অনেকবার করেছে কিন্তু মিলি উত্তর দেয়নি। সেলিম বারবার দাবি করেছে সে এমন কাজ করেনি কিন্তু মিলি বিশ্বাস করেনি। চিঠিতেও সেলিমা একই কথা বারবার বলেছে।
মিলি কি কোথাও ভুল করেছিল? তা কেমন করে হবে, সেলিমের সেক্রেটারি রুবি নিজেই তো মিলিকে সেলিম কার সাথে বাইরে যাছে, অফিসে কোন মহিলার সাথে ঘনিষ্ঠতা, সব খবরই মিলিকে দিত। সেলিম কখন বাসায় ফিরে, কখন বের হয় সবটার সাথেই তো মিলে যেত। যদিও মিলি কখনো নিজ চোখে কিছু না দেখলেও সেলিমের এই ব্যাভিচারীতা মেনে নিতে পারেনি। কিন্তু সন্দেহ একবার ঠুকলে সেটা ঘুণের মতো অন্তরে কাটতে থকে, শত চেষ্টা করেও দূর করা যায় না। তার উপরে যদি কিছুদিন পরপর কেউ নতুন নতুন খবর দিতে থাকে তাহলে তো কথাই নেই।
মিলি গত তিন বছরে এ নিয়ে অনেক ভেবেছে, অনেক বিনিদ্র রজনী এভাবে কেটেছে। মিলির কী সেলিমকে সন্দেহের কারণ খুলে বলা উচিৎ ছিল? সেলিমকে কি বলা উচিৎ ছিল যে তার নিজের সেক্রেটারিই মিলিকে সব কিছু জানাত? সে মহিলা অবশ্য মিলিকে শপথ করিয়েছিল সেলিমকে তার ব্যাপারে কিছু না বলে কেননা বললে তার চাকরি থাকবে না। সে জন্য মিলি সেলিমকে রুবি সম্পর্কে কিছু বলেনি। কিন্তু রুবির কি কোনো অশুভ উদ্দেশ্য ছিল? অবশ্য এই কথাটি তার আগে মনে হয়নি কিন্তু ইদানীং তার কেমন যেন সন্দেহ হয়। কিছুদিন পরে অবশ্য রুবিকে সেলিমের সেক্রেটারির পদ থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। রুবি মিলিকে বলেছিল সেলিম হয়তো সন্দেহ করেছিল রুবি মিলিকে সেলিম সম্পর্কে সব জানাত বলে। এই কথা শুনে মিলি প্রচণ্ড রেগে সেলিমের অফিসে গিয়ে অনেক চেঁচামেচি করেছিল। এখন সে কথা চিন্তা করলেও লজ্জা লাগে। কিন্তু রাগ, বিশেষ করে অতি প্রিয়জনের প্রতি, এমন এক জিনিস যার ফলে সবই সম্ভব হয়েছিল। মিলি কোন ভাবেই মেনে নিতে পারেনি যে সেলিমের ভালবাসার কোন অংশীদার থাকবে—সেলিম শুধু তার।
সেলিম ঠিকই লিখেছে বিয়ের প্রথম বছরের কথা। সত্যি এই সময়টা মিলির জীবনেরও শ্রেষ্ঠ সময়। কিন্তু টিকলো কোথায়, তিন বছরের মধ্যেই তো সব কিছু ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেল। একদিক থেকে বিচ্ছেদ হয়ে ভালই হয়েছে। ঘটনা যেভাবে ক্রমাগত খারাপের দিকে গড়াচ্ছিল, কোথায় যেয়ে যে শেষ হতো একমাত্র আল্লাহ্ই জানেন। শেষের দিকে সেলিমের দেরী করে বাসায় ফিরতে দেখে মিলির রাগ আরও বেড়ে যায়। যেই কাজ মিলি কখনো করেনি সেই কাজ, বাসার সব কিছু ভাংতে শুরু করল, বাসার প্রায় কিছু অক্ষত রইলো না। এই সব জিনিষ সেলিম ও মিলি একসাথে অনেক বাছাই করে কিনেছিল, কিন্তু মিলির ভাঙতে বাঁধেনি।
সেলিমের চিঠি পাবার পর থেকেই মিলি তার সেলিমের সাথে প্রেম, বিয়ে, ও বিচ্ছেদ সব ঘটনা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করছে। মিলি একটি ঘটনাও মনে করতে পারে না যেখানে মিলির প্রতি সেলিমের ভালবাসার কোন ত্রুটি পেয়েছে। তাহলে রুবি কেন টেলিফোনে মিলিকে এসব কথা বলত? এখন মনে হয় সেলিমকে রুবি সম্পর্কে মিলির বলা উচিৎ ছিল। মিলি এখন বুঝে সন্দেহ এমন একটা বাতিক, একবার কাউকে এই ব্যাধিতে ধরলে নিস্তার নেই।
সেলিম সালমা বলে এক মেয়ের কথা লিখেছে। মিলি বুঝে পাচ্ছে না সেলিমের সাথে সালমার ঘনিষ্ঠতা কেন সহ্য করতে পারছে না। তাদের তো বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে গেছে, সেলিমের সাথে কার কী সম্পর্ক হলো তা দিয়ে মিলির কী এসে যায়? তাহলে কি মিলির হৃদয়ে সেলিমের স্থান এখনো অক্ষত আছে? সেলিম চিঠিতে একটি কথা লিখেছে যে বদ্ধ হৃদয়ে কেউ দখল করে আছে কি না, সেটা হৃদয়কে না খুললে বুঝা যায় না। আর হৃদয় তখনই খোলার চেষ্টা করা হয় যখন হৃদয়ে অন্য কেউ স্থান পাবার চেষ্টা করে। কথাটা মিলির বেলায় ও খাটে। মিলির বোন অ্যামেরিকায় মিলিকে আবার বিয়ে দেবার অনেক চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু মিলি বিভিন্ন অজুহাতে এড়িয়ে গেছে। নিজের জীবনের প্রথম প্রেমকে কি কখনো এত সহজে ভুলা যায়?
সেলিম বিচ্ছেদের কথা লিখেছে। বলেছে যে ঘটনা যেভাবে গড়াচ্ছিল, সেই মুহূর্তে তার অন্য কোনো উপায় ছিল না। আসলেই কী তাই? দুজনে কি কিছুদিনের জন্য বিচ্ছেদ না ঘটিয়ে আলাদা আলাদা থাকতে পারতো না? কিন্তু পরক্ষণেই মিলি সেই সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দিল—সে নিজেই রাজি হতো না। সেলিম তাকে একবার এই কথা বলেছিল কিন্তু সন্দেহ বাতিকে আক্রান্ত মিলি রাজি হয়নি।
সেলিম লিখেছে যে আবার মিলির সাথে ঘর করতে চায়। মিলি এ ব্যাপারে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। এ জন্যই আজকে মিলি সেলিমের সাথে দেখা করতে যায়নি।
টেলিফোনটা ক্রিং ক্রিং করে বেজে উঠলো। মিলি ঘর থেকে বের হয়ে টেলিফোন ধরল। অপর প্রান্তে মিলির খালাতো ভাই রাজুর কণ্ঠ শুনতে পেল। রাজু খুব উত্তেজিত ভাবে বলল, “আপা জানো, আজকে সেলিম ভাই সাড়ে এগারোটার দিকে বিজয় সরণীতে এক ভয়াবহ এক্সিডেন্ট করেছে। তার কী অবস্থা জানি না, কিন্তু তার গাড়ি দেখে আমি চিনেছি, গাড়িটা দুমড়ে মুচকে রাস্তায় পড়ে ছিল।“ মিলির হাত থেকে টেলিফোনটা পড়ে গেল। সাড়ে এগারোটা, মানে তাদের যেখানে দেখা করার কথা ছিল সেখান থেকে ফিরছিল। মিলি না যাওয়াতে এই ঘটনা ঘটেছে। মিলি হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। মিলির কান্না শুনে মিলির মা প্রায় দৌড়ে এলেনন, “কি হয়েছে মা, কাঁদছ কেন?” মিলি মাকে ধরে আরও জোরে প্রায় চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করলো। মিলির মা প্রশ্ন করতেই থাকলেন, কী হয়েছে, কী হয়েছে; কিন্তু মিলির চোখের পানি বাঁধভাঙ্গা জোয়ারের মতো অনর্গল ঝরতে থাকলো।
এসময় টেলিফোনটা আবার বেজে উঠলো। এবার মিলির মা টেলিফোন ধরলেন। অপর প্রান্তে আবার রাজু। “খালাম্মা আমি মিলিকে একটা খবর দিচ্ছিলাম কিন্তু হঠাৎ মিলি টেলিফোন রেখে দিল।“ মিলির মা জানতে চাইলে রাজু সেলিমের এক্সিডেন্টের কথা জানালো। মিলির মা টেলিফোন রেখে দিলেন।
মিলির মা মিলিকে আবার জড়িয়ে ধরলেন। বুঝতে পারলেন মেিয়ের মনের অবস্থা। মিলিকে সান্ত্বনা দিতে থাকলেন। মিলি কেঁদেই চলেছে। কিছুক্ষণ পর মিলি একটু ধাতস্থ হয়ে চোখ মুছে উঠে দাঁড়ালো। টেলিফোনটা নিয়ে রাজুকে আবার টেলিফোন করলো। “রাজু, তুমি জানো সেলিমকে কোন হাঁসপাতালে নিয়ে গেছে?” “না আপা, ঠিক জানি না, তবে এরকম সিরিয়াস কেসে ঢাকা মেডিকেল ছাড়া তো আর কোনো জায়গা নেই। নিশ্চয়ই ঢাকা মেডিকেলে নিয়েছে। “মিলি কথা না বাড়িয়ে টেলিফোন রেখে দিল।
মা’র দিকে ফিরে বলল, “মা, আমি এখনই একটু বের হবো, সাটাইকে প্লীজ একটু বলো না ড্রাইভারকে গাড়ি বের করতে।“ মিলির মা কিছু না বলেই বেরিয়ে গেলেন।
প্রায় সাথে সাথেই মিলি বাসার কাপড়েই নীচে
নেমে গাড়িতে উঠে ড্রাইভারকে ঢাকা মেডিকেলে যেতে বলল। গাড়ি ছুটছে, মিলির মন ও
ছুটছে। মিলির চোখের পানি থামছে না। বার বার মনে হচ্ছে সেলিমের আজকের এক্সিডেন্টের
দায়িত্ব তার নিজের। খামখেয়ালি করে মিলি আজকে সেলিমের সাথে দেখা করতে যায়নি। না
যাবার সিদ্ধান্ত একেবারে শেষ মুহূর্তে, যখন যাবার
জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল তখনের।
সেলিমের চিঠি থেকেই তো বুঝা যায় সে কি উদগ্রীব হয়ে আজকে মিলির সাথে দেখা করার অপেক্ষা করছিল। মিলি না গেলে সেলিমের মনের অবস্থা কেমন হবে মিলি একবারও ভেবে দেখেনি। মিলি রুমাল দিয়ে নাক মুছল, কিন্তু চোখের পানি ধরে রাখা যাচ্ছে না। কিন্তু এখন এসব চিন্তা করে কী লাভ? সেলিম বেঁচে আছে তো, মিলির বুকটা হঠাৎ কেঁপে উঠলো। সেলিম মারা গেলে মিলি কী করবে? মিলি এই অপরাধবোধ নিয়ে বাঁচবে কেমন করে?
গাড়ি মেডিকেল কলেজের ইমার্জেন্সিতে ঢুকল। চারিদিকে প্রচণ্ড ভিড়, ভিড় ঠেলে মিলি এগিয়ে গেল। অনুসন্ধান লিখা একটা যায়গা ঘিরে কয়েকজন লোকের জটলা মতো, মিলি জটলা ঠেলে অনুসন্ধানে থাকা একজনকে জিজ্ঞাসা করলো, “সেলিম রহমান নামে একজন গাড়ি এক্সিডেন্টের পেসেন্ট কিছুক্ষণ আগে ভর্তি হয়েছে?।“ চারিদিকের সবাই চেঁচামেচি করছে, কার কথা কে শোনে। চার পাঁচ বার বলার পর একজন উত্তর দিল, “নাম তো জানি না, তবে কিছুক্ষণ আগে এক্সিডেন্টের এক গুরুত্বর আহত রোগীকে আনা হয়েছে, এখন ইমার্জেন্সিতে আছে। ভিতরে যান।“ মিলি হন্তদন্ত হয়ে প্রায় দৌড়ে সামনে এগিয়ে গেল। চারিদিকে বিভিন্ন ধরণের রুগী, কেউ এক্সিডেন্টে আহত, শরীরের বিভিন্ন যায়গা থেকে রক্ত ঝরছে, কেউ আবার মারামারিতে গুরুত্বর আহত, ইত্যাদি বিভিন্ন রুগী ও তাদের স্বজনদের ভিড়। সেলিমকে কোথাও দেখা গেল না। সেলিম কী এখনও এখানে পৌঁছেনি। এমন সময় সেলিমের অফিসের পরিচিত একজনকে মিলি দেখতে পেল। মিলি চিৎকার করে ডাকল, “জহির সাহেব, জহির সাহেব, এদিকে,” নাম শুনে জহির সাহেব ঘুরে মিলিকে দেখে এগিয়ে এলেন। “সেলিম সাহেব এখন অপারেশন থিয়েটারে। এখানে পাবেন না। তিনি গুরুত্বর আহত হয়েছেন। খুব সম্ভবত হাত পা ভেঙ্গেছে, মাথা ফেটেছে, যখন তাকে এখানে আনা হয় তখন তার জ্ঞান ছিলা না। আল্লাহ, আল্লাহ্, করেন। গাড়িটা দেখলে বুঝা যায় কী ধরনের সাঙ্ঘাতিক এক্সিডেন্ট হয়েছে। অফিস থেকে ড্রাইভার দেয়া হয় তার পরেও যে কেন নিজে গাড়ি চালাতে চায় বুঝতে পারি না,” জহির সাহেব অবশেষে থামলেন। তারপর আবার মিলির দিকে তাকিয়ে বললেন, “ভাবী, এখানে দাঁড়িয়ে তো কোনো লাভ হবে না, বাইরে বসার যায়গা আছে ওখানে বসেন। আমি কিছু খবর পেলে আপনাকে জানাবো। আমার এখন রক্ত যোগাড় করতে হবে।“ জহির সাহেব চলে গেলেন।
মিলি বের হয়ে সামনের রিসেপশনে বসতে যেয়ে দেখে কোনো যায়গা নেই। মিলি একপাশে দাঁড়িয়ে রইল। দেয়ালে টাঙ্গানো ঘড়িতে তখন একটা।
মিলি প্রায় আধা ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকার পর একটি চেয়ার খালি হলে বসল। সেলিমের জন্য প্রচণ্ড উদ্বেগে ক্ষণে ক্ষণেই কান্না আসছে। এভাবে প্রায় দুই ঘণ্টা বসে থাকার পর রাজুকে নিয়ে বাবা ও মা এলেন। মিলিকে দেখে তারা তার দিকে এগিয়ে এলেন। বাবা জিজ্ঞাস করলেন কিছু খবর পেয়েছি কি না। মিলি মাথা নাড়িয়ে না জানালে সবাই বিমর্ষ মুখে দাঁড়িয়ে রইলেন। মিলি চেয়ার ছেড়ে উঠে মা’কে বসতে বলল। মিলির মা বেশীক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন না। মিলির বাবা জানালেন যে তার কয়েকজন ডাক্তার বন্ধু আছে, তিনি তাদেরকে বলেছেন। একটু পরেই কিছু জানা যাবে। মিলির মা মিলিকে বললেন, “মিলি তুমি তো সকালের নাস্তার পর কিছু খাওনি। রাজু দেখুক না আশপাশে কোথাও খাওয়া পাওয়া যায় নাকি। মিলির বাবা রাজুকে টাকা দেবার জন্য ব্যাগ থেকে টাকা বের করতে উদ্যত হলে রাজু বলে উঠল, “না, না, টাকা লাগবে না, আমার কাছে আছে।“ রাজু চলে গেল।
কিছুক্ষণ পর একজন সাদা এপ্রোন পরা ডাক্তার ভিতর থেকে বেরিয়ে এসে মিলির বাবার নাম ধরে জোরে জোরে ডাকতে শোনা গেল। মিলির বাবা হাত তুলে ইশারা করলে সেই ডাক্তার মিলির বাবার কাছে এলো। সবাই ডাক্তার কথা শুনার জন্য ঘিরে ধরল।
ডাক্তার জানালেন যে সেলিমের একটা হাত, একটা পা ও পাঁজরের কয়েকটা হাড় ভেঙ্গেছে, কিন্তু সবচেয়ে মারাত্মক হচ্ছে মাথায় আঘাত। এখনও অপারেশন চলছে, ছয়জন ডাক্তার অপারেশন থিয়েটারে আছেন। তারা সাধ্যমত চেষ্টা করছেন সেলিমকে বাঁচাতে। মিলি শুনেই আবার কাঁদতে শুরু করল। মা তাকে সান্ত্বনা দিতে থাকলেন। ডাক্তার চলে গেলেন।
এদিকে সেলিমের অফিস থেকে অনেকে এসেছেন, সেলিমের বস সহ কিছু সহকর্মী। তারা এসে বিভিন্ন প্রশ্ন করলেন এবং জানালেন যে কোনো কিছুর প্রয়োজন হলে অফিসে জানাতে। বস বললেন যে তিনি অফিসের একটি গাড়ি রেখে যাচ্ছেন মিলিদের ব্যাবহারের জন্য। তিনি জানতে চাইলেন সেলিমের বাবা মা’কে রাজশাহীতে জানানো হয়েছে কী না। সেলিমের বাবা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা করেন।
রাজু কিছুক্ষণ পর কিছু প্যাটিস নিয়ে ফিরে এলো, “মিলি আপা এগুলো খেয়ে নেও, এখনো গরম আছে।“ রাজু প্যাটিস ও একটি কোকের বোতল মিলির দিকে এগিয়ে দিল। মিলি এই হাসপাতালের এই নোংরা পরিবেশে খেতে ইতস্তত করছিল। তার ক্ষুধা নেই কিন্তু প্রচণ্ড তৃষ্ণা পেয়েছে। সে কোকের বোতল নিয়ে ঢোঁক ঢোঁক করে এক চুমুকে শেষ করে ফেলল। মিলি বোতলটা রাজুকে ফিরিয়ে দিল। “আমি এখানে কিছু খেতে পারব না,” সে প্যাটিসের প্যাকেট রাজুকে ফিরিয়ে দিল।
অনেক লোক এখানে আসছে ও যাচ্ছে, চারিদিকে একটা গুঞ্জনের মতো কোলাহল। এমন সময় মিলি দুজন মহিলাকে অনুসন্ধানের দিকে আসতে দেখল। একজনের বয়স মিলির কাছাকাছি হবে, আরেকজনের ১৮-১৯। তারা অনুসন্ধানে সেলিম রহমান সম্পর্কে জানতে চাইল। মিলি যেহেতু প্রায় পাশেই বসে ছিল সে সেলিমের নাম স্পষ্ট শুনতে পেল। মিলি মহিলাকে একটু ভাল করে খেয়াল করল। মহিলা প্রায় মিলির কাছাকাছি লম্বা, ফর্শা, একটি প্রিন্টেড সালওয়ার-কামিজ পরা। কোন সাজগোজ করেনি। মিলি ধারণা করলো যে এই মহিলা নিশ্চয়ই সালমা। মিলি উঠে মহিলার কাছে যেয়ে জানতে চাইল, “আপনি কি সালমা?” সালমা অবাক হয়ে মিলির দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে রইলো, তারপর বলল, “আপনি মিলি?” মিলি মাথা নাড়াল। “সেলিম চিঠিতে আপনার কথা আমাকে লিখেছিল।“ মিলি মাথা নিচু করে আবার কাঁদতে শুরু করল। সালমা মিলিকে জড়িয়ে ধরল। মিলি সালমাকে জড়িয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকলো। মিলি সালমাকে সেলিম সম্পর্কে ডাক্তারের কাছে যা শুনেছিল সেটা জানাল।
এদিকে বেশ কয়েকজন লোক চেয়ার ছড়ে চলে গেলে সবার বসার ব্যবস্থা হলো।
এভাবে, প্রায় সাড়ে
পাঁচটার দিকে একজন সার্জেন সেই আগের ডাক্তার সহ কয়েকজন সহকর্মীর সাথে বেরিয়ে এলেন।
মিলিদের কাছে এসে জানালেন যে তারা এই মাত্র অপারেশন শেষ করে বের হলেন। মাথার
আঘাতটাই সবচেয়ে গুরুত্বর। তাছাড়া কিছু হাড়গোড় ভেঙ্গেছে, সে গুলো
প্লাস্টার করে দেয়া হয়েছে। এক মুহূর্তে জ্ঞান নেই, সেডেটিভ
দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে। এখন পোস্ট অপারেটিং রুমে আছে।
“এখন আপনাদের কিছুই করার নেই, ৭২-ঘণ্টা পরে বুঝা যাবে রোগীর কী অবস্থা। এখন বাসায় যান। কিন্তু আপনাদের যোগাযোগের নামার, ঠিকানা সব দিয়ে যান। কিছু ডেভেলপমেন্ট হলে আমারা আপনাদের জানাব। পেসেন্টের অবস্থা উন্নতি হলে কেবিনে শিফট করা হবে, তার জন্য কেবিন বুক করা আছে।“ এই কথা বলে ডাক্তার তার লোকদের নিয়ে চলে গেলেন।
মিলির বাবা বললেন, “মিলি, এখন এখানে থেকে তো কোনো দরকার নেই, বাসায় চলো।“ “না, আমি এখন যাব না, আমি এখানেই থাকবো, তোমরা যাও। আমার জন্য একটা গাড়ি রেখে যেও। আমার ফিরতে ফিরতে রাত হবে,” মিলি জবাব দিল। মিলির কথা শুনে রাজু বলল, “খালু, আমি আছি মিলি আপার সাথে, আপনারা যান।“ মিলির বাবা মিলির মা’কে বললেন, “জাহানারা চল।“ “মিলি মা আমরা এখন যাচ্ছি, কিছু খবর পেলে আমাদেরকে টেলিফোনে জানাবে,“ মিলির মা মিলিকে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে চলে গেলান।
এখন মিলি, রাজু, সালমা, ও সালমার বোন রয়ে গেল। এখন কেউ কোনো কথা বলছে না, সবাই কেমন যেন গভীর চিন্তায় মগ্ন। এখন অবশ্য বসে থাকে ছাড়া কিছু করার নেই।
“ভাবী, আমি আপনাকে কিছু কথা বলতে চাই। আমি খোলামেলা কথা বললে কী আপনি কিছু মনে করবেন?” সালমা মিলিকে জিজ্ঞাস করলো। মিলি মাথা নেড়ে বলল, “না”।
“আমি ঠিক জানিনা আপনি আমার কথাগুলোকে অনধিকার চর্চা মনে করবেন কি না, কিন্তু কথাগুলো আমার আপনাকে বলা খুব প্রয়োজন।“ সালমা মিলির দিকে তাকাল। মিলি কিছু বলল না। সালমা বলতে থাকলো, “সেলিম ভাইয়ের সাথে আমার পরিচয় খুব অল্প কিছুদিনের। আমি জানি এই অল্প কয়েকদিনে একজনকে চেনার জন্য যথেষ্ট নয়। কিন্তু এই কয়দিনে আমি যতটুকে দেখেছি, আমার তাকে ব্যভিচারী মনে হয়নি। নিমুনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে তিনি যখন হাঁসপাতালে ছিলেন, তারপরে যখন তার বাসায় আমি প্রায় সাত দিন ছিলাম, তিনি কখনো আমার সাথে বিন্দুমাত্র অশোভন আচরণ তো নয়ই, কোনো ধরনের ফ্লার্ট করার চেষ্টা করেননি। আমি যে তার ব্যাপারে দুর্বল সেটা জানার পরেও।
আমি তার মন পেতে অনেক চেষ্টা করেছি, কিন্তু সব সময় তিনি আমার আহ্বান এড়িয়ে গেছেন। এধরণের মানুষকে কি কখনো অবিশ্বস্ত ভাবা যায়? আমার সাথে যেদিন শেষ কথা হয় তিনি আমাকে স্পষ্ট বলে দিয়েছিলেন যে তার হৃদয়ে আপনি ছাড়া আর কারো যায়গা হবে না। আপনাকে বলতে আমার লজ্জা নেই যে আমি আশাহত হয়ে ফিরে যাই। আমার মনে হয় না, সেলিম ভাই এমন কোনো কাজ করতে পারেন যার জন্য আপনি তাকে সন্দেহ করতে পারেন। কিন্তু আপনার সাথে তার সম্পর্ক অনেক দিনের এবং আপনি সেলিম ভাই সম্পর্কে অনেক জানেন, তবুও আমার মনে হচ্ছে আপনি কোথাও ভুল করেছেন। আপনাকে এভাবে সরাসরি কথা বলার জন্য আমি দুঃখিত কিন্তু আমার মনে হয়েছে এই কথাগুলো আপনাকে বলা খুবই জরুরি ছিল।“
মিলি চুপ করে সালমার কথা শুনল, মাথা নিচু করে কাঁদতে থাকলো। সালমা মিলিকে বলল, “ভাবী, চলেন এখন যাই, এখন ৮-টা বাজে। এখানে থেকে কোনো লাভ নেই। আপনি তো গোটা দিন কিছু খান নাই, বাসায় যায়ে খেয়েদেয়ে বিশ্রাম করেন। নাহলে কালকে আসতে পারবেন না।“ সালমা মিলিকে হাত ধরে উঠাল। চারজনেই একসাথে হাসপাতাল থেকে বের হয়ে এলে মিলিকে নিয়ে রাজু বাসার উদ্দেশ্যে রওয়ান হলো।
পরের দিনেও সেলিমের জ্ঞান ফেরেনি। মিলি ন’টার সময়
হাঁসপাতালে এসে আবার রাত্রি আটটা পর্যন্ত অপেক্ষা করেছে। সালমা বিকেলের দিকে এসে
মিলির সাথে দুই ঘণ্টার মতো ছিল।
তৃতীয় দিন সন্ধ্যায় সেলিম প্রথম চোখ খুলে। একজন ডাক্তার এসে মিলিকে এই সংবাদ দেন। তিনি বলেন যে কালকেও যদি তার অবস্থা স্টেবল থাকে তাহলে হয়তো কেবিনে নিয়ে যেতে পারে। তখন আপনারা তাকে দেখতে পারবেন।“ মিলি আকুতি করে বলল, “আমি কি একবারের জন্য তাকে একটু দেখতে পারি।“ ডাক্তার একটু অনিশ্চিত ভাবে মিলির অতি করুণ মুখের দিকে তাকিয়ে একটু চিন্তা করে বললেন, “আচ্ছা, আমার সাথে আসুন, কিন্তু দেখেই ফিরে আসতে হবে। আমি আপনার জন্য ICU-র প্রটোকল ভাঙছি।“ ডাক্তার মিলিকে নিয়ে প্রথমে গাউন, টুপি ইত্যাদি পরিয়ে মিলিকে নিয়ে ICU-তে ঢুকলেন।
ভিতরে অনেক রুগী, চারিদিকে বিভিন্ন ধরণের মেডিকেল যন্ত্রপাতি, বেশীর ভাগ রুগীর মুখে অক্সিজেনের মাস্ক পরান, কাউকে চেনার উপায় নেই। ডাক্তার মিলিকে রুমের প্রায় অন্য প্রান্তে একটি বিছানার সামনে নিয়ে গেলেন। হাতে, পায়ে, সারা শরীর, ও মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা, মুখে অক্সিজেন মাস্ক পরিহিত সেলিমকে মিলি চিনতে পারল না। সেলিম ঘুমিয়ে আছে। সেলিমকে দেখে মনে হচ্ছে একটি মমি। মিলি কাঁদা আটকাতে পারল না। ডাক্তার মিলিকে আবার রুমের বাইরে নিয়ে এলেন। “উনার বয়স কম ও শক্তসমর্থ শরীরের জন্য তিনি তিন দিনেই জ্ঞান ফিরে পেলেন। এরকম গুরুত্বর আহতদের অধিকাংশই বাঁচে না।“, ডাক্তার চলে গেলেন।
মিলি এর মধ্যে দুই তিন বার ICU-তে গিয়েছে, কিন্তু প্রত্যেক সময়ই সেলিম ঘুমিয়ে ছিল।
এর দুই দিন পর সকালে মিলি হাঁসপাতালে গিয়ে জানতে পারলো সেলিমকে কেবিনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সেলিম জ্ঞান ফিরে পেয়েছে। এখনও খুবই দুর্বল কিন্তু অল্প কথা বলতে পারে।
মিলি কেবিনে ঢুকল। কেবিনগুলো দোতালায়, বেশ বড়, খোলামেলা, কেবিনের সাথে একটা ব্যালকনি যেখান থেকে একটা ছোট বাগান দেখা যায়। ঘরগুলো অনেক পুরানো হলেও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। সেলিম চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে, একজন নার্স স্যালাইনের ব্যাগ পরিবর্তন করছে।
মিলিকে দেখে নার্স ঠোটে আঙ্গুল দিয়ে ইশারাতে কথা বলতে নিষেধ করল। কাজ শেষ হলে মিলিকে রুমের বাহিরে নিয়ে জিজ্ঞাস করলো, “আপনি রুগীর কী হন?” মিলি নির্ধিদায় উত্তর দিল, “আমি তার স্ত্রী।“ আচ্ছা ভাল হলো, রোগীকে বেশী কথা বলতে দিবেন না। তার এখন অনেক বিশ্রাম দরকার। এখনও তাকে অনেক সেডেটিভ দেয়া হচ্ছে ফলে বেশীর ভাগ সময় তিনি ঘুমাবেন। বেশী লোকজন যেন কেবিনে না আসে। দুইজনের বেশী কখনই একসাথে রুমের ভিতরে থাকবে না। এখনও উনি সলিড খেতে পারবেন না, সুপ বা ফলের রস খেতে পারেন। শরীর আরেকটু ভাল হলে শক্ত খাওয়া দেয়া যাবে। আমরা না বললে দিবেন না। ও, হাঁ, রুমের ভিতরে ঢুকার আগে সবাইকে জুতা খুলে ঢুকতে বলবেন। আমি বা অন্য কেউ মাঝে মাঝে দেখতে আসবে। ভিতরে একটা কলিং বেল আছে, ওটা টিপলে কেউ না কেউ আসবে। এখন আমি যাচ্ছি।“ একনাগাড়ে কথা বলে নার্স চলে গেলান। মিলি স্যান্ডেল খুলে কেবিনের বাইরে রেখে ভিতরে একটি চেয়ারে বসল।
মিলি সেলিমের দিকে তাকিয়ে চেয়ারে বসে আছে। সেলিমের মুখের কিছু অংশ দেখা যাচ্ছে। বাম হাত পুরোটাই প্লাস্টার করা। ডান হাতে অনেক ব্যান্ডেজ আছে কিন্তু প্লাস্টার নেই। বাম পা প্রায় সবটাই প্লাস্টার করা। একটি স্টেন্ডের সাথে স্ট্রেপ দিয়ে ঝুলানো। ফলে নড়াচড়া করার কোনো সুযোগ নেই। সম্পূর্ণ মাথা ব্যান্ডেজ করা, একটি চোখের কিছু অংশ ব্যান্ডেজে ঢাকা পড়ে আছে।
মিলির মনটা অতীতে ফিরে গেল। সেলিমের সাথে প্রথম দেখার দিনের কথা মনে পড়ল। এক বন্ধুর জন্মদিনের জন্য মিলি নিউ-মার্কেটে বই কিনতে গিয়েছিল। দোকানে ঢুকে দেখে বিক্রেতা ছাড়া মাত্র একজন খদ্দের, সামনে একগাদা বই খুলে পড়ছে। মুখটা অন্যদিকে ফেরান। মিলি দোকানদারকে জিজ্ঞাস করলো, “নতুন কোন ভাল কবিতার বই বের হয়েছে?” এক কথা শুনে সেই লোকটা ঘুরে মিলির দিকে তাকাল। প্রায় ছয় ফুট লম্বা, উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ, একটি ছোট মোচ, লোকটা দেখতে বেশ সুশ্রী। বয়স কত হবে? সাতাশ, আটাশ?
দোকানদার বেশ কিছু বই বের করে দেখাল। মিলি বইগুলো উল্টেপাল্টে দেখছে কিন্তু মিলির মুখ দেখে মনে হচ্ছে বইগুলো মন:পুত হচ্ছে না।
“আপনি মনে হয় কবিতার বই খুঁজছেন? কিছু যদি কিছু মনে না করেন তাহলে আমি কি সাজেস্ট করতে পারি?” মিলি লোকটার দিকে ঘুরে তাকাল, মুখে একটু অনিশ্চিত ভাব। অন্য কেউ এরকম অযাচিত ভাবে কথা বললে মিলি হয়ত রুঢ় উত্তর দিত। কিন্তু এই লোকাটার কেমন যেন একটি অদ্ভুত আকর্ষণ ছিল, খারাপ কিছু বলতে ইচ্ছে করল না। “হাঁ, নিশ্চয়ই, বলুন।“
ভদ্রলোক দোকানদারকে বললেন, “আমি যে কয়েক দিন আগে রুমির একটা বই কিনলাম, কী যেন নাম, The Essential, কী যেন? ও, হাঁ, The Essential of Rumi, আমার বইটা খুব ভাল লেগেছে, আপনারও হয়ত ভাল লাগতে পারে।“ দোকানীর দিকে ফিরে বললেন, “বইটা আছে না, একটা বের করেন দেখান।“ দোকানি বইটা বের করে কাউন্টারে রাখল।
ভদ্রলোক বইটা তুলে মিলির দিকে বাড়িয়ে দিলেন। মিলি বইটা নিয়ে পাতা উল্টিয়ে দেখতে শুরু করলো। ভদ্রলোক বললেন, “বইটা পড়ে দেখবেন, আশা করি ভাল লাগবে।“ মিলি দোকানিকে টাকা দেবার জন্য ব্যাগ খুলতে উদ্যত হলে, “না, না, এটার জন্য টাকা দিতে হবে না, বইটা তো প্রায় জোর করেই আমি আপনাকে গছালাম। পড়ে ভাল লাগলে একদিন কফি খাইয়ে দিয়েন?”
মিলি টাকা ছাড়া বইটা নিতে চাইল না, “না, না, তা কেমন করে হয়?” মিলি ব্যাগ থেকে টাকা বের করে দোকানির দিকে মেলে ধরল। দোকানি একবার মিলির দিকে তাকায় একবার সেই লোকের দিকে তাকায়। “দেখুন, ও আপনার টাকা নিবে না। আমি এই দোকানের নিয়মিত গ্রাহক, আমার কথা কি সে ফেলতে পারবে? মনে হয় না।“ দোকানি একটু অপ্রস্তুতভাবে হেসে আমতা আমতা করে বলল, ঠিক আছে, আপা, টাকা দিতে লাগবে না।
“আচ্ছা, বুঝতে পাচ্ছি যে একজন অচেনা লোকের কাছ থেকে কিছু নিতে আপনার বাঁধছে, তাই না? বইটা পড়ে যদি আপনার ভাল লাগে তাহলে আমাকে একদিন কফি খাওয়াবেন, তাহলে ঋণ শোধবোধ? আর যদি বইটা পড়ে খারাপ লাগে তাহলে বইটা ফেলে দিয়েন অথবা আমাকে ফেরত দিতে পারেন। কী সমস্যার সমাধান হলো?”
“বইটার
পেছনের পাতায় আমার নাম ও টেলিফোন নাম্বার লিখে দিচ্ছি,” নাম লিখে
বইটা বন্ধ করে মিলির দিকে বাড়িয়ে ধরল। মিলি কেন যেন কোনো কথা না বলে বইটা গ্রহণ
করেছিল। ভদ্রলোক কিন্তু মিলির নাম, ঠিকানা
কিছুই জানতে চাইলেন না। এভাবেই সেলিমের সাথে পরিচয়।
সেই পরিচয়ের পর দু-বছর প্রেমের পর বিয়ে। সেই মধুর সময়গুলো কেমন করে যেন নিমিষের মধ্যে হারিয়ে গেল।
দেয়ালের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে বেলা প্রায় একটা। এর মাঝে একবার নার্স এসে সেলিমকে দেখে গেছে। সেলিম এখনো ঘুমাচ্ছে। হঠাৎ মনে হলো সেলিম যেন একটু নড়ল, মিলি চেয়ার থেকে উঠে সেলিমের বিছানার পাশে দাঁড়াল। সেলিম একটু একটু করে চোখ খুলতে শুরু করল। মিলি এক দৃষ্টিতে সেলিমে দিকে তাকিয়ে আছে। সেলিম চোখ খুলেই মিলিকে দেখতে পেল এবং সাথে সাথেই তার চোখের যেন মুহূর্তেই উদ্দীপ্ত হয়ে জ্বলে উঠলো।
মিলি সেলিমের চোখ খুলতে দেখে চোখের পানি ঘরে রাখতে পারল না। বাধ ভাঙা জোয়ারের মতো অশ্রু গড়াতে থাকল। সেলিমের চোখেও পানি। মিলি সেলিমের ডান হাত ধরে আছে। দুজনের কারো মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছে না। দুজন শুধু দুজনের দিকে চেয়েই রইল।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন